মেয়েটার বয়স নয় বছরের কাছাকাছি অথচ সে এখনো নিজের কাপড়ের বোতামটা পর্যন্ত লাগাতে পারে না। ভ্যালেরিদের অতিরিক্ত রুমটায় থাকছে ও। ওর নাম রবিন। রবিন ভ্যালেরির সামনে কার্পেটে হাঁটু গেড়ে বসা। প্রথমে সে তার কাপড়ের হাতাটা ঠিক করে নিল। তারপর ভ্যালেরির দিকে পেছন ফিরে বসল যাতে ভ্যালেরি তার জামার পেছনের বোতামগুলো লাগিয়ে দিতে পারে। বাদামী রঙের বোতামগুলির দীর্ঘ সারির ফাঁকে রবিনের শীর্ণ দেহের হাড্ডিসার মেরুদণ্ড দেখা যাচ্ছে। পরনে একটা সাদা রঙচটা স্কার্ট। রবিন ভ্যালেরিদের বাসায় এসেছে সপ্তাহখানেক হল। যদিও প্রতি রাতে ভ্যালেরি রবিনকে সাবানের ফেনা তোলা পানিতে শরীর ডুবিয়ে গোসল করতে উৎসাহ যুগিয়েছে এরপরও রবিনের শরীর থেকে এক ধরনের স্যাঁতসেঁতে পুরানো মশলার গন্ধ ভাসছে বাতাসে।
গন্ধটি খুব সম্ভবত রবিনের কাপড়টা থেকে আসছে। ওর রাতের শোবার কাপড়টা সম্ভবত ড্রাইওয়াশ করা লাগবে তাই ভ্যালেরি ওয়াশিং মেশিনে দেয়নি যদি নষ্ট হয়ে যায়। রবিনের চুল লালচে, এবং সেগুলো সে কপাল থেকে টেনে ফিতে দিয়ে বাঁধা। ওকে দেখে এলিস ইন দ্যা ওয়ান্ডারল্যান্ডের গল্পের এলিস মনে হচ্ছে। রবিনের মা কেন তাকে এমন লম্বা লম্বা পুরনো ধাঁচের কাপড় পরায়? ভ্যালেরি ভাবল। বাচ্চারা পরবে টি-শার্ট আর জিনস যাতে তারা সহজে দৌঁড়ঝাপ করতে পারে, খেলতে পারে। রবিনকে ভ্যালেরির পুরনো ছবিতে আঁকা ভিক্টোরিয়ান এতিম বাচ্চার মতন মনে হয়। যদিও রবিনের একটা আঁটোসাঁটো প্যান্ট আর ইলাস্টিকের টপস আছে- কিন্তু রবিনের সবুজ কোটটা এই শীতের উপযোগী নয়।
এই নয় বছরের মেয়েটি ভ্যালেরির সৎ মেয়ে। গত এক সপ্তাহ যাবত ভ্যালেরি রবিনের সাথে নানা বিষয়ে কথা বলার চেষ্টা করছে। কিন্ত রবিন পারতপক্ষে তেমন কোন কথা বলেনি। সে চুপচাপ থাকতে পছন্দ করে নাকি তার মা ভ্যালেরি খারাপ কিছু বুঝিয়ে ওর ছোট মনটাকে বিষাক্ত করে তুলেছে কে জানে!
মেয়েটা একটা ছোটখাটো পুতুলের মত দেখতে — ফ্যাকাশে, চওড়া রক্তশূন্য মুখ।ওর বড় বড় ধূসর চোখগুলোয় রাজ্যের সরলতা, এক চোখ থেকে অন্য চোখের দূরত্ব যেন একটু বেশি, চুলগুলো সবসময় পেছনে চ্যাপ্টা করে বাঁধা। দুষ্টু তো না-ই বরং এ বয়েসি ছেলেমেয়েদের সাথে তুলনা করলে রবিন খুব শান্ত মেয়ে।
ভ্যালেরির বেশির ভাগ প্রশ্নের উত্তর সে হ্যাঁ এবং না দিয়ে দেয়। যেন এর চেয়ে বেশি কথা বলবার শক্তি বা আগ্রহ তার নেই। ভ্যালেরির ধারনা রবিন ঠিকই কথা বলে কিন্ত তার সাথে বলছে না। ওর কথায় একটা গেঁয়ো টান আছে তাতে অবশ্য রবিনের কোনো দোষ নেই। সে যেখানে বড় হচ্ছে সেখান থেকেই সে শিখছে।
তবে সে খুব ভদ্র। সবসময় প্লিজ এবং ধন্যবাদ বলে।একদিন ভ্যালেরি তাকে তার শিক্ষকের নাম জিজ্ঞেস করেছিল। রবিন উত্তরে তার শিক্ষকের নাম বলেছিল কিন্তু ভ্যালেরি যখন জিজ্ঞাসা করেছিল যে সে তার শিক্ষককে পছন্দ করে কিনা তখন সে তার চোখ ভ্যালেরির থেকে অস্বস্তিকরভাবে সরিয়ে নিয়ে কাঁধটা ঝাঁকায় যেন পছন্দ করা বা না করার বিষয়টা নিয়ে সে নিশ্চিত নয়।
আর একটা বিষয় ভ্যালেরিকে অবাক করে। বাড়ন্ত বয়েসে বাচ্চারা অনেক ক্ষুধার্ত থাকে।কিন্তু রবিন খেতে পছন্দ করে না। এই কদিন আগে তাকে মাছের কেক দেবার পর রবিন কেমন যেন নাক কুঁচকে প্লেটটা সরিয়ে দেয়। ভ্যালেরি একজন ভালো রাঁধুনি এবং সে স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে রাঁধতে ভালোবাসে। স্বাভাবিকভাবেই রবিনের এরকম ব্যবহার ভ্যালেরিকে আহত করেছে। রবিনের খাওয়ার প্রতি অনীহা দেখে ভ্যালেরি জানতে চেয়েছিল বাড়িতে সে কি খায়। রবিন শুধু ব্রেকফাস্ট সিরিয়াল আর চিপসের নাম বলেছিল।
ডিম? সব্জী? মাছ? মাংশ?
ভ্যালেরি জানতে চাইলে রবিন চুপ ছিল। তার কেবলই মনে হচ্ছিল মেয়েটা খুব কম খাবারের নাম জানে। টোস্ট সে পছন্দ করে কিন্ত ডিম বা মাখন দিয়ে খেতে চায় না। শুধু টোস্ট। এ কয়দিনে রবিনের পছন্দের খাবারের একটা লিস্ট মোটামুটি বানিয়েছে ভ্যালেরি। রুটি, টমেটো স্যুপ, কর্নফ্লেক্স, বাটারস্কচ। ভাগ্যিস তার স্বামী গিল এই সমস্ত খাবার যে রবিনকে সে খেতে দিচ্ছে তা দেখছে না। তাহলে সে ভাবতো তার মেয়েকে ভ্যালেরি অস্বাস্থ্যকর খাবারের অভ্যেস করিয়ে তার স্বভাব খারাপ করছে।
গিলের রাজনৈতিক মতাদর্শ বামপন্থী হলেও মূল্যবোধের বেলায় বাড়িতে সে একটু সেকেলে। বোঝার সুবিধার্থে একটা উদাহরণ টেনে বলছি – গিলকে থাকার জন্য তার ইউনিভার্সিটি থেকে একটা ছোট কিন্ত আধুনিক ফ্ল্যাট দিয়েছে কিন্ত গিল চেয়েছিল ভ্যালেরির অফিসের পিছনের রাস্তায় যে পুরানো বাড়িটা আছে সেটি ভাড়া নিতে। পুরানো বাড়ির এখানে সেখানে চালতে ওঠা রঙ, বিশাল পুরানো দরজা, সাথে লাগোয়া গাছ ভর্তি বাগান গিলের পছন্দ।
ভ্যালেরি গিলকে কখনো বলেনি এই আধুনিক ফ্ল্যাটের সকল সুবিধা সে কতটা উপভোগ করছে – পরিষ্কার, হালকা ঘর, পুরো ঘরকে গরম রাখার মেশিন, রান্নাঘরের দেয়ালে লাগানো বৈদ্যুতিক ফ্যান সবই তার খুব পছন্দ। ভ্যালেরি শুনেছে গিল তার প্রথম স্ত্রী রবিনের মা মারিসাকে নিয়ে যাযাবরের মতো জীবনযাপন করত।
গিলের সাথে যখন ভ্যালেরির পরিচয় হয় তখন ভ্যালেরির বয়স চব্বিশ। টগবগে তরুণী। মারিসার বয়স হয়ত এখন চল্লিশ ছুঁই ছুঁই, সে নিশ্চয়ই এখন আর তেমন সুন্দরী নেই। আচ্ছা ভ্যালেরির বয়েস কম বলেই কি গিল তাকে বিয়ে করেছিল? যাই হোক গিল প্রায়ই তার প্রথম স্ত্রীকে নিয়ে বাজেভাবে কথা বলে যেটা ভ্যালেরির ভালো লাগে না। গিল মারিসকে বেশ্যা ডাকে।
