Home » সদ্য প্রয়াত আজারবাইজানের কবি নোরিমান হাসানজাদের সাক্ষাৎকার

সদ্য প্রয়াত আজারবাইজানের কবি নোরিমান হাসানজাদের সাক্ষাৎকার

ভূমিকা ও বাংলায় অনুবাদ: মাজহার জীবন

আজারবাইজানের ‘জনগণের কবি’ নোরিমান হাসানজাদে ১৯৩১ সালের ২ ফেব্রুয়ারিতে সে দেশের গাজাক জেলার পোয়লু গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। আজারবাইজানের গাঞ্জা স্টেট ইউনিভার্সিটির ভাষা ও সাহিত্য অনুষদ এবং মস্কোর ম্যাক্সিম গোর্কি লিটেরারি ইনস্টিটিউটে পড়াশোনা শেষে তিনি বাকু স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে ১৯৬৫ সালে সায়েন্স ক্যান্ডিডেট ডিগ্রি অর্জন করেন।

১৯৭৮ থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত তিনি “লিটারেচার অ্যান্ড আর্ট” পত্রিকার প্রধান সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯১ থেকে ২০০১ সময়কালে আজারবাইজানের প্রেস ও তথ্য মন্ত্রণালয়ের প্রথম উপমন্ত্রী এবং ভারপ্রাপ্ত মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন তিনি। ২০০১ সাল থেকে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি ন্যাশনাল অ্যাভিয়েশন একাডেমির মানবিক বিভাগ পরিচালনা করেন।

তিনি ইউএসএসআর লিটারারি ফান্ডের আজারবাইজান শাখার পরিচালক হিসেবে এবং স্থানীয় কাউন্সিল ও আজারবাইজানের সুপ্রিম সোভিয়েতের দ্বাদশ অধিবেশনে প্রতিনিধিত্ব করেছেন।

আজারবাইজানি সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে তাঁর অবদানের জন্য “শোহারাত অর্ডার” (২০০১), “শারাফ অর্ডার” (২০১১), “ইস্তিগলাল অর্ডার” (২০২১) এবং “হায়দার আলিয়েভ অর্ডার” (২০২৬) প্রভৃতি রাষ্ট্রীয় সম্মাননা অর্জন করেন। ২০০৫ সালে জাতীয় সম্মাননা ‘আজারবাইজানের জনগণের কবি’ খেতাবে ভূষিত হন

তিনি ২০২৬ সালের পয়লা আগস্ট ৯৫ বছর বয়সে মারা যান।

তাঁর সাহিত্যকর্মের মূল বিষয়বস্তু হলো ভালোবাসা, আজারবাইজানের ইতিহাস, লোকজ ঐতিহ্য, সমাজে নারীর ভূমিকা এবং প্রাকৃতিক পরিবেশ। তাঁর কবিতা জাতীয় সাহিত্যের সমৃদ্ধ ঐতিহ্যের প্রতি বিশ্বস্ত থাকার পাশাপাশি একটি নতুন ধারার প্রবর্তন করেছে। দেশপ্রেম, জাতীয় স্বাধীনতা, ঐতিহ্যগত মূল্যবোধ এবং নৈতিক সততাকে কেন্দ্র করে রচিত তাঁর সাহিত্যকর্ম তাঁকে আজারবাইজানের সাহিত্য অঙ্গনে এক চিরস্থায়ী স্থান এনে দিয়েছে। গীতিকবিতা সমসাময়িক আজারবাইজানি সমাজের আবেগ ও আকাঙ্ক্ষাকে প্রতিফলিত করেছে। তাঁর আখ্যান কবিতা এবং কাব্যনাটক দেশপ্রেম ও রাষ্ট্রীয় ভাবধারায় আজারবাইজানের জাতীয় ইতিহাসের ক্রান্তিকাল ফুটে উঠেছে। তার সৃষ্টির অধিকাংশই থিয়েটারে সফলভাবে প্রদর্শিত হয়েছে।

মায়ের রুটি:

নোরিমান হাসানজাদের সাক্ষাৎকার

 সাক্ষাৎকার গ্রহণ ও ইংরেজি অনুবাদ: শেহলা নাগিয়েভা

আপনার জীবনভিত্তিক উপন্যাস আন্টি নাবাথ’স ব্রেড’  পড়তে গিয়ে মনে হয় যেন এটি বিংশ শতাব্দীর মধ্যবর্তী সময়ে সেই সময়ের সোভিয়েত আমলের আজারবাইজানে এক তরুণ লেখকের বড় হয়ে ওঠার গল্প। বর্তমান সময়ে আজারবাইজানে যারা লেখক হতে চায় সেসব তরুণদের জন্য পরিবেশ কতটা আলাদা?

