একটা বিরাট কালো পাথর ধীরে ধীরে নেমে আসে মিরাজের বুকের উপর। সে শুয়ে আছে বিকট কাচিমের মতো চিৎ হয়ে। ভয়ে চোখ বন্ধ। বড় করে নিশ্বাস নেওয়ার সময় খরখরে পাথরের সঙ্গে বুকের স্পর্শ অনুভব করে। কেউ যেন সূক্ষ সূতা দিয়ে পাথরটা তার বুকের উপর ঝুলিয়ে তামাশা দেখছে। ধীরে ধীরে পাথরটা এমনভাবে চেপে বসে যে তার নিশ্বাস নিতে ভীষণ কষ্ট হচ্ছে। তার মনে হয় বুকের দুর্বল পাঁজরগুলো মটমট শব্দে ভেঙে গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে যাবে।
শরীরের পুরো শক্তি দিয়ে দুই হাত দিয়ে ঠেলে বুকের উপর চেপে বসা পাথর সরানোর চেষ্টা করে। কিন্তু তার দুর্বল দুটি হাত কিছুতেই সেই পাথর সরাতে পারে না।তার মনে হচ্ছে সে কেন দেশের ষোল কোটি মানুষের বত্রিশ কোটি হাতও এই পাহাড়সহ এই পাথর সরাতে পারবে না। হাত-পা ছুঁড়ে ছটফট করতে করতে ঘুম ভেঙে গেলে সে বুঝতে পারে তার হাঁপানির টান উঠেছে।
ঘামে পুরো শরীর ভিজে গেছে। সে উঠে দুই হাঁটুতে মাথা রেখে বসে, তার পর শুরু হয় কাশি। জুনের মাঝামাঝি এমনিতেই গরম। তার উপর তার ঘরের টিনের চাল সারাদিন গরমে তেতে থাকে। যাত্রাবাড়ির করাতটোলার –তিনতলা বাড়ীর ছাদের উপর দুই রুমের টিনের ঘরটাতে বউ আর দুই মেয়ে এক ছেলে নিয়ে মিরাজ উঠেছে অনেক বছর আগে। ঝড় বৃষ্টি কিংবা খরতাপের প্রথম ধাক্কাটা এই টিনের ঘরটাকেই আগে সামলাতে হয়। তবু ঘরটা আঁকড়ে আছে ছাদটুকুর লোভে, বিশেষ ঠেকায় না পড়লে নিচ থেকে কেউ সরু সিঁড়ি দিয়ে উপরে ওঠার ঝুঁকি নিতে চায় না। তাই এই ছাদের উপর ব্যবহারিক স্বত্ত্ব পুরোপুরি তাদের। এই ঘরের কিছু উপকারিতাও আছে। যত গরমই পুড়ক, ভোরের দিকে কুয়াশাভেজা টিনের চাল থেকে একধরনের শীতল বাতাস নেমে আসে, এছাড়া বর্ষায় বৃষ্টির অবিরাম শব্দে ছোটবেলার গ্রামের সুখস্মৃতি পাওয়া যায়।
এবারের গরমটা অনেক বেশি, ভোরের দিকেও শীতল বাতাসের দেখা নেই।
ভোরের দিকে এই রকম অদ্ভূত স্বপ্নটা কেন দেখে সে, মনের মধ্যে এই প্রশ্ন বারবার হানা দেয়। হাঁপানির টানের সঙ্গে এই স্বপ্নের কোনো সম্পর্ক নাই, এই রোগ তার পুরানো।
তেল চিটচিটে শক্ত বালিশে হেলান দিয়ে মিরাজ মিয়া ডাঙ্গায় তোলা বোয়াল মাছের মতো হা করে নিশ্বাস নেয়। রাত কতো বুঝতে পারে না, তৃষ্ণায় বুকের ছাতি ফেটে যাওয়ার মতো হলেও উঠে গিয়ে পানি খাওয়ার জোর নেই শরীরে।
পাশে নূরজাহান ঘুমাচ্ছে। ঘাড় উঠিয়ে সোজা হয়ে বসে নিজেকে সামাল দেয়ার চেষ্টা করে। বউকে এত রাতে জাগানো ঠিক হবে না, পরিশ্রমের শরীর। ফজরের আজান দিলে একাই উঠে যাবে।
মিরাজ পাথর চেপে বসার খোয়াব নিয়ে ভাবে, এই ধরনের খোয়াবের কি অর্থ হতে পারে। ভালো কিছু যে নয়, সেটা বুঝতে পারে, অদৃশ্য একটা জগদ্দ্ল পাহাড়ের নিচে এমনিতেই চাপা পড়ে আছে, নতুন করে আর পড়ার কি আছে? তার মনে হয় যেকোনো দিন তার দম বের হয়ে যাবে, তারই ইঙ্গিত দেয়া হচ্ছে।
মিরাজ মিয়া ক্রনিক হাঁপানির রুগি বলতে যা বুঝায় তা নয়, পরিশ্রম বেশি হলে শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়। টানা দুই দিন বিছানায় লেপটে থেকে আবার সোজা হয়ে উঠে তীব্র ঝড়ে নোয়ানো নারিকেল গাছের মতো।
মিরাজ মিয়া বহু দিন থেকেই ভ্যান চালায়, পায়ে চালানো ভ্যানটাতে ইঞ্জিন লাগাতে পারলে তার এত কষ্ট হত না। এনজিও থেকে ঋণ করে ভ্যানে ইঞ্জিন লাগিয়েছে ঠিকই, ততদিনে তার শরীর ঘুনপোকায় খাওয়া ফোকলা কাঠের মতো হয়ে গেছে। স্বপ্নের কথা ভাবতে ভাবতে আবার ঘুমিয়ে যায় মিরাজ। যখন ঘুম ভাঙে তখন রান্না ঘর থেকে রুটি শেকার গন্ধ পায় সে।
শেকা রুটির গন্ধটা নেশার মতো লাগে। ডান হাতে বুক চেপে ধরে জোর করে শ্বাস নেয় মিরাজ আর থেমে থেমে বড় মেয়ে মিতুকে ডাকে। ডাকাডাকির পর মিম এসে বলে, “আব্বা মিতুপা ঘরে নাই।”
“কই গেছে?”
