Home » গলি পেরিয়ে // মিজানুর রহমান নাসিম

গলি পেরিয়ে // মিজানুর রহমান নাসিম

এইতো দু’মিনিট আগেও আবেগ টগবগিয়ে উঠছিল—আজ তাকে খুঁজে বের করবোই! অথচ ওই পথে যেতে এখন আমার মনে বেশ খানিকটা দ্বিধা কাজ করছে। মনটা সায় দেয়ার বদলে ক্রমশ নিজেকে গুটিয়ে নিতে চাইছে। এমন হেলদোলে নিজেকে কেমন হাস্যকর মনে হচ্ছে। অথচ গত বিশতিরিশ বছর থেকে তার সাথে দেখা করার একটা প্রবল ইচ্ছে মনে পুষে রেখেছিলাম। কিন্তু তা নিয়ে এগোতে গেলে প্রতিবার শেষমেষ আমার পক্ষে সেটাকে হাস্যকর বা অনধিকার চর্চা বলে মনে হতো। তিনি এখন অন্য বাড়ির বৌ। আদৌ কি কোনো কারণ আছে দেখা করার! আমি কি তার রক্তসম্পর্কীয় বা আত্মীয়? বিশেষ করে তার দ্বিতীয় স্বামী যখন আমাকে চিনেনই না। বিষয়টিকে তিনি শিষ্টাচার বহির্ভূত বলে মনে করতে পারেন এবং সন্দেহের চোখেও দেখতে পারেন। কী শাঁখের করাত আমার গলায়!

কিন্তু আজ নিজেকে সায় দিই—পুরোনো দিনের পড়শী হিসেবে অবশ্যই আমার অধিকার আছে। কে কী বলে বলুক! আমার সিদ্ধান্তে আমি অটল। আমি কী সংসার ভাঙার প্রকল্প নিয়ে যাচ্ছি, না তার সাথে প্রণয় করতে যাচ্ছি! স্রেফ মায়া। পোড়োবাড়িতে খাড়া হয়ে থাকার হাস্যকর চেষ্টা আর কী!

বাজারের প্রধান সড়কের দু’ পাশেই কালো ধোঁয়ার কুণ্ডুলির মত অটোরিক্সা ও মানুষের চলাচল ছড়িয়ে পড়ছে। তবে বামের ওই গলিটাতে  চুয়ানো জলের মত দু’একজন মাঝেমধ্যে ঢুকছে বা বেরোচ্ছে। মেইন রোডে মানুষ চলাচলের তুলনায় গলিটা স্রেফ নির্জীব—শান্ত ও ভুতুড়ে। গলির মোড়ের এক কোণে দাঁড়িয়ে সিগারেট ধরালাম। বহুদিনের মরিচাধরা ধূলিধূসরিত অতীত উঁকি দিতে চাইছে।

পা চালালাম। এক পা দুই পা চার পা…

ম্রিয়মান আলো ও চাউর হওয়া অন্ধকারের মিশেলে অস্পষ্ট পথটা দেখে মনে হলো সেটা যেন এখানকার বাসিন্দাদের এক অনির্দিষ্ট নিয়তি। দিকচিহ্নহীন, ধূসর, অসীম—গোরক্ষনাথের ধাঁধা। খানিকটা ক্লান্তও। সব মিলিয়ে বললে, বহু অতীতের কোনো পরিত্যক্ত ও বোবা জনপদ যেমন ইংগিত দেয়, তেমন আর কি! আমার জংধরা অতীতের সাথে কী দারুণ মিল!

অথচ, কে বিশ্বাস করবে, চারদশক আগে এই পথে দিনেরাতে আমার পা পড়তো। আমিও এখানকারই বাসিন্দা ছিলাম। তখন পিঠের কাঁটা বের করা হেরিংবোন; কাদাও ছিল। প্রতি বর্ষায় নাজেহাল হতে হয়েছে। এখন বিটুমিনে মসৃণ। পথের দু’পাশে থোপ থোপ আবছা ঘরবাড়ি। আগের চেয়ে খানিকটা গোছানো ও কেতাদুরস্থ। অথচ হিম ঘরের মত কেমন ঠান্ডা, নিষ্ঠুর—ম  ম ঘ্রাণটা কই, যেটা ছিল?

এত খুঁটিয়ে তালাশ করে কী করবো, আজ আমি তো স্রেফ একজন আগন্তুক। আমার মত মুসাফিরের পা আর কোনোকালে এই গলিতে হাজির হবে তার কী ঠিক আছে!

