Home » জর্জ অরওয়েলের ‘ডায়েরি’ // মধুসূদন মিহির চক্রবর্তী

জর্জ অরওয়েলের ‘ডায়েরি’ // মধুসূদন মিহির চক্রবর্তী

(পূর্বাংশ)

 জর্জ অরওয়েল ডায়েরি লিখতেন। তাঁর অকালমৃত্যুর আগে লেখা শেষ কাজগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল তাঁর ‘ডায়েরি’। সদ্যপ্রয়াত প্রখ্যাত ব্রিটিশ সাহিত্যিক অধ্যাপক পিটার ডেভিসন জর্জ অরওয়েলের ২০ খণ্ডের প্রামাণ্য গ্রন্থ ‘কমপ্লিট ওয়ার্কস’ সম্পাদনার জন্য সর্বাধিক পরিচিত। অরওয়েলের সাথে ডেভিসনের সম্পর্কটি ছিল কয়েক দশকব্যাপী। অধ্যাপক পিটার ডেভিসন এবং তাঁর স্ত্রী নিবেদিতপ্রাণ ব্রিটিশ গবেষক শীলা ডেভিসন মিলে ১৭ বছর ধরে অরওয়েলের নয়টি প্রধান বই থেকে শুরু করে তার হারিয়ে যাওয়া লেখা, ডায়েরি এবং সাংবাদিকতার বিশাল ভান্ডার প্রভৃতি সংকলন ও সম্পাদনা করেন।

জর্জ অরওয়েলের ডায়েরির ভূমিকা হিসেবে গবেষক ক্রিস্টোফার হিচেন্স তাঁর সবচেয়ে প্রিয় লেখকদের একজনের প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি হিসেবে লিখলেও, একে একটি সতর্কবাণী হিসেবেও নেওয়া যেতে পারে। ক্রিস্টোফার হিচেন্স ছিলেন জর্জ অরওয়েলের একজন একনিষ্ঠ বুদ্ধিবৃত্তিক উত্তরসূরি, যিনি সত্যের প্রতি তাঁর অটল সমর্থন, সর্বগ্রাসীবাদ-বিরোধিতা এবং গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্র দ্বারা গভীরভাবে অনুপ্রাণিত হন। হিচেন্স বিশেষভাবে ‘হোয়াই অরওয়েল ম্যাটার্স’ নামক জীবনীমূলক প্রবন্ধটির রচয়িতা। এই প্রবন্ধে তিনি অরওয়েলকে সর্বশ্রেষ্ঠ ইংরেজ প্রাবন্ধিক এবং ক্ষমতা ও গোষ্ঠীচিন্তার টানের প্রতিকূলে বুদ্ধিবৃত্তিক সততার এক নৈতিক উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেন। হিচেন্স লিখেছেন, “এই ডায়েরিগুলো যত্ন সহকারে পড়লে… অরওয়েল কীভাবে দৈনন্দিন অভিজ্ঞতাকে রসদ বানিয়ে কয়েকটি জনপ্রিয় বিখ্যাত উপন্যাস ও বিতর্কিত রচনা গড়ে তুলেছেন, সে সম্পর্কে আমাদের বোঝাপড়াকে ব্যাপকভাবে সমৃদ্ধ করতে পারে।” তিনি অরো বলেছেন, “এই ডায়েরিগুলো কোনোভাবেই একটি ‘সরাসরি’ নির্দেশিকা বা সূত্র ও পারস্পরিক তথ্যের ভান্ডার নয়।” হিচেন্সের ভূমিকা অরওয়েল-ভক্তদের সতর্ক করে দেয় যে, তাঁর অন্যান্য লেখা থেকে পাঠকেরা যে আনন্দ পান, এই বইটি থেকে সেরকম পাওয়ার আশা করা উচিত নয়। এই সংগ্রহটিতে ১১টি ডায়েরির সবগুলোই পাওয়া য়ায় তবে এর সাথে আছে অরওয়েলের দুটো নোটবুকও। ধারণা করা হয় যে, আরও ডায়েরি থাকতে পারে। গবেষক ও সম্পাদক পিটার ডেভিসন দাবি করেছেন যে, “জর্জ অরওয়েলের লেখা একটি দ্বাদশ এবং সম্ভবত একটি ত্রয়োদশ ডায়েরি স্প্যানিশ গৃহযুদ্ধের সময় কর্তৃপক্ষ বাজেয়াপ্ত করে। ওই দুটো ডায়েরি মস্কোর এন.কে.ভি.ডি. আর্কাইভে গোপনে রাখা আছে –এই বিষয়টি প্রায় নিশ্চিত।” ১৯২০-এর দশকে পেশাগত জীবনের শুরুতে অরওয়েল বার্মায় ইমপেরিয়াল পুলিশ কর্মকর্তা থাকাকালীন সময়ে হয়তো একটি দিনলিপি লিখেছেন, কিন্তু সেটি প্রায় নিশ্চিতভাবেই হারিয়ে গেছে। তবে তাঁর বার্মিজ ডেইজ উপন্যাস পাঠ করলে সেকালের বার্মায় কাটানো সময়কে কিছুটা উপলব্ধি করা যায়। সংগৃহীত ডায়েরিগুলোর বেশিরভাগ উপাদান অরওয়েলের রচনার অন্যান্য উৎসেও পাওয়া যায়।