“আপা টিউশনিতে গেছে।”
“ তোর আম্মা কই?”
“আম্মা আর বড়পা সকালবেলা আরবি পড়াতে যায়, তুমি জানো না আব্বা?”
“জানি, তবু জানতে চাইলাম।”
“রাতে তোমার হাঁপানি উঠেছে, আম্মা তোমাকে বাইরে যেতে নিষেধ করে গেছে।”
“দেখ না মা, মাঝরাতে হাঁপানির টান উঠেছে।”
মিমি বাপের কপালে হাত দিয়ে দেখে শরীর গরম।
“আব্বা, তোমার শরীরে জ্বর। আম্মা বলে গেছে মাঝ রাতে তোমার শ্বাস টান উঠেছে। এখন দেখছি জ্বরও এসেছে। তোমাকে একটু গরম দুধ দেব আব্বা?”
“রাব্বির কোন খবর আছে মা,রাব্বিটা এখন কোন ইয়ারে? তার পাস করে বের হতে কতো দিন লাগবে?”
“ তোমাকে কতোবার বলেছি, সেকেন্ড ইয়ারে, আরো দুই বছর তো লাগবে।”
“আমি একটা খারাপ খোয়াব দেখেছি” বলে মেয়েকে বলার জন্য সোজা হয়ে বসে।
“নিশ্চয় খারাপ খোয়াব দেখেছ, খারাপ খোয়াব হলে বলার দরকার নাই।”
“খারাপ হলেও তোকে বলি। খোয়াবে দেখি বড় একটা কালোপাথর আমার বুকের উপর নেমে আসছে। ধীরে ধীরে পাথরটা আমার বুকের উপর চেপে বসে..।” এই পর্যন্ত বলে মিরাজ দেখে মিম তার সামনে নেই। মনে মনে মিরাজ বলে, এদের একটা কথা শোনারও ধৈর্য নেই।
মিম রান্না ঘর থেকে একবাটি দুধ আর দুইটা রুটি নিয়ে এসে বলে, “তুমি কি যেন বলছ পাথরের কথা। তুমি একা না, সারা দেশের মানুষের বুকের উপর পাথর চেপে আছে, এর মধ্যেই মানুষ বেঁচে আছে, তুমিও বেচে থাকবা।”
“আমাকে নিয়ে চিন্তা করি না, চিন্তা করি তোদের নিয়ে।”
“আমাদের নিয়ে চিন্তা করিও না, তোমাকে কতবার বলেছি ভ্যান চালানো ছেড়ে অন্য কিছু করো। শুনলা না।“
“কি হইছে শোন মিম” বলে মিরাজ সোজা হয়ে বসে দম নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে।
“এবার সমস্যাটা হইছে লোভের কারণে। যাত্রাবাড়ি পাইকারি বাজার একটা এলাহি কারবার। তোর ইয়াসিন কাকা বলে, মিরাজ ভাই বড় একটা কাম পাইছি, ঠিকা কাজ। তার কথায় রাজি হয়ে গেছি, এত মাল যে টানতে হবে বুঝতে পারিনি।”
“তুমি বানায় বানায় আর কতো গল্প করবা আব্বা! ইয়াসিন কাকা আজ পনের দিন হয় গ্রামে গেছে। তার শালাকে পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে, এই খবর শুনে বাড়ি যে গেছে আসার কোনো খবর নাই।”
মিরাজ বোকার মতো হাসে। প্রসঙ্গ পাল্টাতে মিমকে বলে, “পুলিশ ধরছে কি জন্য?”
“পুলিশের মন চাইছে সে জন্য ধরেছে। পুলিশ ধরার জন্য কোন কারণ লাগে? তুমি ঠিকমতো শ্বাস নিতে কেন পারছো না পুলিশ চাইলে এই জন্য তোমাকে ধরে নিয়ে যেতে পারে।”
মিমের কথায় মিরাজ হাসে, সাথে মিমও। মনে হচ্ছে অনেকদিন পর বাপ মেয়ে একসঙ্গে হাসল।
২
রাব্বি মোবাইলে হঠাৎ করে ২০১৮ সালে নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের সময়ের একটা ছবি পেয়ে যায়। তখন সে মাত্র অষ্টম শ্রেণির ছাত্র। সে নিজে একটা কাগজে শ্লোগান লিখে রাস্তায় নামে। এতে লেখা ছিল:
“নিজের খাই নিজের পরি
তবু কেন রাস্তায় মরি।”
ছবিটা দেখে নিজেরই হাসি পায়, কত ছোট ছিল তখন।
সেই ছবিটা তখন ভাইরাল হয়েছিল। ‘নিজের খাই নিজের পরি/ তবু কেন রাস্তায় মরি।’
এই কথা বলে বলে মিম আপু অনেক ক্ষেপাত। বলত আমাদের বীর বাহাদুর রাব্বি ভাই।
ছবিটা ফেসবুকে আবার পোস্ট দিয়ে রাব্বি লেখে আবার লড়াই হবে। ছবিটা পোস্ট দিয়ে রাব্বি লাইট অফ করে শুয়ে পড়ে।
কিছুক্ষণের মধ্যে হোয়াটসএপে রিংটোন, মিতু আপুর ফোন।
“তুই কি করিস রাব্বি?”
“আপু শুয়ে আছি।’
“ শুয়ে আছিস ভালো কথা, তুই এটা কি পোস্ট করেছিস? এক্ষুণি ডিলিট কর।’
“তুমি ভয় পাচ্ছ আপু, ভয় পাওয়ার কিছু নাই।”
“তোকে এতো পাকামি করতে বলিনি, ডিলিট করতে বলেছি, ডিলিট কর।”
“সারা দেশে স্টুডেন্টরা নেমে পড়েছে, এবার অন্যরকম কিছু হবে..”