আন্দাজ করে যেখানে গিয়ে থামলাম, সেখানে একটা দম নেয়া যাক, ব্যাস। তারপর—জিজ্ঞাসা। শেষে কিনা দেখতে পেলাম এক আবছা কানাগলি। “ওই ঘর”—পথ দেখানো দোকানদার ছেলেটা গলির শেষ প্রান্তে গিয়ে আঙুল ইশারা করে বলল! বলেই চলে গেল।

সন্ধ্যার অন্ধকারটা ঘোলাটে ছিল। তখনও রাত অবশ্য জাকিঁয়ে উঠেনি। আমি যা খুঁজছি—তা ওই সামনের বাড়ি। বারান্দায় একটি কম পাওয়ারের বাল্ব জ্বলছিল। ঘোলা ও টিমটিমে। হাফ বিল্ডিং দালানটির আলোছায়াময় কামরাগুলো অচেনা ছায়ামূর্তির মতো ইশারায় ডাকছিল। নৈঃশব্দের অলিখিত এক চুক্তি দেয়ালে-মেঝেতে— যেন যুগ যুগ চলছে আর নুন ঝরাচ্ছে।  

বাড়িটা বিবর্ণ। টিনসেড দালানের এলপ্যাটার্নে দু’তিনটে কামরা। ঠিক খুপরির মতো। তাঁর কামরাটি একেবারে মাঝে।

বারান্দায় দাঁড়ানো একজন কমবয়সের মেয়ে। এ বাড়িরই মেয়ে বা বউ হতে পারে। তাকে বললাম, তিনি আমার পরিচিত, দয়াকরে উনাকে আমার নামটা একটু বলেন।‌ মেয়েটি ভিতরে ঢুকে এক মিনিট পর বেরোলো। কৌতূহলের স্বরে বলল, “আসুন”।

অপেক্ষার সময়টুকুতে দ্বিধাগ্রস্ত হলেও রুমে ঢুকেই আড়ষ্টহীনভাবে আমি তাঁর মুখোমুখি অপর খাটের প্রান্তে বসে পড়লাম। এমনভাবে, যেন বসাটা আমার অধিকার।

আমাকে দেখার পর একটা চাপা উত্তেজনায় তিনি খানিক নড়েচড়ে বসলেন। কিন্তু মুহূর্তেই নিজেকে সংযত করে ফেললেন। এক চিলতে হেসে আমাকে স্বাগত জানালেন। সুদূর অতীতের একরাশ পেলব স্মৃতি যেন তার চোখেমুখে আভা ছড়িয়ে দিল। আহা, আমার অনধিকার চর্চার রানি! রানিই তো!

তাঁকে নিয়ে আমার দীর্ঘকালের কৌতূহল গিরিমুখের স্ফুলিঙ্গের মতো উদগীরণ হচ্ছিল। কিন্তু শীঘ্র সেটাকে নিয়ন্ত্রণ করে ফেললাম।

*

সে এক পুরাকালের কথা। বহুদিনের ধূলোর আস্তরণ আমাদের বাস্তব পৃথিবীর জমিন থেকে তাঁকে আড়াল করে রেখেছে। তবে যার কখনো আর খোঁজ মিলবে না বা খোঁজ নেওয়াটাও আমার এখতিয়ারের মধ্যে পড়ে না বলে ভেবেছিলাম, বিষয়টা আসলে তেমন না। এখন আমার কাছে মনে হচ্ছে, জগতসংসারে অধিকারটা থির বিন্দু বা পূর্বনির্ধারিত নয়— আপেক্ষিক। পারদ উপর নিচ হয়। আর কোনো কিছুই হারায় না। বস্তু এবং মনোজগত উভয়ই অবিনাশী।  

