Home » প্রকাশিতব্য ‘স্তালিন’ উপন্যাসে মাক্সিম গোর্কি //

প্রকাশিতব্য ‘স্তালিন’ উপন্যাসে মাক্সিম গোর্কি //

১৯২১ সালের আগস্ট। মস্কো শহরটা যেন নিজের ছায়ার ভেতর বাস করছে। বিপ্লবের চার বছর পেরিয়েছে। গৃহযুদ্ধও প্রায় শেষ। কিন্তু বিজয়ী শহরের চেহারা এখনও পায়নি। রাস্তায় ক্ষুধার্ত মানুষ। দোকানের সামনে লম্বা লাইন। ট্রামের ভেতরে মুখগুলো কেমন যেন চুপচাপ, মনমরা। সন্ধ্যার পর বাতাসে কয়লার ধোঁয়া আর ক্লান্তির গন্ধ।

মাক্সিম গোর্কি জানালার পাশে দাঁড়িয়ে নিচের রাস্তার দিকে তাকিয়েছিলেন। একটা ঘোড়ার গাড়ি ধীরে ধীরে চলে গেল। তার পেছনে দুজন শ্রমিক হাঁটছে। একজন কাশছে। অন্যজন মাথা নিচু করে আছে।

এই শহরটাকে তিনি একসময় ভালোবাসতেন। এখনও ভালোবাসেন। কিন্তু মানুষ যেমন অসুস্থ সন্তানের দিকে তাকিয়ে ভয় পায়, তেমন এক ভয় তাঁকে গ্রাস করে আছে। পেছন থেকে পরিচারিকা এসে বলল,

‘কমরেড, একজন লোক এসেছে।’

‘কে?’

‘চিনি না।’

‘ভেতরে পাঠান।’

একটা লোকটা ঢুকল। চেহারায় উদ্বেগ ও কেমন যেন বিভ্রান্তি। তাকে আগে কোথাও দেখেছেন বলে গোর্কির মনে হলো। হয়তো কোনো পত্রিকার লোক। হয়তো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক।

এই সময়ে সবাইকে একই রকম দেখায়। কেমন

ঘুমহীন, চেহারায় ভীতি, শরীরে অপুষ্টি। লোকটি না বসেই সরাসরি বলল, ‘কবি নিকোলাই গুমিয়েলেভকে গ্রেফতার করা হয়েছে।’

গোর্কি কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।

‘কবে?’

‘গতকাল।’

‘কী অভিযোগ?’

লোকটি কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল, ‘প্রতিবিপ্লবী ষড়যন্ত্র।’

গোর্কি মুখে একটা হাসি ফুটে উঠল। একটা শুষ্ক, ক্লান্ত হাসি। মুখে বললেন, ‘আজকাল এই অভিযোগ তো নতুন নয়।’

লোকটি চুপ করে থাকে।

গোর্কি জানালার দিকে ফিরে গেলেন।

‘নিকোলাই গুমিয়েলেভ’—এই মানুষটিকে তিনি পছন্দ করতেন না। কখনোই না। তাঁর রাজনৈতিক মতাদর্শকে তিনি ঘৃণা করতেন। তাঁর অহংকার তার কাছে বিরক্তিকর ছিল। বরং তাঁর স্ত্রী আন্না আখমোতোভাকে তিনি বেশি পছন্দ করতেন। তাঁর সাম্রাজ্যবাদী মনোভাবকে তার পশ্চাৎমুখী মনে হতো। তবু…তবু সে একজন কবি। আর একজন কবিকে গুলি করে হত্যা করার বিষয়টা তিনি কল্পনাও করতে পারেন না। তাই বললেন, ‘কোথায় রাখা হয়েছে?’