বয়েসে অনেক বড় হওয়া সত্ত্বেও ভ্যালেরি গিলকে বিয়ে করেছিল কারণ গিল সমাজে একজন সম্মানিত ব্যক্তি, কিংস কলেজের অধ্যাপক, টিভিতে নানা আলোচনায় তাকে অতিথি হিসেবে ডাকা হয় – এসব দেখে সে তার প্রেমে পড়েছিল। তার সাথে সম্পর্ক হবার পর ছাত্রীর সাথে প্রেম করায় গিলকে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়েছিল তবে তাদের বিয়ের পর সে সব আলোচনা বন্ধ হয়ে গেছে। সে স্বপ্নেও ভাবেনি যে একজন অধ্যাপক তার আগের স্ত্রী সম্পর্কে এই ধরনের কথা উচ্চারণ করতে পারে।
গিল তার মেয়ের সাথে দেখা করার বিষয়ে তার প্রাক্তন স্ত্রীর সাথে ফোনে অনেক হট্টগোল করেছিল। অথচ মেয়েটা আসার পর থেকে গিল প্রায় রাত অবধি বিশ্ববিদ্যালয়েই কাটাচ্ছে, এই বলে যে সে এখন যে বইটা লিখছে তার জন্য একাগ্রতা জরুরি। তবে রবিন তাকে মিস করছে বলে মনে হয় না। ভ্যালেরি যখন গিলের সম্পর্কে কথা বলতে গিয়ে বারেবারে বলছিল, ‘তোমার বাবা’ ভ্যালেরির মনে হয়েছে রবিন এই বাবা শব্দটার সাথে খুব বেশি পরিচিত নয়। তাহলে রবিন কি গিলকে অন্য কোন নামে ডাকে? রবিনের মা যখন আলাদা হয়ে যায় তখন রবিনের বয়স ছিল মাত্র তিন কি চার বছর।
ভ্যালেরি গিলকে জিজ্ঞাসা করেনি মেয়েকে যখন আনতে লন্ডনে গিয়েছিল তখন ওই দীর্ঘ গাড়িতে যাত্রায় তার মেয়ের সাথে কী কথা হয়েছিল। সম্ভবত তারা পুরো পথটাই নীরব ছিল। অথবা গিল রবিনকে তার মা সম্পর্কে প্রশ্ন করেছিল, বা নিজের কাজ সম্পর্কে কথা বলেছিল বা ভ্যালেরিকে নিয়ে কথা বলেছিল। কখনও কখনও সন্ধ্যায় গিল ভ্যালেরির সাথে ঘন্টার পর ঘন্টা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজনীতি বা অন্য ইতিহাসবিদদের বিষয়ে কথা বলতে থাকে এমনকি গৃহযুদ্ধ বা রাষ্ট্রের নানা সমস্যা সম্পর্কেও কথা বলে। গিল শুধু বলে যেত কিন্তু খেয়াল করতো না ভ্যালেরি শুনছে কিনা বা শুনতে আগ্রহী কিনা। ভ্যালেরি হয়ত সে সময় ভাবছে সামনের রুমটায় কি রঙের পর্দা দিলে ভালো দেখাবে কিংবা আপন মনে উল দিয়ে সোয়েটার বুনে যেত। গিলের তাতে কোনো সমস্যা হত না, ওর দরকার একজন মানুষ যে চুপ থেকে তার কথা শুনবে। কোনো আলোচনা সমালোচনায় যাবে না।
গিল একগুঁয়ে স্বভাবের আর কিছুটা অহংকারী। গিল যে বয়েসে বাবা হয়েছিল হয়ত সে সময়ে সেই দায়িত্ব নেবার জন্য সে তৈরি ছিল না – মনে মনে ভাবল ভ্যালেরি। কিংবা তার মেয়েটা যদি দেখতে আরো সুন্দর বা চটপটে হত হয়ত গিল তাকে মেয়ে হিসেবে ভালোবাসতো। গিল এসে রাতের খাবার খেতে খেতে রবিন বিছানায় ঘুমিয়ে গিয়েছে। গিল বিড়বিড় করে বলল, ” কে জানে, মেরিলিবোনের বিখ্যাত বেশ্যা কার থেকে এই বাচ্চাটা নিয়েছিল? আমার বিশ্বাস হয় না ও আমার বাচ্চা। ওর সাথে আমার কোথাও কোন মিল নেই। এ ও হয় নাকি? বাচ্চার সাথে বাবার চেহারা স্বভাব কিছুতেই মিল থাকবে না? ওই মহিলা এই বাচ্চাটাকে আদৌ স্কুলে পাঠায় কি না আমার তাতেও সন্দেহ আছে। সে তো তার প্রেমিকদের নিয়েই ব্যস্ত থাকে, বাচ্চা পালার কি সময় আছে তার? তার বিশাল বাড়িতে না জানি এই মেয়েটা কি দেখে বড় হচ্ছে। ওটা তো ঘর না একটা পচা ডোবা।” কথাগুলো বলতে বলতে গিল তার নাকটা এমনভাবে কুঁচকালো যেন সেই পচা ডোবার গন্ধ পাচ্ছে সে ।
ভ্যালেরি এতদিনে বুঝে গিয়েছিল, যে কোন ঘটনাকে একটু অতিরঞ্জিত করে বলা গিলের স্বভাব। গিলের বাবা ছিল না। তার বিধবা মার গ্রামে একটি ছোট দোকান ছিল। বহু কষ্ট করে গিল এতদূর এসেছে। তার এই উঠে আসার সংগ্রামকে গিল লুকায় না। সে বরং নানা অনুষ্ঠানে বেশ ফলাও করে প্রচার করে তার কষ্টকর দারিদ্রতায় ভরা অতীতের গল্প। গিলের মা সম্ভবত ক্যান্সারে মারা গিয়েছিলেন। গিলকে একবার জিজ্ঞেস করেছিল ভ্যালেরি। গিল প্রশ্নটা শুনে কেমন যেন বিরক্ত হয়েছিল। তারপর সে বিষয়টা এড়িয়ে গিয়েছিল। ভ্যালেরির ধারনা গিলের মা অনেকদিন ক্যান্সারে ভুগে মারা গিয়েছিলেন এবং সম্ভবত গিল যেমন খামখেয়ালি হয়ত সে তখন তার মায়ের খুব বেশি খোঁজখবর নেয়নি যেটা এখন তাকে পীড়া দেয় এবং সে জন্যই সে মায়ের মৃত্যু বিষয়টা এড়িয়ে যায়।
গিল তার মেয়ে রবিনের সাথে তার কোনো মিল খুঁজে না পেলেও রবিন দেখতে একদম তার বাবার মতন, ভ্যালেরি ভাবল। একইরকম ফ্যাকাসে গায়ের রং, বড় বড় চোখের মণি দুটা যেন শান্ত দীঘিতে ডুব সাঁতার কাটছে, গিলের চোখ তার বিশাল কালো গোল চশমার ফ্রেমে ঢাকা পড়ে থাকে তাই হয়ত সে খেয়াল করেনি রবিনের চোখ দুটো হুবহু তার মতন দেখতে।
গিলের যখন মন ভালো থাকে তখন সে তার চশমাটা খুলে নানা রকমের মজার গল্প বলে আর হো হো করে হাসে। তখন তাকে একটা ছোট্ট বাচ্চা ছেলের মতন সরল মনে হয়। গিল যদি অধ্যাপক না হয়ে অন্য কোনো পেশায় থাকত তাহলে হয়ত সে এমন গম্ভীর হয়ে দিনের বেশির ভাগ সময় কাটাত না।
রবিন এক সপ্তাহ তাদের সাথে থাকবে। ভ্যালেরির মনে হচ্ছিল সময় যেন কাটছে না। এই যে একজন আলগা মানুষ ঘরের ভেতরে, সে কি খাবে, কি পরবে তা নিয়ে ভ্যালেরিকে ভাবতে হচ্ছে এসব তার মনের ওপর হাল্কা চাপ সৃষ্টি করেছে। মেয়েটা সময় কাটানোর জন্য তার সাথে কোনো খেলনাও আনেনি। সকালের খাওয়া শেষে ভ্যালেরি একটা ম্যাগাজিন নিয়ে বসেছে। রবিন যথারীতি চুপচাপ নিজের মতন আছে। ভ্যালেরি এখন এটাতে অভ্যস্ত হয়ে উঠছে। কিছুক্ষণ পরে, সে লক্ষ করল রবিন দুটি অদ্ভুত ছোট মূর্তি নিয়ে খেলছে, উল দিয়ে বোনা কাপড়কে সুতো দিয়ে বেঁধে পুতুলের আকৃতি দেয়া হয়েছে। রবিন পুতুলগুলোর সাথে কথা বলছে এরপর সে কণ্ঠ বদলে ফেলল। এখন একটা পুতুল আরেকটা পুতুলের সাথে কথা বলছে । একটি কন্ঠস্বর ছিল বেশ হাসিখুশি, অন্যটা বেশ গম্ভীর। ভ্যালেরি কান পাতলো।
“আপনার হাত মোজাগুলো পরুন,” একটা পুতুল বলল।
“কিন্তু আমি নীল রঙ পছন্দ করি না,” অন্যজন বলল।
“এই হাত মোজার বিশেষ ক্ষমতা আছে,” প্রথম কণ্ঠটি বলল। “পরে দেখুন না কি হয়।”
ভ্যালেরির খুব মজা লাগল। সে রবিনকে জিজ্ঞেস করল এগুলো তার পুতুল কিনা। রবিন মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলল।
“ওদের নাম কি?”