পুরোপুরি ভিন্ন। সোভিয়েত আমলের তরুণ আর আজকের তরুণদের জীবনধারা ও জীবন একদম আলাদা। এই পার্থক্যের মূল কারণ হলো সমাজ নিজে, সমাজের কাঠামো, জীবনের প্রতি তরুণদের দৃষ্টিভঙ্গি, এমনকি তাদের নৈতিকতার বোধও সম্পূর্ণ বদলে গেছে। আজকের তরুণরা অত্যন্ত সচেতন। আমার সময়ে তরুণরা ছিল খুবই নিষ্কলঙ্ক, সহজ-সরল—এমনকি বলব কিছুটা অপরিণামদর্শী। তারা যা শুনত তা-ই বিশ্বাস করত, অথচ আজকের তরুণরা কোনো কিছুই বিশ্বাস করে না। এই সংশয়বাদ বা অবিশ্বাস আসলে একটি ট্র্যাজেডি, কারণ বিশ্বাস হলো পবিত্রতার প্রতীক। যদিও অন্ধবিশ্বাসের কিছু ত্রুটি রয়েছে, তবুও বিশ্বাস জিনিসটা পবিত্র। আমি মনে করি, আজকের এই বিশ্বাসের অভাবটা ইউরোপীয় তরুণদের কাছ থেকে এসেছে। মার্ক্স তাঁর একটি সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন: “আমি মানুষকে মারাত্মক সন্দেহের চোখে দেখি।”

আমার সময়ের তরুণদের সাথে আজকের তরুণদের পারিবারিক মূল্যবোধের পার্থক্যটাও স্পষ্ট। উদাহরণস্বরূপ, আমি কখনোই কল্পনা করতে পারতাম না যে কোনো ছেলে বা মেয়ে তাদের বৃদ্ধ বাবা-মাকে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠিয়ে দেবে! একবার আমি এক বৃদ্ধ বাবাকে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলতে শুনেছিলাম যে, তিনি সাতটি সন্তানকে বড় করে তুললেও, সেই সাত সন্তান মিলে একজন মানুষকে—তাদের জন্মদাতা বাবাকে—দেখালোঝোনা করতে পারল না। ইউরোপেই হোক বা আজারবাইজানে, যারা এমন কাজ করতে পারে আমি তাদের ধিক্কার জানাই। মানুষের নৈতিকতা আজ ধ্বংস হয়ে গেছে। একে অপরের প্রতি মানুষের ভালোবাসাও আজ বিনাশের পথে।

এখন কেউ যদি দয়া করে কারও জন্য কিছু করে, তবে বিনিময়ে সে কিছু প্রত্যাশা করে। এটি একটি করুণ ট্র্যাজেডি। কারণ মানুষ সমাজকে যত বেশি দেয়, তারা তত বেশি শক্তিশালী ও মহান হয়ে ওঠে। খুব কম মানুষই এখন প্রার্থনা করে যে, সৃষ্টিকর্তা যেন অন্যদের সেবা করার জন্য তাদের দীর্ঘায়ু দান করেন।

তা সত্ত্বেও, উন্নত প্রযুক্তিসম্পন্ন আজকের সমাজের কিছু সুবিধা রয়েছে। যেমন, আমি যখন শহরে পড়াশোনা করতাম, প্রতি মুহূর্তে আমার জানতে ইচ্ছে হতো আমার ছোট গ্রামে মা কী করছেন, কোথায় আছেন, কেমন আছেন। কিন্তু তাঁর সাথে সহজে যোগাযোগ করার কোনো উপায় ছিল না। আর এখন—আপনার হাতে মোবাইল ফোন রয়েছে এবং দূরদূরান্তের মানুষের সাথে আপনি নিমেষেই যোগাযোগ করতে পারছেন। এটি এক চমৎকার সুবিধা।

