আমরা থাকি চার তলা বিল্ডিংয়ের চার তলায়। উপরে ছাদ। বিল্ডিংটা বেশ পুরানো, এ জন্য রুমগুলো বড় বড়। তিন দিকে টানা বারান্দা। এখন এ ধরনের বারান্দাকে অপচয় বলা হবে। অনেকে ব্যালকনি ভেঙ্গে রুমে নিয়ে নেয়। আর বারান্দা ছোট হতে হতে জিরো সাইজ হয়ে গেছে। ধনী আত্মীয়দের মধ্যে যারা দামি ফ্লাট কিনেছেন, আমাদের বাসাটা দেখে তাদের অনেকের চোখ টাটায়- ‘এতবড় বারান্দা।’
আমরা বলেছি, ‘হোক বড় বারান্দা, ভাড়া বাড়ি। নিজের বাসা খুপরি হলেও ভালো।’ তারা তখন বলে, ‘ঠিকেই বলেছেন, আমরাও সেই কথাই বলি।’
গরমের সময় মনে হয় আমরা ওভেনে আছি, বাড়িওয়ালা বিষয়টা জানে, তাই ভাড়া তুলনামূলক কম নেয়। একটু বৃষ্টি হলে বা বাতাস বইলে চারদিক থেকে বাতাস ঢুকে শা শা শব্দ করে, বৃষ্টির ছাট ঢুকে। আমাদের আসবাবপত্র তেমন নাই, তাই জানালা দিয়ে যখন বৃষ্টির ছাট আসে আমরা জানালা বন্ধ করি না। ওই ছাটের মধ্যে উদোম শরীরে বসে থাকি, এই সময় আমরা ওভেনে থাকার কষ্ট ভুলে যাই। বৃষ্টি পড়লে ভোরের দিকে শীত শীত লাগবেই, তখন আমরা স্বামী স্ত্রী জড়াজড়ি করে ধরি। এই সুবিধার কথা বাড়িওয়ালা জানলে নির্ঘাত দুই হাজার টাকা ভাড়া বাড়িয়ে দিত। প্রতিবার ভাড়া দিতে গেলে বৃদ্ধ বাড়িওয়ালা বলেন,‘কষ্টসিষ্ট করে এসি একটা লাগাই নিয়েন, গ্লোবল ওয়ার্মিংয়ের কথা তো আপনি জানেন, আপনারে কি কমু, সেই প্রভাব দেশে এসে গেছে।’ তখন ঘাড় কাত করে এসি লাগানোর সম্মতি দিয়ে আসি। ভাড়া দিয়ে উপরে এসে এসি লাগালে বিদ্যুৎ বিল কত আসতে পারে সেই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করি। তারপর আমরা সিদ্ধান্ত নিই যে, এসি লাগানোর দরকার নাই। এসিতে লাভের চাইতে ক্ষতিই বেশি। মন মেজাজ ভালো থাকলে আমার স্ত্রী নিজেই এসির বিপক্ষে অনেক অকাট্য তথ্য হাজির করেন। তখন আমাদের এসি না লাগানোর পক্ষে যুক্তি আরো মজবুত হয়। তার বান্ধবী রুবাবার বাসায় এসির কারণে কারেন্ট বিল এসেছে গতমাসে ৫ হাজার টাকা। নীলিমার বাসায় এসেছে সাড়ে ৫ হাজার টাকা। আমরা এই তথগুলো বিশ্লেষণ করি, এই বাড়তি ৫ হাজার টাকায় কয়দিনে বাজার হবে সেই হিসাব কষি, যেমন করে অর্থনীতিবিদরা বলেন এত টাকা পাচার না হলে এতটা পদ্মাসেতু হত। এভাবে এসি ছাড়া তিন বছর পার করে দিয়েছি। আমরা এও সিদ্ধন্তি নিই যে, ধ্বস না হওয়া পর্যন্ত আমরা এই বাসা ছেড়ে যাব না। আবার তীব্র গরমে ছাদ থেকে ল্যু হাওয়া নামার সময় গায়ে ভেজা গামছা জড়িয়ে আমার স্ত্রী পাগলের মতো এই রুম ওই রুম করতে করতে আগামী মে মাসের আগে বাসা ছাড়ার আল্টিমেটাম দেয়। আমাদের পোষ্য বিড়াল দুইটা, তোতন আর চেরি দিনের বেলা বাথরুমে থাকা শুরু করে দেয়।