“ওদের কোন নাম নেই।”
“আমরা আমার সেলাই মেশিন বের করে ওদের জন্য কাপড় তৈরি করতে পারি।”
রবিন মাথা নাড়ল, “ওদের কাপড়ের দরকার নেই। ধন্যবাদ।”
পরে রবিন বলেছিল এই পুতুলগুলো সেলেনা ওর জন্য বানিয়েছিল। সেলেনা ওদের ঘর পরিষ্কার করতে আসত। “সে আর আসে না,” রবিন একটু মন খারাপ করে বলল, “ সেলেনা জিনিস চুরি করেছিল তাই মা ওকে আসতে নিষেধ করে দিয়েছিল।”
যাক আজ মেয়েটা অনেক কথা বলছে।
“মন খারাপ করোনা। চলো আমরা একটা মজার খাবার তৈরি করি। রবিন উঠে দাঁড়াল। ভ্যালেরি রবিনকে একটা এপ্রোন পরিয়ে ছোট্ট চেয়ারে দাঁড় করিয়ে দিল। একে একে সবগুলো উপকরণ বাটিতে ঢালার পর ভ্যালেরি রবিনকে মাখাতে বলল। রবিনের ছোট ছোট আঙ্গুলগুলি ময়দাতে ঢেকে যায়। তার গরম হাতের তালুতে মাখন গলে এদিক ওদিক ঝরতে থাকে। ওকে দেখেই বোঝা যাচ্ছে ও কখনো ময়দা মেখে কিছু বানায়নি আগে। ভ্যালেরি তাকে দেখিয়ে দিল কিভাবে হাতে আগে মাখন মেখে তারপর ময়দা মাখাতে হয়।
রবিন পুরোটা সময় একদম চুপচাপ ছিল। ভ্যালেরি বুঝতে পারছিল না রবিন কি কাজগুলো খুশি হয়ে করছিল না কি সে পুরো ব্যাপারটা অপছন্দ করছে কিন্তু সৌজন্যতাবশত ভ্যালেরিকে কিছু বলতে পারছিল না। ভ্যালেরি পিঠাগুলো ওভেনে ঢুকিয়ে দিল। রবিন তার রুমে চলে গেছে।পিঠা ঠান্ডা হবার পর রবিনকে দিয়ে এসেছিল খেতে। কিন্তু রবিন সেগুলো ছুঁয়েও দেখেনি।
রবিন এক সপ্তাহের জন্য এলেও সে পর্যাপ্ত কাপড় নিয়ে আসেনি— অনেকগুলো বোতামওয়ালা একটা জামা, একটি ধূসর স্কার্ট যা দেখতে স্কুলের ইউনিফর্মের মতো, একটা নাইলনের জাম্পার, একটা টাইটস, অদ্ভুত রঙের একজোড়া মোজা এবং একটি লাল উলের ফ্ল্যানেল দিয়ে তৈরি লম্বা ম্যাক্সি আর গল্পের বইয়ের মতো কিছু বই এনেছে। আগেই বলেছি ওর ম্যাক্সি থেকে একটা বাজে গন্ধ আসে। ভ্যালেরির ধারনা ওটা পরলে রবিনের শরীর চুলকায়।
বিকেলের দিকে ভ্যালেরি রবিনকে নিয়ে শপিংয়ে গিয়েছিল। কিছু জামাকাপড় কিনে দেয় ওকে তারপর তারা ব্রিটিশ হোম স্টোরের ক্যাফেটেরিয়াতে চা খায়। রবিনকে খুশি করতে ভ্যালেরি এটা করেছিল। “আমি কি ওই ব্যাগটা আমার হাতে রাখতে পারি?” রবিন ভ্যালেরির হাতে ধরে থাকা কাপড়ের ব্যাগটা দেখিয়ে জিজ্ঞেস করল? “নিশ্চয়ই এগুলো তো তোমার জন্য কেনা, নাও ধর।” রবিন কাপড়ের ব্যাগটা খুব আদর করে জড়িয়ে ধরে রাখল এক হাতে আরেক হাতে বিস্কুট খেতে লাগলো। রবিন খুব বেশি কথা বলে না তাই ভ্যালেরিকে একাই কথা বলতে হয়। সে কথা বলতে বলতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল।
আস্তে আস্তে রবিনের তার মায়ের বাড়ি চলে যাবার দিন আসলো। ভ্যালেরি তার সব কাপড় ধুয়ে (শুধু রাতের ম্যাক্সিটা ছাড়া), ইস্তিরি করে তার ব্যাগে ভরে দিল। একবার তার মনে হয়েছিল রবিনকে বলে সে যেন তার একটা পায়জামা আর রাতে পরার গেঞ্জি রেখে যায় তাহলে পরের বার এলে পরার জন্য পরিষ্কার এক সেট কাপড় তৈরি থাকবে। কিন্তু রবিন যদি তাতে মন খারাপ করে? সে যদি ভাবে কাপড়গুলো ভ্যালেরি কিনে দিয়েছে বলে ও এমনটা বলছে? এই যে রবিনের সব কাপড় ধুয়ে ইস্তিরি করে ব্যাগে ঢুকিয়ে দিয়েছে ভ্যালেরি সেটি রবিনের মায়ের জন্য একটা বার্তা পাঠানো। তাকে বোঝানো একটা বাচ্চাকে কিভাবে অন্যের বাড়িতে থাকতে পাঠাতে হয়। বাচ্চাটা যে খুব বেশি যত্নে নেই সে ব্যাপারে এখন ভ্যালেরির আর কোনো সন্দেহ নেই।
গত দুইদিন যাবত রবিন চুপচাপ ভ্যালেরির পেছন পেছন ঘুরছিল। যেন সে ছোট একটা কুকুরছানা, প্রভুর পায়ে পায়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
গিলের বুধবার রবিনকে লন্ডনে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার কথা ছিল। মঙ্গলবার সন্ধ্যায়, গিল একটু জলদি বাড়িতে ফিরল। ভ্যালেরি তখনও বুঝতে পারেনি যে কিছু একটা ঘটেছে। রান্নাঘরের কাউন্টারে যখন সে রান্না মাংসের সাথে খাবার জন্য রুটি তৈরি করছিল তখন গিল তার পিছনে এসে দাঁড়ায়, তারপর ভ্যালেরির ঘাড়ে আস্তে আস্তে হাত বোলাতে থাকে। গিলের আরেক হাতে এক গ্লাস স্কচ। ভ্যালেরি বুঝে গেল গিল তার কাছ থেকে কিছু চাইবে।
“তুমি এত ভালো একজন স্ত্রী, এই যে আমি এত ব্যস্ত থাকি তুমি একা সব সুন্দর করে সামলাচ্ছ। আমি সত্যি ভাগ্যবান।”
“ওহ প্রিয়, তোমার কি চাই বলো?” ভ্যালেরি কন্ঠটা মোলায়েম করে বলল।
“আমি জানি আমি খুব স্বার্থপর। সেজন্য তুমি মনে মনে অনেক কষ্ট পাও তাই না?”
ভ্যালেরি কিছু বলল না, আপন মনে রুটি বেলতে লাগল।
গিল তাকে সময় দিতে পারে না বলে ক্ষমা চাইল। তারপর জানালো আগামীকাল(বুধবার) সে ছুটি নিয়েছিল কিন্তু হঠাৎ করে একটি সমস্যা দেখা দিয়েছে। আগামীকাল ডিনারে একজন বিশেষ অতিথি আসছেন, যার সাথে গিলের দেখা করাটা খুব জরুরি। রবিনকে তার মায়ের কাছে পৌঁছে দিয়ে ডিনারের আগে কিছুতেই ফেরা সম্ভব নয়। পরদিন বৃহস্পতিবার তার জরুরি মিটিং আছে আর শুক্রবার ম্যানচেস্টারে একটা অনুষ্ঠানে সে বক্তৃতা দিতে যাবে। তার মানে আগামী শনিবারের আগে কিছুতেই রবিনকে নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। রবিনের মা যদি ভালো মানুষ হত তবে সে তাকে বুঝিয়ে রবিনকে আরো কিছুদিন রাখার জন্য অনুমতি নিত কিন্তু ওই মহিলা এই সাতদিন থাকতে দিতে কত মাস ঘুরিয়েছে। ওই বাজে মহিলাকে ফোন করলে সে রাজি তো হবেই না, না জানি কি উল্টাপাল্টা বলবে। গিল ভ্যালেরিকে অনুরোধ করল যদি ভ্যালেরি কষ্ট করে রবিনকে পৌঁছে দিয়ে এরপর রাতটা ভ্যালেরির মায়ের বাসায় কাটিয়ে তারপর দিন ফিরে আসে তাহলে গিল চির কৃতজ্ঞ থাকবে।
ভ্যালেরি সকাল থেকে ভাবছিল, আগামীকাল সকাল থেকে সে আবারো মুক্ত হবে, বাড়িতে সবকিছু স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসবে। গিল রবিনকে নিয়ে চলে যাবার পর দুপুরে নিজের জন্য কিছু কেনাকাটা করে বাইরে খাবে, এমনটাই তার প্ল্যান ছিল।
ভ্যালেরির এখন সত্যিই মনে হচ্ছে গিল খুবই স্বার্থপর একজন মানুষ। সে শুধু তার সম্মান, সমৃদ্ধির পেছনে ছুটছে। ভ্যালেরিরও যে কিছু চাওয়া পাওয়া আছে সে নিয়ে গিল ভাবে না। জনপ্রিয় মানুষদের স্ত্রী হতে হলে কিছু মূল্য তো চুকাতেই হবে সেই ভেবেই গিলের বাচ্চা আছে জেনেও ভ্যালেরি তাকে বিয়ে করেছিল। কি আর করা? ভ্যালেরি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “আগামীকাল বসার ঘরের জন্য পর্দা পছন্দ করতে আমি জোন্সে যাব ভেবেছিলাম।”
“আমি দুঃখিত, আমি সত্যিই দুঃখিত।”
ভ্যালেরি জানে এই দুঃখ প্রকাশটা শুধুই বলার জন্য, গিল তার নিজের ভাবনা জগত নিয়েই ব্যস্ত। তবে এটি আমার জন্য একটা ছোটখাটো ছুটি হতে পারে, ভ্যালেরি ভাবল।
ঠিক তখন গিল বলল, “তুমি আরেকটা কাজ করতে পারো। তুমি রবিনকে ট্রেন স্টেশন থেকে একটি ক্যাবে বসিয়ে, ড্রাইভারকে ঠিকানা দিয়ে দাও। রবিন ঘরে পৌঁছে গেলে রবিনের মা ড্রাইভারকে ভাড়া দিয়ে দিবে। সে তো রবিনের মা, তার ও তো কিছু দায়িত্ব আছে, বলো ঠিক কি না? আমি জানি তার কাছে টাকা আছে, এত এত লোকের সাথে টাকা ছাড়া কি শুচ্ছে?”