মিনু ভাবী মুখ খুললেন। বহু পুরোনো দু-একটি শব্দ আওড়াতেই মনে হলো, ওর ঠোঁটে নড়ছে টেপরেকর্ডারের গান। সেইসব দিনে স্বামীর বিলেত থেকে আনা লাল সনি ক্যাসেটপ্লেয়ারটাতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বাজতো হেমন্ত, লতা, সন্ধ্যার গান। গানের মধ্যেই তিনি গৃহস্থালী কাজের ছন্দ খুঁজে পেতেন। খাটুনির কষ্টটাও ভুলে যেতে পারতেন বেশ। ভুলে তো তাঁকে থাকতেই হতো। জানতেন, তাঁর জীবন এত মসৃণ না। স্বামীর প্রবাস জীবনের দীর্ঘ শূন্যতা ওঁর মাথায় ভর করে থাকতো। নিয়মের সংসারটা তাঁর কাছে মনে হতো, সবকিছু থেকেও নেই। সেই শূন্যস্থানে শ্বশুরের একটা কালো গাই বা দহলের টিউবওয়েল থেকে ভরে আনা জলের কলস। স্বামীর লম্বাটে কালো কুচকুচে মুখের প্রতিচ্ছবি বারবার তার রক্তে ফিনকি দিয়ে ওঠত। ওর মুখটা তখন গোধূলির মত লালচে বিষণ্ন তাপ ছড়াতো।

—একদিন আপনার রেকর্ডারে বাজছিল—যদি কোনদিন ঝরা বকুলের গন্ধে হও তুমি আনমনা…। সে কথা তুলতেই, তার চেহারায় লজ্জা উঁকি দিলো। ওর দিকে তাকিয়ে আমার খুব সুখ হচ্ছিল।

—এতদিন পরে কোথা থেকে ভাই? কি মনে করে এলে? মিনু ভাবী মিষ্টি হেসে বললেন।

—আপনার ভারী মিষ্টি আটসাঁট চেহারাটা স্মরণ করে! মিনু ভাবী আমার কথায় পুলকিত হলেন।

—আচ্ছা আপনিই কি সোফিয়া লরেন! কৌতূহল আর আবেগে আচ্ছন্ন হয়ে একটু দুষ্টুমির সাথে তাকে বললাম। মৃদু হাসি ছড়িয়ে ওর দুই চোখের পাপড়ি একটু কেঁপে উঠল।

*

মিনু ভাবী ছিলেন আমার দহনকালের পড়শিতো ভাবী! আমার উঠতি যৌবনে কল্পনার নায়িকা। সোফিয়ার পরে আবারও যদি উপমা দিই তাহলে বলব, মাদাম তুসোর মোমের মূর্তির মত তার টানটান অবয়ব। বরাবরই তাকে আমার মসৃণ মোমের মূর্তি বলে মনে হয়েছে। চল্লিশ বছর পরেও তাইই। এই দেখুন, ওর পেলব-ফর্সা মুখমণ্ডল এবং রুটি বেলনার মত হাতদুটো ঘরের অপর্যাপ্ত আলোতেও কেমন চকচক করছে! আর তার মুরগিছানার মতো তুলতুলে অথচ সটান গাল। সৃষ্টিকালে ওকে গড়াতে কী বাড়তি মনোযোগটাই না দেয়া হয়েছে!

অবাক করার মত যে, এতকাল পরেও তার উপচেপড়া সৌন্দর্য এতটুকু ম্লান হয়নি। শুধু বাহ্যিক অবয়ব খানিকটা বদলে গেছে। তাঁর মাধবীলতার মতো চুলে ভরা পরিপাটি মাথা ইদানীং আড়াল করে রেখেছে সেমেটিক স্কার্ফ। ঘনকালো লম্বা চুল রীতির অনুশাসনে আবৃত।

কথা বলতে বলতে তার চোখদুটো থেকে ঠিকরে বেরোচ্ছিল অদ্ভুত এক আলোর তরঙ্গ। দূর ছায়াপথের বিমূর্ত স্নিগ্ধ আলো যেন। স্পন্দনহীন, অসম্ভব থির। তার মৃদু আভাই কি ঘরটাকে আলোকিত করে তুলেছে? অথচ তিনি বললেন বাম চোখটায় এখন আর কিছুই দেখতে পান না। ওই চোখটার মনি নষ্ট হয়ে গেছে। এমনকী ডান চোখটাতেও পৃথিবী পুরোপুরি দৃশ্যমান না। ঝাপসা। তার দৃষ্টিতে দুনিয়ার সমস্ত বস্তুনিচয় টুকরো টুকরো, জালি—ছিদ্রল। দিনেরাতে তাঁর চারপাশে অতল অন্ধকার ধেয়ে আসে আর মাঝেমধ্যেই তিনি খেই হারিয়ে ফেলেন।

—কিছুই দেখি না, কিচ্ছু না। লোকটা আমাকে শেষ করে ফেলেছে—খুনি ।

—আপনি তো স্বেচ্ছায় খুন হওয়ার পথ বেছে নিয়েছিলেন? তাঁকে প্রশ্ন করি।

—আমাকে বাধ্য করা হয়েছিল। তিনি দৃঢ়তার সাথে উত্তর দিলেন।

—আপনি না চাইলে…?

