আগরতলার রাত্রি
ধুলিধূসর আর এলোমেলো রিকশার এই উষ্ণ
শহরে আমি চিরকাল থেকে যেতে পারতাম,
উপকথার গল্প থেকে শিক্ষণীয় কিছুর মতো।
যদিও সেখানকার রাস্তার কুকুরগুলোর মধ্যে
আমি কোনো পার্থক্য করতে পারিনি, তবুও জেনেছিলাম
কোনো জনগোষ্ঠীকে স্তব্ধ করে দেওয়ার সবচেয়ে কার্যকর পন্থা হলো
নিজ মাতৃভাষার ভারে তাদের শ্বাসরোধ করে রাখা।
তাদের ক্ষতবিক্ষত হতে দাও
গভীর ঘৃণা, সংগ্রাম আর ক্রোধের অনলে পুড়তে দাও:
তবু তারা মূক হয়েই থাকবে।
কেড়ে নাও তাদের রীতিনীতি, প্রাসাদগুলোকে পরিণত করো
প্রান্তিক মিলনায়তন আর পর্যটন কেন্দ্রে
মূলধারায় তাড়িয়ে নিয়ে যাও তাদের, আর সেখানেই ডুবিয়ে দাও।
তারা জঙ্গল থেকে বেরিয়ে আসুক, শুধু বিশ্রামগঞ্জের
জমাট-কাদায় হাঁটু গেড়ে বসে লুড়ি লুড়ার মতো
সবজি ফেরি করার জন্য।তারপর সীমান্তে বেড়া তোলো,
বিদ্রোহী আর অভিবাসীদের বাইরে রাখো
(কী অদ্ভুত ছিল বাংলাদেশ, যাকে ছুঁতে পারতাম কিন্তু পা রাখতে পারতাম না)।
রিক্ত আগরতলা, তবে কি বলব যে
এমনই ভাগ্য সমস্ত শূন্য স্থানের?
এমন সব রাত… সমস্ত কদর্যতা আড়াল করে স্বপ্নের মতো উন্মোচন করে অপরূপ দৃশ্যপট
সেই রাতগুলোই আমি আবার ফিরে পেয়ে যাপন করতে চাইতাম যদি
হ্রদের বুকে সেই গোলাপী-সাদা রাজকীয় নীড়মহলে থাকতাম,
এমন সব রাত… যেখানে ভাষাগুলো তাদের সুরের বিস্ময় উগরে দেয়!
যখন মন্ত্রী আমলারা বক্তৃতা ও প্রতিশ্রুতির বদলে উন্মত্ত কবির মতো
অনুভূতিশীল হয়ে ওঠেন! প্রাণবন্ত মানুষ আর বিচিত্র জনতার সম্মিলন ঘটায়… এমন সব রাত।
প্রাচীন আত্মার সন্ধানী, গর্জনরত কোকবোরোক জলপ্রপাত;
রবীন্দ্র-সংগীতের সুরে মগ্ন এক বিষাদময় বিষ্ণুপ্রিয়া; নিঃশব্দে কঠিন সুরের রূপকার প্রাণোচ্ছল অসমীয়া;
কবিদের উগ্র রক্ষক এক সুরাসক্ত ত্রিপুরী; আর দিব্যেন্দু
রুগ্ন কন্যার মাঝেও আনন্দপ্রত্যাশী এক পরম উদার পিতা।
এমন সভাসদদেরই আমি আপন করে নিতাম, যাদের কোনো
মতলব নেই, আছে শুধু হৃদয়।
টীকা: লুডি লুডা – খাসি লোককথার বিশৃঙ্খল পশু মেলা। নীড়মহল – ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের রাজধানীর মেলাঘরে রুডিজালা হ্রদের মাঝখানে নির্মিত ত্রিপুরার শেষ রাজা বীরবিক্রম কিশোর মাণিক্যের প্রাসাদ।
–
মায়ের জন্য ধর্মদ্রোহী পঙক্তিমালা
আর. কে. নারায়ণ আর নেই।
আজ রাতে তাঁর বাঁশের চেয়ারে বসে
বিষণ্ণ মনে ‘একান্ত দূর্লভ আত্মা’র কথা বলছেন।
দৈবাৎ আমারও ‘আপন নির্জন আত্মা’র সমূল ব্যবচ্ছেদের আকাঙ্খা জেগেছে।
শুরুতেই বলছি আমার মা নারায়ণের মায়ের চেয়ে অধিক ‘স্পষ্টভাষী’, অত্যন্ত ‘সত্যবাদী’।
আমার মা বেকার, দন্তবিহীন, বহুমূত্ররোগী, শিরপীড়ায় জর্জরিত,
সংক্ষেপে, ছানিতে ক্রমশ অন্ধ হয়ে আসা একজন বদমেজাজি বৃদ্ধা।
সেই সময়ের কথা মনে পড়ে যখন ঝগড়াটে যুবতী ছিলেন মা
দুপুরে যখন ঘুমাতেন, বাঘিনীর মতো গর্জন করে বলতেন, ‘মাগীর বাচ্চা সব!’