ভ্যালেরি কথাটা শুনে চমকে গিয়েছিল। নয় বছরের একটা বাচ্চা মেয়েকে একা ট্যাক্সিতে তুলে দেবার কথা সে ভাবতেই পারে না। যাহোক সে রবিনকে লন্ডনে তার বাড়িতেই পৌঁছে দেবার সিদ্ধান্ত নিল। এতে করে দুইটা লাভ হবে। এক সে গিলের প্রথম স্ত্রীকে দেখার সুযোগ পাবে। গিল তার প্রথম বিয়ের কোনো ছবিই রাখেনি তাই এটাই একমাত্র সুযোগ তাকে দেখার। দুই – রবিন কি ধরনের পরিবেশে বেড়ে উঠছে সেটাও দেখে আসা যাবে।
চেলসির সদর দরজার বাইরে, ভ্যালেরি এক হাতে রবিনের স্যুটকেস, তার চামড়ার হাত মোজা এবং অন্য হাতে নিজের হাতব্যাগ ধরে দাঁড়িয়েছিল। বাড়িটি বেশ বড় কিন্তু জরাজীর্ণ, সদর রাস্তা থেকে বেশ ভেতরে বাড়ির সামনে একটা বড় বাগান, অযত্নে পড়ে আছে। এখন শীত কাল গাছে কোনো পাতা নেই কিন্তু বাগানটি দেখলেই বোঝা যাচ্ছে বহু বছর এর কোনো যত্ন নেয়া হয়নি। কয়েকটা পাথরের সিঁড়ি বেয়ে একটা সমতল জায়গায় দাঁড়ালো, সামনে একটা বিশাল কালো রঙের পুরানো দরজা। বাড়ির নাম্বারটা ফিকে হয়ে গেছে, প্রায় দেখাই যাচ্ছে না। এর ভেতরে দুই বার কলিং বেল টিপল ভ্যালেরি, ভেতরে টিংটং সুর বেজে উঠল। ঠান্ডায় ভ্যালেরির পা বরফের মতো জমে যাচ্ছিল। বিকেলের আলো ঘন হয়ে আসছিল। রবিন তার পাতলা সোয়েটার পরে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে ছিল, যদিও ট্রেনে সে রবিনকে কয়েকবার ঠান্ডায় কেঁপে উঠতে দেখেছিল। ট্রেনে হিটিং কাজ করছিল না তাই বেশ ঠান্ডা ছিল। ভ্যালেরি পুরো রাস্তা ম্যাগাজিন পড়ে কাটিয়েছে আর রবিন তার রঙিন বইয়ের একের পর এক পৃষ্ঠা দেখে কাটিয়েছে। ভ্যালেরি ও রবিন প্রচণ্ড ঠান্ডায় দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে আছে। রবিনকে দেখে মনে হচ্ছে সে এতে অভ্যস্ত। সে সাত দিন পর তার মাকে দেখবে কিন্তু তার ভেতরে কোনো উত্তেজনা দেখা যাচ্ছে না। রবিন এখনো বাচ্চা মেয়ে। এই বয়েসে বাচ্চারা মায়ের সাথে অনেক ঘেষে থাকে। অবশেষে যখন দরজা খুলল, ভ্যালেরি দরজার ওপাশে দেখতে পেল প্রায় তার বয়সী এক যুবক- ফর্সা, দীর্ঘ চুল পেছনে ছড়ানো এবং লোকটার মুখটা দেবদূতের মতন, চওড়া চোয়াল, তার ঝুলন্ত ঠোঁটের মাঝে আটকে আছে একটা নেভানো সিগারেট — ভাবলেশহীন চেহারা নিয়ে সে শুধু বলেছিল, “ওহ, হ্যালো?”
তার আলুথালু কাপড় দেখে মনে হচ্ছে সে কেবল বিছানা থেকে উঠে এসেছে। গায়ে লেপটে থাকা পাতলা টি-শার্টের ভেতর দিয়ে তার শক্ত মাংসল পেশিগুলো ফুলে উঠেছে সাথে পরেছে একটা গোলাপী শার্টিনের ট্রাউজার। তার পা খালি। ওর শরীর থেকে চিড়িয়াখানার প্রাণীর গায়ে যেমন বিদঘুটে গন্ধ হয় তেমন গন্ধ বের হচ্ছিল, কেমন টকটক ও দমবন্ধ করা গন্ধ। রবিনকে দেখে সে খুব মজা করে বলার চেষ্টা করল, “ও তুমি সেই ছোট্ট মেয়েটা?”
“মিসেস হোপ কি বাড়িতে আছেন?” ভ্যালেরি একটু গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করল।
লোকটা টি-শার্টের নিচে তার বুক আঁচড়ে নিল এবং অসভ্যের মত ভ্যলেরির সারা শরীরে এক ঝলক চোখ বুলিয়ে বলল, “হ্যাঁ, নিশ্চয়ই আছে, এটা তারই বাড়ি।”
ঠিক সে মূহুর্তে একজন মহিলা লোকটার পিছনে এসে দাঁড়াল। মহিলা লোকটার চেয়ে লম্বা, তার চকচকে চোখের চারপাশে মেকআপের কালো ছোপ, এবং তার কালো চুলের স্তূপে যেন চিকমিক হীরে জ্বলছিল এই মধ্য বিকেলেও। সম্ভবত সে চুলে জরি মেখেছে। মারিসাকে লম্বা সাদা পোশাক এবং সাদা পেটেন্ট-চামড়ার বুট জুতাতে বেশ আকর্ষণীয় দেখাচ্ছিল: তার মুখে অতিরিক্ত প্রসাধনী মাখা থাকলেও বোঝা যাচ্ছে সে চোখে পড়বার মতন সুন্দরী। নাটকে সিনেমায় যেমন দেখা যায় ঠিক তেমন।
“ওহ, জেসাস, ওর কি আজ আসার কথা ছিল? ছিঃ! আমি তো ভুলেই গিয়েছিলাম” মারিসা একটু ন্যাকামো করে যেন কাঁদছে সেভাবে রবিনের দিকে হাত বাড়াল, ” মা আমার, দাও আমাকে চুমু দাও। এই যে এ হল জেমি, জেমিকে চুমু দাও। এই জেমি আমার মেয়েকে হ্যালো বল। ও কি মিষ্টি দেখতে তাই না? রবিন তোমার জেমি চাচ্চুর কথা মনে আছে? ওই যে ব্যান্ডে গান করে?”
রবিন হ্যালো বলল, মায়ের গালে চুমু দিলেও জেমির গালে চুমু দেয়ার কোনো আগ্রহ দেখাল না। তার মা চারপাশে সুগন্ধি ছড়িয়ে রবিনকে অনেকটা টেনে ঘরের ভিতরে নিয়ে গেল। ভ্যালেরি তখনও বাইরে দাঁড়িয়ে। মারিসা এমন ভাব করছে যেন ভ্যালেরি পয়সা নিয়ে বাচ্চা দেখাশোনা করবার আয়া। ভ্যালেরির দিকে তাকিয়ে রবিনের ব্যাগটা দেখিয়ে বলল, “এগুলো কি রবিনের জিনিস? তুমি ওখানেই ওর ব্যাগ রেখে যাও জেমি ওটা উপরে তুলে নেবে। তোমার কি ক্যাব অপেক্ষায় আছে? উত্তরের অপেক্ষা না করেই সে রবিনকে কোলে তুলে নেবার চেষ্টা করল উফ, কত বড়, ভারী মেয়ে তুমি আমার রবি-ববি। তুমি কি নিজে নিজে উপরে উঠতে পারবে?”
হল রুমটা ছিল একটু আলো আধারিতে ঢাকা। একটি দুর্বল বাল্ব বড় রুমটাকে আলোকিত করার চেষ্টা করছে; ভ্যালেরি কোনো নিমন্ত্রণ ছাড়াই ঘরে ঢুকে পড়লো। তার পায়ের জুতো কালো সেটি সাদা মার্বেলের টাইলগুলিতে প্রতিধ্বনি তুলছিল। “হ্যালো, মিসেস এইচ.,” ভ্যালেরি খুব দৃঢ় কণ্ঠে বলে উঠল।, “আমি নতুন মিসেস এইচ. আপনার সাথে দেখা হওয়ায় ভালো লাগছে।”
মারিসা ততক্ষণে রবিনের পিছু পিছু দোতলার কয়েকটা সিঁড়ি পেরিয়ে গেছে সেখান থেকে ঘাড় বাঁকিয়ে তার দিকে তাকাল, “ওহ, আমি ভেবেছিলাম তুমি মিসেস এইচ হতে পার। তোমাকে দেখেই মনে হয়েছিল সে হয়তো তোমার মতো কাউকে বেছে নিয়েছে।”
“বাইরে ভীষণ ঠান্ডা, আমি কি এক কাপ চা পেতে পারি?,” ভ্যালেরি প্রফুল্লভাবে এগিয়ে গিয়ে মরিসকে বলল। তার ধারনা ছিল এতে করে তাদের দুজনের মাঝের অস্বস্তিকর যে অনুভূতি তৈরি হয়েছে সেটি কিছুটা দূর হবে এবং সব কিছু সহজ হয়ে উঠবে। অবশ্যই মারিসা জানত যে সে রবিনকে নিয়ে আসছে – গিল তাকে বলার জন্য গতকাল রাতে টেলিফোন করেছিল। “ ট্রেনের হিটিং কাজ করছিল না, আমরা দুজন ঠান্ডায় জমে গেছি।”
“তুমি কি দুধ চা খাও?” মারিসা জিজ্ঞেস করলো। “আমি জানি না আমাদের ফ্রিজে কোনো দুধ আছে কিনা, সম্ভবত শেষ হয়ে গেছে।”
“গরম কিছু হলেই হবে!”