—ঘটনাটা ওরকম না। এসবক্ষেত্রে নানানভাবে হয়রানিতে ফেলা হয়, কিছুই করার থাকে না। আর সবাই মেয়েমানুষের দিকেই আঙুল দেখায়। সত্যি কথা বলতে, লোকটি ছিল অমানুষ ও ঘাতক। আমাকে তিলে তিলে মেরেছে।

চরম বিতৃষ্ণায় তার ফর্সা মুখটি তামাটে হয়ে গেল আর চোখের পাতায় জল।

—ভাগ্যিস মরে গেছে। কী অত্যাচারটাই না করেছে আমাকে! রাতের পর রাত ঘুমাতে দেয় নাই, দাঁড় করিয়ে রেখেছে। একেকবার মনে হতো আত্মহত্যা করি অথবা ঘুমন্ত মাতালটাকে শতটুকরা করি। শেষমেষ চোখের জল ফেলা ছাড়া আর কোনোটাই করতে পারিনি। অবশ্য শেষমেষ আমাকে আর ওসব করতেও হয়নি। নিজের পাপের ঘড়া পূর্ণ করে নিজেই মারা গেছে। শ্বাসকষ্টে ধড়ফড় করতে করতে শরীরটা বেঁকে গিয়েছিল। ইনহেলারটা এগিয়ে দিতে মন চায়নি। তুমি আমাকে নিষ্ঠুর বলতে পারো, কিন্তু যা সত্য তাই!

এতদিন ভেবেছিলাম স্বামীর মৃত্যুর পর ফের নতুন জীবন গড়ে তুলেছিলেন মিনু ভাবী। এক ধরনের স্বার্থপরতার জন্য তাঁর প্রতি খানিকটা বিরাগ ছিল। যদিও ‘স্বার্থপরতা’ শব্দটা বলার মত অধিকার আমাকে কেউ দেয়নি। তবে আমি অনুভব করতে পারছিলাম, আমার এটা নিয়ে প্রশ্ন করার একটা প্রচ্ছন্ন অধিকার আমার আপনাআপনিই তৈরি হয়েছে। তার সৌন্দর্যের অনুরাগী ও শুভাকাঙ্ক্ষী পড়শি হিসেবে অধিকারটি আমার স্বসৃষ্ট। সুন্দরের অধিকার যে সর্বজনীন এটা কে না জানে! এছাড়া তাঁর প্রথম স্বামী জামিল আহমেদ আমার খুবই পছন্দের একজন মানুষ ছিলেন।

*

জামিল ভাই মারা গেছেন বছর দশেক আগে। হঠাৎ করেই কেন জানি অকাল মৃত্যু ভর করেছিল লম্বাটে মুখের আমার ওই পড়শিতো ভাইয়ের উপর। বহুজাতিক জাহাজের চাকরি করতেন‌। কত অজানা দেশের মাটি স্পর্শ করার সুযোগ তিনি পাচ্ছেন—কল্পনা করে একসময় অবাক হতাম। বন্দরে বন্দরে পণ্য খালাস হতো। তাছাড়া চারিদিকে শুধু জল আর জল। মহাসাগরের বুকে পাহাড়ের মত উঁচু উঁচু ঢেউ জাহাজটাকে আছড়াতে থাকতো। দিনের পর দিন দরিয়ায় ছুটে চলা। মাস, বছর। চলছে তো চলছেই।

একসময় কূলে ভিড়তো। বছরে দু’তিনবার দেশে নামতেন। “যাই বলো, সব বন্দর বা সমুদ্রতো একই, সবই তো জল। একই জলের কত ভাগাভাগি আর নামকরণ!” —বলতেন তিনি।

বাড়ি ছুটে এসে হাঁফ ছেড়ে বাঁচতেন জামিল ভাই। যে কয়টা দিন বাড়ি থাকতেন, পড়শি বাড়িটায় উৎসব লেগে থাকতো। মিনু ভাবীর ছন্দ তখন কলকল ধ্বনিতে বয়ে চলতো। দূর থেকে নীরবে তাকিয়ে দেখতাম, গানের তালে তালে মিনু ভাবী করিৎকর্মার মত ঘরকন্যার কাজগুলো একে একে গুছিয়ে করে চলছেন। সদ্য স্নান সারা গামছাপেঁচানো মাথায় মিনু ভাবীর ফর্সা শীতল মুখটা তখন কুয়াশাভেজা শেফালী ফুলের মত শুভ্র, টসটসে, সুগন্ধীময়।