এতকিছুর মধ্যে ঢাকা শহরে আমাদের স্বস্তি পাওয়ার মতো এই একটাই জিনিস আছে।
আমাদের বেড রুমের জানালা বারবর একটা নিম গাছ। লিকলিকে নিম গাছট তিনতলা পর্যন্ত উঠে আসার পর কেউ যেন থামিয়ে দিয়েছে। আমরা জানালা দিয়ে নকশাকাটা পুলিপিঠার ধারের মতো খাজকাটা নিমপাতার সৌন্দর্য্য দেখি। আদর করে হাত বুলিয়ে দিই। বাতাসে দুলে দুলে নিম গাছের বৃষ্টিতে ভেজার দৃশ্য দেখি খাটে বসে বসে। জোছনা রাতে বেডরুমে মেঝেতে নিমগাছের পাতার ছায়া এসে পড়ে, আমরা শুয়ে শুয়ে ছায়ার মধ্যে পাতার খাজ খোঁজার চেষ্টা করি। ছায়ার মোটিফে আমরা বিভিন্ন অবয়ব খোঁজার চেষ্টা করি। জানালা পেরিয়ে নিমের শুকনো পাতা, শুকনো ডাল বেড রুমে এসে পড়ে। আমরা ঝাড়– দিয়ে পরিষ্কার করি, কিন্তু ডাল কেটে ফেলার কথা চিন্তাও করি না। একবার আমার স্ত্রী এক অদ্ভূত তথ্য হাজির করে; সে বলে,‘আমাদের অন্য রুমের চাইতে এই রুমটা অনেক ঠান্ডা, তার কারণ কী জানো, এই নিম গাছটা।’
আমি মাথা নেড়ে সম্মতি জানাই,‘ হতে পারে।’
আমার কথায় সে সন্তুষ্ট হতে পারে না, সে আরো যুক্তি দেয়। সে বলে,‘একটা পূর্ণ বয়ষ্ক নিম গাছ কতটন কার্বোনড্রাই অক্সাইট শোষণ করে তোমার কোনো ধারণা আছে? এখন বুঝতে পারছ কাহিনিটা কোথায়?’
আমি বলি, সৌদিতে এই গাছকে বলে জিয়া ট্রি, জিয়াউর রহমান এক সময় সৌদি আরবকে অনেকগুলো নিম গাছ উপহার দিয়েছেন।’
এ কথা শুনে স্ত্রী বলে,‘সব কিছুর মধ্যে রাজনীতি টেনে আনা ঠিক নয়।’
গলির রাস্তা থেকে এক বিল্ডিং পিছনেই আমাদের বাসাটা। রাস্তা থেকে আমাদের বিল্ডিং দেখা যায় না। এর কারণ হচ্ছে এর সামনেই তিনতলার আন্ডার কনস্ট্রকশন একটা বিল্ডিং, তিনতলা হওয়ার পর কাজ বন্ধ হয়ে গেছে। লম্বা লম্বা রড বের হওয়া পিলারগুলো দেখা যায়। রাস্তা থেকে বের হওয়া বিল্ডিংটাই দেখা যায়। এটি এখন পরিত্যক্ত। একটা সুরু গেট দিয়ে, যেটা সবসময় বন্ধ থাকে, আমাদের বিল্ডিংয়ে ঢুকতে হয়। পূব দিকে আমাদের রুম থেকে ওই বিল্ডিংয়ের ছাদ; একটা কদম গাছ পরিত্যক্ত ভবনের ছাদের অনেকটা দখল করে নিয়েছে।
আমাদের সামনের রুমের জানালা দিয়ে কদম গাছটার বেড়ে উঠা দেখি। কদম গাছ এত দ্রুত বাড়ে আমরা আগে জানতাম না। আমরা রুমে বসে বসে বৃষ্টিতে কদম গাছের ভেজতে থাকা দেখি, ছাদে বৃষ্টির পানির গড়াগড়ি দেখি। মে মাসের মাঝামাঝি কদমগাছে ফুল আসে, দেখতে দেখতে পুরো গাছ ফুলে ভরে যায়। একসময় ফুল ঝরে নিচে পচতে থাকে।
চাইলে টিনের বেড়া ফাঁক করে পরিত্যক্ত ভবনের ছাদে উঠে কদম ফুল এসে বউয়ের খোপায় দিতে পারি, ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে সঙ্গে ‘বাদল দিনের প্রথম কদম ফুল’ গান জুড়ে দিতে পারি। যখন কদম গাছ এত কাছাকাছি দেখিনি তখন নেট থেকে ডাউনলোড করে পোস্ট করেছি।
