বৈশাখ মাসের তপ্ত দিনের মধ্যে একজন সন্তকে দেখা যায় মাঠের কিনারার এক পাকুড় গাছের ছায়ায় বসে ধ্যান করতে! চারদিকের মাটি উত্তাপে ঝাঁঝাঁ, ক্ষেতের তরমুজ বাঙ্গি ফেটে চৌচির! গ্রামের কোন কোন লোকের মায়া হতো সন্তের জন্য! তাদের কেউ চুপিচুপি কেউবা সরবে ফল জল বাতাসা মুড়ি গুড় রেখে যেতো! আর কাশি দিয়ে, গলা খাখারি দিয়ে সন্তের ধ্যান চুরমার করে জিজ্ঞেস করতো , বাবা আপনার কষ্ট হচ্ছে না? সন্ত মিহি হাসি দিয়ে বলত, চারদিকে মানুষের এতো বিপদ আর আমি তো শান্তিতে গাছের ছায়ায় বসে আছি, আমার কষ্ট কিসে?! লোকেরা তাকে ভেজা গামছা দিয়ে বলত, হাতমুখ মুছে নেবেন, চাইলে আপনি আমাদের বাড়িতে একটা ঘর নিয়ে ধ্যান করতে পারেন,কেউ ত্যক্ত করবে না! সন্ত আরও মিহি হেসে বলতেন, কষ্ট যেদিন আসবে সেদিন প্রথমে আপনার গৃহেই অতিথি হবো। এরপর সেই লোক আফসোস করতে করতে কিংবা নিজেকে ভর্ৎসনা করতে করতে চলে যেতো এই বলে, সন্তের মতো নিষ্ঠা আমার কেন হলো না? আফসোস।
এরপর সন্ত যেই আঁখি মুদে বসেছেন, অম্নি আরেকজন বুড়ো এসে একটা ডাব রাখতে রাখতে সন্তকে জাগিয়ে বলত একই সব প্রশ্ন, তোমার কষ্ট হচ্ছে না বাবা? সাধু মিহি হেসে বলতেন, কষ্টের জীবনে আমি তো তবু একটা পাকুড় গাছ মাথায় উপর পেলাম অথচ চারদিকে দেখো মানুষের কতরকম কষ্ট, দুঃখ; যার নিদান দেবার শক্তি আমার নেই, বরং আমি আমোদে আছি। তারপর হয়তো আবার সেইসব একই প্রশ্ন উত্তর করে লোক্টা নিজেকে নিয়ে আফসোস করতে করতে চলে যেতো। এরপর আরেকজন আসতো। দিনে কয়েক গন্ডা এরকম হৃদয়বান মানুষের কৌতুহলে সন্তের ধ্যান ভন্ডুল হতে লাগ্লো! একদিন ভোরে সন্ত পাকুড় গাছের মাথায় উঠে বসে থাকলেন! তারপর একে একে লোকেরা এলো তার খোঁজ নিতে! কিন্তু সন্তের বেদি ফাঁকা দেখে প্রথম প্রথম তারা ভাব্লো হয়তো প্রাতঃকৃত্য করতে আশপাশে গেছেন! চলে আসবেন। ফলে সবাই অপেক্ষা করতে লাগ্লো!
একসময় সবাই অবাক হয়ে খেয়াল করলো গ্রামের অর্ধেক বাড়ির কেউ না কেউ এসে বসে আছে সন্তের কষ্টের খোঁজ নিতে! ওদিকে গাছের ডালে বসে পাতার আড়াল থেকে মুগ্ধ নয়নে সন্ত দেখলো মানুষের ভালোবাসা! দুপুর যখন হামাগুড়ি দিয়ে এগিয়ে এলো সবার চিন্তা বেড়ে মধ্যগগনে উঠে গেলো, কেউ কেউ ভাব্লো, সন্তের কোন বিপদ হয়নি তো? কেউ কেউ ভাব্লো, তাদের খোঁচাখুঁচিতে সন্ত বিরক্ত হয়ে অন্য কোথাও গেছেন! তবে সবাই মনে মনে অপেক্ষা করতে লাগ্লো, তিনি ফিরে আসবেন এরকম বিশ্বাস নিয়ে! ঠিক তখন গাছের ডালে বসে, সন্তের অন্তরের মুক্তি ঘটলো। তিনি নিজেকে একটা কাঠবিড়ালিতে রূপান্তরিত করে গাছ বেয়ে তরতর করে নেমে অন্য গাছে চলে গেলেন! সবাই কাঠবিড়ালির চলে যাওয়া দেখে চোখ মুছতে মুছতে ভাব্লো, এ-ও নিশ্চয়ই সন্তের খোঁজ নিতে এসেছিলো। যেহেতু কাঠবিড়ালি চলে গেছে সেহেতু সবাই একে একে ফিরে গেলো ঘরে!
পরদিন থেকে রোজ তারা মনে করতে লাগ্লো, আজ পাকুড় তলায় গেলেই সন্তকে দেখা যাবে বসে আছেন! কিন্তু কাউকে দেখা যেতো না।
এরকম কিছুকাল যাবার পর সবাই একে একে নিজের বাড়ির সামনে একটা পাকুড় গাছ লাগালো। কারণ তাদের মনে ধারণা ছিলো, একদিন ঘুম থেকে উঠে দেখবেন সন্ত তাদের বাড়ির সামনের পাকুড়তলায় বসে ধ্যান করছেন! আর কেউ কাঠবিড়ালি দেখলেই ভাবতো, সন্তের খোঁজে বেচারা গাছ থেকে গাছে ঘুরে বেড়াচ্ছে! তবে তারা আশা ছাড়লো না, কারণ তারা বিশ্বাস করতো, সন্ত একদিন ফিরে আসবেই। ফলে প্রচুর পাখি আর ছায়া জমে উঠেছিল ঐ গ্রামে। মানুষগুলোর মনে একধরনের প্রশান্তি জমে উঠেছিল; কারণ তারা অনুভব করতো, দুঃখের পৃথিবীতে তারা অন্তত ছায়াময় আঙিনায় কারোর অপেক্ষায় বসে আছে!!
১৩ মে ২০২৬
রোমেল রহমান
কবি, নাট্যকার ও গল্পকার। খুলনাতে বাস করেন। কাব্যগ্রন্থ: বিনিদ্র ক্যারাভান,. গদ্যগ্রন্থ: বাঘ, প্রপাগান্ডা, মহামারী দিনের প্যারাবল, আরোগ্যবিতান. ধারাবাহিক উপন্যাস কাওরামঙ্গল.