তবে সব অগ্রগতিরই কিছু ক্ষতিকর দিক থাকে। উদাহরণস্বরূপ, একজন মানুষ হয়তো দেখতে চায় শনি গ্রহের জীবন কেমন। সেটা তার ইচ্ছা, আর তাই লক্ষ্য পূরণের জন্য সে যা খুশি করতে পারে। কিন্তু সেই দূরের লক্ষ্য অর্জনের জন্য সে কেন তার কাছের একজন মানুষকে হত্যা করবে? আমি এমন প্রচেষ্টার মাঝে কোনো মহানুভবতা দেখি না। কোনো মানুষের উচিত সুদূর শনি গ্রহে না ছুটে, বরং তার আশেপাশের মানুষের মনের ভেতর কী আছে তা আবিষ্কার করার চেষ্টা করা। কারণ তারা হয়তো শনি গ্রহে জীবন খুঁজে পাবে, কিন্তু নিজ চারপাশের মানুষের ভেতরের জগৎটা তারা কখনো দেখতে পাবে না।

ইতিহাসজুড়ে তরুণ ও প্রবীণদের মাঝে একটি জেনারেশন গ্যাপ সবসময়ই ছিল। তরুণরা মনে করে তারা বয়স্কদের চেয়ে বেশি জানে; তাদের ধারণা বয়স্কদের জ্ঞান পুরনো বা সেকেলে হয়ে গেছে। অন্যদিকে প্রবীণ প্রজন্ম তরুণদের ওপর ভরসা করতে দ্বিধা করে; আশেপাশের পৃথিবীকে সামলানোর বিষয়ে তরুণদের সক্ষমতা নিয়ে প্রবীণরা খুব একটা আশাবাদী হতে পারে না। প্রবীণ প্রজন্ম দুশ্চিন্তায় ভোগে—তরুণরা দেশ ঠিকমতো চালাতে পারবে তো, জনগণের সমস্যা সমাধান করতে পারবে তো, সবকিছু সামলাতে পারবে তো? আসলে, প্রতিটি প্রজন্মই বিশ্বাস করে যে, তারা নিজেরাই দেশ বা সমাজ পরিচালনার জন্য সবচেয়ে বেশি যোগ্য।

আপনি মূলত কবি হিসেবেই পরিচিত। গদ্যে আত্মজীবনী বা স্মৃতিকথা লেখার সিদ্ধান্তের পেছনে কারণ কী? ১৯৭০-এর দশকে এই অনুপ্রেরণা কোথা থেকে এলো? আর কবিতার তুলনায় গদ্য লেখার চ্যালেঞ্জগুলো কেমন ছিল?

আমি জানি না কেন আমি [আমার জীবনের ওপর ভিত্তি করে] এই উপন্যাসটি লিখেছিলাম। আমি তো এই বিষয়টার ওপর একটি দীর্ঘ কবিতা লেখার পরিকল্পনা করছিলাম; আমি এটি জোর করে লিখিনি—এটি এমনিতেই জন্ম নিয়েছে!

তখন আমি জাতীয় সাহিত্য পত্রিকা এদেবিয়াত’-এর কবিতা বিভাগের প্রধান হিসেবে কাজ করছিলাম। আমি একগুচ্ছ নোট বা দিনলিপির মতো করে বইটা লিখেছিলাম। লেখা শেষ হলে আমি পত্রিকার সমালোচনা বিভাগের প্রধান আকিফ হুসেইনভকে পড়তে এবং মতামত দিতে বলি। প্রায় এক মাস কেটে গেলেও তিনি আমার নোটগুলো ফেরত দিলেন না। যখনই জিজ্ঞেস করতাম, তিনি বলতেন পরের সাক্ষাতেই এনে দেবেন—কিন্তু তাও তিনি আনতেন না।

অনেক দিন পর, তিনি পত্রিকার মুদ্রিত সংখ্যাটি আমার কাছে নিয়ে এলেন, যেখানে আমার নোটগুলো হুবহু প্রকাশ করা হয়েছিল! আমি দারুণ অবাক হলাম এবং বেশ লজ্জা পাচ্ছিলাম। তাকে বললাম যে আমি তো প্রকাশের উদ্দেশ্যে ওগুলো লিখিনি। তিনি উত্তর দিলেন: “ভালোই হয়েছে যে আপনি প্রকাশের জন্য লেখেননি। এখন আর একটা লাইনও ছুঁয়ে দেখবেন না!”