বউকে যখন বলি, এক থোকা কদম ফুল এনে দিই তোমাকে, তার উত্তরে সে দার্শনিকের মতো কথা বলে,‘ ফুল গাছেই বেশি শোভা পায়, ছিড়ে এনে খোপায় দেয়ার কিছু নাই। আর তোমরা আর কতো দিন বর্ষা এলে রবিঠাকুরের এই গান বাজাবে। ঠাকুর তোমাদের কতবড় ক্ষতি করে গেছে দেখেছ, সব বিষয়ে ঠাকুর লিখে গেছেন, এরপর তোমরা কেবল সেগুলো আওড়ায় চলেছ, নিজেরা একটা লাইনও লিখতে পারছ না।’
‘তুমি কি আইয়ূব খানের এক মন্ত্রীর কথা বলতে চাইছ, সে মন্ত্রী বলেছে আপনারা রবীন্দ্র সঙ্গীত লিখতে পারেন না কেন?
‘আইয়ূব খান লোকটা কে?’
‘আইয়ূব খানের নাম শুনোনি?’
‘আইয়ূব খানের কি অভাব আছে? কোন আইয়ূব খানের কথা বলছ?’
আমি আলাপটা ঠাকুর আর কদম ফুলের মধ্যে রাখতে চাই, তাই আইয়ূব প্রসঙ্গ এড়িয়ে চলি।
‘তা হলে কদম ফুল নিয়ে ঠাকুরের গান শুনবো না?’
‘কোনো গানই শুনবা না, ধরো বর্ষা কি ঠাকুরের আমলে হয়েছে, এখন হচ্ছে না। এখনতো শুনি ক্লাউড ব্লাস্ট হচ্ছে, এইসব নিয়ে তোমাদের কোন অনুভূতি হয় না? ধার করা অনুভূতি দিয়ে আর কতো কাল? তোমরা কি দুই লাইন লিখেতে পারতে না? আমার মনে হয়, ঠাকুরের সব কিছু নিষিদ্ধ করে দেয়া উচিত, তা হলে তোমরা নতুন করে কিছু লিখতে, ভাবতে পারবে। ঠাকুরই আসলে তোমাদের নতুন চিন্তার পথে বাধা।’
বউয়ের কথার যুক্তি আছে। আমরা কদম গাছ রেখে বিড়ালের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম নিয়ে মাথা ঘামাই। চেরির চারটা বাচ্চার ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করি। চেরির চারটা বাচ্চা বড় হলে কি করবো এই নিয়ে ভাবি, আমরা অনেকগুলো এডপশন পোস্ট দেওয়ার কথা ভাবি, ঢাকা শহরে অসংখ্য বিড়ালপ্রেমী আছে। এদের মধ্য থেকে একটা রেখে দেব, সবাই তোতনকে রেখে দেওয়ার পক্ষে। আমরা কেন বছরের পর বছর বিড়াল ছাড়া থাকতে পারি না এর একটা যুতসই কারণ খুঁজার চেষ্টা করি। রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে একদিন এর করাণ পেয়ে যাই। গল্পটা আমাকে এক বিড়ালপ্রেমী ছেলে বলেছে। সে বলে ‘আঙ্কেল আমার নানার একটা বিড়াল ছিল। নানা একবার মারা যাওয়ার অবস্থা, টানা সাত দিন নানা শয্যাশায়ী ছিলেন। সেই সাতদিনই নানার বিড়ালটা তার বুকের উপর শুয়েছিল। সাত দিন পর নানা বেঁচে উঠেন ঠিকই কিন্তু তার আদরের বিড়াল মারা যায়। নানা শরীর থেকে এতোটাই নেগেটিভ এনার্জি টেনে নিয়েছে যে, সে আর বাঁচতে পারেনি। ছেলেটা কলেজে পড়ে, নটরডেম কলেজে, বিজ্ঞানের স্টুডেন্ট। সে তো বানায় বলার কথা নয়। এই কথাটা বাসায় বলার পর সবাই সত্যতা স্বীকার করে।
তারা বলে, ‘তোমার সঙ্গে কি ঘটেছিল মনে নেই?’
