Home » ঘণ্টার কাঁটা // আশানুর রহমান

ঘণ্টার কাঁটা // আশানুর রহমান


ট্রেনটা যশোর স্টেশনে ঢুকতেই বৃষ্টিটা হঠাৎ থেমে গেল। যেন নাটকের মঞ্চে পর্দা পড়ল, ‘বিরতি।’ ছাউনি থেকে জলের ফোঁটা টুপটাপ ঝরছে, কিন্তু হাওয়া বেশ শুকনো। আমাকে নামতে দেখে ধুতি পরা এক কুলি বলল, ‘বাবু, ব্যাগপত্র নেই?’ আমি হেসে বললাম, ‘ব্যাগ যতটা, তার চেয়ে কাজ বেশি।’ কুলি এমনভাবে মাথা নাড়ল, যেন কাজও একটা ব্যাগ। যার ওজন আছে, হাত ব্যথা করে, কিন্তু ভাড়া মেলে না।

আমি অরুণ। ঘড়ি সারাই করি, সাইনবোর্ড লিখি, ছবিও আঁকি। চাইলে হারমোনিয়ামের রিডও পাল্টে দিতে পারি। ছ’মাস আগে কুষ্টিয়া শহরের বউবাজারের ‘সাহা এন্ড সন্স’ দোকানটা উঠে গেল। তখন থেকে ঘুরে ঘুরে কাজ নিই। আজ এসেছি যশোরের পুরোনো আদালতভবনের ঘড়িঘরটা ঠিক করতে। কাল এখানে বড় একটা পাবলিক ইভেন্ট আছে। ‘স্বচ্ছতা মেলা’। সেটার উদ্বোধনীতে টাওয়ার-ঘড়িটা থেকে বারোটা বাজার সাথে সাথে ঘণ্টা বাজাতে হবে। এই নিয়ে সবাই ব্যস্ত। আমাকে ফোনে বলা হয়েছিল, ‘দাদা, আপনি নাকি বাজে ঘড়ি বাজাতে পারেন?’ আমি উত্তর দিয়েছিলাম, ‘বাজে ঘড়ি নয়; তবে ঘড়ি যদি দুর্ভাগ্যজনক হয়, বাজাতে পারি।’

স্টেশন থেকে রিকশা নিলাম। রাস্তার পিচ ভাঙা। পথের দু’ধারে লম্বা তেঁতুলগাছ। যশোর শহরটা পুরোনো হলেও মফস্বলের ছাপ সর্বত্র। এক দোকানে দেখি সাইনবোর্ডের অক্ষর ঝুলছে। ‘আলো মার্ট’ এর ‘আলো’ শব্দটায় জং ধরেছে। আমি ভাবলাম, চেখভ হলে হয়তো একটি ফিসফিস সংলাপ লিখতেন, ‘অক্ষরও বুড়ো হয়।’

আদালতভবনে পৌঁছলেই চোখে পড়ে ইটখসে পড়া লাল ভবন। তার মাথায় চুন-সাদা ঘড়িঘর। চারদিকে শামুকের খোলসের মতো দোকান। পলেস্তারা নেই, তবু যেন জেনেশুনেই দাঁড়িয়ে আছে। প্রবেশদ্বারে ক্লার্ক নির্মলবাবু দাঁড়িয়ে। তার চোখে সোনালি ফ্রেমের চশমা। হাতে রেজিস্টার খাতা। বললেন, ‘আপনিই আরুণ? সময়মতোই এসেছেন।’ সময়মতো; এই শব্দটা শুনলেই আমার কানে ঘড়ির পেন্ডুলামের টিকটিক শব্দ বাজে। সময়মতো আসা আর সময়কে আসতে দেওয়া দুটো ভিন্ন কাজ।

চৌকিদার আলতাফ ঘড়িঘরের চাবিটা আমাকে দিলেন। বললেন, ‘ঘড়িঘরে ভূত না থাকলেও কবুতর আছে। ভয় পেলে নামবেন, তখন চা দেব।’ আমি বললাম, ‘ভয় পেলে আমি নামি না; ঘড়ির ভেতর ভয়কে বসাই। ভয় একটা ভালো পিকআপ-কয়েল।’ আলতাফ হা করে চেয়ে থাকল। হয়তো ভাবল আমার মাথার তারছেঁড়া।

সিঁড়ি ভাঙতে ভাঙতে দেখি দেয়ালে কালি দিয়ে কেউ লিখেছে, ‘ঘণ্টা বাজলে নাম ধরে ডাকবে।’ কে ডাকবে? হয়তো শহর, হয়তো অতীত, হয়তো একেবারে কল্পনা।

সিঁড়ির শেষে লোহার দরজা। খুলতেই ভেতরটা অন্ধকারের গন্ধে ভরা। কাঠ, তেল, পুরোনো লোহা। ওপরে কাঠের মাচা। তারও ওপরে ঘড়ির চারটি মুখ। যার একটার কাঁচ ভাঙা, বাকিগুলো ধুলোতে ম্লান। মাঝখানে লোহার দাঁড়ার জট; গিয়ার, স্প্রকেট, রড। আর ডানদিকে একটা বড় পিতলের হাতুড়ি। ঘণ্টা-হাত, অসাড় হয়ে পড়েছে। চেখভের নিয়ম মনে পড়ল। প্রথম অঙ্কে বন্দুক দেখালে শেষ অঙ্কে সেটা বাজতেই হবে। আমার গল্পে বন্দুক নেই, আছে ঘণ্টা। এর সুর কি শেষ অঙ্কে উঠবে?