১৯৩১ সালে কেন্টে-এ থাকাকালীন অরওয়েল একজন পরিযায়ী কৃষি শ্রমিক হিসেবে অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। সেই সময়ে লিখিত তাঁর ‘হপ-পিকিং ডায়েরি’ জনপ্রিয় চার খণ্ডের সংকলন ‘দ্য কালেকটেড এসেজ, জার্নালিজম অ্যান্ড লেটার্স’-এ প্রকাশিত হয়। ১৯৩১ সালের আগস্ট থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে লেখা তাঁর অভিজ্ঞতাসমূহের দলিল এই ‘হপ-পিকিং ডায়েরি’। দরিদ্র ও শ্রমিকদের জীবন গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতে অরওয়েল ছদ্মবেশে লন্ডনের বস্তি থেকে কেন্টের হপ (বিয়ার তৈরির উপাদান) খামারে শ্রমিক সেজে কাজ করতে যান। এটি তাঁর পরবর্তী সাহিত্যকর্ম, যেমন ‘এ ক্লারজিম্যান্স ডটার’ উপন্যাসের ভিত্তি হিসেবে কাজ করে।এই ডায়েরিতে অরওয়েল বর্ণনা করেছেন যে কীভাবে হপ গাছগুলো ১০ ফুট উঁচুতে খুঁটি বা তারে বাঁধা থাকত। আমাদের দেশের চা-বাগান সমূহে চা পাতা সংগ্রহের মতো শ্রমিকদের প্রতিদিন প্রায় ১০ ঘণ্টা দাঁড়িয়ে হপের লতাগুলো টেনে বিন বা পাত্রে হপগুলো জমা করতে হতো। হপের কষ এবং ডাঁটার কাঁটায় তাদের হাত কালো হয়ে যেত ও কেটে রক্তাক্ত হতো। শ্রমিকদের প্রতিটি বুশেল হপ তোলার জন্য ২ পেন্স করে দেওয়া হতো। বুশেল হলো শুষ্ক আয়তনের একটি প্রমিত সাম্রাজ্যিক এবং মার্কিন প্রচলিত একক। এটি প্রধানত কৃষিক্ষেত্রে শস্য, ফল এবং শাকসবজির মতো বিপুল পরিমাণে উৎপাদিত পণ্যের ফলন বা পরিমাণ পরিমাপ করতে ব্যবহৃত হয়। হপ তোলার সময় হপের আকার অনুযায়ী আয় কম-বেশি হতো, আবার অনেক সময় পরিমাপক ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে হপগুলো ডলে বুশেলের পরিমাণ কমিয়ে দিতেন। হপ তোলা শ্রমিকদের থাকার জায়গাগুলো ছিল অত্যন্ত শোচনীয়। ভালো ঘর না থাকায় শ্রমিকদের গোল টিনের কুঁড়েঘরে থাকতে হতো, সেগুলোর জানালা ছিল কাঁচহীন। কুঁড়েঘরের মেঝেতে খড় বা হপের লতা বিছিয়ে শ্রমিকদের ঘুমাতে হতো। এই অভিজ্ঞতা অর্জনকালে অরওয়েল জিংগার নামক এক বেপরোয়া, প্রায় অর্ধ-শিক্ষিত কিন্তু সাহসী তরুণের সাথে বন্ধুত্ব করেন। সমাজ ও প্রান্তিক মানুষের এই রুক্ষ জীবনযাত্রা অরওয়েলের বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গি এবং ‘অ্যানিম্যাল ফার্ম’ ও ‘নাইটিন এইটি-ফোর’ উপন্যাসের চরিত্র গঠনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল।