মনে পড়ে, এই রকম একটা ঘটনা আমার সঙ্গেও ঘটেছে। স্ট্রং ডায়রিয়ায় দুই দিন বিছানায় পড়ে থাকি। এই দুই দিন জেরি আমার শরীরে ঠেস দিয়ে শুয়েছিল। তার বয়স তখন মাত্র আড়াই মাস। তখন আমার ছেলেটার কথা মনে পড়ে।
জেরির চার বাচ্চা, চেরি, তোতন, জেমস, বুম্বা। চেরি মেয়ে, আর বাকী তিনটা ছেলে। চেরি হয়েছে তার মায়ের মতো। সারা শরীর সাদা, পিঠের উপর অ্যাশকালারের লাগোয়া দুটো বৃত্ত, একটা বড়, অন্যটা ছোট। মাঝে মাঝে দূর থেকে দেখলে মানুষের আকৃতি মনে হবে। তোতন দেখতে অবিকল তার বাবার মতো, সাদাকালো শরীর, সাদা চার পায়ের মধ্যে পিছনের বাম পা হাঁটু থেকে নিচের দিকের অংশ কালো, আর জেমসের মধ্যে সবসময় রাগি রাগি ভাব দেখা যায়, এদের মধ্যে সেই কেবল ডাকার সময় তার স্বরে চিৎকার করে। আর সাদা কমলা রঙের মিশ্রণে বুম্বা হয়েছে আদুরে, তাকে দেখলেই মনে হবে কোলে নিয়ে আদর করি।
সামনের রুমে, যেখান থেকে আমরা কদম গাছ দেখি সেখানে খেলায় মশগুল। চেরি কাত হয়ে শুয়ে ছেলেমেয়েদের খেলা দেখে মিটমিটে চোখে। চেরির শোয়ার ভঙ্গিটা দেখলে জমিদারদের মজমায় বসার ভঙ্গির কথা মনে পড়ে। মাঝে মাঝে তার চোখ দেখলে মনে হবে সে একটা খুনি। তবে সে একটা খুন করেছে। তার স্বামী বলি বয়ফ্রেন্ড যাই বলি থাকে সে খুন করেছে। তার স্বামীর নাম আমরা রাখিনি, কেননা সে আমাদের পোষ্য ছিল না। তবে সে অনেক স্বাস্থ্যবান, নাদুসনুদুস ও বয়স্ক, বয়সের ভারে সে ক্লান্ত, গায়ের রঙ সাদাকালো। সে পড়ে পড়ে সারাদিন ঘুমাত কর্নিশে। তরুণী জেরি এই বয়স্ক নাদুসনুদুসের সঙ্গে সম্পর্ক করেছে। পরিত্যক্ত ভবনের ছাদে কদম গাছের ঝোপের নিচে সেই সাদাকালো দানুসনুদুস হুলার সঙ্গে দুপুরে মেটিং করত, অন্য কোনো হুলার সঙ্গে তাকে কখনো দেখা যায়নি। এই অর্থে ওই হুলা বিড়ালটাই চেরির স্বামী বা বয়ফ্রেন্ড যাই বলি না কেন বলতে পারি। চেরি যখন বাচ্চা নিয়ে ব্যস্ত তখন দিনের পর দিন হুলাকে বসে থাকতে দেখেছি। গাছ বেয়ে এক সন্ধ্যায় হুলা আমাদের বারান্দায় উঠে আসতেই চেরি ভয়ঙ্করভাবে তাকে আক্রমণ করে চারতলা থেকে ফেলে দেয়, সঙ্গে সঙ্গে হুলার মৃত্যু হয়। তার সন্তানদের ক্ষতি করতে পারে এই আশঙ্কা থেকে চেরি এই হামলা করেছে। চেরিকে আমরা দয়িত্বশীল মা বলব নাকি খুনি বলব, যে কিনা নিজের স্বামীকে খুন করেছে; এই দ্বন্দ্বের মধ্যে পড়ে যাই। এই নিয়ে আমরা কোনো স্থির সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারি না, আমরা কি তাকে ঘৃণা করব নাকি পুরস্কৃত করব এই সুরাহা করতে পারি না। তার চোখের দিকে তাকালে আমাদের বিভ্রান্তি আরো বেড়ে যায়, খুনি নাকি দায়িত্বশীল মা – দুই ধরনের অভিব্যক্তি আমরা তার চোখে দেখতে পাই। আমার স্ত্রী বলেন, ‘একজন মা সন্তানের জন্য কিভাবে খুন করতে পারে, চেরি তা দেখিয়ে দিয়েছে।’