আমি সরঞ্জাম খুললাম। তেল, স্ক্রু-ড্রাইভার, ব্রাশ, কাপড়, ছোট বাটিতে পাতলা ঘি। মাথার ওপর কবুতরের ডানা। ওরা ‘ভড়ভড়’ শব্দ তুলে হঠাৎ উড়ে গিয়ে আবার ফিরেও এলো। গিয়ারের দাঁতে ব্রাশ বোলাতে বোলাতে নিজেকে বললাম, ‘শান্ত থাক। সময়ের দাঁতে তেল দিলে সময়ও নরম হয়।’

দুপুরের একটু আগে টাওয়ার থেকে নামতেই চায়ের দোকান থেকে চিৎকার, ‘অরুণ দা, আসেন।’ কাছে আসতেই বলে, ‘উনি মায়া, দোকানের মালিক।’ দোকানটা ভাল করে দেখলাম। অর্ধেক চায়ের দোকান, আর অর্ধেকটা যেন সালিশি বোর্ড। তিনি আমাকে গরম কাপে চা দিলেন। বললেন, ‘ঘড়ি বাজবে তো?’
আমি বললাম, ‘বসে গেছে। ওঠাতে হবে।’
তিনি হেসে বললেন, ‘মানুষও বসে থাকে, ওঠে না।’
আমার মনে হল, ‘বসে থাকা’ আর ‘ঘুমিয়ে থাকা’ দুটো আলাদা বিষয়। মানুষ বসে থাকে প্রতীক্ষায়, ঘড়ি বসে থাকে ভয়ে। ভেঙে গেলে কে সারাবে?

চায়ের দোকানে আরও কয়েকজন আছে। রিমি, যশোর মাইকেল মধুসূদন কলেজে পড়ে, টিকটক করে। জসিম, আদালতের নথিপত্র বওয়া লোক। আর কোণে বসে শিরিন আপা, টাউন হল লাইব্রেরির লাইব্রেরিয়ান। তার কাঁধের কাছে চুলগুলো সব সাদা। লাইব্রেরিটা আদালতের উল্টোদিকে। শুকনো কাঠের দরজা, ভেতরে ফাইল-পত্রে ঠাঁসা। শিরিন আপা আস্তে করে বললেন, ‘ঘড়িটা যদি বাজে, লাইব্রেরির ঘড়িটাও আবার টিকটিক করবে।’
আমি বললাম, ‘লাইব্রেরির ঘড়ি?’
‘একটা পুরোনো ওয়াল ক্লক,’ বললেন তিনি। ‘তোমার কাজ শেষ করে একবার দেখবে?’
আমি মাথা নেড়ে চা খেতে লাগলাম। শিরিন আপা বললেন, “কথা দিন, কাল বারোটায় ঘড়িটা বাজবে। কাল ‘স্বচ্ছতা মেলার’ উদ্বোধন।” আমি অল্প হাসলাম।

বিকেলে ঘড়িঘরে আমি আবার উঠলাম। তেল, ধুলো আর কাঠের গন্ধ। জং-ধরা পেন্ডুলাম তার দিয়ে নতুন করে বেঁধে দিলাম। ঘণ্টার হাত থেকে জং খুঁটে খুঁটে তুললাম। পিতল ধাতুটা ভেতরে এখনও চকমকে। একটা স্ক্রু ছিল যা খুলতে পারছিলাম না। হঠাৎ ব্যাগ থেকে বেরোল ছোট্ট হাতুড়ি। আমার গুরু বাপুন কাকা বলতেন, ‘হাতুড়ির শব্দে লোহা ভয় পায়।’ আমি হাতুড়ি দিয়ে টোকা দিতেই স্ক্রুটি নরম হলো।

ঘড়িঘরের ভেতরে কাজে করতে করতেই চোখে পড়ল এক কোণে মোটা একটা খাম। পুরনো তবে সিল করা। তাতে নীল কালি দিয়ে লেখা, ‘ঘণ্টা বাজার দিন খুলিবে।’ হঠাৎ চারদিক যেন নীরব হয়ে গেল। ‘ঘণ্টা বাজার দিন’, মানে? টাওয়ার কি কোনো গোপন প্রতিজ্ঞা করেছে যে বাজবে বলেই খুলবে? খামটা হাতে নিয়ে বসে থাকলাম। খামের ওপরে আর্দ্রতা লেগে মসৃণ একটা নকশা পড়েছে। বাড়তি রহস্য। কার চিঠি? কার উদ্দেশে?