“তোকে যেটা বলছি, সেটা কর, এক্ষুণি কর, আম্মা আব্বা কারো শরীর ভালো না, তোর এসব বাড়াবাড়ি ভালো হচ্ছে না।”
“করছি করছি, আপু..”
ফেসবুক খুলে দেখে পোস্টটা বিশবার শেয়ার হয়েছে, মানে ছড়িয়ে গেছে।
রাব্বি পোস্ট ডিলিট করে শুয়ে পড়ে।
পরের দিন দুপুর পর্যন্ত ঘুমিয়ে কাটিয়ে দেয় রাব্বি। বিকেলে আখতার আসে। দুজনে ক্যান্টিনের রেলিংয়ের উপর পাশাপাশি বসে মোবাইলে রিল দেখে। তখন পড়ন্ত বিকেল। হঠাৎ আক্তার বলে উঠে ‘শিট’।
মোবাইলের স্ক্রিনে চোখ রেখে রাব্বি বলে, “ডাটা শেষ। এখন কি করবো।”
‘ডাটা শেষ হইছে কি হইছে?”
‘দাঁড়া তোকে ডাটা দিচ্ছি।”
মোবাইলের ডাটা পেয়ে খুশি আকতার আবার রিল দেখতে শুরু করে।
“তোর মামার কোনো খবর আছে?”
“না।”
“তোর মামাকে ধরেছে কতোদিন হবে?”
“দুই বছরের বেশি হবে।”
“জেলে আছে, না গুম করে দিয়েছে?”
“না, গুম করেনি।”
“তোর মামাকে কেন ধরেছিল?”
“এই দেশে ধরতে কোনো কারণ লাগে? মামাকে ধরেছে জঙ্গি কানেকশনের কথা বলে। মামা অত্যন্ত নরমশরম টাইপের লোক। হঠাৎ মামা নিখোঁজ। কিছুদিন পর দেখি র্যাব মামাসহ ৫ জনকে নিয়ে মিডিয়া ব্রিফিং করছে। সবার মুখে লম্বা দাড়ি। পরনে আলখেল্লা। মামা জিনসের প্যান্ট আর টিসার্টই পরত।”
“এবার ছাড়া পেয়ে যাবে, চিন্তা করিস না। শোন আকতার, ঢাকায় চলে যাচ্ছি। মিম আপা দুপুরে কড়া নির্দেশ দিয়েছে। কেন ডেকেছেন আমি জানি। আমি দুইবার মিছিলে গেছি এটা জেনে গেছে।”
রাব্বির ঢাকায় যাওয়ার কথাটা রাতেই তার বন্ধুদের সবাই জেনে যায়। সকালে সবাই বাসস্টপে এসে হাজির। রাব্বি সবাইকে দেখে অবাক। “তোরা সবাই সাবধানে থাকিস, আর হয়তো দেখা হবে না।”
৩
রাব্বি বাসায় পৌঁছায় বিকেলের আগে আগে। রাব্বিকে দেখে সবাই হাফ ছেড়ে বাঁচে। রাব্বির পুডিং খুব পছন্দ। তার জন্য পুডিং বানাচ্ছে নূরজাহান বেগম। পাশে চা বানাচ্ছে মিতু। নূরজাহান বলে, “শোন মিতু, রাব্বি যে ঢাকায় আসার জন্য এক কথায় রাজি হবে ভাবতে পানিনি। ছেলেটা হয়েছে অনেক একরোখা।”
“এসেছে ভালো কথা, দেখ কতোক্ষণ বাসায় ধরে রাখা যায়।”
এই সময় রাব্বি এসে পা ঝুলিয়ে খাটে বসে পেছনে সরু দু হাতে ভর দিয়ে।
একুশ বাইশ বছরের ছেলেদের চেহারা যেমন মায়া মায়া থাকে রাব্বির চেহারাও এর ব্যতিক্রম নয়। হালকা পাতলা শরীর, খাড়া নাকের নিচে চিকন গোপের রেখা। ঘাড় অবধি নেমে আসা এলোমেলো চুল, মনে হয় কোনোদিন চিরুনি পড়েনি। চোখে কৌতুক। পাশের মসজিদ থেকে মাগরিবের আজান ভেসে আসে। অন্য দিনের তুলনায় মুয়াজ্জিনের গলা কেমন যেন ভরাট, বেদনার্ত। মাথায় কাপড় টেনে রাব্বির পাশে গিয়ে বসে নূরজাহান। আর এক পাশে মিম। চা নাস্তা নিয়ে এসে মিমের পশে বসে মিতু।
নূরজাহান বেগম এক পিস পুডিং ছেলের মুখে তুলে দেয়। আঁচল দিয়ে মুখ মুছিয়ে দিয়ে ধীরে ধীরে বলে, “আমাদের পরিবারের কি অবস্থা তুই জানিস না বাবা। তোর বাপ অসুস্থ, ঠিক মতো কাজ করতে পারে না। তোর বোনরা টিউশনি করে সংসার চালায়। সবার ভরসা তোর উপর, আমাদের বংশের একটা ছেলে ইঞ্জিনিয়ার হবে, আমাদের কতো আশা। তুই নিজেকে শেষ করে দিবি?”
তার নিষ্পাপ চাহনি, পাতলা ঠোঁটের কোনে বিদ্রুপের হাসির সামনে সবাই কেমন যেন ম্রিয়মান।
“তুমি কি বলতে চাইছ সেটা বলো’’
“এতোদিন গেছিলি গেছিলি, আর যাইস না বাবা, পুলিশ পাগলা কুত্তা হয়ে গেছে।’’
“তা তো হবেই, পুলিশের পাগলা কুত্তা হওয়ারই কথা।’’
“তুই মিছিলে যাইস না রে বাবা, কতো কষ্ট করি দেহছ, আমার কষ্ট কি তোর কলিজায় লাগে না বাবা? তুই কোন অভাবে যাবি বাবা?”
