Home » অনামিকা যোশীর কবিতা // অনুবাদ : ঈশিতা দস্তিদার
অনামিকা যোশীর কবিতা // অনুবাদ : ঈশিতা দস্তিদার

অনামিকা যোশীর কবিতা // অনুবাদ : ঈশিতা দস্তিদার

(মা তুম ভি গলত হো সাকতি হো)

মা তো

কীভাবে ভুল করবে, বলো?

সংসারে যেন কোনো কিছুর অভাব না থাকে

জলখাবার যেন একদম সুস্বাদু হয়

সময়মতো কাচা হয় বাচ্চাদের জামাকাপড়

একটা দাগও যেন না থাকে।

মা তো   

তাঁর কীভাবে ভুল হবে, বলো?  

যখন চাকুরি করতে চাইলেন সন্তানেরা বাঁধা দিলো

বাড়িতে কিছু করতে গেলে সবাই মানা করল 

তুমি না মা, সন্তানদের থেকে মায়ের সময়টুকু কেড়ে নিতে পারো? 

কেমন মা তুমি, যে শুধু নিজের জন্য বাঁচতে পারো? 

আর শৈশব থেকে মায়ের প্রতি সন্তানদের এমনই ভালোবাসার অধিকার যে

সবসময় তাঁদের ভুল শুধরে ঠিক করে দেয়া চাই! 

‘মা, বন্ধুদের সামনে লজ্জা দিয়ো না’

‘শোনো মা, স্কুলে ঠিকঠাক পোশাক পরে এসো’

‘ছেড়ে দাও তুমি, ইংরেজিতে কথা বলার চেষ্টাই কোরো না’

‘বাড়িতেই থাকো তুমি, মা।’

সন্তানদের ভুল হাজারবার ক্ষমা করে দেয়া মা নিজে যেন কখনও ভুল করতে পারেন না।

যাক গে

মায়েরাও তো তাঁদের সন্তানদের সাথে বেড়ে ওঠেন

কিন্তু  এখনও তাঁকে আড়চোখে আমার দিকে তাকাতে দেখি

যেন জিজ্ঞেস করছেন, “ঠিক আছে তো জামাটা? কথা এভাবেই বলব তো? এভাবে করব না ওভাবে?”

যে মায়ের কাছ থেকে আমরা সবকিছু শিখেছি, সেই মায়েদেরই আমরা

সন্তানেরা শেখাবার চেষ্টা করি সারা জীবন ধরে!

মায়েরাও সন্তানের মনমতো চলেন, যেভাবে তারা চায় একদম সেভাবে

মা হয়ে যেন কখনো কোনো ভুল না করে বসেন!

তাই আজ, ক্ষমা নয় মা

আমি তোমার পাশে থাকার প্রতিজ্ঞা করছি

তুমি শুদ্ধ হও বা ভুল তোমার সঙ্গেই থাকব 

অনুমতি নয় মন যা চায় তাই করো

তুমিও ভুল করতে পারো, মা।

যেমনই হও না কেন আমার মা ই তো থাকবে

ভগবান বানিয়ে রাখবো না তোমায়, মানুষের মতো বাঁচবে 

ইচ্ছে মতো বাঁচো আর ভুল করো    

তোমার পাশেই থাকব, মা 

ঠিক যেমন করে তুমি আমার পাশে ছিলে।

(আঁখির তুম হোতে কৌন হো)

ব্যাপারটা এই যে, বাঁধা দাও না …তার মানে এই নয় যে সব মেনে নাও তুমি! যখন আমাকে শাড়ির বদলে সালোয়ার পরিয়ে দাও আর বলো, “আমি কত্তো দিলদরিয়া মানুষ! ঘোমটা না দিলেও ক্ষতি নেই, কিন্তু মাথায় সিঁদুর আর হাতে এক এক করে চুড়ি পরে নিলে কী ক্ষতি হবে তোমার?গুরুজনদের দুটো কথা মেনে নিলেই বা কি এমন পাহাড় ভেঙে পড়বে?”