আমি খামটা পকেটে রাখলাম। পাঠিয়ে দেওয়ার তো ঠিকানা নেই, শুধু যেন সময়ের জন্য লেখা। চোখে এক মুহূর্তে ভেসে উঠল একটা জিনিস। শিরিন আপার কাঁধের সাদা চুল, তার ভেতরে ঝড়ো উদাসী ভাব। হয়তো চিঠিটা লাইব্রেরির। অথবা আদালতের কারও। অথবা কারও নয়; ঘড়ির নিজস্ব।

নিচে নামতেই আলতাফ বলল, ‘দাদা, আজ না বাজলেও কাল তো বাজবেই, তাই না?’
আমি বললাম, ‘চেখভের নিয়ম।’
আলতাফ চোখ কুঁচকে বলল, ‘চেখভও কি আপনার মতো ঘড়ির মিস্ত্রী?’
আমি হেসে বললাম, ‘মিস্ত্রিরই মতো। গল্পও বানাতে হয়, ভাঙতে হয়। মেরামতও করতে হয়।’

সন্ধ্যায় লাইব্রেরিতে গেলাম। ছোট ছোট আলমারি। কাঠের টেবিল, কোণে একটা পিতলের স্ট্যান্ডে লাল কালির দোয়াত। শিরিন আপা ওয়াল ক্লকটা নামিয়ে দিয়ে বললেন, ‘চলবে?’
আমি বললাম, ‘হয়, এমন হয়। ঘড়িরা মানুষকে মনে রাখে।’ ঘড়ি খুলতেই দেখি স্প্রিং শক্ত, কিন্তু পেন্ডুলামের এস্কেপমেন্ট ক্ষয়ে গেছে। আমি নিজের একটা ছোট বুশিং লাগিয়ে দিলাম। অল্প তেল, সামান্য ঘষা দিতেই ঘড়ি টিকটিক শুরু করল। শিরিন আপার চোখ চকচক করতে লাগল। বালিকার মতো আনন্দ। তিনি বললেন, ‘আমার স্বামী লালন সংগীত গাইতে গাইতে ঘড়ির সময় ঠিক করতেন। সে-ও চলে গেল, ঘড়িও থেমে গেল।’
তিনি হাসলেন, ‘তুমিও কি মনে রাখবে?’
আমি বললাম, ‘ঘড়িগুলো আমাকে রেখে দেয়, আমি কী করে ভুলব?’

লাইব্রেরির দরজার কাছে চুপচাপ দাঁড়িয়েছিল একটি কুকুর। গায়ের রং ময়লা সাদা। শিরিন আপা বললেন, “ওর নাম ‘খেজুর’। বিকেলে এসে বসে।” আমি কয়েকবার ডাকলাম, ‘খেজুর’ ‘খেজুর’ বলে। সে লেজ নেড়ে বসে থাকল।
‘কী খায়?’, আমি জিজ্ঞেস করলাম।
‘খায়,’ শিরিন আপা বললেন। ‘কিন্তু কেউ দিলে তবেই। নিজে থেকে কিছু নেয় না।’

বাইরে বৃষ্টি শুরু হলো। মিহি, পাতলা। শিরিন আপা জানালার দিকে তাকিয়ে বললেন, “বৃষ্টি হলে লাইব্রেরির কাঠে এক ধরনের বাজনা ওঠে। শব্দটা একটা ‘সা’; আরেকটা ‘মা’।” আমি খেয়াল করলাম চেখভের চরিত্রের মতোই, তার কণ্ঠে কিছু বলা হয়নি এমন মিল। শরীর-ভাষা, সাঁঝের গন্ধ, ছোট ছোট সংকোচ। আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘আপা, কাল… অনুষ্ঠান?’
‘হবে,’ বললেন। “স্বচ্ছতা…মহাস্বচ্ছতা। আমাদের লাইব্রেরিতে নাকি ‘স্মার্ট রিডিং কর্নার’ হবে। পুরোনো বইগুলো থাকবে, কিন্তু কভারে ‘নতুন’ কাগজ বসবে। নতুন কাগজের গন্ধ সুন্দর। কিন্তু অক্ষরগুলো যেন কাঁশে, মনে হয় সর্দি হয়েছে।”

আমি বলতে গিয়েও থামলাম। আমার পকেটে থাকা খামটা যেন ততক্ষণে ধীরে ধীরে ভারী হচ্ছে।

রাত হলো। আমার থাকার কথা ছিল আদালতের গেস্টরুমে। কিন্তু নির্মলবাবু বললেন, ‘এখানে রাত হলে তো শুধু কাগজরা শ্বাস নেয়। আপনি বরং পুরোনো ডাক-বিভাগের চৌকি ঘরেই থাকুন।’ আমি সেখানে গেলাম। মাটির মেঝে, টিনের ছাদ, একটা টেবিল। এক কোণে একখানা হারমোনিয়াম; শুধু বেলোস আছে, রিড নেই।

খাটে শুয়ে পকেট থেকে খামটা বের করলাম। আলোটা হলদে। খামের সিল নরম। একটু টান দিলেই খুলে যাবে। আমি বুকের ভেতরে ওয়ার্কশপের টিকটিক শুনতে পেলাম। ‘খুলে ফেলো? আগামীকাল না ঘণ্টা বাজার দিন।’ আমার ভেতরের শিল্পী সত্তা বলল, ‘গল্প তো বিলম্বে জন্মায়, একটু অপেক্ষা কর।’ আর আমার ভেতরের মিস্ত্রি বলল, ‘সময়ের আগে নেকলেস কেটে ফেললে মুক্তোগুলো হারিয়ে যায়।’

আমি খামটা টেবিলের ওপর রেখে বাতি নেভালাম।

ঘুমের আগে বাইরে বৃষ্টি নামল। উচ্চারণহীন, কিন্তু দৃঢ়। কুকুরের ডাক এলো দূর থেকে। খেজুর কি? কিংবা এই শহরের অন্য কোনো ভিজে প্রাণি। ঘুমিয়ে পড়ার ঠিক আগে আমার মনে হলো ঘড়িঘরের ঘণ্টা-হাতটা স্বপ্নে একবার নড়ে উঠল, ‘টং’। একটি ক্ষীণ শব্দ, কিন্তু দূরে যাবার মতো।