ত্রিশের দশকের মাঝামাঝি সময়ে উত্তর ইংল্যান্ডের নোংরা অঞ্চলে ভ্রমণের ডায়েরিটি, যেখানে ধাতুমলের স্তূপ, ময়লার ট্রেন, কালো হয়ে যাওয়া বাড়িঘর এবং মলিন মুখে নতজানু বসে থাকা অর্ধনগ্ন খনি শ্রমিকদের কথা উল্লেখ ছিল, তা থেকেই অরওয়েলের বই ‘দ্য রোড টু উইগান পিয়ার’ তৈরি হয়। এই বইটি শুরু করা হয়েছিল এভাবে, “ভোরবেলায় পাথরের সড়কে কাঠের খড়ম পায়ে দিয়ে কারখানায় কাজ করা নারীরা খটখট শব্দ করে হেঁটে যায়, যা এক অদ্ভুত ভীতিকর আওয়াজ তৈরি করে”, পরবর্তীতে সেটিকে পরিমার্জন করে মনোযোগ আকর্ষণকারী উদ্বোধনী বাক্যে পরিণত করা হয়, “সকালের প্রথম শব্দ ছিল পাথরের সড়কে কারখানার নারী শ্রমিকদের কাঠের খড়মের খটখট শব্দ।” জর্জ অরওয়েলের ১৯৩৭ সালের গ্রন্থ ‘দ্য রোড টু উইগান পিয়ার’ -এর প্রথম অংশে ইংল্যান্ডের উত্তরাঞ্চলের কয়লা খনি শ্রমিক ও দরিদ্র শ্রমিক শ্রেণীর শোচনীয় জীবনযাত্রার বাস্তব চিত্র তুলে ধরেছেন অরওয়েল। দ্বিতীয় অংশে সমাজতন্ত্রের তাত্ত্বিক দুর্বলতা এবং বুদ্ধিজীবী মহলের কপটতার সমালোচনা করা হয়েছে। অরওয়েল এই গ্রন্থে ভয়াবহ বাস্তবতার চিত্রায়ন করেছেন। তিনি উইগান, ম্যানচেস্টার ও বার্নসলির মতো শিল্প শহরগুলোতে ভ্রমণ করেন এবং শ্রমিকদের মানবেতর জীবনযাপন, চরম বেকারত্ব, নোংরা পরিবেশ ও স্বাস্থ্যঝুঁকি নিজের চোখে দেখেন। তিনি মাটির নিচে খনিতে কয়লা উত্তোলনের ভয়ানক ও শারীরিক কষ্টকর প্রক্রিয়াটি বিস্তারিত তুলে ধরেছেন। গ্রন্থটির দ্বিতীয় পর্বে তিনি সমাজতন্ত্রের সমালোচনা করেছেন। অরওয়েল নিজেকে একজন সমাজতান্ত্রিক বলে মনে করতেন। তবে তিনি যুক্তি দেন যে, মধ্যবিত্ত বুদ্ধিজীবীরা প্রায়শই শ্রমিক শ্রেণীর সাথে মিশতে চান না, বরং তাদের চালচলন ও আচার-আচরণে আভিজাত্য বজায় থাকে। তাদের জটিল ও তাত্ত্বিক কথাবার্তা সাধারণ শ্রমিকদের কাছে সমাজতন্ত্রকে অপ্রাসঙ্গিক বা কঠিন করে তোলে। অরওয়েল তাঁর নিজের মধ্যবিত্ত শ্রেণি এবং শ্রমিক শ্রেণীর মধ্যকার সাংস্কৃতিক ও মানসিক দূরত্বের কথা অকপটে স্বীকার করেছেন।তিনি বিশ্বাস করতেন যে, যদি এই কৃত্রিম শ্রেণি বাধাগুলো দূর করা না যায়, তবে সমাজতন্ত্র কখনোই কার্যকর হবে না। গ্রন্থটির মূল লক্ষ্য ছিল সুবিধাপ্রাপ্ত মধ্যবিত্ত সমাজকে বোঝানো যে, শ্রমিকরা অলস বা নিকৃষ্ট নয়, বরং একটি ত্রুটিপূর্ণ অর্থনৈতিক ব্যবস্থার শিকার।