‘তোরা আমাকে এক মুহূর্তও বিশ্রাম নিতে দিবি না, পিশাচের দল! এদিকে আয়,
জানোয়ারের বাচ্চা! যদি তোদের ধরি, খোঁড়া করে দেব! পঙ্গু করে দেব! … উকুনের ছা!
তোরা তোদের জন্মদাত্রীর মাংস খেয়েই বাঁচিস! ঘুমানোর সময় ফের কোনো আওয়াজ করেছিস
তো এমন পেটাব যে কুকুরের মতো কাঁদবি! দায়িত্বজ্ঞানহীন নির্বোধ!’
’যদি একটা ভালো স্বপ্নই না দেখি, তাহলে বাজি ধরব কী করে?
কী করে তোদের খাওয়াব, ছোটলোকের বাচ্চা?’
যখন কাঠের টুল, লোহার চিমটা আর ব্রোঞ্জের ফুঁকনি নিয়ে
এই জ্বলন্ত আক্রমণ ছুটে আসত, আমরা প্রাণপণে দৌড়াতাম
মা লাঠি আর কাঠ নিয়ে আমাদের তাড়া করতেন, সঙ্গে তাঁর এলোমেলো চুল
জ্বলজ্বলে চোখ দুটো আর উন্মত্ত ক্রোধে ঝলসে উঠা জবান।শিশুকালে এই অদ্ভুত
অস্ত্রগুলো এড়াবার কৌশল রপ্ত করা বাদে আর কিছুই শিখতাম না আমরা।
মনে পড়ে, মেয়ে ছিল না বলে আমাকে দিয়েই তাঁর রক্তাক্ত ন্যাকড়া ধোয়াতেন।
অস্বীকার করছি না, লাঠি দিয়ে সেগুলো তুলে আমি সদাই
একটা পুরোনো লোহার বালতিতে পিষতাম যতক্ষণ না পরিষ্কার হতো
কিন্তু সবকিছুই হতো গোপনে, হাতে ধুইনি দেখলেই পরিণাম ভয়াবহ!
চেরাপুঞ্জির দিনগুলোতে জানতামই না শৌচাগার কী, আমাদের
কখনো সেপটি ট্যাঙ্ক ছিল না, ছিল কেবল পবিত্র উপবন ।
মা কিন্তু ময়লার ঝুড়িতেই মাঝে মাঝে সারতেন; অস্বীকার করবার জো নেই,
তখন আমার কাঁধেই এসে পড়ত পবিত্র বনে সেসব বয়ে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব
সর্বদা উপরে ছাই ছিটিয়ে, সুপারির খোসা আর অন্যান্য জিনিসে ঢেকে নিন্দুক
প্রতিবেশী আর সঙ্গীদের এড়িয়ে যাবার কী প্রাণপণ উদ্যম ছিল আমার!