সকাল। মেলার ব্যানার ওঠে। তাঁবু, প্লাস্টিকের চেয়ার, মাইকের শব্দ। আদালতভবনের সামনে প্যান্ডেল। উদ্বোধকের নাম ডেপুটি চিফ কিছু একটা। নির্মলবাবু তালিকা মিলিয়ে বললেন, ‘বারোটা বাজার সাথে সাথে বাজাতে হবে।’
আমি বললাম, ‘ঘড়ির জন্য বারোটা ঠিকই, মানুষের জন্য বারোটা মানে দুপুর। ক্ষুধা আর ঘোষণার ঝগড়া। তবু বাজাব।’

চায়ের দোকানে ঢুঁ মারতেই মায়া চিৎকার করে বললেন, ‘অরুণ দা, আপনার জন্য লাচ্ছা পরোটা।’ যে শহরে মানুষ রসিকতা বোঝে, সেখানে পরোটাও নির্মল। রিমি ফোনে কারও কাছে রিহার্সাল ভয়েস পাঠাচ্ছে, ‘লাইভ আপডেট দিচ্ছি।’ জসিম আদালতের ফাইল নিয়ে যাচ্ছে, কপালে কালির দাগ। শিরিন আপা একটু কাছে এসে বললেন, ‘আজ বেলা সাড়ে এগারোটার দিকে একবার লাইব্রেরিতে আসবেন?’
‘কেন?’
তিনি বললেন, ‘আমি একটা দরজা বন্ধ করব। আপনি থাকলে ভয়টা কমে।’
আমি বললাম, ‘আচ্ছা।’

খেজুর আজকেও দরজায় বসে ছিল। আমার দিকে সরল দৃষ্টি। আমি একটা বিস্কুট দিলাম। সে নিল না। শিরিন আপা বললেন, ‘লাইব্রেরির জিনিস, লাইব্রেরির থেকেই খায়।’

সাড়ে দশটা নাগাদ ঘড়িঘরে গিয়ে শেষবারের মতো টেস্ট করলাম। পেন্ডুলাম সোজা, এস্কেপমেন্ট ছন্দে আছে। ঘণ্টা-হাতের কলার-স্ক্রু শক্ত। তবে একটা ছোট ঝামেলা দেখলাম। পশ্চিম দিকের ঘড়িমুখের মিনিটের কাঁটাটা এক বিন্দু পরে থাকছে। আমি কাঁটাটা ছাড়িয়ে আবার বসালাম। মাঝে মাঝে এমন এক অনুভূতি হয় যেন ঘড়িগুলো নিজেদের নীতিমালা লিখে রাখে যে, মানুষ আসে, একটু পড়াশোনা করে চলে যায়।

ঘড়িঘরের খোলা জানালা দিয়ে দেখলাম দূরে লাইব্রেরির দরজায় শিরিন আপা দাঁড়িয়ে। তার বুকের কাছে চাবির রিং। আমি ঘড়িঘর থেকে নেমে সাড়ে এগারোটায় সেখানে গেলাম। ‘দরজা বন্ধ কেন?’, আমি জিজ্ঞেস করলাম।
‘পুরোনো পাণ্ডুলিপির শেলফে একটা কাঠের পাল্লা আছে,’ বললেন তিনি। ‘বরাবর খুলে পড়ে; আজ বন্ধ করে দেব। আপনি থাকুন।’

আমি চুপ করে দাঁড়ালাম। ভয় লাগছিল? না। ভয়ের সঙ্গে একটা সামঞ্জস্য। শিরিন আপা চাবিটা ঢুকিয়ে পাল্লাটা ধীরে টেনে তুললেন। তার মধ্যে পুরোনো কাগজের গন্ধ। একরাশ বোরোলিন-সদৃশ স্মৃতি। তিনি দরজা ঠেলে বন্ধ করতেই টন করে শব্দ হলো। আমার বুকের ভেতরে কোথাও একটা ঘণ্টা ছোট করে বেজে উঠল।

শিরিন আপা হালকা হাঁফ ছাড়লেন। বললেন, ‘হয়ে গেল।’ আমি বললাম, ‘আজ বারোটায় আপনি কোথায় থাকবেন?’ ‘এখানেই। ঘণ্টা বাজলে শুনব’, বললেন তিনি।

আমি মাথা নেড়ে বের হলাম। পকেটে খামের কথা মনে পড়ল। আজ বারোটা। ‘ঘণ্টা বাজার দিন’। চিঠি খুলব?

প্যান্ডেলে লোকে লোকারণ্য। স্টলে স্টলে গামছা, টুপি, লিফলেট। মঞ্চে নীল ব্যাকড্রপ। ‘স্বচ্ছতা মেলা—এক ছাতা তলে সেবা।’ মাইক্রোফোনে অল্প অল্প ফিডব্যাক। নির্মলবাবু উত্তেজনায় ছটফট করছেন। তিনি বললেন, ‘সব ঠিক তো?’
‘হ্যাঁ,’ বললাম।
‘তাহলে বারোটায়…’
‘বাজবে।’