জেমি রবিনের ব্যাগ নিয়ে উপরে উঠে গেল।
প্রথম তলায় একটি বিশাল খোলা দরজা। দরজার ওপাশের রুমটা বেশ বড়। সম্ভবত এটা এ বাড়ির সবচেয়ে বড় রুম। দরজার গায়ে বেগুনী আর কমলা রঙের আলপনা আঁকা। এককালে হয়ত দেখতে ভালো ছিল এখন বেশ জরাজীর্ণ অবস্থা। একটা দরজার পাল্লার নীচের অংশ কিছুটা দুমড়ে গেছে, মনে হচ্ছিল কেউ একজন খুব জোরে কিছু দিয়ে দরজাটা আঘাত করেছিল। দরজার লাগানো তালাটা ইয়েল কম্পানির বানানো এবং কোনো এককালে দরজাটাতে বেগুনি এবং কমলারঙ করা হয়েছিল। ধূসর রঙের মার্বেল পাথরে ঢাকা ফায়ার প্লেস। সামনে বিশাল জানালায় পুরানো পর্দা ঝুলছে। বোঝাই যাচ্ছে এককালে এ বাড়িটা বেশ আকর্ষনীয় ছিল।
পাশের ঘরটি অপেক্ষাকৃত ছোট। একটি চামড়ার সোফার পাশে একটি কালো ঝাঁঝরিতে কাঠের মোটা গুড়ি পুড়িয়ে আগুন জ্বলছিল। সোফার ফ্যাকাসে কুশনগুলি বলে দিচ্ছে ওগুলো বহু বছরের পুরনো । জেমি ব্যাগগুলো একটা দেয়ালের পাশে নিয়ে রাখল। রবিন এবং ভ্যালেরি, তাদের গায়ে পরা কোট দরজায় লাগানো হ্যাঙ্গারে ঝুলিয়ে আগুনের পাশে গিয়ে বসলো। দুজন তখনো ঠান্ডায় কাঁপছে। মারিসা পাশের রান্নাঘরে গিয়ে ঢুকলো, খুব সম্ভবত ফ্রিজে দুধ আছে কিনা তা দেখতে।
জেমি আরও কয়েকটা কাঠ ফায়ারপ্লেসে গুঁজে দিল।
একটু পর মারিসা ফিরে এসে জানাল দুধ নষ্ট হয়ে গেছে। টিন স্যুপ আছে। ভ্যালেরি কি ব্লাডি মেরি খেতে চায় কিনা। ভ্যালেরিকে ফিরতে হবে অনেকটা পথ তাই এখন মদ খাওয়াটা কি ঠিক হবে কিনা বুঝতে পারছিল না। কিন্তু সে ঠান্ডায় পুরোপুরি কাবু হয়ে পড়েছিল তাই হেসে হ্যাঁ বলল। একটু পর তিন গ্লাস পানীয় এল, সেখানে প্রচুর বরফ, লেবুর রস আর কাঠিতে গোঁজা কয়েকটা জলপাই। খেতে বেশ কড়া হলেও ঠান্ডায় বেশ লাগল খেতে। মারিসা বলল, ‘ মাঝে মাঝে আমি শুধু এটা খেয়েই সারাদিন কাটিয়ে দিই, এটা বেশ স্বাস্থ্যকর পানীয়।” মারিসা রবিনের হাতে টমেটোর একটা পানীয় গুঁজে দিল সেটাতে কোনো ভদকা মেশানো ছিল না, তার সাথে এক প্যাকেট ক্রিপ্স। “এই নাও এই ক্রিপ্সটা আমি তোমার জন্য রেখে দিয়েছিলাম আমার ক্ষুধার্ত ভালুক, আমি তো জানি তোমার কত খিদা লাগে আর তুমি কত খেতে পার। আমাদের জেমিও মস্ত পেটুক। যা-ই দেবে সব খেয়ে নেবে। তাই এই ক্রিপ্সটা তোমার জন্য আমি জেমির কাছ থেকে লুকিয়ে রেখেছিলাম। তুমি কি এখনও ক্ষুধার্ত আমার মিষ্টি ভালুক ববিন?”
রবিন তখন অপ্রত্যাশিতভাবে ভাল্লুকের মতন তার কাঁধ কুঁকড়ে, চোখ বড় বড় করে, এদিক ওদিক লাফাতে থাকে এবং হাঁপাতে থাকে, সে তার হাত দিয়ে মুখ আঁচড়ে অদ্ভুত সব শব্দ করতে থাকে। যাক রবিন অন্য বাচ্চাদের মতন খেলতে ভালোবাসে, দেখে ভ্যালেরি খুশী হয়ে উঠল। মারিসা তার মেয়ের দিকে তাকিয়ে হাসছিল।
একটু পর মারিসা বলল “অনেক হয়েছে ববিন ভালুক এখন তুমি ক্রিপ্সটা নিয়ে তোমার ঘরে যাও। না হয় জেমি ভালুক সেটা খেয়ে ফেলবে।”
রবিন চুপ হয়ে গেল, সেই শান্ত গোলাপি রঙের ছোট্ট পুতুল ফিরে এল। সে যাবার সময় মাকে বলল, ” মা আমি কি আন্টিকে আমার রুমটা দেখাতে পারি?”
“আন্টি? কে তোমার আন্টি? হায় জেসাস ও কি করে তোমার আন্টি হবে? তুমি কি জানো না সে কে?”
ভ্যালেরি একটু অপ্রস্তুত হয়ে বলল, ” আসলে আমিই ওকে আন্টি ডাকতে বলেছিলাম, সেটাই ঠিক সম্বোধন হবে এটাই মনে হয়েছিল?”
” তাও ভালো তুমি ওকে মামি বা মম ডাকতে বলোনি।”
” মা আমি জানি ভ্যালেরি আমার সৎ মা।”
” ঠিক তাই, ও তোমার দুষ্ট সৎ মা। ওকে তাই ডাকবে।” এই বলে মারিসা ভ্যালেরির দিকে চোখ কুঁচকে তাকাল যেন সে খুব মজার কিছু বলেছে।
রবিন ওর রুমে চলে গেল। জেমি তার গিটারে কিছু একটা বাজানোর চেষ্টা করছে। মারিসা সিগারেট ধরাল এবং নিজেকে সোফায় ছুড়ে দিল। ঘরে একটা বাজে গন্ধ ছড়িয়ে পড়ল। ঠিক এ গন্ধটাই রবিনের কাপড় থেকে পাচ্ছিল ভ্যালেরি।
পানীয় খাওয়া শেষে গ্লাসটা রাখতে ভ্যালেরি রান্নাঘরের দিকে এগিয়ে গেল। রান্নাঘরটা প্রচণ্ড অগোছালো। সিঙ্কে অনেক বাসনকোসন জমানো, কে জানে কতদিন যাবত ওগুলো ওখানে পড়ে আছে। ভ্যালেরি ভাবছিল যে তার চলে যাওয়া উচিত। এখানে তার আর কিছুই করার নেই। রান্নাঘর থেকে আগের রুমটায় ঢুকতেই মারিসা বলল, “তাহলে, ভ্যালেরি,” “তুমি আমার প্রিয় মেয়ের সাথে কিভাবে সময় কাটালে? ও একটা মজার ছোট্ট সাপ, তাই না? আমি আশা করি গিলবার্ট তার সাথে প্রতিটি মুহূর্ত উপভোগ করেছে। সে তোমাদের কোনো সমস্যায় ফেলেনি তো?”
“না একদম না। রবিন খুব ভাল মেয়ে। আমাদের কোনো সমস্যা হয়নি।”
“ও গিলবার্টের মতন বুদ্ধিমান না, সে বাবার চেহারা এবং আমার মগজ পেয়েছে। অথচ উল্টোটা হলে কত ভালো হতো, তাই না?”
বাইরে, বিকেলের শেষ আলো নিভে যাচ্ছিল, এবং যদিও বাতাস পুরোনো জানালার প্যানগুলিকে ধাক্কা দিচ্ছিল, তবু কেউ পর্দা টেনে দিতে বা বাতির সুইচটা জ্বালানোর চেষ্টা করল না। ভ্যালেরি যাওয়ার জন্য উঠে দাঁড়াল কিন্তু মারিসার দেয়া পানীয়টি তার জন্য একটু কড়া হয়ে গিয়েছিল। এত কড়া মদ সে খেয়ে অভ্যস্ত নয়, তাই ধপ করে আবার সোফায় বসে পড়ল। হঠাৎ করেই তার কল্পনায় ভেসে উঠল তার স্বামী গিলবার্ট মারিসের এই নির্লজ্জ, উচ্ছৃঙ্খল সংসার দেখে কেমন উত্তেজিত হতে পারে।
“আমি বুদ্ধিমান পুরুষদের পছন্দ করি,” মারিসা বলল। “আমি গিলবার্টের বুদ্ধিমত্তার প্রেমে পড়েছিলাম, প্রথমে তার জন্য একদম পাগল ছিলাম। ঘন্টার পর ঘন্টা আমি তার কথা শুনতে বসে থাকতাম। সে আমাকে ইতিহাস, রাজনীতি এবং শিল্প সম্পর্কে চমৎকার সব তথ্য দিত যা আমাকে অবাক করত। আমি বোকা মানুষ। আমার বয়স যখন চৌদ্দ বছর তখন আমাকে স্কুল থেকে বের করে দেওয়া হয়েছিল— স্কুলের নানরা আমাকে ঘৃণা করত। ভ্যালেরি, আমি খুব কমই পড়তে এবং লিখতে পারি। তুমি নিশ্চয়ই অনেক পড়াশোনা জানা মেয়ে তাই না? টাইপিং এবং শর্টহ্যান্ড করতে পার, তুমি চালাক মেয়ে, দেখেই বুঝেছি। কিন্তু তুমি যতটা চালাক আমি ঠিক ততটা বোকা, তাই আমি গিলবার্টের পায়ের কাছে হাঁটু গেড়ে বসে থাকতাম, যখন সে কথা বলত তখন তার দিকে তাকিয়ে থাকতাম। সে ঘণ্টার পর ঘণ্টা শুধু কথা বলতো আর আমি তা গোগ্রাসে মুগ্ধ শ্রোতার মতন গিলতাম। সে আমার এই ভক্ত হয়ে বসে থাকাটা খুব পছন্দ করত। সব পুরুষই চায় তার মহিলা সঙ্গী তার অন্ধ ভক্ত হবে, তাই না?”