এরপর আমি এক সপ্তাহের জন্য মুখ লুকিয়েছিলাম, কোথাও বের হইনি। অনুভূতিটা বড় অদ্ভুত ছিল। আমি তো কেবল আমার অনুভূতিগুলো কাগজে টুকে রেখেছিলাম। কবি হিসেবে গদ্যের চেয়ে কবিতায় নিজের অনুভূতি প্রকাশ করা আমার জন্য সহজ। বানিয়ে বানিয়ে গদ্যের বাক্য গঠন করা আমার জন্য বেশ কঠিন, কিন্তু আন্টি নাবাত’স ব্রেড’-এর জন্য আমাকে উদ্দেশ্যপ্রণয়োদিতভাবে কোনো গদ্যের বাক্য সাজাতে হয়নি—আমার মনে যেমনটা এসেছে, আমি ঠিক সেভাবেই লিখে গেছি। বাক্যগুলোকে মসৃণ করার চেষ্টা করিনি। যদি তা করতাম, তবে আমার মনে হয় না বইটির এত শক্তিশালী প্রভাব থাকত। মজার বিষয় হলো, আজারবাইজানের জাতীয় লেখক সুলেমান রাহিমোভ উপন্যাসটি পড়ে বলেছিলেন, “আপনি কোনো উপন্যাস লেখেননি, লিখেছেন একটা টেলিগ্রাম! এটার ওপর আরও কাজ করুন এবং বড় উপন্যাস বানান; এতে অনেক উপাদান আছে।”

পরবর্তী সময়ে মস্কো থেকে বিশিষ্ট রুশ কবি কোজলভস্কির অনুবাদে বইটি প্রকাশিত হয়। মস্কো রেডিওতে পরপর তিনবার এটি পাঠ করে শোনানো হয়েছিল। একটি পর্যালোচনায় লেখা হয়েছিল: “এটি একটি হীরে; লেখকের ভাবাবেগকে রক্ষা করে একে হীরের মতোই প্রদর্শন করা উচিত।” প্রকাশনা সংস্থা মলোদায়া গভার্দিয়া’ আমাকে আরেকটি উপন্যাসের জন্য চুক্তি এবং রয়্যালটির অগ্রিম অর্থের প্রস্তাবও দিয়েছিল। (তবে নোরিমান আর কখনো কোনো উপন্যাস লেখেননি।)

আজারবাইজানি কবি ফ্লোরা খলিলজাদে বলেছিলেন, “এই কবি জীবনে মাত্র একটিই গদ্য লিখেছেন, আর তা সর্বত্র আবৃত্তি করা হয়।” বইটি ইতোমধ্যে আটটি ভাষায় অনূদিত হয়েছে, আর এখন ইংরেজি হতে যাচ্ছে নবম ভাষা।

আপনার জীবনে তো বিশাল সব পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাওয়ার অভিজ্ঞতা রয়েছে—পোয়লুর ছোট গ্রাম থেকে গাঞ্জা, বাকু বা বিশ্বের বড় বড় শহরে যাওয়া; সোভিয়েত আমল থেকে আজকের স্বাধীন জাতীয় সরকার; কিংবা টাইপরাইটারের যুগ থেকে কম্পিউটারের যুগ। একজন কবি হিসেবে এতসব স্থানীয় ও বৈশ্বিক পরিবর্তন, রাজনীতি এবং প্রযুক্তির পরিবর্তনের মধ্যেও টিকে থাকতে আপনাকে কোন জিনিসটা সাহায্য করেছে?