লোকটি একটি নাম বলল। গোর্কি মাথা নাড়লেন। মুখে বললেন, ‘আমি চেষ্টা করব।’

লোকটি উঠে দাঁড়াল। চোখে একটা ভরসা ফুটে উঠেছে। তবে গোর্কি সেই চোখ দেখে অস্বস্তি অনুভব করলেন।

মস্কো শহরের অর্ধেক মানুষই এখন ভাবতে শুরু করেছে, তিনি চাইলে সবকিছু বদলে দিতে পারেন। অথচ নিজে জানেন, তিনি কত অসহায় হয়ে পড়েছেন।

পরদিন সন্ধ্যায় তিনি ক্রেমলিনে গেলেন। তিনিই একমাত্র মানুষ, যিনি লেনিনের সঙ্গে দেখা করতে পারেন কোনো পূর্বনির্ধারিত সময় ছাড়া। ব্যবস্থাটা বহু বছর আগে লেনিন নিজেই করেছিলেন। শুরুতে কারণ ছিল বন্ধুত্ব। পরে সেটা অভ্যাসে পরিণত হয়েছিল। আর এখন সম্ভবত অপরাধবোধে!

ক্রেমলিনের তিনতলার অফিসে তখনও আলো জ্বলছে। সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত নামছে। দরজার কাছেই একটি টেবিলে বসে আছেন মারিয়া ফতিয়েভা। লেনিনের বিশ্বস্ত সচিব। তিনি গোর্কিকে দেখে মাথা নেড়ে অভিবাদন জানালেন।

‘আবার?’

গোর্কি মৃদু হেসে বললেন, ‘তোমার কণ্ঠে মনে হয় অভিযোগ শুনছি।’

‘অভিযোগ নয়। অনুমান।’

‘কী তোমার অনুমান?’

‘আজও কাউকে বাঁচাতে সুপারিশ নিয়ে এসেছেন।’

গোর্কি বললেন, ‘হয়তো।’

ফতিয়েভা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, ‘একদিন আপনাকে নিয়েও কাউকে দরবার করতে হবে।’

গোর্কি হেসে ফেললেন। কিন্তু হাসিটা বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। ফতিয়েভা ভেতরে ঢুকলেন। কয়েক মিনিট পর ফিরে এসে বললেন, ‘যান।’

লেনিন মাথা নিচু করে একটা ফাইল দেখছিলেন। টেবিলের ওপর ফাইলের পাহাড়। চোখের নিচে ক্লান্তির ছাপ। গায়ের রং আগের চেয়ে ফ্যাকাসে।

গোর্কি ঢুকতেই তিনি উঠে দাঁড়িয়ে বরাবরের মতোই উষ্ণ কর্মমোদন করে বসতে বললেন। লেনিন নিজে বসতে বসতে বললেন, ‘আচ্ছা, এবার কাকে বাঁচাতে এসেছেন?’

গোর্কি চুপচাপ বসে পড়লেন। কিছুক্ষণ লেনিনের চোখের দিকে তাকিয়ে কিছু একটা খুঁজতে খুঁজতেই বললেন, ‘নিকোলাই গুমিয়েলেভ।’

লেনিন চেয়ারে হেলান দিয়ে গোর্কির মুখের দিকে তাকালেন। তারপর ধীরে ধীরে চশমা খুলে বললেন, ‘গুমিয়েলেভ।’

‘হ্যাঁ।’

‘আপনি জানেন সে কে?’

‘জানি।’

‘সে শ্বেত রক্ষীদের সমর্থন করেছে।’

‘জানি।’

‘সে প্রকাশ্যে সোভিয়েতবিরোধী বক্তব্য দিয়েছে।’

‘জানি।’

‘তবু তাকে বাঁচাতে সুপারিশ করতে এসেছেন?’

গোর্কি সামনে ঝুঁকে এসে বললেন, ‘আমি তার রাজনীতি সমর্থন করি না। কিন্তু আমি মৃত্যুদণ্ডও সমর্থন করি না।’

লেনিন কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন। এরপর চেয়ারে সোজা হয়ে বসে বললেন, ‘রাষ্ট্র কখনো কখনো কঠিন সিদ্ধান্ত নেয়।’

‘রাষ্ট্র কি কবিদের ভয় পায়?’