“তাই কি? আমি জানতাম না তো।”
“হা হা এখনো টের পাওনি তুমি? যখন আমরা তাদের পায়ের কাছে হাঁটু গেড়ে বসে থাকি তখন তারা নিজেদের প্রভু ভাবে। অবশ্য জেমি মনে করে এটা হাস্যকর, তাই না, জেমি? এখন আমি গিলবার্টের পরিবর্তে জেমিকে পূজা করছি। কিন্তু জেমি মনে করে আমি তার গিটারের পূজা করছি।”
“আমার প্রতিভা কে ,” শুধরে দিল জেমি। মারিসা তার সাদা বুটটা জেমি যে সোফায় বসেছে তার পায়ার দিকে ঠেলতে গিয়ে আলুথালু হয়ে পড়ে যাবার দশা হল। নিজেকে ঠিক করে নিয়ে মারিসা আবার বলতে শুরু করল, “গিলবার্ট উঁচু আসনে বসে নিজের চতুরতার বড়াই করত, নিজেকে এক উজ্জ্বল তারকা ভেবে নিত আর আমি যেন খুব তুচ্ছ একজন পিপীলিকা। হঠাৎ একদিন আমি এ অবজ্ঞা আর তাচ্ছিল্য নিতে পারলাম না! আমার মনে হল জীবন মানেই কি আমি অনেক বুদ্ধিমান তা দেখিয়ে বেড়ান? বুদ্ধি যাদের নেই তবে কি তারা জীবনযাপন করছে না? নিশ্চয়ই করছে, বুদ্ধিই বেঁচে থাকার, সুখে থাকার একমাত্র নেয়ামক হতে পারে না।”
“আমি কখনোই গিলের কাজে খুব একটা আগ্রহ দেখাইনি,” ভ্যালেরি বলল। “যদিও আমি জানি সে অনেক বুদ্ধিমান এবং তার কাজ অনেক উঁচু মানের। আমি আমার নিজের স্বার্থে ওর সাথে আছি।”
“ওহ, তাই? সে যদি তোমার জন্য ভালো হয় তো খুবই ভালো! এসব কথা তোলার কোনো আগ্রহই আমার ছিল না। পুরুষ চাইলে আমি যেকোন সময় পেতে পারি কিন্তু গিলবার্ট সবার চেয়ে আকর্ষণীয় ছিল। তুমি কি জান গিলবার্ট আমাকে মারধর করত? হ্যাঁ সত্যিই বলছি ও আমার গায়ে হাত তুলত।”
কি মেলোড্রামা! ভ্যালেরি মনে মনে খুব জোরে হেসে উঠল। সে এটা বিশ্বাস করেনি। এমন নয় যে গিলবার্ট রাগ করে না। যখন তারা প্রথম বিয়ে করেছিল তখন ডিপার্টমেন্টের লোকজনের নানা কথায় গিলবার্ট রাগে উন্মত্ত হয়ে উঠেছিল। ইউনিভার্সিটির অফিসে, সমস্ত মহিলারা তা দেখেছিল এবং তার রাগ দেখে তারা ভয় পেয়েছিল। ব্লাডি মেরির প্রভাব ঝেড়ে ফেলার চেষ্টা করে আবারো উঠে দাঁড়ালো ভ্যালেরি।
” আমার মা আমার জন্য অপেক্ষায় আছেন”, সে বলল। “এবং আমি জানি না রবিনের রাতের খাবার নিয়ে তোমার পরিকল্পনা কী। দুপুরে আমি ট্রেনে ওকে পনির স্যান্ডউইচ বানিয়ে দিয়েছিলাম, এবং ও একটি আপেল খেয়েছে।”
মারিসা যেন খুব মজা পেয়েছে সেভাবে বলল, “রবিনের রাতের খাবার নিয়ে আমার কোনো পরিকল্পনা নেই। আমি কখনো খাওয়া দাওয়া নিয়ে অত ভাবি না।”
ভ্যালেরি তখন রবিনকে খুঁজতে যেতে চাইল, ওকে বিদায় জানাতে। কিন্তু রবিনের ঘরটায় যেতে হলে রান্নাঘরটা পেরিয়ে যেতে হবে। রান্নাঘরের বিশৃঙ্খল দৃশ্য ভ্যালেরিকে অসুস্থ করে তুলছিল, একটি পুরানো সিঙ্কে থালাবাসন, নোংরা গ্যাসকুকার, মেঝেতে রুটির টুকরো ও কমলার খোসা ছড়ানো এবং নোংরা চায়ের তোয়ালে। রান্নাঘরের টেবিলে তখনও একটা প্লেট পড়ে ছিল যার উপর কিছু মাংসের ঝোল বা সস জমাট বেঁধেছিল। ভ্যালেরি দেয়ালের পাশ থেকে তার ব্যাগটা নিয়ে বলল, “রবিনকে আমার ভালবাসা দিও।”
কেউ ভ্যালেরির সাথে বাইরের দরজা পর্যন্ত এগিয়ে এলো না। ভ্যালেরি আলো আধারিতে রাস্তা চিনে নীচে নেমে ময়লা কার্পেটটা পেরিয়ে বাইরে গিয়ে একটা লম্বা নিঃশ্বাস নিল। ওই ঘরের বাতাসে আর কিছুক্ষণ থাকলে সে দম বন্ধ হয়ে মরে যেত।
সেই রাতে তুষারপাত হয়েছিল। ভ্যালেরি সকালে তার পুরানো বেডরুমে ঘুম থেকে জেগে উঠেছিল। জানালা দিয়ে বাইরে তাকাতেই দেখল চারপাশ তুষারে ঢেকে গেছে। চারপাশে একটা বিশুদ্ধ আলো জ্বলজ্বল করছে। তার রুমের বেশ কিছু আসবাবপত্র তার দাদির কাছ থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া। তারপরও সব আসবাবপত্রেই যত্নের ছাপ। কোথাও এক রত্তি ধুলো নেই। পর্দাটা পুরো টেনে ভ্যালেরি আবারো শুয়ে পড়ল। তুষারপাতের দিকে তাকালে কেন যেন সে শৈশবে ফিরে যায়। নীচ থেকে তার মায়ের কণ্ঠ শুনতে পাচ্ছে ও, খুব সম্ভবত সে যে ঘুম থেকে জেগেছে তা টের পেয়ে কথা বলছেন।
“ট্রেন চলছে না,” ভ্যালেরি নেমে আসার পর তার মা আনন্দের সাথে বলল। গ্যাসের আগুনের তাপে ভ্যালেরির মা তার হাউসকোটটা গায়ে জড়িয়ে টেবিলে বসে ধূমপান করছিল। ” তাই তোমাকে আরও একটা রাত এখানে থাকতে হবে।”
“ওহ, আমি জানি না, মা। আমার বাড়িতে কিছু জরুরি কাজ আছে।”
তুষার তাকে অস্থির করে তুলেছিল; সারাদিন তার মায়ের সাথে বলার মতো তেমন কোনো কথাও তার মাথায় জমা নেই, কিন্ত সে চুপও থাকতে চায় না তাতে মা মনে কষ্ট পাবে। একটা আলমারির পিছনে এক জোড়া ভেড়ার চামড়ার বুট খুঁজে নিয়ে ভ্যালেরি রাস্তার ফোন বাক্সের দিকে হাঁটতে লাগল। সরু রাস্তা জুড়ে তুষার ঝরছিল, এখনও ছেলেমেয়েরা তুষার নিয়ে খেলতে বেরোয়নি তাই সব খুব সুন্দর গোছাল মনে হচ্ছে। যেন একটা ছবি। ফোনের বাক্সটি তুষারে ঢেকে গেছে।
সে গিলকে ফোন করল। তাকে বলল, সে একটু পর স্টেশনে যাবে এবং কী ঘটছে তা খুঁজে বের করবে। গিল বলে, উত্তরেও তুষারপাত হচ্ছে। সে আজ ফ্যাকাল্টি মিটিংয়ে যাবে না; বাড়িতে তার বইয়ের কাজ করবে। “তুমি যেভাবে পার এখানে চলে আসার চেষ্টা কর,” খুব নিচু কণ্ঠে বলল, “আমি তোমাকে মিস করছি।”
ঘরে ঢুকে ভ্যালেরি মাকে বলল “আমাকে যেতে হবে।”
“আমি জানি না কেন তুমি গিলের কাছে চলে যেতে এত আগ্রহী, আমার কাছে কি দুইটা দিন থাকা যায় না?” মা বিড়বিড় করল। কিন্তু ভ্যালেরি তৈরি হয়ে বেরিয়ে পড়ল। ট্যাক্সি নিয়ে কিংসক্রস স্টেশনে যেতে তার প্রায় দেড় ঘন্টা সময় লাগল – একটা পাতাল রেল চলছিল, কিন্তু ঘণ্টায় মাত্র একটা করে চলছিল। ভ্যালেরি যে ট্রেনে ফিরে যাবে সেটা চলছিল না। তুষারপাত বন্ধ হয়ে গেছে, ট্রেনের এক কর্মচারি বলল, বিকেল নাগাদ তারা কয়েকটা ট্রেনের লাইন আবার খুলে দিতে পারবে। ভ্যালেরি কিংসক্রসে থাকতে চায়নি। সে তার ব্যাগ স্টেশনে লাগেজ রুমে জমা রাখল, তারপর শপিংয়ে যাওয়ার কথা ভাবল—এতক্ষণে নিশ্চয়ই অক্সফোর্ড স্ট্রিট পরিষ্কার করে ফেলেছে। কিন্তু ভ্যালেরি অক্সফোর্ড স্ট্রিটে না নেমে তার পরিবর্তে পিকাডিলি লাইন নিয়েছিল। কখন যে সে চেলসির বাড়িতে গিয়ে পৌঁছল ভ্যালেরি টেরই পায়নি। কেমন একটা ঘোরের মধ্যে ছিল কিছুক্ষণ। তখন দুপুর দুইটার মতো।
বাড়িটা দিনের আলোয় আর তুষারে ঢেকে একদম অন্য রকম হয়ে গিয়েছিল। ভ্যালেরি প্রথমে চিনতেই পারছিল না। বাড়ির সামনের অগোছালো ঝোপঝাড় এখন তুষারে ঢাকা, এখন আর বাড়িটা দেখতে অত খারাপ লাগছিল না। ভ্যালেরি নিজেও জানে না কেন সে ফিরে এসেছে সেখানে। বাড়িতে ঢোকার সিঁড়ির মুখটায় দাঁড়িয়ে দোতলার পাশের জানালাটার দিকে তাকাল সে। সেখানে সে রবিনকে দেখতে পেল – রবিন অন্যদিকে তাকিয়েছিল, সম্ভবত সে তুষার দেখছিল, কিন্ত হঠাৎ সে ভ্যালেরিকে দেখতে পায়। তাকে দেখে সে এত উত্তেজিত হয়ে পড়েছিল যে মনে হচ্ছিল জানালার কাঁচের উপর দিয়ে লাফ দিয়ে ভ্যালেরির কাছে চলে আসবে। এখন প্রায় দুপুরের খাবারের সময় শেষ হয়ে আসছে অথচ তখনও রবিন রাতে ঘুমাতে যাবার জন্য যে নতুন সাদা পায়জামা কিনেছিল সেটা পরে আছে। রবিন এখন জানালা ধরে দাঁড়িয়েছে যেন সেখান থেকেই সে লাফ দিবে। আগের রাতে সেই জানালাগুলি কীভাবে বাতাসে ঝাঁকুনি দিয়েছিল তা মনে করে, ভ্যালেরি তার হাত মোজা খুলে রবিনকে নীচে নামতে ইশারা করল। রবিন তার কথা শুনতে পেল না কিন্তু বোঝার চেষ্টায় উন্মুখ হয়ে তাকিয়ে রইল। ভ্যালেরি আবার ইশারা করল: নামো, সাবধানে নীচে নামো। রবিন ঘাড় নাড়ল, তারপর ঝট করে সরে গেল সম্ভবত নীচে নামছে। দরজাতে শব্দ হচ্ছে।
ভ্যালেরির বুট তুষারে ভিজে গেছে। ডোরবেল বাজানোর সাহস হয়নি এবার। কি বলবে সে? কেন এসেছে সে এখানে? তার কাছে এর কোন উত্তর নেই। রবিন দরজা খুলে দিতেই ভ্যালেরি ভেতরে ঢুকে পড়ল। উপর থেকে জেমি চেঁচিয়ে উঠলো “জন, তুমি এসেছ?”