সত্যি বহু পরিবর্তন ঘটেছে। সোভিয়েত আমল থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত বহু উষ্ণ ও শীতল অভিজ্ঞতা আমার মধ্যে স্থান বদল করেছে। এখন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির যুগ। এর ভালো দিক রয়েছে—যেমনটা আমি আগেও বলেছি, এখন যে কোনো মুহূর্তে যে কারো সাথে যোগাযোগ করা যায়। কিন্তু অতীতের মাঝে এমন এক ধরণের পবিত্রতা বা গুণ ছিল, যা আমি নিজেও ভাষায় ব্যাখ্যা করতে পারব না। আজ মানুষের ভেতরের পারস্পরিক সম্পর্ক জটিল হয়ে পড়েছে: মানুষ কেবল কিছু পাওয়ার আশাতেই অপরের জন্য ভালো কিছু করে। আমাদের যৌবনে মানুষ নীতি-নৈতিকতায় আরও অনেক বেশি উন্নত ছিল। আমার নিজের বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, বিখ্যাত ছোটগল্পকার মীর জালাল পাশায়েভ সরকার কর্তৃক তাঁর ছেলের নামে বরাদ্দ করা অ্যাপার্টমেন্টটি আমাকে উপহার দিয়ে দিয়েছিলেন। তাঁর নিজের ছেলের তখনো বিয়ের তাড়া ছিল না, কিন্তু আমার বিয়ে ঠিক হয়েছিল। অথচ মীর জালাল কখনো অন্যদের সামনে এই কথা উল্লেখও করেননি।

আজকাল মানুষ—এমনকি আমিও—সবসময় তাড়াহুড়োর মধ্যে থাকে। কিন্তু তারা কোথায় যেতে এত তাড়াহুড়ো করে? আমাদের সময়ের বড় অভাব; আমরা সবসময় সময় নিয়ে অভিযোগ করি। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে আমরা আমাদের জীবন পরিকল্পনা করি। এমন জীবন যাপন করা কতটা কঠিন! মানুষের জীবন ছোট হয়ে আসছে। আমাদের জীবনযাত্রা বড্ড কঠিন হয়ে পড়েছে। আমার তরুণ বয়সে মানুষ মক্কায় যেতে পুরো এক বছর সময় নিত, আর এখন মানুষ হাতে তসবিহ নিয়ে বিমানে উঠে কয়েক দিনের মধ্যে মক্কা থেকে ঘুরে চলে আসছে। সামান্য চেষ্টা বা সময়েই তারা ‘হাজী’ হয়ে যাচ্ছে। খুব অদ্ভুত লাগে যে মানুষ এখন আর আগের মতো নিজেদের অনুভূতিগুলোকে গভীরভাবে অনুভব করতে পারে না। সবাই দৌড়ের ওপর জীবন কাটাচ্ছে। আজ না দৌড়ে বাঁচা অসম্ভব, আবার দৌড়াতে দৌড়াতে বাঁচাও ভীষণ কঠিন।

মানুষকে পরিবর্তন করার, প্রভাবিত করার এবং বেঁচে থাকার প্রেরণা জোগানোর জন্য সাহিত্য—বিশেষ করে কবিতা ছাড়া আর কোনো কিছুর এত শক্তি নেই।

আজকের বিশ্বে সাহিত্যের, বিশেষ করে কবিতার ভূমিকা কী বলে আপনি মনে করেন?

আমার কাছে সাহিত্যের ভূমিকা অনন্য। মানুষকে পরিবর্তন করার, তাদের প্রভাবিত করার এবং বেঁচে থাকার উৎসাহ জোগানোর ক্ষেত্রে সাহিত্য—বিশেষ করে কবিতা ছাড়া অন্য কিছুর এত ক্ষমতা নেই। সাহিত্যের প্রভাবশালী ক্ষমতার সাথে অন্য কিছুর তুলনা হয় না। তাই, বিশ্বের পরিচালনা হওয়া উচিত সাহিত্যিক ও লেখকদের হাতে। যদি তা হতো, তবে পুরো বিশ্বে মানবতা বিজয়ী হতো।

সেই সূত্র ধরে, আজারবাইজান এবং বিশ্বজুড়ে আজকের তরুণ লেখকদের জন্য আপনার কী উপদেশ থাকবে?