আমরা যখন চেরির মা ও খুনি চরিত্র নিয়ে আলাপ করছি ঠিক তখনই বাড়িওয়ালা দরজা নক করে। বৃদ্ধ বাড়িওয়ালা সাধারণত বাসায় আসে না, কি মনে করে লাঠি ঠুকতে ঠুকতে দরজায় কড়া নাড়ে। পিকিংহোল দিয়ে বাড়িওয়ালাকে দেখে আমার স্ত্রী বাচ্চাগুলোকে লুকিয়ে ফেলতে উদ্যত হয়। আমি বাধা দিয়ে বলি,‘ যেভাবে খেলছে সেভাবে খেলুক।’
বাড়িওয়ালা সোফায় বসে হাঁপাতে হাঁপাতে বিড়ালের বাচ্চার খেলা দেখে, হাঁপানি থামলে লাটি দিয়ে বাচ্চাদের দেখিয়ে বলে,‘ বিড়ালের খামার দিছেন নি, বাড়িভাড়া দিছি আপনাদের থাকার জন্য, বিড়ালের খামার বানাতে দিছিনি।’
আমি বাড়িওয়ালাকে ছাদের পলেস্তরা খড়ে পড়ার দৃশ্য দেখানোর পর বাড়িওয়ালা বলেন,‘বিড়াল পালা ভালো, আমাদের নবী করিম বিড়াল পছন্দ করতেন। কেবল কুত্তা না পাললেই হলো।’
আমি বলি, ‘কুকুর নিয়ে একটা হাদিস আছে।’
‘আছে নাকি, থাকলে ভালো। কথা হচ্ছে, দেশে এইসব কী হচ্ছে। পোলাপান রাস্তায় নেমে গেছে, আপনার কি মনে হয় পোলাপান সরকার উল্টাই দিতে পারবো?’
কথাটা বলে আমার উত্তরের অপেক্ষায় থাকেন তিনি।
সবাই মিলে তখন বুম্বাকে মারছে, বুম্বা চার পা তুলে চিৎ হয়ে আছে, মারামারি খেলা। খেলার মধ্যে মারামারি খেলাই উপভোগ্য।
আমি বুম্বার থেকে দৃষ্টি সরিয়ে তার দিকে তাকায় এবং বলি, ‘কোন পোলাপানের কথা বলছেন?’
‘আপনি দেশের কোন খবর রাখেন না?’
‘খবর টবর দেখি না, তাই সেভাবে রাখা হয় না। আপনি ভার্সিটির পোলাপানের কথা বলছেন?’
‘হ্যাঁ তাদের কথা বলছি। বলছি, এরা কি সরকার উল্টাই দিতে পারবে?’
‘আপনি কি যে বলেন, পোলাপান কয়টা রাস্তায় নেমে হৈচৈ করলো, আর সরকার উল্টে যাবে? আপনার বুদ্ধিতে কি বলে?’
‘আমিও সেই কথাই বলি, পোলাপানতো সমস্যা নয়, সমস্যা হচ্ছে পেছন থেকে কে যে কলকাঠি নাড়ে সেটা বুঝা মুশকিল।’
‘আপনি চিন্তা করিয়েন না, মোল্লার দৌড় মসজিদ পর্যন্ত, সব ঠিক হয়ে যাবে।’
‘আমার মনে হয় আপনার কথাই ঠিক..’ বলে বাড়িওয়ালা লাঠিতে ভর করে উঠে দাঁড়ায়।
এবার জেমসকে সবাই মারছে।
আপনার বিড়াল বাচ্চাগুলো ভালো, প্লেফুল। বিড়াল পালা ভালো, আমাদের নবী করিম..’