কোনো আওয়াজ না পেয়ে জেমি রুম থেকে বেরিয়ে আসতেই ভ্যালেরির মুখোমুখি হল, “হুল্লো! তুমি এখানে কি করছ? কে দরজা খুলে দিয়েছে?”
ভ্যালেরি দেখল জেমি খালি গায়ে একটা ছোট প্যান্ট পরে আছে। ভ্যালেরি অস্বস্তি বোধ করল। এমন নির্লজ্জ লোকের সাথে কথা বলার ইচ্ছে তার হচ্ছে না। “রবিন কিছু জিনিস ফেলে এসেছিল। আমি ওকে তা দিতে এসেছি।” মিথ্যে বলল ভ্যালেরি।
“আমি ওকে আমার খেলনা দেখাতে চাই,” রবিন বলল।
জেমি ইতস্তত করল। “ওর মা শুয়ে আছে – তার মাথা ব্যথা উঠেছে। তুমি ওর রুমে যেতে পার। ওর সাথে খেলার জন্য এখানে কেউ নেই।”
রবিন ভ্যালেরির হাত ধরে একটা দরজা দিয়ে টেনে নিয়ে গেল যা সোজা রান্নাঘরের ভেতর দিয়ে যায়; কেউ টেবিলে পড়ে থাকা মাংসের ঝোল লাগানো প্লেটগুলি পরিষ্কার করেছে কিন্তু তা ভালো করে ধোয়নি, – সেগুলো এখনো সিঙ্কের পাশের নোংরা বাসনপত্রের স্তূপের পাশে পড়ে আছে। সকালের নাশতার একমাত্র লক্ষণ ছিল টেবিলে একটা কর্নফ্লেক্সের খোলা প্যাকেট এবং একটি বাটি ও চামচ। রবিনের শোবার ঘরটা বেশ বড়, চমৎকার সব খেলনা দিয়ে সাজানো, ভ্যালেরি বেশ অবাক হল। সে ছোটবেলায় এত খেলনা পায়নি। বিশাল একটা পুতুলের ঘর, সাদা মসলিনের চাদরসহ একটি পুতুলের দোলনা, একটি কাঠের নোয়াস আর্ক যেটা ছাদ পর্যন্ত উঠে গেছে। কিন্তু ঘরটা ঠান্ডা এবং বিষণ্ণ। বিছানায় কোনও চাদর ছিল না, কেবল একটা নোংরা হলুদ নাইলনের স্লিপিং ব্যাগ ছিল।
কেউ রবিনের স্যুটকেসটা খোলেনি – সবকিছু এখনও ভিতরে ভাঁজ করা; পায়জামা বের করার জন্য রবিন নিশ্চয়ই ওটা খুলেছিল। একটা টেবিল যার ড্রয়ারগুলি খোলা এবং রবিনের বেশিরভাগ জামাকাপড় দেয়ালের সাথে স্তূপ করা সুপারমার্কেট ক্যারিয়ার ব্যাগ থেকে উপচে পড়ছে। একটা কাপড়ের আলমারি নেই রবিনের কামরায়।
“আমি জানতাম তুমি ফিরে আসবে,” রবিন আহ্লাদের স্বরে বলল, ভ্যালেরির হাত সে এখনো ধরে রেখেছে।
ভ্যালেরি তার মুখ খুলল ব্যাখ্যা করার জন্য – এই আবহাওয়ায় সে তার ট্রেন মিস করেছে, তাই এখানে আর কাউকে সে চেনে না বলে এখানে চলে এসেছে। “আমরা কেউ এমন তুষারপাত আশা করিনি, করেছিলাম কি?” ভ্যালেরি হেসে বলল।
“তুমি কি আমাকে নিতে এসেছ? তুমি কি আমাকে আবার তোমার বাসায় নিয়ে যাবে?”
ভ্যালেরি রবিনকে বলল, সে রবিনকে বিদায় জানাতে এসেছে।
“না, ভ্যালেরি আন্টি, দয়া করে তুমি আমাকে এখানে ফেলে যাবে না।”
“আমি নিশ্চিত তুমি খুব জলদি আমাদের সাথে থাকতে আসবে।”
রবিন ছোট্ট অসহায় বাচ্চার মতন ভ্যালেরিকে জড়িয়ে ধরে। “এখনই না! আমি তোমার বাবার সাথে কথা বলি তারপর। এবার আমি যাবো, ভালো থেকো!”
রবিনকে দারুণ অসহায় দেখাচ্ছে। মনে হল সে সত্যিই এখানে থাকতে চাইছে না। তার চোখ আর কপাল কুঁচকে আছে।
“তুমি কি সত্যিই আমার সাথে আমাদের বাসায় যেতে চাও?”
“সত্যি, সত্যি,” রবিন আকুতি করল।
“কিন্তু তোমার আম্মুর কি হবে?”
“সে কিছু মনে করবে না! আমরা ওকে না বলেই বেরিয়ে যেতে পারি।”
“উহু তোমার মায়ের অনুমতি ছাড়া তোমাকে নিয়ে যাওয়াটা আইনগত অন্যায়। যাহোক সে এখন ঘুমাচ্ছে। চলো তোমার কাপড় চোপড় সুটকেসে ঢোকাই, তৈরি থাকি। তোমার কাপড় বদলাতে হবে। বাইরে প্রচণ্ড ঠান্ডা, তুমি কি সত্যিই যেতে চাইছ? আরো ভেবে বল। পরে কান্নাকাটি করবে না তো? আরেকটা সমস্যা হল এখনো ট্রেন চালু হয়েছে কিনা সেটা দেখতে আমাদের স্টেশনে যেতে হবে।” ভ্যালেরি দ্রুত চারপাশে তাকাল। “তোমার কোট কোথায়? তোমার কি বাথরুমে যেতে হবে?”
রবিন তার পায়জামা খুলতে মেঝেতে হঠাৎ বসে পড়ল, এবং ভ্যালেরি স্যুটকেসের সব বের করে যেগুলো দরকারী সেগুলো গোছাতে লাগল — প্যান্টি, উলের জাম্পার এবং জুতা। টুথব্রাশটা তখনো তার স্পঞ্জ ব্যাগেই ছিল। ঠিক তখন তারা পায়ের আওয়াজ শুনতে পেল। রান্নাঘরের একটি চেয়ার ঠেলে কেউ এগিয়ে আসছে। ভ্যালেরি সোজা হয়ে বসল। মারিসাকে কি বলতে হবে তা জলদি ঠিক করতে হবে। মারিসা তার পিছনে জেমিকে নিয়ে বেডরুমের দিকে যেন ঝাঁপিয়ে পড়ল। রবিন ট্রাউজারটা মাত্র পরেছে। “কি অসাধারণ!” মারিসা চিৎকার করে উঠল, “তুমি কি মনে কর, ভ্যালেরি? তুমি আমার সন্তানকে অপহরণ করবে আর আমি তাকিয়ে তাকিয়ে তা দেখব?” মারিসা সোনালি সিল্কের কিমোনোতে মোড়ানো। তার পরনের কাপড়ে একটা এমব্রয়ডারি করা ড্রাগন। চোখের নীচে এখনো গতকালের মেকআপ ল্যাপ্টে আছে। মারিসাকে কোনো নাটকের দুখী কিন্ত সাহসী নায়িকার মতন লাগছে।
“উত্তেজিত হয়ো না,” ভ্যালেরি শান্তভাবে বলল, “আমি রবিনকে অপহরণ করছি না। আমি এখুনি তোমাকে খুঁজতে যাচ্ছিলাম, জিজ্ঞেস করতে যে রবিন আমাদের সাথে আরও এক সপ্তাহ থাকতে পারবে কিনা।”
“আমি পুলিশ ডাকছি।”
“আমি যদি তুমি হতাম তবে কখনওই সে ভুল করতাম না। তুমি এ রুমের চারপাশে চোখ বুলিয়ে দেখ। ওর বিছানায় কোনো চাদর নেই, এই ঠান্ডায় কোনো ভারি লেপ নেই। এ রুমটা দেখলেই বোঝা যায় তুমি ওকে কিভাবে অবহেলায় বড় করছ।”
“রবিন স্লিপিং ব্যাগ পছন্দ করে সেজন্য তাকে লেপ দিইনি, তুমি রবিনকে জিজ্ঞাসা কর। আর বিছানার চাদর থাকলো কি থাকলো না তাতে কিছুই প্রমাণ হয় না!”