“আম্মু তুমি কাইন্দ না, মুগ্ধ আর আবু সাইদ শহীদ হয়েছেন, তাদের রক্তের মূল্য নাই?”
“যে গেছে গেছে, তোকে ছাড়া বাঁচুম না রে বাজান।’’
সবাই নিশ্চুপ, কারো মুখে কোন কথা নেই।
নিরবতা ভেঙে নিতু চিৎকার দিয়ে বলে, “তোকে ঢাকায় এনেছি কি মিছিলে পাঠানোর জন্য? গুলি খেয়ে মরার জন্য?”
এসময় পায়ের বুড়ো আঙ্গুল দিয়ে মেঝেতে বিলি কাটে রাব্বি। একসময় মাথা তুলে রাব্বি বলে, “আম্মা, আমাকে বুঝিয়ে বা ধমক দিয়ে লাভ হবে না। আমি মিছিলে যাব। আবু সাইদ ভাই নাই, মুগ্ধ ভাই নাই, আমি আমরা ঘরে বসে থাকতে পারি না। সব ছেলেমেয়ে রাস্তায় নেমে এসেছে, মায়েরাও রাস্তায়, তুমি আমাকে আটকাচ্ছ কেন? তোমারও উচিত রাস্তায় নামা। আমি জানি আপুরাও রাস্তায় নেমেছে।”
মিতু মিম একে অন্যের দিকে থাকায়।
নূরজাহান শাড়ির আঁচলে চোখ মুছতে মুছতে বলে, “তোর মামাকে আসতে বলেছি, আমি আর পারছি না।’’
****
রাব্বি শুয়ে আছে ছাদের ছোট রুমটায়, বাড়িওয়ালাকে বলে সিঙ্গেল রুমটা করিয়ে নিয়েছে নূরজাহান বেগম। ছেলে ঢাকায় এলে এই রুমে থাকে। কখনো সখনো তার ভাইরা এলে এই রুমে থাকে। রুমের পাশে সারি করে রাখা টবে ফুলগাছ। কাটা ড্রামে লাগানো বাগানবিলাস রুমের ছাদে আধিপত্য বিস্তার করেছে নিজের মতো করে।
রাত অনেক, রাব্বির রুমে আলো জ¦লছে। মিম নিঃশব্দে গিয়ে রাব্বির মাথার পাশে বসে, আলতো করে চুলে বিলি কেটে দেয়। আশপাশের ভবনের বাতি একে একে নিবে যায়।
রাব্বি মিমের দিকে তাকায়।
“কিছু বলবে আপু?”
গরমের কারণে রাব্বি শুয়েছিল খালি গায়ে। মিমের চোখ জোড়া গিয়ে পড়ে রাব্বির বুকে রাবার বুলেটের আঘাতে ক্ষত স্থানের দিকে। ক্ষতটা এখনো পুরোপুরি শুকায়নি। দেয়ালে ঝুলানো ক্যালেন্ডারটা মাঝে মাঝে খসখস শব্দ করে নড়ছে। মিম ক্যালেন্ডারের পাতায় আজকের তারিখটা খোঁজে। আজ ৪ আগস্ট, রাব্বি শাহবাগে রাবার বুলেটে আহত হয় ২১ জুলাই, এতদিন হয়ে গেছে এখনো ক্ষত শুকায়নি। সেদিনের কথা মনে পড়ে মিমের। দুইটা ছেলে ধরাধরি করে রাব্বিকে উপরে তোলে, রাব্বির শার্ট রক্তে ভেজা। তাকে দেখে মিতু চিৎকার করে ওঠে, ভাগ্যিস সে সময় আম্মা বাসায় ছিল না। রাব্বি নিচু গলায় বলে, তেমন কিছু হয়নি আপু, পুলিশের ছোড়া রাবার বুলেট লেগেছে, আমি টেনে বের করেছি।
লজ্জা পেয়ে রাব্বি খুলে রাখা টিশার্ট দিয়ে বুক ঢেকে দেয়।
“বুলেটটা আর একটু ভিতরে ঢুকলেই তুই শেষ হয়ে যাইতি রাব্বি।’’
“গেলে যাইতাম, কতো ছেলে তো এর মধ্যে শহীদ হয়েছে। এই ভাগ্য সবার হয় না, দেখনা মরতে মরতে বেঁচে গেছি।’’
“চুপ কর শয়তান।’’
“কিছু বলবা আপু, আমার ভীষণ মাথা ব্যথা করছে। মনে হচ্ছে মাথার ভিতরের সব তার ছিড়ে বেরিয়ে আসবে।’’
“ওঠে বস ভাই, এই ট্যাবলেটটা খেয়ে নে, তোর ভালো ঘুমের দরকার। ভালো ঘুম হলে মাথার যন্ত্রণাটা কমে যাবে।’’
বাধ্য ছেলের মতো রাব্বি ধীরে ধীরে উঠে বসে, মিমের দিকে তাকায়।
মিম রাব্বির হাতের তালুতে দুইটা ট্যাবলেট দিয়ে পানির গ্লাস এগিয়ে দেয়।
রাব্বি, হাতের তালুতে রাখা ট্যাবলেটগুলোর দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলে, “আমারে এইডা খাইতে দিলি? আমাকে ঘুম পাড়ায়ে রাখতে চাস?”
ট্যাবলেট দুইটা খেয়ে নিয়ে রাব্বি শুয়ে পড়লে মিম তার মাথায় হাত বুলাতে থাকে।
পাশাপাশি মিতু আর তার মা নূরজাহান শুয়ে আছে, পাশে কাঠের নড়বড়ে চেয়ারে পা তুলে বসে মিম মোবাইলে সারাদিনের খবরাখবর দেখে।
“পাগলাটাকে ঘুমের ট্যাবলেট খাওয়াতে পারলি?”