ঠক ঠক লাঠির শব্দ করে তিনি নেমে যান। আমার কথা শুনে বাড়িওয়ালা আশ্বস্ত হল কিনা বুঝতে পারি না। আবার সরকার উল্টে যাওয়া নিয়ে তার মাথাব্যথা কেন সেটাও বুঝতে পারি না।
পোলাপান রাস্তায় নেমে কি করছে সে বিষয়ে আমাদের আগ্রহ তৈরি হয়, কিন্তু বাসায় আমরা কেউ খবর দেখি না, টকশো দেখি না। বহুদিন থেকে বাসায় খবর দেখার রেওয়াজ উঠে গেছে। কেন দেখি না এর কোনো শক্ত কারণ দেখাতে পারব না, এই ব্যাপারে এক বন্ধুর সাহায্য চাইলে সে আমাকে মার্ক টোয়েনের কথা শোনায়। মার্ক টোয়েন বলেছেন,‘খবর না দেখলে আন ইনফরমেশন, আর দেখলে মিস ইনফরমেশন।’ কথাটা মার্ক টোয়েন বলেছেন কিনা যাচাই করতে পারিনি, না বললেও সমস্যা নাই।
কথাটা আমাদের মনে ধরেছে।
বাড়িওয়ালা চলে যাওয়ার পর আমাদের মাইকের কথা মনে পড়ে। মাইক পরিত্যক্ত ভবনের ছাদে এক সঙ্গীকে নিয়ে থাকে। প্রতি রাত ১১ টা হলে সে বিশেষভঙ্গিতে আমার স্ত্রীকে ডাকতে থাকে, তার পর আমার স্ত্রী পলিথিনে করে ঢিল দিয়ে খাবার দিলে তারা খেয়ে সারারাত পাহারা দেয়। সকাল হলে ছাদ থেকে নেমে যায়। আমার স্ত্রী বিড়াল আর কুকুরের ভাষা বুঝতে পারে, বিশেষ করে সে বিড়ালের ভাষা রপ্ত করে নিয়েছে বিড়াল পালনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে।
বিড়াল বিশ রকমের ডাক দিতে পারে, আমার স্ত্রী প্রতিটা ডাকের এক একটা ব্যাখা দাঁড় করায় এবং অনবরত তাদের সাথে কথা বলে। আমরা যখন বাসায় থাকি না তখন সে বিড়ালের সঙ্গে কথোপকথন করেই সময় কাটায়। আমি অনেক সময় শুয়ে শুয়ে আমার স্ত্রী আর বিড়ালের কথোপকথন শুনি। আমি কোনো ডাকই আলাদা করতে পারি না, হতে পারে আমার মধ্যে শব্দ আলাদা করার অনুভূতি নেই। মাঝে মাঝে আমার মনে হয় আমার স্ত্রীর মাথা বিগড়ে গেছে, নানাভাবে পর্যবেক্ষণ করে দেখি এই বিড়ালের সঙ্গে কথা বলা ছাড়া আর কোনো অস্বাভাবিকতা খুঁজে পাই না। আবার মনে মনে ভাবি আমরা যে বিড়াল কুকুরের ভাষা বুঝতে পারি না এইটাই বোধ হয় আমাদের অস্বাভাবিকতা।
আর একটা কথা বলা হয়নি, আমাদের বিল্ডিংয়ের দোতলায় থাকে বাড়িওয়ালার এক ছেলে, বউ বাচ্চা নিয়ে। বাড়িওয়ালার বড় ছেলেকে কালেভদ্রে দেখা যায়। তিনতলায় থাকে পুলিশের এক দারোগা। দারোগার সঙ্গে বাড়িওয়ালার ফুজুরফুজুর সম্পর্ক।
বাড়িওয়ালার বড় ছেলেকে মাঝে মধ্যে উঠা নামার সময় সিঁড়িতে দেখেছি, দেখতে অনেক বিনয়ী মনে হয়েছে। সালাম দিয়ে পাশে সরে গিয়ে উঠার পথ করে দিত। কয়েকদিন পরে আমরা জানতে পারি বাড়িওয়ালার ছেলের অনেক পাওয়ার। তখন সিঁড়িতে দেখা হলে আগবাড়িয়ে আমিই সালাম দিতাম। ইচ্ছা করে দিয়েছি এমন নয়, ক্ষমতাবান কথাটা শোনার পর সালামটা এমনিই চলে আসে।