রবিন মাথা নামিয়ে প্যান্ট খুলে তার আগের পরা পায়জামা পরে তার মুখ ঘুরিয়ে নিল। মা তাকে যেতে দেবেন না সে নিশ্চিত ।
” আমি জানতে চাই রবিন এ বাড়িতে আসার পর থেকে কি কি খেয়েছে। তোমার ঘরে দুধ নেই, আছে? তার মানে আজ সকালে সে শুধুই শুকনো কর্নফ্লেক্স খেয়েছে। এখন দুপুর আড়াইটা বাজে। গতকাল দুপুরের খাবারের পর সত্যিকার অর্থে ও না খেয়েই আছে।”
“আর বকো না, বাচ্চা পালার তুমি কি জান? তোমার তো এখনো কোন বাচ্চাই হয়নি!” মারিসা চিৎকার করে উঠল। “রবিন দুধ পছন্দ করে না – সে দুধ ঘৃণা করে। সে যেদিন জন্মেছিল সেদিন থেকেই সে একটা বখাটে বাচ্চা হয়ে বড় হয়েছে। খুবই অসভ্য একটা বাচ্চা, অন্য বাচ্চাদের মতন নয় – একজন গুপ্তচরও বটে! আমার সম্পর্কে নিশ্চয়ই তোমাকে অনেক বানিয়ে বানিয়ে গল্প বলেছে তাই না? সে জন্যই তোমার মন উথলে উঠেছে। কত বাজে বাচ্চা হতে পারে ভেবে দেখ। যে মা তাকে এতদিন ধরে বড় করল, কদিনের জন্য বাবার কাছে গিয়ে একটু আরাম আহ্লাদ পেয়ে সেই মাকে সে ভুলে গেছে। অকৃতজ্ঞ ছোট্ট সাপ আর এই তুমি, তুমি তাকে আমার বিরুদ্ধে যেতে উৎসাহিত করেছ। আমি জানতাম এটা ঘটবে. আমার কখনই গিলবার্টের কাছে ওকে পাঠানো ঠিক হয়নি। আমি জানতাম সে আমার বাচ্চাটাকে আমার বিরুদ্ধে আজেবাজে কথা বলে ভড়কে দেবে। এত বছর সে কোথায় ছিল, তার মেয়ের কোন দায়িত্বটা সে পালন করেছে? আমি জানতে চাই। জেমি, এই অপহরণকারী ফালতু বেশ্যাটাকে এখান থেকে নিয়ে যাও। ও অন্যের বর চুরি করে নেয়া একজন বেশ্যা টাইপিস্ট। ওকে আমার ঘর থেকে বের করো, এখুনি।”
ভ্যালরি নিজ থেকে উঠে দাঁড়াল, “আমাকে বের করতে হবে না আমি নিজেই বেরিয়ে যাচ্ছি।” কয়েক মিনিট পর ভ্যালেরি দরজার বাইরে অগোছালো তুষারে ঢাকা বাগানটার সামনে দাঁড়িয়ে রইলো। ঠান্ডায় এবং রাগে সে কাঁপছে। পাশাপাশি সে খুব অনুতপ্ত এবং লজ্জিত। তার এমন আচরণ করা উচিত হয়নি; রবিন তার সন্তান নয়। মারিসা ঠিকই বলেছে বাচ্চা লালনপালনের কি বোঝে সে? আজ যদি সে আবার ফিরে না আসত তবে রবিন ঠিকই তার মায়ের সাথে আগের মতো জীবন কাটাত। এখন মারিসা ভাববে এই যে, সে আবার ফিরে এসেছে এতে রবিনের হাত আছে। রবিন নিশ্চয়ই ভ্যালেরিকে মা এর সম্পর্কে খারাপ কিছু বুঝিয়েছে, যেটা সত্য নয়। রবিনের জন্য বরং বিপদ ডেকে এনেছে ভ্যালেরি। তার মনটা দুঃখে ভারি হয়ে গেল, পা আর চলছে না। কতক্ষণ বাগানটার মুখে ভ্যালেরি দাঁড়িয়েছিল তার মনে নেই। হঠাৎ বাড়ির সামনের দরজাটা খুলে গেল এবং জেমি বাড়ির সামনের সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসলো তার কাঁধে রবিনের নোংরা স্লিপিং ব্যাগ ঝুলছে। কিছু বুঝে ওঠের আগেই জেমি ব্যাগটা ভ্যালেরির পায়ের কাছে রাখল “নাও জলদি চলে যাও, ওর মা আবার শুয়ে পড়েছে। ওকে নিয়ে যাও আর এ বাড়িতে আসবে না।”
ওই স্লিপিং ব্যাগটা মুড়ে যে রবিনকে তুষারের উপড়ে শুইয়ে গেছে জেমি সেটা বুঝতে ভ্যালেরির কয়েক মূহুর্ত সময় লেগেছে। জেমি সরে পড়তেই রবিন সেখান থেকে বেরিয়ে ভ্যালেরিকে জড়িয়ে ধরল। এই ঠান্ডায় রবিন তার সাদা পায়জামা পরা গায়ে শুধু পাতলা একটা সেমিজ, রবিনকে এমন পোশাক পরিয়ে এই বরফের ভেতরে কীভাবে সে ট্রেন স্টেশনে যাবে? ও অসুস্থ হয়ে পড়বে। ঠিক তখন দোতলার জানালা খুলে গেল এবং জেমি কিছু একটা নীচে ছুড়ে মারল। রবিনের সুটকেস, যা পথের ওপরে একটা মৃদু ধাক্কা দিয়ে বরফের ভেতর কিছুটা ডুবে গেল: তারপর জেমি জানালা বন্ধ করে অদৃশ্য হয়ে গেল। ব্যাগে কোনো কোট ছিল না, ভ্যালেরি রবিনকে তার পায়জামার উপরে একটা কর্ড ট্রাউজার পরাল, মোজা পরাল, দুইটা গেঞ্জি পরিয়ে তার ওপরে জাম্পার পরিয়ে দিল। সে খুব দ্রুত কাজগুলো করল। কে জানে কখন মারিসা ছুটে আসে।
“আমি ভেবেছিলাম মা আমাকে রাগে খেয়ে ফেলবে,” রবিন বলল।
“বোকার মতন কথা বলো না, উনি তোমার মা,” ভ্যালেরি শক্ত গলায় বলল। রবিন স্লিপিং ব্যাগটাকে লাথি মেরে বাগানের দিকে ছুঁড়ে দিল।
“আমরা কি পালিয়ে যাচ্ছি?”
“হুম, আমরা একটি অ্যাডভেঞ্চার করছি।”
ওরা রওনা হল। সৌভাগ্যক্রমে, তারা মূল সড়কে পৌঁছানোর সাথে সাথেই একটা ট্যাক্সি দাঁড়িয়ে থাকতে দেখল, ড্রাইভার আরামে নাক ডাকছিল। “কিংস ক্রসের জন্য কত নেবে?” ভ্যালেরি জিজ্ঞেস করল। ট্যাক্সিতে উঠে ভ্যালেরি ঠিক করল দোকান থেকে রবিনের জন্য একটা কোট কিনে নেবে। ওর জন্য ট্রেনের টিকেটও কাটতে হবে। ট্যাক্সিটাকে একটা পোস্ট অফিসে থামিয়ে ভ্যালেরি গিলকে একটা টেলিগ্রাম পাঠাল। সে গিলকে টেলিফোন করতে পারত, কিন্তু এখন গিলের নানা প্রশ্নের উত্তর দেয়া সম্ভব নয়; টেলিগ্রামে সে লিখল “মেয়েকে সাথে নিয়ে ফিরছি। কারণ ওর মায়ের বাড়িটা বাচ্চাদের বসবাস যোগ্য নয়।” সে তার পার্স থেকে শিলিং গুনে কাউন্টারে রেখে ট্যাক্সিতে ফিরে গেল।
ট্যাক্সিতে ফিরে রবিনকে জিজ্ঞাসা করল, ” তোমার পুতুলগুলো কোথায়?” রবিন চোখ বড় বড় করে তাকাল – সে তাদের বালিশের নীচে রেখেছিল। ওগুলো ওখানেই রয়ে গেছে। পুতুলগুলোর দুঃখে রবিন হাল্কা ফুঁপিয়ে উঠল। ভ্যালেরি বলল, ” চিন্তা করো না আমার সেলাই মেশিন দিয়ে আমরা আরো সুন্দর সুন্দর পুতুল বানাবো। কেমন?” রবিন বাইরে তাকিয়ে আছে, তার মনটা খারাপ। সেটা কি তার মায়ের জন্য নাকি পুতুল দুটার জন্য তা ভ্যালেরি জানে না।
টেসা হাডলি ছোট গল্পের একজন জনপ্রিয় লেখিকা। ছোট গল্প ছাড়া তিনি ৬টি উপন্যাসও লিখেছেন। এর মধ্যে “The London Train,” “Clever Girl,” “The Past,” “Late in the Day,” “Free Love” পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছে। ২০১৬ সালে তিনি তার গম্পের জন্য উইন্ডহাম ক্যাম্বেল পুরস্কার জিতে নেন।