‘এটা কবিতার প্রশ্ন নয়।’

‘তাহলে কী?’

‘ক্ষমতার প্রশ্ন।’

গোর্কি হাসলেন। এরপর চেয়ার হেলান দিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ‘আপনি যখন ক্ষমতার কথা বলেন, তখন সব যুক্তি শেষ হয়ে যায়।’

লেনিনও হাসলেন। তারপর বললেন, ‘আর আপনি যখন মানবতার কথা বলেন, তখন বাস্তবতার নিরিখে বলেন না।’

কিছুক্ষণ দুজনেই চুপ করে থাকেন। তাদের কথোপকথনে এই নীরবতা নতুন কিছু নয়।

বহু বছর ধরে তাদের বন্ধুত্ব এই ধরনের নীরবতার ভেতর দিয়ে হেঁটেছে। একসময় নীরবতা ভেঙে লেনিন বললেন,

‘আপনি একটুও বদলাননি।’

গোর্কি বললেন, ‘আপনিও না।’

‘না, ভুল বললেন।’

এরপর লেনিন জানালার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘আমি বদলেছি।’

গোর্কি বুঝলেন, কথাটা সত্যি। সামনের মানুষটা সেই নির্বাসিত বিপ্লবী নয়, যাকে তিনি সুইজারল্যান্ডে চিনতেন। এখন তিনিই রাষ্ট্র। আর রাষ্ট্র সবসময় মানুষকে বদলে দেয়। তবু নিজের আসার কারণ মাথায় রেখে তিনি বললেন, ‘আমি চাই তাকে বাঁচানো হোক।’

লেনিন দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

‘আমি চেষ্টা করব।’

‘প্রতিশ্রুতি?’

‘আমি দেখছি।’

‘ভ্লাদিমির…’

‘আমি দেখছি।’

গোর্কি বুঝলেন, এর বেশি আর কিছু পাওয়া যাবে না। মন খারাপ করেই তিনি ফিরে গেলেন।

চার দিন পর সকালে তিনি খবরটা পড়লেন। সংবাদটা ছিল মাত্র কয়েক লাইনের। ‘নিকোলাই গুমিয়েলেভ-এর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর।’

গোর্কি অনেকক্ষণ খবরটার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর ধীরে ধীরে পত্রিকাটা ভাঁজ করলেন। ঘরের ভেতর অদ্ভুত নীরবতা। মনে হলো যেন কোথাও কিছু ভেঙে গেছে।

গুমিয়েলেভের মৃত্যু তাঁকে যতটা না আঘাত করল, তার চেয়ে বেশি আঘাত করল এই উপলব্ধি যে, তিনি আর কাউকে বাঁচাতে পারছেন না। লেনিনও না। অথবা লেনিন হয়তো আর চান না।

সেই সন্ধ্যায় তিনি ডায়েরি খুললেন। অনেকক্ষণ কলম হাতে বসে রইলেন। তারপর লিখলেন, ‘বিপ্লব তার সন্তানদের খাচ্ছে—এ কথা পুরোনো। কিন্তু এখন সে তার কবিদেরও খেতে শুরু করেছে।’

তিনি লেখা বন্ধ করলেন। জানালার বাইরে তাকালেন। আকাশে মেঘ। মস্কোর ওপর অন্ধকার নেমে আসছে। হঠাৎ তাঁর মনে হলো, তিনি ক্লান্ত। অস্বাভাবিক রকম ক্লান্ত।

শুধু শরীর নয়। তাঁর বিশ্বাসও ক্লান্ত।

সেই সময়ে প্রায় প্রতি সপ্তাহে কেউ না কেউ তাঁর কাছে আসত। কেউ মুক্তির আবেদন নিয়ে। কেউ চাকরির আবেদন। কেউ রুটির ব্যবস্থা চেয়ে। কেউ কারাগারে আটক ভাইয়ের খোঁজে। এক সন্ধ্যায় তিনি বিরক্ত হয়ে বলেছিলেন, ‘আমি কি রাষ্ট্র চালায়?’