একবার আমি আর আজারবাইজানের বিখ্যাত জাতীয় কবি খলিল রেজা কীভাবে সেরা কবিতা লেখা যায় তা নিয়ে তর্ক করছিলাম। খলিল রেজা বললেন, “রুশ ফিউচারিস্ট কবি ভ্লাদিমির মায়াকোভস্কির মতো করে লেখা উচিত।” আমি প্রতিবাদ করে বললাম যে মায়াকোভস্কির কবিতা বড্ড বেশি উত্তপ্ত বা আক্রমণাত্মক; আমাদের বরং শান্ত ও আবেগঘন রুশ গীতিকবি সের্গেই আলেকসান্দ্রোভিচ ইয়েসেনিনের মতো লেখা উচিত।

আমরা চূড়ান্ত উত্তরের জন্য তুর্কি কবি নাজিম হিকমতের কাছে গেলাম এবং জিজ্ঞেস করলাম আমাদের মধ্যে কে ঠিক। তিনি সোফায় বসে ছিলেন, উঠে দাঁড়িয়ে জানালার ধারে গেলেন এবং আজারবাইজানি কবি সামাদ ভুর্গুনের একটি কবিতার লাইন স্মৃতি থেকে আবৃত্তি করলেন: কবি, তুমি কত দ্রুত বুড়িয়ে গেলে।”

হিকমত একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “তোমাদের কবিতা লেখা উচিত মায়ের ভাষায়—অর্থাৎ, তোমরা যেন নিজের মায়ের সাথে কথা বলছ। একজন কবি তাঁর মা এবং প্রিয়তমার সাথে খুব নম্রভাবে, মিষ্টি করে কথা বলেন, চিৎকার করে নয়।” আমি খলিল রেজার দিকে ফিরে বললাম, “তাহলে তোমার কবিতাগুলোর কী হবে? সেগুলোর বেশিরভাগই তো খুব উত্তপ্ত, সেগুলো উচ্চস্বরে পড়তে হয়। সেগুলোর কথা কী বলবে?” তিনি আমাকে উত্তর দিলেন, “হ্যাঁ, তুমি ঠিক বলেছ। আমি ওগুলো এভাবে লিখেছি যাতে প্রয়োজন পড়লে মানুষ আমার কবিতা ব্যবহার করতে পারে—তবে মায়াকোভস্কিরগুলো নয়।”

আমরা একইভাবে সাত্বিক লেখক জলিল মামাদগুলুজাদের নাটক মাই মাদার্স বুক’-এ কবিতা লেখার একই দৃষ্টিভঙ্গি দেখতে পাই, যেখানে মায়ের ভাষায় কবিতা লেখার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। একজন কবির সাহিত্যকর্মের শিকড় থাকা উচিত সেই দুধের গভীরে, যা সে একদা তার মায়ের বুক থেকে পান করেছিল।

ইংরেজিভাষী পাঠকদের জন্য আপনার শেষ কোনো অনুভূতি?