অরওয়েলের ডায়েরিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুইটি ডায়েরি তিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শুরুর দিকের বছরগুলোতে লিখেছেন। সেই সময়ের ডানকার্ক থেকে পশ্চাদপসরণ, ফ্রান্সের পতন এবং লন্ডন শহরে আকস্মিক বিমান হামলার মতো গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলো ঘটেছিল। লন্ডন শহরে অরওয়েলের অ্যাপার্টমেন্ট ভবনটিও একটি জার্মান ডুডলবাগ বোমার আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ডানকার্ক থেকে পশ্চাদপসরণের আগ মুহূর্তে আক্রমণকারী জার্মান সেনাবাহিনী ব্রিটিশ অভিযাত্রী বাহিনী এবং মিত্রবাহিনির ইউনিটগুলোকে পরিবেষ্টন করে রেখেছিল। নিম্নভূমি অঞ্চল এবং উত্তর ফ্রান্সে জার্মানি দ্রুত ‘ব্লিটজক্রিগ’ কৌশল অবলম্বন করে। ফলে, ব্রিটিশ অভিযাত্রী বাহিনী (BEF) এবং মিত্রবাহিনির ইউনিটগুলো বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে এবং ইংলিশ চ্যানেলের দিকে পিছু হটতে বাধ্য হয়। আকস্মিক বিমান হামলাসহ ‘ব্লিটজক্রিগ’ (জার্মান ভাষায় যার অর্থ ‘বিদ্যুৎগতি যুদ্ধ’) এমন একটি সামরিক কৌশল যা দ্রুত, কেন্দ্রীভূত এবং অপ্রতিরোধ্য শক্তির ওপর জোর দেয়। যান্ত্রিক পদাতিক বাহিনী, ট্যাঙ্ক, কামান এবং বিমান সহায়তাকে সমন্বিত করে তীব্র গতি এবং মনস্তাত্ত্বিক আঘাতের মাধ্যমে দ্রুত বিজয় অর্জন করার লক্ষ্যে ‘ব্লিটজক্রিগ’ পরিচালিত হয়। এর ফলে শত্রুর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সংগঠিত করার ক্ষমতাকে অচল করে দেয়। যদিও জার্মান সামরিক বাহিনী কখনও আনুষ্ঠানিকভাবে ‘ব্লিটজক্রিগ’ শব্দটি একটি স্বতন্ত্র মতবাদ বা পন্থা হিসাবে গ্রহণ করেনি। এই কৌশলটি আধুনিক দেশগুলোর যুদ্ধ করার পদ্ধতি পরিবর্তন করে দিয়েছে।