মোবাইলের স্ক্রিনে চোখ রেখে মিম বলে, “সুবোধ বালকের মতো খেয়ে নিয়েছে, কোন আপত্তি করেনি।’’
বৃষ্টি উপেক্ষা করে শহীদ মিনারে মানুষ আর মানুষ, সেই মানুষের ছবির মাঝে ছোট একটা কাগজের লাল কালিতে লেখা ‘একদফা’। ছবিটা মিম বারেবারে দেখে।
“দুইটা ট্যাবলেটই খাওয়াতে পারছিস?”
“হুম, দুটাই খাওয়াইছি।’’
“আজ না হয় গেছে, কাল কি হবে কে জানে? ফজরের আযানের বেশি দেরি নাই, তোমরা ঘুমাও। ফজরের আযানের পর তোমাদের ডেকে দেব। ঘুমের ট্যাবলেট তো খাইছে, পাগলা কখন উঠে চলে যায় ঠিক নাই।’’
মিম লাইট অফ করে নিঃশব্দে ছাদে এসে দাঁড়ায়। আকাশজুড়ে হালকা কালো মেঘ, মাঝে মাঝে ঝিরিঝিরি বৃষ্টি, এখন বৃষ্টি নেই আছে হালকা শীতল বাতাস। চোখে মুখে বাতাসের ঝাপটা দারুণ একটা শান্তির ছোয়া এনে দেয়।
গলির মাথা থেকে কুকুরের কান্না ভেসে আসে। সবাই যেন কিছু একটার জন্য অপেক্ষা করছে, মহা কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে।
“আপু, তুমি জেগে আছ?”
“কে রাব্বি? তুই ঘুমাসনি? তোকে না দুইটা ঘুমের ট্যাবলেট খাইয়েছি।’’
“ঘুম আসছে না আপু। তুমি জেগে আছ কেন? তোমার ঘুম আসছে না, নাকি আমাকে পাহারা দেওয়ার জন্য জেগে আছ।’’
“দূর পাগল তোকে পাহারা দেয়ার কি আছে?”
“আপু, তোমাকে একটা কথা বলি, দেশের কোন ছেলেকে আটকানো যাবে না, আমাকেও পারবে না।’’
৪
মিরাজ মিয়া যাত্রাবাড়ির পেট্রোল পাম্প পর্যন্ত কোনোরকমে যেতে পেরেছে, পুলিশ আর শতশত মানুষ মুখোমুখি। পুলিশ থেমে থেমে টিয়ারশেল নিক্ষেপ করছে, গুলি করছে। এই যুদ্ধ যাত্রাবাড়িতে কয়েকদিন থেকে চলছে। ছেলেগুলো এক একটা আহাম্মকের আহাম্মক। তোরা কিছু পোলাপান রাস্তায় নামলেই সরকার উল্টে যাবে? সরকার উল্টানো এত সোজা? মাঝখান দিয়ে কিছু বাপ-মার বুক খালি হবে। কারা যে এদেরকে নাচাচ্ছে কে জানে?
এই মারামারির মধ্যে তার বের হওয়ার কোনো ইচ্ছা ছিল না, সে এসেছে রাজুর খোঁজে। রাজুর বয়স বেশি নয়, রাব্বির সমবয়সী। কাঁচামাল লোড আনলোড করে।
কয়েক দিন থেকে রাজুকে ফোনে পাওয়া যাচ্ছে না। কোথাও পাওয়া না গেলেও যাত্রাবাড়ি কাচাবাজারে সবজির আড়তের সামনে ফজলুর চা দোকানে পাওয়া যাবে।
মিরাজকে দেখেই ফজলু মিয়া চিৎকার করে উঠে, “আরে মিরাজ ভাই যে, এতো দিন কই ছিলা?”
“শরীরটা ভালো না, ভ্যান নিয়া বাইর হইনি।’’
“শরীর খারাপ, নাকি ডরে ঘরে হান্দাই রইছ?”
“কি যে কও, এখন ঘরে থাকার টাইম? লম্বারে দেখছনি?”
চায়ের কাপ বাড়িয়ে দিতে দিতে ফজলু মিয়া বলে, “যুদ্ধে গেছে। সকালে আইসা চা বিড়ি খাইয়া ফাইট করতে গেছে। চিন্তা কইরো না, গুলি না খাইলে চা খাইতে আইসা পড়বে। গরিবের ঘোড়া রোগ আছে না, এটা হইলো গরিবের ঘোড়া রোগ। ওনারা সরকার উল্টাই দিবো।’’
“ফজলু ভাই, তোমার বয়স হইছে, পোলাপাইনের মতো কথা কইতেছ।’’
রাজুর কাঁধে ভর দিয়ে পা টেনে টেনে এগিয়ে আসছে নূরু।
“মিরাজ ভাই, ওই দেখ লম্বু।’’
“নূরুর কি হইছে আবার?”
“কি হইবো আবার, গুলি খাইছে আরকি? এখন গুলি খাওয়ার সময়। এত গুলি করতেছে, এত গুলিতে মরতেছে তবু ছেলেগুলো থামছে না।’’
নূরুকে টেবিলে বসিয়ে রাজু বলে ‘‘ফজলু চাচা একটা পানির বোতল দাও।’’
তার বাহু থেকে রক্ত ঝরছে,
“নূরুর বাহুতে রক্ত কেন? কি হইছে?”
“কিছু হয় নাই মিরাজ ভাই, একটা বুলেট এক খাবলা মাংস তুলে নিয়ে গেছে।’’
রাজু পানি দিয়ে ক্ষত স্থান ধুয়ে দিতে দিতে বলে, “আর একটু হলে তোর হাতটা উড়ে যেত নূরু।’’
রাজুর কথায় নূরুর মুখে কষ্টের হাসি।
‘‘চা খইছ মিরাজ ভাই?’’