এক কোণে একজন মানুষ বসে আছে। চোস্ত পাজামা, হাতে খয়েরি ফাইল। নাম সদরুদ্দিন। তিনি চোখের ওপর দিয়ে দেখছিলেন, যেন খড়ের গাদা থেকে আগুনের গন্ধ খুঁজছেন। কয়েক মিনিট পর তিনি আমার কাছে এসে বললেন, ‘আপনি ঘড়ির মিস্ত্রি?’
‘হ্যাঁ।’
‘চিঠি-টিঠি যদি পান কিছু, আমাকে দিবেন।’
আমি চমকালাম, ‘কেন?’
‘ঘড়িঘরে পুরোনো ডাকঘরের থলি ছিল। কিছু নথি খোঁজা হচ্ছে। তার মধ্যে যদি…’
কথা শেষ করলেন না। আমি মাথা নেড়ে বললাম, ‘আজকের অনুষ্ঠানটা হোক। পরে কথা বলব।’

নির্মলবাবুর ঘড়ি দেখার ভঙ্গিতে যেমন আনন্দ, তেমন ভয়ও আছে। ঘড়ি বাজলেই তিনি বোধহয় জীবনে কোনো একটা সিঁড়ি পার হবেন। প্যান্ডেলের শেষ সারিতে রিমি দাঁড়িয়ে লাইভ দিতে দিতে আমাকে থাম্বস-আপ দেখাল। আমার মনে হল বারোটা বাজলে এ শহরের কিছু হয়ত বাজবে। হৃদয়ের ভেতরে, কপালের ঘামে, অথবা চায়ের গ্লাসে টুংটাং শব্দে।

১১:৫৮। আমি টাওয়ারে উঠে গেলাম। শেষ মুহূর্তে একটা থ্রটল-পিন ঠিক করতে হল। পেন্ডুলাম এখন পুরো নাচছে, যেন পুরোনো কোন ব্যান্ডের ড্রামার রিহার্সাল দিচ্ছে।

১১:৫৯। নিচে ভিড় স্থির। মাইক্রোফোনে অতিথির কণ্ঠ, ‘গণমান্য অতিথিবৃন্দ…’

১২:০০। এস্কেপমেন্ট যখন ধাপে ধাপে তার নির্দিষ্ট দাঁতগুলো অতিক্রম করল, স্ট্রাইক ট্রেন চালু হলো। ঘণ্টা-হাত উঁচু হলো, আর—টাং!

ঘণ্টা বাজল। প্রথমে একটা দীর্ঘ, পিতল-দেহী সুর। তারপর কয়েক সেকেন্ড বিরতি, তারপর আবার—টাং! টাং! টাং! এভাবে বারোবার বাজবে। শব্দটা একবারে ওপরে ওঠে, তারপর ঝিল্লির মতো ছড়িয়ে পড়ে। কবুতরেরা ঢেউয়ের মতো উড়ল। প্যান্ডেলে শিশুদের চোখ একসঙ্গে গোল হল।

নিচে খেজুর। কুকুরটা ঘাড় তুলল, আবার মাথা নামিয়ে বসে থাকল। লাইব্রেরির দিকে তাকালাম। দরজা বন্ধ। একটা চেয়ারের ছায়া জানালার কাঁচে।

টাং!—দশম বার।
টাং!—একাদশ।
টাং!—দ্বাদশ।

আর, ঠিক সেই মুহূর্তে, আমার পকেটে থাকা খামটা যেন কেঁপে উঠল। আমি টাওয়ারের রেলিং আঁকড়ে দাঁড়ালাম। ভেতরে ভীষণ নীরবতা। বারোটার শব্দের পর শহর যেন চুপ করে গেল। একটি দুই সেকেন্ডের সাদা শূন্যতা। তারপর হাততালি। মাইক্রোফোনে ঘোষণা ‘স্বচ্ছতার জয়!’

আমি ধীরে ধীরে সিঁড়ি থেকে নেমে এলাম। চিঠি খোলার সময় হয়েছে।

১০

নিচে নামতেই আলতাফ ফিসফিস করে বলল, ‘লাইব্রেরিতে যান।’ কেন? বুঝলাম না। প্যান্ডেলের ফাঁক দিয়ে লাইব্রেরির দিকে দৌড়লাম। দরজা খোলা। ভেতরে শিরিন আপা। চেয়ারে বসা, চোখ বোজা। খেজুর তার পায়ের কাছে, নীরব। আমি কাছে যেতেই খেয়াল করলাম শিরিন আপার হাত শিরায় শিরায় স্থির। তার চোখের কোনায় অদ্ভুত নরম হাসি।
আমি ধীরে ধীরে হাত দিয়ে দেখলাম, তিনি চলে গেছেন!
খেজুর নিঃশব্দে আমার দিকে তাকাল। আমার বুকের ভেতর কোথাও একটা কাচ যেন ভেঙে গেল। ‘বারোটা’র ঘণ্টা তিনি শুনেছিলেন কি? উত্তর মনে হলো হ্যাঁ। তাঁর মুখে যে শান্তির রেখা, সেখানে একটি সুর যেন হালকা বসে আছে।

আমি চেয়ারটা একটু সোজা করে দিলাম। কেন জানি না শিরিন আপার আঙুলের ওপর খামের কাগজ ছোঁয়ালাম। ‘ঘণ্টা বাজার দিন খুলিবে’; আজ তো সেই দিন। আমার হাতে হঠাৎ কাঁপুনি। খামটা আলগা করলাম। ভেতরে দুটি কাগজ। একটাতে লাইব্রেরির পুরোনো ইনভেন্টরি। হারানো কিছু বইয়ের তালিকা। আরেকটায় হাতের লেখা—

‘প্রিয়তমা,
ঘণ্টা বাজলে বুঝবে আমি ফিরে এসেছি। যদি না ফিরি, তবে ঘণ্টা বাজাকে আমার ফিরে আসা ধরে নিও। বইগুলোর তালিকা রেখেছি। কার হাতে কোথায় গেছে জানি; কিন্তু ফিরিয়ে আনতে পারিনি। ক্ষমা কোরো।
— N.’