আমি সেইসব ইংরেজিভাষী পাঠকদের কাছে অত্যন্ত কৃতজ্ঞ, যারা আমার শৈশব এবং আমার মায়ের জীবন নিয়ে লেখা উপন্যাসটিতে আগ্রহ দেখিয়েছেন। যারা উপন্যাসটির অনুবাদ ও প্রকাশনায় সাহায্য করেছেন, তাদের সবার কাছে আমি ধন্য। আমার মা হয়তো কোনো অভিজাত নারী হতে পারতেন; অভিজাত নারীদের মতো হয়তো হাতে সুন্দর দস্তানা বা গ্লাভস পরতে পারতেন। কিন্তু তা তাঁর কপালে ছিল না। এই ইংরেজি অনুবাদের মাধ্যমে ইংরেজিভাষী বিশ্বের মানুষ আমার মাকে জানতে পারবে, আমাদের জাতীয় ‘খামরালি’ রুটি তৈরিতে তাঁর দক্ষতার কথা জানতে পারবে। তারা সেই রুটির স্বাদ ও গন্ধ অনুভব করতে পারবে (আজারবাইজানি সংস্কৃতিতে রুটি অত্যন্ত পবিত্র এবং জীবনের প্রতীক)। শৈশবে আমি সবসময় দেখেছি আমার মা সবার শেষে ঘুমাতে যেতেন; কিন্তু তিনি কখন ঘুম থেকে উঠতেন তা আমি কখনোই দেখতে পাইনি। আকাশে ভোরের তারা ওঠার সাথে সাথেই আমি জেগে উঠে দেখতাম মা রুটি সেঁকার জন্য আগুন জ্বালিয়েছেন। আমার মা ষোলো রুবেলে এক বস্তা আটা কিনতেন এবং রুটি বানাতেন। সেই রুটি বিক্রি করে তিনি পেতেন বিশ রুবেল, অর্থাৎ বস্তাপ্রতি তাঁর আয় হতো চার রুবেল। সম্প্রতি আমি গাঞ্জা শহরে আমার এক পরিচিতের জানাজায় গিয়েছিলাম। সেখানে খাবারের সাথে যে রুটি দেওয়া হয়েছিল, তার গন্ধ আমাকে শৈশবে ফিরিয়ে নিয়ে গিয়েছিল। আমাকে আমার মায়ের হাতের রুটির স্বাদের কথা মনে করিয়ে দিয়েছিল। দুঃখের বিষয়, বাকুর খাবারে আমি আর কখনো সেই স্বাদ পাই না। আমাদের মুখগুলো আসলে সত্যি সত্যি স্বাদ পাওয়ার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে।

পোয়লু—যে ছোট গ্রামে আমি জন্মেছি এবং বড় হয়েছি—আমার জীবনে ও স্মৃতিতে এক বিশেষ জায়গা জুড়ে আছে; এটি অবিস্মরণীয়। আপনার এই ‘শেষ অনুভূতির’ প্রশ্নের উত্তর হিসেবে আমি একটি কবিতাও লিখেছি, যার শিরোনাম পোয়লুতে আমি যা ফেলে এসেছি…”। কারণ, আমি সেখানে রেখে এসেছি সেই ছোট কুঁড়েঘর আর কুর নদীর তীর। আমি যখনই সেই জায়গাগুলোতে ঘুরতে যাই, আমি আবারও খুঁজে পাই আমার বিশুদ্ধতা, আমার মর্যাদা, আমার শৈশব, আমার বিবেক আর আমার স্বজাতিকে।

সেপ্টেম্বর ২০১৮

সম্পাদনা: অ্যালিসন মান্ডাভিল

অ্যালিসন মান্ডাভিল: কবি এবং ফ্রেসনো স্টেট ইউনিভার্সিটির ইংরেজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক।

শেহলা নাগিয়েভা: আজারবাইজান ইউনিভার্সিটি অব ল্যাঙ্গুয়েজেসের বিদেশি সাহিত্য বিভাগের অনুবাদ ও সাহিত্যের সহযোগী অধ্যাপক।

অনুবাদে এআই-এর সাহায্য নেয়া হয়েছে।

Avatar photo

Mazhar Ziban

সম্পাদক, লেখালেখির উঠান । কলেজ জীবন থেকে রূপান্তরবাদী রাজনীতির সাথে জড়িত। সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনের একজন সক্রিয় কর্মী। একটি বামপন্থি ছাত্র সংগঠনের রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি ছিলেন। অনূদিত কবিতার বই আমিরি বারাকা'র কেউ আমেরিকা উড়িয়ে দিয়েছে। হাওয়ার্ড জিনের নাটক এমা, সম্পাদক: মাঠের পারের দূরের দেশ: দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার ছোটগল্প সংকলন, সহলেখক: • বাংলাদেশের দলিত সম্প্রদায়: বৈষম্য, বঞ্চনা ও অস্পৃশ্যতা মাধ্যমিক পর্যায়ে বিজ্ঞান শিক্ষা বরেন্দ্রী আদিবাসীদের চালচিত্র Colonialism Casteism and Development: South South Cooperation as a 'New' Development paradigm

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ভাষা
Scroll to Top