‘‘খাইছি, তোর জন্য বসে আছি।’’
‘‘তুই আর মিছিলে যাইস না রাজু, তোকে নিয়ে আমার ভয় হচ্ছে।’’
‘‘ভয়ের কিছু নাই মিরাজ ভাই’’ নূরুকে নিয়ে রাজু আবার মিছিলে চলে যায়।
ফজলু বলে, ‘‘তুমি কই যাও?’’
রাজু, নূরু চলে যাওয়ার পর মিরাজ উঠে দাঁড়ায়।
‘‘তুমিও কি মিছিলে যাচ্ছ?’’
‘‘না, আমার ভয় লাগে, নূরুর রক্ত দেখে আমার মাথাটা কেমন করছে।’’
রাজু আর নূরুর কথা ভাবতে ভাবতে মিরাজ বাসায় দিকে হাঁটতে থাকে। গলির মাথায় এসে দেখে লোকের জটলা, একটা সময় ছিল কোনো মানুষ ভয়ে ঘর থেকে বের হতে চাইত না, এখন কোনো লোকই মনে হচ্ছে ঘরে থাকতে চাইছে না।
গলির মাথায় মিরাজ দাঁড়িয়ে হাঁপাতে থাকে, অতিরিক্ত উত্তেজনায় হাঁপানির তোপ বেড়ে যায়। মনে হয় ছেলেগুলোর মতো পুলিশের বন্দুকের সামনে দাঁড়িয়ে থাকে, মাত্র একটা বুলেটে তার এই যন্ত্রণা থেকে মুক্তি। কিন্তু সাহসে কুলায় না।
হঠাৎ নূরুর ফোন; ‘‘মিরাজ ভাই, রাজু গুলি খাইছে, আমরা ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে যাচ্ছি। মাথার খুলি উড়ে গেছে।’’ বলে নূরু ফোন কেটে দেয়। মিরাজ চোখেমুখে ঝাপসা দেখতে থাকে। রাজুর মুখটা চোখের সামনে ভাসতে থাকে, হঠাৎ রাব্বির মুখটা এসে যায়। রাব্বি-রাজু, রাজু রাব্বি চলতে থাকে। হঠাৎ মনে হলো রাব্বির মতো একটা ছেলে দ্রুত পায়ে হেঁটে যাচ্ছে। চোখের ভুল কিনা বুঝতে পারে না। মিরাজ কয়েক পা এগিয়ে দেখে রাব্বিই।
‘রাব্বি, রাব্বি..দাঁড়া বাবা।’
কি মনে করে কয়েক পা এগিয়ে এসে মিরাজের সামনে এসে দাঁড়ায় রাব্বি।
‘‘গুলি হইছে, গুলি, রাজু গুলি খাইছে, তুই যাইস না বাবা। তুই ছাড়া আমাদের কেউ নেই। তোর কিছু হলে তোর মা বাঁচবে না।’’
মিরাজ হাত বাড়িয়ে রাব্বিকে ধরতে যাবে এমন সময় কিছু বুঝে উঠার আগে হঠাৎ রাব্বি তার বুকের মধ্যে প্রচণ্ড জোরে ধাক্কা দেয়, আকস্মিক ধাক্কা সামলাতে না পেরে রাস্তায় চিত হয়ে পড়ে যায় মিরাজ। রাব্বি যে এই কাণ্ড করবে সে ভাবতেও পারেনি। ঘাড় তুলে বিহ্বল মিরাজ অসহায়ের মতো রাব্বির দিকে তাকিয়ে থাকে। তার পর দেখে রাব্বি বাতাসের বেগে কোথায় যেন হারিয়ে যায়। মিরাজের মাথায় তখন একটা শব্দই ঘুরতে থাকে বুলেটের মতো, ‘রাজু গুলি খাইছে, মাথার খুলি উড়ে গেছে, গুলি..,মাথার খুলি…।’
ধুলা ঝাড়তে ঝাড়তে মিরাজ দ্রুত ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো নিয়ে ঘোরের মধে পড়ে যায়। রাজুর মাথার খুলি কি উড়ে গেছে? রাব্বি কি তাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়ে চলে গেছে? মিরাজ খাড়া সরু অন্ধকার সিঁড়ি বেয়ে বাসায় যখন ঢুকে হাঁপানি তখন তীব্র আকার ধারণ করে, শ্বাস কষ্টে তার দুই চোখ যেন বেরিয়ে আসছে। মিরাজ গদি বসে যাওয়া সোফায় হেলান দিয়ে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করে। তার জরাজীর্ণ শরীরের ফুসফুস আরো বেশি জরাজীর্ণ, একটা বুলেট, মাত্র একটা বুলেট ফুসফুসটা ফুটো করে বেরিয়ে গেলে সব কষ্ট শেষ হয়ে যায়।
‘‘আব্বা, রাব্বিকে নিচে দেখেছ, আমরা বাইরে যাওয়ার সময় তালা লাগিয়ে গেছি। সে ঘরের তালা ভেঙে বেরিয়ে গেছে।’’
‘‘গুলি, গুলি খাইছে.. মাথার খুলি উড়ে গেছে, রাব্বি রাব্বি..চলে গেছে, ধাক্কা দিয়ে ..’’
মিরাজের মুখ থেকে বের হওয়া শব্দগুলোর কোন অর্থ বের করতে পারে না।
সবগুলো চোখ মিরাজের দিকে স্থির হয়ে যায়, কারো মুখে কোনো কথা নেই। কে গুলি খেয়েছে? কার মাথার খুলি উড়ে গেছে, কে পড়ে গেছে?
‘‘কি বলতেছ তুমি? কে গুলি খেয়েছে? তোমাকে বলেছি রাব্বি বাসা থেকে পালিয়েছে।”
‘‘আমি আছি ছেলের চিন্তায়, এখন দেখছি এই লোক পাগল হয়ে গেছে।’’
নূরজাহানের ঝাঁঝালো কথার পর মিরাজ নড়েচড়ে বসে, পানির গ্লাসে চুমুক দিয়ে নিজেকে সামলে নিয়ে বলে, ‘‘গলির মাথায় রাব্বিরে পাইছি, ধরতে পারিনি।’’
‘‘গুলি খাইছে গুলি খাইছে বলতেছ কেন?’’