— খুব ভালো ছিল মানুষটা। আমাকে ভীষণ কেয়ার করতো। মিনু ভাবীর মুখটা উজ্জ্বল হয়ে উঠল। জামিল ভাইয়ের স্মৃতি তার মানসপটে অপ্রতিরোধ্য। দুই ছেলেমেয়ে, জামিল ভাই, কী সোনায় সোহাগা বউ ছিলেন তিনি! যদিও  মাঝেমধ্যে শাশুড়ির খসখসে শাসানি শুনে তিনি কাজের মধ্যেও মাঝেমধ্যে গলির টিনের বেড়ায় ধাক্কা খেতেন। আমার সামনে পড়ে গেলে মুখ ঘুরিয়ে না দেখার ভান করে চলে যেতেন ।

মিনু ভাবী নতুন করে সংসার বাঁধতে বাধ্য হলেন চার বছর পর। তাঁকে বাধ্য করল লোকটি। একমাত্র রোজগেরে, স্বামীর মৃত্যুতে ওদের সুরলহরীর সংসারটা ছিন্নভিন্ন হয়ে গিয়েছিল। বড় ভাইয়ের মৃত্যু ও ভাবীর নতুন করে সংসার বাঁধার ছ’মাস পরই ওদের অপদার্থ ছোট ভাই ওরফে আমার বন্ধুর মস্তিষ্ক বিকৃতি দেখা দিল। সংসারটা এলোমেলো হওয়ার ধাক্কাটা মনে হয় সে সহ্য করতে পারেনি। এক বছর বাদে বন্ধুরও মৃত্যু হলো। মিনু ভাবী অকুল পাথারে পড়লেন। আর দ্বিতীয় স্বামী নামক ব্যক্তিটি এই সুযোগই খুঁজছিলেন। তিনি লম্বাটে মুখের জামিল ভাইয়ের বন্ধু। তিনি বন্ধুর বউকে ফাঁদে আটকালেন। এরপর নৃশংসতার অধ্যায় শুরু…

*

মিনু ভাবী আমাকে তাকিয়ে দেখছিলেন। তাঁকে বললাম, তখনকার দিনে সকালটা শুরু হতো চমৎকার সব গান দিয়ে। চৌয়ারি ঘরে পার্টিশন দেয়া তার নিজস্ব ছোট্ট খুপরি থেকে একটার পর একটা গান। শুনে তার ডান চোখের পাপড়ি একটু নড়ে উঠল। হয়তো তিনি দহলের PHE অংকিত টিউটওয়েলের বাঁকানো হাতল চেপে কলসি ভরতে শুরু করলেন।  

কোনো কোনো দিন সেইসব গান শুনতে শুনতেই আমি উদ্দেশ্যহীনভাবে হেঁটে যেতাম বকুলতলার দিকে। হেরিংবোন পথের দুপাশে সারি সারি  বকুলগাছ। শিশিরমাখা বকুলফুল ভোরের পৃথিবীকে সুরভীত করে তুলছে। ঝরা ফুলগুলো পড়ে আছে গাছের তলায় তলায়, ভিজে ইটের কোলে। বকুলের মিষ্টি ভুরভুরে গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে সারা পথে।

সামনে এগোলেই টিনের বেড়ায় ঘেরা হেডস্যারের কোয়ার্টার—আয়তকার চৌচালা বনেদী টিনসেড বাড়ি। হেঁটে যেতে প্রতিবারই অনুমান করতাম বন্ধুর বড় বোন আমাদের রোজ আপার অস্তিত্ব। আমাদের মনের অন্তরালে লুকিয়ে থাকা প্রেয়সীমূর্তি। কী দারুণ টিপটপ সাজিয়ে রেখেছেন প্রতিটি কামরা। আর হেডস্যারের বউ—খালাম্মা রান্নাঘরে হয়ত দিনশুরুর চা সাজাচ্ছেন। হেডস্যার চশমাটা খুঁজে নিয়ে বিছানা থেকে উঠব উঠব করছেন। ছোট্ট মেয়েটি বিড়ালছানার মত ঘুমিয়ে আছে কোলবালিশ জড়িয়ে। বাইরের ঘরে আমাদের বন্ধুর তখন নাক ডাকার শব্দ।