যেদিন সারারাত মাইক চিৎকার দিয়ে কান্না করেছে তার পরদিনই আমরা স্ত্রী বলেছে, একটা খারাপ কিছু ঘটতে যাচ্ছে। এরপর আমরা খেয়াল করি নিম গাছটা মরে গেছে। আমরা ভালো করে পর্যবেক্ষণ করে দেখি, সত্যি সত্যি মারা গেছে। কি কি কারণে মারা যেতে পারে সে বিষয়ে অনেক কারণ বের করার চেষ্টা করি কিন্তু সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারি না, বরং আরো জট লেগে যায়।
তখন আমাদের বনফুলের ঠানদিন কথা মনে পড়ে যায়, আমাদের বুকটা হুহু করে কেঁদে ওঠে। আমরা কারণ অনুসন্ধান স্থগিত রাখি এবং এই সিদ্ধান্তে উপনীত হই যে, জন্মের পর মৃত্যু, উত্থান-পতন স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। এর একদিন পর সকালের পরপরই আমরা শুনতে পাই যে, সরকার উল্টে গেছে। দলে দলে লোক রাস্তায় নেমে উল্লাস করছে। মনে হচ্ছে সকল মানুষ রাস্তায় নেমে এসেছে, মানুষ এতটা উন্মত্ত হয় আগে কখনো দেখিনি। মনে হচ্ছে মানুষ যুগের পর যুগ অপেক্ষা করে আছে এই রকম একটা উল্লাসের জন্য।
আমরা মনে করি এই উল্লাসে সামিল হওয়া উচিত, এমন একটা দিন সহজে আসে না, অনেক অনেক বছর পর আসে। একটা অটোরিকসা ভাড়া করি, অন্তত শাহবাগ থেকে যেন ঘুরে আসতে পারি। অটোতে উঠব এমন সময় আমার স্ত্রী বলে ‘তোমরা যাও, এই রকম সময় আরো কত আসবে।’ আমি আমার দুই মেয়েকে নিয়ে অটোতে বসি। বারবার সিলেবাস পরিবর্তনের কারণে তারা এমনিতেই সরকারের শিক্ষামন্ত্রীর উপর চটে আছে। রাস্তায় মানুষ আর মানুষ, এত মানুষ ঢাকা শহরে থাকে আমরা ভাবতেও পারি না। মানুষের উল্লাসের কোন শেষ নেই, মানুষের মনে কতটা রাগ ক্ষোভ জমে ছিল এই উল্লাস না দেখেলে বুঝা যাবে না। মানুষ ঠেলে ঠেলে আমরা যখন শিশুপার্কের কাছে যাই তখন আমার মেয়েরা বলে, ‘থামো থামো।’
আমাদের অটো থেমে যায়। একদল যুবক শিশুপার্কের উল্টো দিকে দেয়ালে শেখ মুজিবের মুরাল ভাঙছে, ভাঙতে ভাঙতে তারা শেখ মুজিবের, হাত পা, মাথা, বুক, সব ভেঙে ফেলে। তারপর একজন লাফ দিয়ে উঠে তর্জনীটা ভেঙে ফেলে। আমরা অসহায়ের মতো দেখি, আমার মেয়েরা প্রশ্ন করে, ‘ বাবা, শেখ মুজিবের কি দোষ?’ এই প্রশ্নের সামনে আমি নিশ্চুপ থাকি।
বড় মেয়ে বলে,‘অটো ঘুরাও আমরা আর যাব না। ছেলেগুলোর মধ্যে ঝামেলা আছে। এরা বিপ্লবী নয়, বিপ্লবীরা কখনো বড় মানুষকে আঘাত করে না। শেখ মুজিবের তর্জনী যারা ভেঙ্গে ফেলছে তাদের সঙ্গে থাকা চলে না।’