তালিকায় পাঁচটি বই। তার মধ্যে একটি ‘বাংলার লোকসঙ্গীত সংকলন, ১৯৭৮’, একটি ‘প্যারিসের চিঠি’, একটি ‘মানুষ ও সময়’, আর দুটি নাম অপরিষ্কার।
‘প্রিয়তমা’ কে? শিরিন আপা? N কে? নির্মল? নাকি…? চিঠির নিচে মলিন একটি তারিখ, পড়া যায় না।

আমি শিরিন আপার পাশে বসে কাগজ দুটো ধরলাম। বাইরে ‘স্বচ্ছতা’র ঘোষণায় সঙ্গে সঙ্গে হঠাৎ এক হুল্লোড়ময় গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ল। ভেতরে একটি শান্ত মৃত্যু। এই দৃশ্য বর্ণনায় চেখভ হয়তো এই মুহূর্তে একটা কাঁচ-গ্লাস আঁকতেন। গ্লাসে একটু পানি, তাতে একটি সাদা চুল ভাসছে।

খেজুর ধীরে ধীরে উঠে আমার পায়ের কাছে মাথা রাখল। আমি হাত রাখলাম তার মাথায়। সে চোখ বুজল। তার শ্বাসে একটা ছোট টিকটিক। যেন ঘড়ির এস্কেপমেন্ট ভাল ভাবেই চলছে।

১১

সন্ধ্যায় শহরে বৃষ্টি নামল। ঘোষণা, গান, ফিতেকাটা; সব শেষ। আমি টাওয়ারে গিয়ে ঘণ্টা-হাতটা একবার টানলাম। বাজল না। সময়ের নিয়ম; একদিনে এক আত্মা বাঁচে, আরেকদিনে একটা ঘণ্টা বাজে।

চায়ের দোকানে গেলে মায়া নরম স্বরে বললেন, ‘শিরিন?’ আমি মাথা নেড়ে বললাম, ‘নেই।’ রিমি এসে গলা নামিয়ে বলল, ‘আপনার কি কান্না পাচ্ছে, কাঁদবেন?’ আমি বললাম, ‘কাঁদবো না; আজ টিকটিক শব্দ শুনব।’ জসিম এককাপ চা দিল। বৃষ্টিতে দোকানের টিনে ঝংঝং শব্দ। কেউ হাসল না, কেউ নাটক করল না। শহর এমনই; দুঃখ হলে পা টিপে হাঁটে।

কিছুক্ষণ পর নির্মলবাবু এলেন। আমার হাতে কাগজ দেখে বললেন, ‘ওটা…’ । আমি বললাম, ‘লাইব্রেরির খাম।’
‘খুলেছেন?’
‘হ্যাঁ।’
‘কী আছে?’

আমি প্রায় বলতে গেলাম যে, শিরিন আপা, প্রিয়তমা, N। কিন্তু থেমে গেলাম। বললাম, ‘কিছু পুরোনো বইয়ের তালিকা। আর কিছু না।’ নির্মলবাবু মুখ নামালেন। বললেন, ‘এ শহরের বইগুলো ঘরে ফিরতে চায় না।’

মায়া কেটলি নামাতে নামাতে বললেন, ‘লক্ষ্মী ছেলেমেয়েরা নাকি বিয়ে করে বাইরে থাকে। বইগুলোও তাই। লোকের ঘরে গিয়ে চুপচাপ পড়ে থাকে।’

রিমি ফিসফিস করে বলল, ‘ঘণ্টা আর বই; আজ দুটোই বাজল।’ আমি তাকালাম। তার চোখে জলের মতো আলো। আমি কিছু বললাম না। চেখভ শিখিয়েছেন, ‘অতিরিক্ত আবেগকে সংযমে ঢেকে রাখলে তার গন্ধ প্রলম্বিত হয়।’

১২

রাতে ডাক-বিভাগের ঘরে ফিরলাম। হারমোনিয়ামটা টেনে নিলাম কাছে। আমি নোট তুলতে পারি না। তবু বেলোসে বাতাস ঢোকাতে ঢোকাতে মনে হলো, একটা সুর নিজের মতো করে বেরোবে। বেরোলও। একটা নির্দিষ্ট ‘পা’। হারমোনিয়ামের কাঠে কোথাও ‘N’ খোদাই করা ছিল কি? খুঁজে পেলাম না।

খামটা আবার পড়লাম। ‘প্রিয়তমা’। শিরিন আপা হয়তো হয়ে উঠেছিলেন এমন একজন, যার কাছে ফিরে আসার অঙ্গীকার দিয়েও কেউ আর ফিরতে পারেনি।

আমি চিঠিটার ভাঁজ করলাম। খেজুর জানালার ধারে শুয়ে। আমি বললাম, “তোর মালকিনকে আমরা ‘পৌঁছে’ দিয়েছি তো, খেজুর?”
সে মাথা তুলল না। শুধুই শ্বাস নিল।

ঘুমিয়ে পড়ার আগে মনে হল ঘড়িঘরের ঘণ্টা-হাতটা আজ আর বাজবে না। কাল ভোরে বাজবে কি? নাকি সত্যিকারের শেষ অঙ্ক তো আজই?