‘‘যাত্রাবাড়িতে রাজু পুলিশের গুলি খাইছে। নূরু ফোন করে জানাইছে, তখনই রাব্বি পালিয়ে যায়।’’
নূরজানা চিৎকার করে বলে, ‘‘তুমি কি ধরনের বাপ হয়েছ, ছেলেটাকে আটকাতে পারো নি? চোখের সামনে ছেলেটা চলে গেছে, বাসায় এসে আবোলতাবোল বকতেছ।’’
‘‘তুমি কি আটকাইতে পারছ? ঘুমের ওষুধ খাওয়াইছ, ঘরের তালা মেরে রেখেছ, শেষ পর্যন্ত আটকাতে পেরেছ?’’
‘‘ঠিকই পারতাম, তোমার পি-ির ব্যবস্থা করতে না যেতে হলে ঠিকই পারতাম। আয় নাই, রোজগার নাই সারাক্ষণ এক হাঁপানি হাঁপানি করে চলছে। বাচ্চা বাচ্চা ছেলোগুলো পুলিশের সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়াচ্ছে, যাও না পুলিশের সামনে, ধুঁকে ধুঁকে চলা এই ফুসফুস নিয়ে বেঁচে কি করবা? ওই যে রাজুর কথা বললা, সে গিয়ে গুলি খেতে পারলে তুমি যেতে পারলা না?’’
মিম, চিৎকার করে বলে, ‘‘তোমরা কি শুরু করেছে? একটা ছেলে চলে গেছে মরতে আর তোমরা ঝগড়া করছ! তোমাদের লজ্জা করে না?’’
কান থেকে মোবাইল সরিয়ে মিতু বলে, ‘‘রাব্বি শয়তানটা মোবাইল বন্ধ করে রেখেছে।’’
‘‘আপু, শামীম মামাকে কল কর, আমার ধারণা রাব্বি শাহবাগেই গেছে।’’
শামীম মামাকে ফেনে পাচ্ছি না।
‘‘শিপলু মামাকে কল কর।’’
“শিপলু মামাকেও পাচ্ছি না।’’
‘‘শামীম ফোন ধরছে না, শিপলুও ফোন ধরছে না’’ বলে আঁচলে মুখে চেপে ঢুকরে কেঁদে ওঠে নূরজাহান।
৫
রাত সাড়ে আটটার দিকে শামীম ফোন ধরে মিতুর।
‘‘মামা, রাব্বি দুপুরে বাইরে গেছে, বিকেল থেকে তার মোবাইল বন্ধ। তাকে পাচ্ছি না।’’
‘‘ কি বলিস, তোদের বলেছি না যে করে হোক ঘরে রাখবি।’’
‘‘রাতে দুইটা ঘুমের ট্যালেট খাওয়াইছি, সারা রাত ঘুাইয়নি। সকালে ঘুমাইছে। আমরা রুমে তালা দিয়ে বাইর হইছিলাম। আব্বা বলল সে বেরিয়ে গেছে। পরে বাসায় গিয়ে দেখি তালা ভেঙে বেরিয়ে গেছে।’’
‘‘শাহবাগে গুলি হইছে, লাশ নিয়ে মিছিল হইছে। কাল দেশে কেয়ামত নেমে আসবে। ছাত্ররা গণভবন ঘোরাওয়ের ডাক দিয়েছে। লাখ লাখ মানুষ ঢাকায় ঢুকবে। তোরা তাড়াতাড়ি শাহবাগে যা, আমিও আসতেছি।’’
ক্যালেন্ডারের সামনে দাঁড়ায় মিম, ১৬ জুলাই সংখ্যাটা লাল কালি দিয়ে গোল করে দাগ দেয়া। পাশে লেখা আছে আবু সাঈদ। ১৮ জুলাই সংখ্যাটাও চারদিকে লাল কালির বৃত্ত। পাশে লেখা মুগ্ধ। এরপরে তারিখগুলোতে কোনো নাম লেখা নেই, কেবল সংখ্যা লেখা।
আজ ৪ আগস্ট, আগস্টের পাতা উল্টায়। হঠাৎ দেখে এক থেকে চার সংখ্যাগুলো লাল হয়ে আছে। চার আগস্ট সংখ্যাটার উপর আলতো করে হাত বুলিয়ে হাতটা সামনে মেলে ধরতেই দেখে আঙ্গুলগুলো রক্তে লাল হয়ে গেছে। এটা কি করে সম্ভব! সে কি পাগল হয়ে গেছে!