কেউ উত্তর দেয়নি। কারণ প্রশ্নটা আসলে কাউকে করা হয়নি। নিজেকেই করা হয়েছিল। সেই রাতে তিনি দীর্ঘ সময় মস্কোর রাস্তায় হাঁটলেন।

একসময় মস্কো নদীর ধারে গিয়ে দাঁড়ালেন।

জল কালো। বাতাস ঠান্ডা। দূরে ক্রেমলিনের দেয়াল। লাল তারকা। ক্ষমতা। সবকিছু স্থির। শুধু তাঁর ভেতরটাই অস্থির। হঠাৎ তিনি বুঝলেন, তিনি শ্বাস নিতে পারছেন না। এই শহরে। এই পরিবেশে। এই নীরবতার মধ্যে। তাঁকে যেতে হবে। হয়তোবকিছুদিনের জন্য, হয়তোবা দীর্ঘদিনের জন্য। অথবা চিরতরে।

দুই সপ্তাহ পরে আবার তিনি ক্রেমলিনে গেলেন। ফতিয়েভা এবার তাকে দেখে কিছু বললেন না। শুধু চুপচাপ দরজা খুলে দিলেন।

লেনিন আগের চেয়ে আরও ক্লান্ত। গোর্কি বসেই বললেন, ‘আমি রাশিয়া ছাড়তে চাই।’

লেনিন মাথা তুললেন। কোনো বিস্ময় নেই। মনে হলো তিনি আগেই জানতেন।

‘চিকিৎসার জন্য?’

‘ধরেন তাই।’

‘আর সত্যি কারণ?’

গোর্কি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,

‘আমি ক্লান্ত।’

লেনিন মাথা নাড়লেন। এরপর বললেন,

‘আমিও।’

দুজনেই হেসে ফেললেন। বহুদিন পর। খুব সংক্ষিপ্ত। খুব বিষণ্ণ এক হাসি।

‘যান,’ লেনিন বললেন।

‘তবে ফিরবেন কি?’

‘জানি না। আপনি চাইবেন, আমি ফিরি?’

লেনিন উত্তর দিলেন না। অনেকক্ষণ পরে শুধু বললেন, ‘আপনাকে রাশিয়ার দরকার হবে।’

গোর্কি উঠে দাঁড়ালেন। দরজার কাছে গিয়ে থামলেন। হঠাৎ তাঁর মনে হলো, হয়তো এটাই শেষ দেখা। তাই তিনি ফিরে তাকালেন। লেনিন আবার কাগজের দিকে ঝুঁকে পড়েছেন। টেবিল ল্যাম্পের আলো তাঁর মাথার ওপর পড়ছে। অদ্ভুতভাবে একা দেখাচ্ছে মানুষটাকে। গোর্কির মনে হলো, বিপ্লব শেষ পর্যন্ত সবাইকে একা করে দেয়। বিজয়ীদেরও। পরাজিতদেরও।

তিনি নিঃশব্দে বেরিয়ে গেলেন।

আশানুর রহমান

পেশায় ব্যাংকার আশানুর রহমান ছাত্র জীবনে পরিবর্তনবাদী রাজনীতির সাথে যুক্ত ছিলেন। তার একমাত্র উপন্যাস "লেনিন" পাঠকমহলে ব্যাপক সাড়া ফেলে এবং এ উপন্যাসের জন্য তিনি আন্তর্জাতিক ক্রিয়েটিভ আর্টস অ্যাওয়ার্ডে ভূষিত হয়েছেন। এছাড়া প্রকাশিত হয়েছে তার গল্পগ্রন্থ "ভোর ও বারুদের গল্প" এবং এক মলাটে দুটি নভেলা "প্রথম প্রেম ও ছায়ার আঙিনা"। তিনি লেখালেখির উঠানের সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ভাষা
Scroll to Top