ওদিকে মিত্রশক্তি কর্তৃক ডানকার্কের পশ্চাদপসরণকে আনুষ্ঠানিকভাবে অপারেশন ডায়নামো বা ‘ডানকার্কের অলৌকিক ঘটনা’ হিসেবে অভিহিত করা হয়। এটি ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের একটি বিশাল সৈন্য অপসারণ অভিযান। ১৯৪০ সালের ২৬শে মে থেকে ৪ঠা জুনের মধ্যে ফ্রান্সের ডানকার্কের সৈকত ও বন্দর থেকে ৩৩৮,০০০-এরও বেশি মিত্র সৈন্যকে (ব্রিটিশ, ফরাসি এবং বেলজিয়ান) উদ্ধার করা হয়। অভিযানটি ডোভার ক্যাসেল থেকে পরিচালিত হয় প্রায় ৭০০টি জাহাজের একটি বিশাল নৌবহরের সমন্বয়ে। এর মধ্যে ছিল নৌবাহিনীর ডেস্ট্রয়ার, বাণিজ্যিক জাহাজ, মাছ ধরার নৌকা ও প্রমোদতরীর মতো শত শত বেসামরিক ছোট জাহাজ। এর ব্যাপকতা ছিল বিশাল। নয় দিনে, ৩৩৮,২২৬ জন পুরুষকে (যার মধ্যে ১ লক্ষেরও বেশি ফরাসি সৈন্য ছিল) ইংলিশ চ্যানেল পার করে ব্রিটেনে নিরাপদে নিয়ে যাওয়া হয়। তবে এর জন্য ব্যাপক মূল্যও দিতে হয় মিত্রশক্তিকে। জনবল বাঁচানো সম্ভব হলেও সমস্ত ভারী সরঞ্জাম পরিত্যাগ করতে হয়, যার ফলে সৈকতে ২,০০০-এর বেশি কামান, ৮৫,০০০ যানবাহন এবং শত শত ট্যাঙ্ক ফেলে আসতে হয়। এটি একটি পশ্চাদপসরণ এবং একটি বড় কৌশলগত পরাজয় হলেও এই সফল উদ্ধার অভিযান ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষিত মূল অংশকে রক্ষা করে। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল এই ঘটনাটিকে জাতীয় মনোবল বাড়ানোর জন্য ব্যবহার করেন এবং তাঁর বিখ্যাত “আমরা সৈকতে যুদ্ধ করব” ভাষণে প্রতিরোধ চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান।

অরওয়েল হোম গার্ডে কর্মরত ছিলেন এবং বিবিসির জন্য কাজ করতেন। তিনি এমন এক জনগোষ্ঠীর বর্ণনা দেন, যারা জার্মানদের বিমান আক্রমণ সত্ত্বেও তাদের দৈনন্দিন কাজকর্ম চালিয়ে যেতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞই ছিল বলা যায়। অরওয়েলের চুল-দাড়ি কামাতেন যে নাপিত, তিনি বিমান হামলার মাঝেও খদ্দেরদের দাড়ি কামানো চালিয়ে যেতেন দেখে বিচলিত অরওয়েল ভাবতেন: “একদিন বোমাটা এত কাছে পড়বে যে সে চমকে উঠে কারও গালের অর্ধেকটা কেটে ফেলবে।” মূলত, লন্ডনের বাসিন্দারা সাম্প্রতিক ঘটনাবলি নিয়ে কোনো আলোচনা এড়িয়ে চলার খুব চেষ্টা করত। একদিন সন্ধ্যায় তিনি পাবে গিয়ে দেখেন রেডিও বন্ধ করা আছে। প্রশ্ন করলে পাবের মালিক তাকে বলেন, “পাশের বারে পিয়ানো বাজছে, আর শুধু খবর শোনার জন্য তারা সেটা বন্ধ করবে না।” অরওয়েলের ‘সাধারণ মানুষ’ সত্তাটি তার স্বদেশীদের এই অবিচলিত ও কাজ চালিয়ে যাওয়ার মানসিকতায় উৎসাহিত হতো, আর তার নীতিবাদী সত্তাটি হতাশ হয়ে পড়ত।