১৩

ভোরে টাওয়ারে উঠলাম। কবুতরগুলো শান্ত। গিয়ার-ট্রেন মসৃণ। বাইরে মেঘ-রোদ্দুর এক জলছবি।

ওখান থেকে নামতেই আমার সামনে দাঁড়ালেন সদরুদ্দিন; খয়েরি ফাইলের মানুষ। বললেন, ‘চিঠিটা…’
আমি বললাম, ‘ব্যক্তিগত।’ তিনি বললেন, ‘সরকারি।’
দু’চোখে কয়েক মুহূর্ত তাকালাম আমরা। তারপর চুপচাপ বললাম, ‘যদি সরকারি হতো, খামটার ওপরে গভর্নমেন্ট সিল থাকত।’ তিনি হাসলেন না। শুধু বললেন, ‘আপনি এ শহরে ক’দিন?’
বললাম, ‘যতদিন ঘড়ি টিকটিক করবে।’

তিনি চলে গেলেন। তার পায়ের শব্দে সিঁড়িতে কোনও শব্দ হলো না। মানুষ মাঝে মাঝে শূন্য পায়ে হাঁটে।

দশটার দিকে লাইব্রেরির দিকে গেলাম। দরজার পাশে ছোট ফুলদানি। শিরিন আপা ছিলেন বলেই হয়তো কেউ রেখে গেছে। রিমি একটা গাঁদা রাখল। আমি ভেতরে গিয়ে ওয়াল ক্লকটা থামিয়ে আবার চালু করলাম। দুপুরে ১২:০০-র দিকে সময় সেট করে দিলাম। মনে মনে বললাম, ‘ঘড়ি, তুমি বাজবে; কিন্তু আজ কোনো ঘোষণা নেই। বাজবে ভেতরে।’

১৪

দুপুরের একটু পর। শহর এখন শান্ত। চায়ের দোকান ফাঁকা। মায়া চুলায় পানি রেখেছেন। নির্মলবাবু পাশ দিয়ে যাচ্ছেন। আজ তার মুখে হাসি কম। তিনি থেমে বললেন, ‘ঘন্টা বাজবে কি?’
‘বাজবে,’ বললাম।
‘আজ কোনো মেলা নেই।’
‘ঘণ্টা কি শুধু মেলার?’
তিনি কিছু বললেন না। দড়াটানা মোড়ের দিকে হেঁটে গেলেন।

খেজুর এসে দোকানের সামনে বসল। আমি একটা শুকনো বিস্কুট ভেঙে তার সামনে রাখলাম। আজ সে খেয়ে ফেলল। মায়া বললেন, ‘শিরিন না থাকলে খেজুরও বদলায়।’ আমি বললাম, ‘বদলায় না; শুনতে শুরু করে।’

১৫

বিকেল। আদালতভবনের বারান্দায় বসে আছি। বৃষ্টির শেষ রেশ। টিপটিপ নয়, চাপা। রিমি পাশে বসে ফিসফিস করে বলল, ‘আপনি রাতেই চলে যাবেন?’
‘না,’ বললাম। ‘ঘড়ি চালু রাখা মানে আশেপাশে হাঁটা।’
‘আপনার ঘর?’
‘ঘর? টাওয়ার আমার ভরসা; লাইব্রেরি আমার অভ্যাস; চায়ের দোকানই আমার বাসস্থান।’
রিমি হাসল। ‘আপনি গল্প লেখেন?’
‘লিখি না।’
‘তবু আপনার চোখে যেন লেখা ছড়িয়ে আছে।’
আমি চুপ করে গেলাম। শহরের ওপর তখন কে যেন একখানা ধূসর কাপড় বিছিয়ে যাচ্ছে; কৌশলে, খুব ধীরে।

১৬

সন্ধ্যে নামার আগে আগে টাওয়ারে ওঠার অভ্যাস করেছি। আজও উঠলাম। গিয়ারের দাঁতে হাত রেখে দাঁড়াই। দাঁতগুলো শীতল, কিন্তু বিশ্বাসযোগ্য। পেন্ডুলাম পৃথিবীর হৃদস্পন্দন নকল করে। একা, ধারাবাহিকতায় ছেদ পড়ে না। হঠাৎ খেয়াল করলাম ঘড়ির পশ্চিমমুখে যে মিনিট কাঁটাটা কালও এক বিন্দু পিছিয়ে ছিল, আজ এক বিন্দু সামনে। আমি ক্ষুদ্র স্ক্রু একটু ঢিলে করে দিলাম। কাঁটা আবার ফিরে এল।

আমার মনে হল, মানুষও এমন। কখনও একটু পিছিয়ে রেখে তবেই ঠিক থাকা যায়। ঠিক থাকা মানে যে এগিয়ে থাকা, তা নয়।

নিচে নামতেই দেখি লাইব্রেরির দরজা আধখোলা। ভেতরে ঢুকে ওয়াল ক্লকটার দিকে তাকালাম। ১২:০০-তে নীরবে থেমে আছে। আমি কাঁটা ঠেলে এগোনো মাত্র টিক করে চলতে শুরু করল। গভীরে কোথাও যেন খামের কাগজের ছোঁয়া এখনও আঙুলে রয়ে গেছে। কালি শুকনো হলেও ভাষা ভেজা।