সামনে মহারাণী হেমন্তকুমারী স্কুলের গেট পেরিয়ে পুকুর। কুয়াশাভেজা ঘাটে তখনও কেউ লুঙ্গিগামছা রেখে গোসল করতে নামেনি। ছাত্রহোস্টেলের সবাই বুঝি ছোট্ট চৌকিতে আড়মোড়া কাটছে। বাস্কেটবল গ্রাউন্ডের ঘাসগুলো গায়ে শিশির মেখে যেন প্রাণ ফিরে পেয়েছে। দিনের আলো ফোটার খানিক পরেই এখানে শুরু হবে ছাত্রদের জটলা, ক্লাস। টিফিনে হইচই, খেলাধুলা।

*

আর মুখে কোনো রা নেই। এই এত বছর পর তার কেউ খোঁজ নিতে এসেছে, তা তিনি বিশ্বাসই করতে পারছেন না। আর এমন একজন, যিনি জাগিয়ে দিচ্ছেন বছরের পর বছর পরম যত্নে পুষে রাখা দিনগুলোর স্মৃতি। দুঃসহ যন্ত্রণার দিনগুলোতে যা স্মরণ করে তিনি মাঝেমধ্যে বিভোর হয়ে থাকতেন। পাষণ্ড লোকটি তখন তাকে যা তা বলে হেনস্তা করতো আর দাঁত খিঁচিয়ে উপহাস করতো। মারের দাগ বসিয়ে দিতো তার পিঠে।

মিনু ভাবী আমাকে শুধুই তাকিয়ে দেখছিলেন। তার জীবনের হিসেব-কিতেব অনেকটাই এখন অপ্রয়োজনীয় অসার হয়ে পড়েছে। তবু অতীতের এক দূত এসেছে বলে তার আনন্দ ও সুখ উপচে পড়ছে। আমার ঝাঁপসা মূর্তি তার চেতনাপটে হয়ত স্পষ্ট অবয়ব খুঁজে পেয়েছে। তাঁর অন্তর্গত চোখ থেকে ঠিকরে বেরোচ্ছে পুরোনো সংসার, রেকর্ড প্লেয়ারের গান। অগণিত দিনের কান্না-হাসিভরা সংসারের দিনরাত্রি। আগন্তুকের জন্যে এক নিটোল মমতাময় আভাও সেখানে ছিল। আমার মুখেচোখে পরম মমতায় হাত বোলালেন তিনি।

তার বাম চোখের ছোট্ট মণিটার দিকে আমি তীর্যক দৃষ্টি রাখলাম। মণিটা বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের কালো তিলের মত এক কৃষ্ণগহ্বর যেন। সেইখানেই তার সুখ-দুঃখের সব সম্পদ জমা আছে। তাঁর নিটোল সুন্দরের মুখ থেকে তৃপ্তির লাবণ্য ছড়িয়ে পড়ছে।

নিজেকে বেশ নির্ভার মনে হচ্ছে। নীরবে পায়ে পায়ে অন্ধকার গলি পেরিয়ে বড় রাস্তায় উঠলাম। 

মিজানুর রহমান নাসিম

জন্ম ১৯৬৮ সালের জামালপুরে। তবে চার দশক থেকে রংপুরে বসবাস করছেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দর্শনশাস্ত্রে বিএ অনার্স, এম এ এবং পিএইডি ডিগ্রি অর্জন করেন। ছাত্রজীবন থেকে প্রগতিশালী রাজনৈতিক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। বর্তমানে একটি কলেজ শিক্ষকতা করেন। লেখালেখির সাথে যুক্ত। আট বছর থেকে নিয়মিতভাবে মননরেখা নামে একটি ষাণ্মাসিক শিল্প-সাহিত্য বিষয়ক সাহিত্য জার্নাল প্রকাশ করছেন যার জন্য ২০২২ সালে তিনি বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি সম্মাননা লাভ বরেন। তিনি পত্র-পত্রিকা ও দেশবিদেশের বিভিন্ন জার্নালেও লিখে থাকেন। প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ: সেইসব মানুষ, অক্টোবর ও অন্যান্য গল্প , র‌্যাপচার : জুলাই অভ্যুত্থানের র‌্যাপসঙ্গীত

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ভাষা
Scroll to Top