ভালোবাসার এমনই প্রকাশ তোমার যে তুমি আমাকেই আমার অধিকারের সীমা বোঝাতে চাও। তুমি আমাকে বাইরে যেতে দাও, কাজ করতে দাও, খাওয়ার টেবিলে কথা বলার অধিকারও দাও। আমাকে নিজের নামে বাঁচতে দাও, এমনকি মাঝে মাঝে দেরি করে ঘুম থেকেও উঠতে দাও। কেবল দিয়েই যাও তুমি! সারাজীবনের সঙ্গী, তাই আমিও মানিয়ে নিয়েছি।মানিয়ে নিতেই থাকি আর সেখানেই হেরে বসি সবাই।

কারণ কে শুধোবে তোমাকে, আমায় সব দিয়ে দেবার তুমিই বা কে? কে তুমি যে নিজেই নিজেকে দাতা ভেবে বলছো, “আমি তোমাকে যেটুকু দিচ্ছি সেটুকুই তোমার, ব্যাস।” কিন্তু কে আমি, কী ছিলাম আর কী হতে পারি সে অধ্যায় তো উন্মোচন করতেই হবে। নাহলে পেছন ফিরে যখন তাকাব তখন আমার বদলে দেখব তাকে যা তুমি আমাকে হতে দিয়েছো!

যে সালোয়ার পছন্দ করে না, স্কার্ট পরতে ভালোবাসে আর চুড়িকে শৃঙ্খল মনে করে। প্রত্যাখ্যান করে চিরায়ত প্রথা আর নিয়ম, সন্ধ্যা আরতির অভ্যাস নেই অথচ কর্মে সম্মান রয়েছে; তাকে এই দুনিয়ার হিসাবনিকাশ শেখাবে তুমি? প্রতিদিন কলমের খোঁচায় ‘দেয়া ও না দেয়ার’ কর্তা হয়ে বোঝাবে আমার অধিকার আর বনে যাবে মহৎ হৃদয়ের মানুষ? কারণ সম্ভবত, তুমি আমায় তা দিয়েছ যা কেবল ভাগ্যবানরাই পায়!

যেমন হপ্তায় একদিন সকালের জলখাবার বানিয়ে পরিতৃপ্ত তুমি আমার বাড়িতে ফোন করে জাহির করো। আর যদি কোনোদিন ঘর সাফসুতরো করে ফেলো তাহলে তো ভেবেই বসো যে সেরা স্বামীর ট্রফিটা তোমারই  প্রাপ্য! তুমি তো সেই মহান অবতার, ষোল সোমবার ব্রত রাখার পরেও যাকে অর্জন করা যায় না, নিশ্চয়ই কিছু পূণ্যের ফলেই তোমাকে পেয়েছি আমি! এ ঘোরের মধ্যেই বাঁচবো যে এমন কাউকে পেয়েছি যে আমায় এত দিয়েছে

আর আমি ভুলেও যাব যে এ অধিকার আমি কাউকেই দিইনি। আমার শৃঙ্খলের শক্তি নির্ণায়ক ছিলাম আমি নিজে, তুমি নও। আমার চারপাশে ছিল না কোনো লক্ষ্মণরেখা যা এখন তুমি এঁকে চলেছো। তোমার সীমারেখায় আসে না আমার ডানার ব্যাস ও দৈর্ঘ্য, যেমনটা তোমারও। যদি আসেও তবে একে অপরের সঙ্গেই আসে। যদি শর্ত নিয়ে আসে তবে সে সঙ্গ নয়, হিসাবের খাতা। ক্ষমা করো আমায়! হিসাবে কাঁচা আমি মনেপ্রাণে শিশু যে এখনও, আমার উড়ে চলাই আমার পরিচয়, স্কার্ট পরি কিংবা শাড়ি। তোমার সম্মান কীভাবে জড়িয়ে গেল, বলো তো?

আটকে রাখে এমন সুতোয় বেঁধো না আমায়, বরং এমন সুতোয় বাঁধো যা উড়ানের কালে একই বন্ধনে জড়িয়ে রাখবে দুজনকে। টু ওয়ে রাস্তা জেনো, একতরফা নয় মোটেও! আমার সম্মানকে আমার পোশাক, আচার বা সাজের মাঝে জুড়ে দিয়ো না। আর রান্নার দক্ষতাকে গুলিয়ে ফেলো না আমার মূল্যবোধের সাথে, আমার শখও তো হতে পারে এসব! বাধ্যতামূলক ভেবে বোসো না। বাকিটা আমি সামলে নেবো; তুমি বেশি ঝামেলা কোরো না

https://uthon.com/wp-content/uploads/2026/06/ৈ.jpeg

ঈশিতা দস্তিদার

জন্ম ও বেড়ে ওঠা চট্টগ্রামে। নৃবিজ্ঞানে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।পরবর্তীকালে পিএইচডি করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগ থেকে । কর্পোরেট চাকরী ছেড়ে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের খন্ডকালীন শিক্ষকতা করেছেন কিছুদিন। আপাতত মুক্ত গবেষক হিসেবে আগ্রহের বিষয়ে লেখালেখি ও অনুবাদ নিয়ে ঢাকা শহরেই বসবাস।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ভাষা
Scroll to Top