এক পর্যায়ে অরওয়েল তাঁর যুদ্ধকালীন ডায়েরিগুলোকে বই আকারে প্রকাশ করার একটি পরিকল্পনা নেন, কিন্তু তাঁর দীর্ঘদিনের প্রকাশক ভিক্টর গোলানকজ সেই পরিকল্পনাটি বাতিল করে দেন। তিনি আশঙ্কায় ছিলেন যে, গ্রন্থাকারে প্রকাশ হলে অনেকেই হয়ত অসন্তুষ্ট হতে পারেন। গোলানকজের উদ্বেগ অমূলক ছিল না। যদিও অরওয়েল দেশপ্রেমের সাথে লিখেছেন যে, তিনি শরণার্থী বা নির্বাসিত হওয়ার চেয়ে ইংল্যান্ডের জন্য মৃত্যুবরণ করাকেই শ্রেয় মনে করেন। তবুও তাঁর রচনার একটি বিশাল অংশ জুড়ে রয়েছে সেই বিদ্রোহী মনোভাব, যাকে তিনি “কর্তৃত্ববাদের প্রতি আমার সহজাত ঘৃণা” বলে অভিহিত করেছেন। “ব্রিটেনের শাসকেরা ছিল বিশ্বাসঘাতক, আর সেনাপতিরা ছিল নির্বোধ”। “যদি কোনো অন্যায় কাজ করার থাকে, তবে তা নির্ভুলভাবে করতে হবে।” এমনকি তিনি চার্চিলকেও দৃশ্যপট থেকে সরিয়ে দেওয়া উচিত বলে মনে করতেন, সম্ভবত তাঁর ভ্রমণের সময় কোনো জার্মান টর্পেডো বা মাইনের মাধ্যমে। এই ধরনের কথাবার্তা মোটেও মানুষের মনোবল বাড়ানোর মতো ছিল না এবং ব্রিটিশ জনগণের পক্ষে এইসব দিনলিপি পড়ে দেখার সুযোগ হয়নি। তাই অরওয়েলের এইসব বিদ্রূপের প্রতি প্রতিক্রিয়া দেখানোর সুযোগও তারা কখনোই পায়নি। অন্তত তখন তো নয়ই। কিন্তু কিছু ছোটখাটো বাদ পড়া অংশ ছাড়া, যুদ্ধকালীন ডায়েরিগুলো অনেক আগে থেকেই ‘দ্য কালেক্টেড এসেইজ, জর্নালিজম অ্যান্ড লেটারস’ গ্রন্থে পাওয়া যাচ্ছিল এবং কয়েক বছর আগে জর্জ প্যাকার তাঁর অরওয়েল সংকলন ‘ফেইসিং আনপ্লিজেন্ট ফ্যাক্টস’ -এ সেগুলোর একটির বেশ বড় অংশ পুনর্মুদ্রণ করেন। 

(চলবে)

মধুসূদন মিহির চক্রবর্তী

তথ্য ও বিজ্ঞাপন চলচ্চিত্র নির্মাণ, আবৃত্তি ও অনুবাদ করার পাশাপাশি মধুসূদন মিহির চক্রবর্তী একজন পরিব্রাজক। বিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর। কুমিল্লা জেলার ঐতিহাসিক প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান ময়নামতিতে তার পৈত্রিক আদিনিবাস। তিনি প্রথম ও পূর্ণাঙ্গভাবে ভারতবর্ষে আরবদের প্রথম বিজয় সম্পর্কিত ইসলামের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ ও দুর্লভ গ্রন্থ চাচনামাহ অনুবাদ করেছেন। গ্রন্থটি বাংলাদেশসহ ভারতের বাংলা ভাষাভাষী অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে সহায়ক পাঠ্য হিসেবে বিবেচিত

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ভাষা
Scroll to Top