‘পুষ্পক’-এ যারা কমল হাসানকে দেখেছেন, বুঝবেন কৌশলগুলো।
আমার মা কতটা বদমেজাজি ছিলেন বোঝাতে দিতে পারি হাজারটা নমুনা।
বলতে চাই না তাঁর সম্বন্ধে কোনো ভালো কথা, আমি তো নারায়ণ নই
আর এটাও বলতে চাই না যে আমার মদ্যপ বাবা
বেঁচে থাকতে বা মরে যাওয়ার পর কতটা কষ্ট পেয়েছিলেন মা,
আপন ছেলে দুটো আর মৃত বোনের নাবালক সন্তানদের ঠিকঠাক
মানুষ করতে কতটা সইতে হয়েছে তাঁকে। তারিফ করে
কিছু বলতে হলে স্বীকার করব পুনরায় বিয়ে করতেন যদি
এবং এমন খিটখিটে মহিলা না হতেন, সম্ভবত
আমিও আজ এখানে দাঁড়িয়ে এই কবিতা পড়তাম না।
—-
টীকা: বাজি – তীরন্দাজির জুয়া। উপবন – মেঘালয়ের খাসি পাহাড়ের প্রায় প্রতিটি গ্রামের নিজ সম্প্রদায়ের বন দেখা যায় যা বিশুদ্ধিকরণের মাধ্যমে সাধারণের জন্য নিষিদ্ধ। পুষ্পক – জনপ্রিয় দক্ষিণ ভারতীয় নির্বাক চলচ্চিত্র। এখানে কমল হাসান একজন অপহরণকারী হিসেবে অভিনয় করেছেন, আর প্রতিদিন সকালে অভিনব উপায়ে তাঁর বন্দীদের মল পরিষ্কার করতেন।
কিনফাম সিং নংকিনরিহ উত্তর-পূর্ব ভারতীয় রাজ্য মেঘালয়ের শিলং-এ বাস করেন। জাতিগতভাবে খাসি নংকিনরিহ্ খাসি ও ইংরেজি উভয় ভাষাতে লেখালেখি করেন। তাঁর কবিতা, ছোটগল্প, উপন্যাস ভারতজুড়ে সমাদৃত। শিলং-এর নর্থ-ইস্টার্ন হিল ইউনিভার্সিটির প্রকাশনা বিভাগের উপ-পরিচালক হিসেবে কর্মরত নংকিনরিহ বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউজলেটার ‘NEHU নিউজ’, বিশ্ববিদ্যালয়ের আনুষ্ঠানিক জার্নাল ‘দ্য NEHU জার্নাল’ এবং খাসি ভাষার প্রথম কবিতা পত্রিকা ‘রিলুম’ সম্পাদনা করেন। তিনি ভারত সরকারের কাছ থেকে ‘ফেলোশিপ ফর আউটস্ট্যান্ডিং আর্টিস্টস ২০০০’ এবং মেঘালয় সরকারের কাছ থেকে খাসি ভাষায় লেখার জন্য তিনটি বৃত্তি লাভ করেন। তিনি ২০০৪ সালে ত্রিপুরার উত্তর-পূর্ব ভারত কবিতা পরিষদ থেকে প্রথম উত্তর-পূর্ব কবিতা পুরস্কারও লাভ করেন। তাঁর কিছু কবিতা ওয়েলশ, সুইডিশ এবং বেশ কয়েকটি ভারতীয় ভাষায় অনূদিত হয়েছে। নয়াদিল্লির ইন্দিরা গান্ধী জাতীয় উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় এবং কোহিমার নাগাল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগের স্নাতকোত্তর শ্রেণীতে পড়ানো হচ্ছে নংকিনরিহ্-র কবিতা।এ সময়ের ক্রমবর্ধমান অস্বস্তি ও জীবনযাত্রার হুমকি প্রতিফলিত হয় তাঁর লেখায়, যা উত্তর-পূর্ব ভারতের সমসাময়িক লেখালেখির একটা বৈশিষ্ট্য। নংকিনরিহ্ বিশ্বাস করেন যে কবিতাকে অবশ্যই তার সময় ও স্থানের জরুরি অবস্থার প্রতি সাড়া দিতে হবে। তাঁর লেখায় বিস্তৃত সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক অনুষঙ্গের পাশাপাশি অকপট রাজনৈতিক চেতনা এবং আদিবাসী ভাষা ও সংস্কৃতির গীতিময়তা, শৈলী ও রীতির প্রভাব দেখা যায়। একজন দ্বিভাষী কবি হিসেবে তিনি খাসিকে তাঁর গোত্রের ভাষা এবং ইংরেজিকে সেই ভাষা হিসেবে বিবেচনা করেন যা বিচ্ছিন্নতাবাদ প্রত্যাখ্যান করে তাঁকে বিশ্বজনীন করে তোলে।
ঈশিতা দস্তিদার
জন্ম ও বেড়ে ওঠা চট্টগ্রামে। নৃবিজ্ঞানে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।পরবর্তীকালে পিএইচডি করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগ থেকে । কর্পোরেট চাকরী ছেড়ে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের খন্ডকালীন শিক্ষকতা করেছেন কিছুদিন। আপাতত মুক্ত গবেষক হিসেবে আগ্রহের বিষয়ে লেখালেখি ও অনুবাদ নিয়ে ঢাকা শহরেই বসবাস।