মিতু এসে ধমকের সুরে বলে, ‘‘ তুই ক্যালেন্ডারের সামনে কি করছিস? শামীম মামা ফোন করেছে এক্ষুণি শাহবাগ যেতে হবে।’’
শামীমের কথা মতো মিতু, মিম, নূরজাহান প্রথমে ছুটে যায় শাহবাগে। সেখানে থমথমে অবস্থা, শাহবাগ থানায় খোঁজ নেবে কিন্তু সেখানে তারা দাঁড়াতেই পারে না। সেখান থেকে তারা ছুটতে থাকে চানখারপুর থানার সামনে। পথে পথে পুলিশ বিডিআরের ব্যারিকেড। চানখানপুর থানার সামনে বেশ কয়েকটা লাশ। তারা তিনজনে লাশগুলোর মুখ ঘুরিয়ে ঘুরিযে দেখে, সেখানে রাব্বি নাই। লাশের পাশে তারা তিনজনে বসে পড়ে। থেমে থেমে গুলির আওয়াজ আসছে। চোখে মুখে জ্বলন্ত টায়ারের ঝাঁঝালো ধোঁয়া।
এইরকম একটা রাত তাদের জীবনে আসবে কখনো ভাবতে পারেনি। সেখান থেকে তারা যখন ঢাকা মেডিকেলে পৌঁছায় তখন ভোর হয়ে গেছে। মেডিকেলে বিভৎস অবস্থা। মোবাইলের ওয়ালপেপারের রাব্বির ছবি দেখিয়ে পাগলের মতো ছুটতে থাকে মিম মিতু। ডাক্তার নার্স যাকে সামনে পাচ্ছে তাকে মোবইলের স্ক্রিনে ছবিটা দেখায়। নূরজাহান দেয়ালে হেলান দিয়ে বসে আছে।
একজন বলে, আপনারা এখানে না খুঁজে মর্গে খোঁজ নেন।
এটা শুনে চিৎকার করে ওঠে মিম। আমরা মর্গে যাবো না, আমার ভাই মর্গে থাকতে পারে না।
দুই বোন মর্গের দিকে দৌঁড়াতে থাকে। মর্গে একটা ছেলে কয়েকটা লাশের ছবি দেখায় মিতু মিমকে। সারি সারি লাশ। দ্বিতীয় ছবিতে দেয়ালের দিকে শেষ সারির আগের সারিতে রাব্বি পড়ে আছে। একটা স্ট্রেচারে এতটুকু হয়ে গুটিয়ে আছে।
‘‘ও আল্লাাহ আমি কি দেখলাম’’ বলে মিতু জ্ঞান হারিয়ে ফেলে, সঙ্গে সঙ্গে মিমও জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। খুঁজতে খুঁজতে মর্গের সামনে শামীম আর শিপলু এসে দেখে মিম আর মিতু জ্ঞান হারিয়ে পড়ে আছে।
জ্ঞান ফিরলে, মিতু বলে. “ মামা, রাব্বির লাশ দিচ্ছে না, পুলিশের অনুমতি লাগবে। জিগাতলা পুলিশের গুলিতে সে মারা গেছে। ”
চারজনে জিগাতলা পুলিশ স্টেশনের দিকে ছুটতে থাকে। চানখারপুল এলাকায় বৃষ্টির মতো গুলি আসেছে, আকাশ থেকেও গুলি আসছে। অলিগলি পেরিয়ে জিগাতলা পুলিশ স্টেশনের সামনে যখন যায় তখন বেলা দশটা থেকে সাড়ে দশটা হবে।
দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যদের এক একজন হায়নার মতো ক্ষিপ্ত হয়ে আছে।
শামীম আর শিপলুকে পুলিশ সদস্যরা ঘাড় ধাক্কা দিতে দিতে থানার বাইরে নিয়ে আসে। ‘‘শালা মিছিলে গেছে কেন, ভালো হইছে মরছে। এখন আমাদের কাছে কি?’’
পুলিশের এই আচরণে আবার ছুটতে থাকে হাসপাতালের দিকে। যে করেই হোক রাব্বির লাশ বের করতে হবে। ডেথ সার্টিফিকেট ছাড়াই তার লাশ বের করতে হবে। হাসপাতালে গিয়ে দেখে শ্রোতের মতো মিছিল আসছে ছাত্র জনতার। হাসপাতালের পেছনের গেট দিয়ে ছাত্ররা মিছিল নিয়ে বের হতে থাকে। হঠাৎ ক্ষোভের মিছিল পরিণত হয় উল্লাসে।
ভিড়ের মধ্যে দুই মামাকে হারিয়ে ফেলে মিম, মিতু। মাকে হারিয়ে ফেলেছে ভোরের দিকে। ভিড়ের মধ্যে রাব্বির লাশ রাখা স্ট্রেচারের সামনের দিক কাঁধে নেয় মিম আর মিতু, পিছনে দিক কাঁধে নেয় রাব্বির মতো লিকলিকে দুইটা ছেলে। ভাইয়ের লাশ কাঁধে নিয়ে হাসপাতালের মর্গ থেকে উর্ধ্বশ্বাসে দৌঁড়াতে থাকে তারা।
৬
চলমান জনশ্রোতে ছুটে চলছে মিরাজ, ছুটে চলছে বললে ভুল হবে, জনশ্রোতে খড়কুটোর মতো মিরাজকে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে দেশের সব মানুষ যাত্রাবাড়িতে চলে এসেছে। যাত্রাবাড়ি থানা থেকে কুন্ডুলি পকিয়ে ধোয়া উঠছে। ফজলু মাঝে মাঝে লাফিয়ে লাফিয়ে মানুষ দেখছে। তাল মিলাতে না পেরে মিরাজ বারবার পিছিয়ে পড়ছে। তার শরীরে দৌঁড়ানোর শক্তি নাই, তবু সে দৌড়াচ্ছে। বারবার হাত ধরে টেনে নিচ্ছে ফজলু।
হঠাৎ পিছন ফিরে দেখে নূরু। ‘‘মিরাজ ভাই, রাব্বি শহীদ হইছে।’’
মিরাজের কানে এই কথা যায় না। সে উল্লসিত জনতার স্রোতে দৌড়াচ্ছে তো দৌড়াচ্ছে। নূরু মিরাজের হাত শক্ত হাতে টেনে ধরে বলে, ‘‘মিরাজ ভাই রাব্বি শহীদ হইছে, এইমাত্র ফেসবুকে দেখলাম।’’
মিরাজ অত্যন্ত ক্রুর চোখে নূরুর দিকে তাকিয়ে এক ঝড়কায় হাত ছাড়িয়ে নিয়ে ছুটতে থাকে …।
খোকন দাস
খোকন দাসের জন্ম ফেনী জেলার দাগনভূঞা উপজেলার চাঁদপুর গ্রামে; ১৯৭০ সালের ৩১ ডিসেম্বরে। গল্পকার এবং প্রাবন্ধিক। সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের জীবন সংগ্রামই তার লেখার বিষয়বস্তু। প্রকাশিত গল্পের বই : কাক ও অন্যান্য গল্প, খড়ের মানুষ। তিনি কর্মসূত্রে খাগড়াছড়িতে থাকেন।