আমরা অটোর চালককে অটো ঘুরাতে বলি, মানুষের স্রোতে সে অটো ঘুরাতে পারে না। সে বলে, ‘পিছনে যাওয়া যাবে না, সামনে যেতে হবে।’
আমরা অটো সামনে যেতে বলি।,
ছোট মেয়ে বলে, ‘তর্জনী ভেঙে ফেলা মানে আমাদের উঠে দাঁড়ানোর ক্ষমতা ভেঙে দেওয়া।’
শাহবাগ, টিএসসি দোয়েল চত্বর, প্রেসক্লাব, দৈনিকবাংলা হয়ে আবার বাসাবো চলে আসি।
আমরা যখন বাসায় পৌঁছায় তখন সন্ধ্যা গড়িয়ে যায়। বাসার সামনে এসে দেখি পরিত্যক্ত বিল্ডিংয়ের সামনে একটা ট্রাক দাঁড়ানো। ‘তর্জনী ভেঙে ফেলা মানে আমাদের উঠে দাঁড়ানোর ক্ষমতা ভেঙে দেওয়া’- কথাটা সারাক্ষণ মাথার মধ্যে ঘুরতে থাকে। অনেকটা ঘোরের মধ্যে ঢুকে যাই, এই ঘোর নিয়ে যখন বাসায় ঢুকি তখন আমার স্ত্রী বলে, ‘ঘটনা একটা ঘটছে’।
আমি বলি, ‘ঘটনা আর কি ঘটবে, যা ঘটার সকালে ঘটে গেছে।’
‘আরে না, আমাদের বিল্ডিংয়ের ঘটনা। বাড়িওয়ালার বড় ছেলেকে ধারে নিয়ে গেছে কারা যেন এসে। আর পুলিশ পালিয়ে গেছে। পুলিশের বাসায় তালা ঝুলছে। বাড়িওয়ালা চাচা, ছেলের বউ সবাই চলে গেছে। সামনের পরিত্যক্ত বিল্ডিংয়ের যে মালিক সে এসে এই বিল্ডিং দখল করে নিয়েছে, বাসার সামনে সাইনবোর্ড ঝুলাই দিছে। এই বাড়িটা চাচার বলে জানতাম, এটা আসলে চাচার নয়, চাচার ছেলেরা দখল করেছিল। সরকার উল্টে যাওয়ার পর তারা নিজের বাড়ি দখলে নিয়েছে।’
আমি তখন তাকে বলি, ‘এটা নতুন বয়ান, যারা দখল করেছে তাদের বয়ান, বিল্ডিং আসলে চাচারই।’
আমার স্ত্রী বলে,‘ এটা তো ভাবিনি, তুমি আবার প্যাচ লাগাইছ।’
আমরা তখন সত্যমিথ্যার দ্বন্দ্বে পড়ে যাই।
আমি অসহায়ের মতো প্রশ্ন করি, ‘আমাদের এখন কি হবে?’
‘আমাদের কি হবে, আমরা ভাড়াটিয়া, ভাড়া দিয়ে থাকব।’
‘আমাদের যদি চলে যেতে বলে?’
‘বলবে না, ওই লোক এসে বলে গেছে, আপনারা চিন্তা করিয়েন না। আপনাদের সম্পর্কে আমরা জানি। আপনাদের যতদিন মন চায় থাকবেন।’
‘আমরা তো ভাড়াটিয়া, বাড়ির মালিক বদল হইছে’ মনে মনে এই কথা বলতে থাকি।
এই সময় আমাদের নিম গাছের কথা মনে পড়ে। নিম গাছের জন্য আমাদের বুকের ভিতর হাহাকার করে উঠে।
খোকন দাস
খোকন দাসের জন্ম ফেনী জেলার দাগনভূঞা উপজেলার চাঁদপুর গ্রামে; ১৯৭০ সালের ৩১ ডিসেম্বরে। গল্পকার এবং প্রাবন্ধিক। সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের জীবন সংগ্রামই তার লেখার বিষয়বস্তু। প্রকাশিত গল্পের বই : কাক ও অন্যান্য গল্প, খড়ের মানুষ। তিনি কর্মসূত্রে খাগড়াছড়িতে থাকেন।