ঘর থেকে বেরোতেই খেজুর আমার পায়ের মুখ ঘষলো। আমি বললাম, ‘চল।’ আমরা দু’জনে হাঁটতে লাগলাম। আদালতের বারান্দা, চায়ের দোকানের টিনের ধার, স্টেশনের খালি বেঞ্চ, তারপর ফের লাইব্রেরির দিকে।

আমি জানতাম না চোখে জল আসবে কি না। এলোও না। শুধু দূরে ট্রেন ঢুকল। আলো জ্বলে উঠল। আর যশোর শহরটা নিশ্বাস নিল; দীর্ঘশ্বাস।

১৭

রাত। ডাক-বিভাগের ঘরের টেবিলে হারমোনিয়ামের বেলোসে বাতাস ঢোকাচ্ছি। বাইরে মৃদু বৃষ্টি। মাঝরাতে ঘড়িঘরের ঘণ্টা একবার স্বপ্নে বাজল। নির্বাক, অথচ শোনা যায়।

আমি উঠে বসে খামটা আবার খুলে চিঠিটা পড়লাম। ‘ঘণ্টা বাজলে…’; বাক্যটির ভেতর কেমন যেন ফেরার আকুতি।

আমি জানালার পাশে গিয়ে বললাম, ‘এখন তো বাজল। আপনি ফিরেছেন, N। দেখতে পাচ্ছেন না?’ বাইরে অন্ধকার যেন ফুঁপিয়ে হাসল। খেজুর সরে এসে আমার পায়ের কাছে বসল। আমি তার মাথায় হাত রাখলাম। সে চোখ বন্ধ করল।

ঘুমের ঠিক আগে একটি কথা আমার মনে এল। বাজতেই হয় এমন জিনিসগুলো একদিন না একদিন বাজে। বাজে না শুধু নিজের ভেতরের ঘণ্টা।

১৮

পরদিন সকাল। মায়া বললেন, ‘অরুণ দা, আজ ভাজা মুড়ি।’
আমি হাসলাম। নির্মলবাবু এসে বললেন, ‘আপনার টাকা?’
‘কীসের?’
‘ঘড়ির কাজের পারিশ্রমিক।’
আমি বললাম, ‘আমাকে ঘড়িতে বেঁধে দিন। যখন বাজবে, তখন মনে করবেন, আমি টাকা নিয়েছি।’
তিনি লজ্জা পেলেন। বললেন, ‘আপনার নামটা লিখে রাখি, ঘড়ির রেজিস্টারে?’
‘লিখবেন না,’ বলি আমি। ‘নাম লেখা থাকলে মানুষ ফিরে আসে না।’
রিমি বলল, ‘আপনি আবার আসবেন তো?’
‘যতদিন ঘণ্টা বাজবে।’
খেজুর তখন দরজায় বসে। তার চোখে জাহাজের বন্দরের মতো একটি স্থির জল; আছে আসা-যাওয়া, তবে নড়াচড়া কম।
আমি টাওয়ারে উঠলাম। গিয়ারের দাঁতগুলো স্পর্শ করে আবার নামলাম। লাইব্রেরিতে গিয়ে ওয়াল ক্লকটাকে একটু দ্রুত করলাম। এখন সময় আমাদের সঙ্গে হাঁটবে।

শিরিন আপার চেয়ারের হাতলে হাত রাখলাম। ঠান্ডা কাঠেও যেন একটি উষ্ণতা থেকে যায়। এটা অবশ্য বিজ্ঞানের বইয়ে নেই। বাইরে বৃষ্টি তখন থেমেছে। দুপুর বারোটা বাজতে এখনও অনেক বাকি। তবু আমি কল্পনায় শুনলাম একটা ক্ষীণ টাং।

১৯

দুপুরের আগে শহরের মোড়ে একটি পতাকা উঠল। কোনো দলের নয়, স্রেফ শহরের। বাচ্চারা দৌড়াচ্ছে। আলতাফ আমাকে হাত নেড়ে ডাকল, ‘দাদা, খেজুরটারে একটা নাম দিবেন?’
‘খেজুরই তো ওর নাম।’
‘আরেকটা নাম দেন,’ বলল সে। ‘যে নামে বুঝা যায় আধা কুকুর, আধা বই।’

আমি হেসে দিলাম। শহরে ভালো হাসি যখন জন্মায়, তখন বৃষ্টি নেমে আসে। যদিও এখন নামেনি।

সদরুদ্দিন আবার এলেন। বললেন, ‘চিঠিটা দিলে ভালো হয়। আর্কাইভে রাখব।’
আমি বললাম, ‘চিঠি আর্কাইভে থাকলে মরবে। শিরিন আপার টেবিলের ড্রয়ারে রেখে দিচ্ছি। আপনি চাইলে এসে দেখতে পারেন।’
তিনি চোখ সরু করলেন। তার মধ্যে কোনো রাগ নেই, কিন্তু খুশিও নেই। চলে গেলেন। আমি ড্রয়ার খুলে চিঠিটা রেখেই তালা দিলাম। বাইরে খেজুর তখন দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

২০

বিকেল নামল ধীরে ধীরে। আমি আবার টাওয়ারে গেলাম। এখন বারোটা নয়, ছ’টা বাজতে চলেছে। প্যান্ডেল নেই, ঘোষণাও নেই। তবু শহর ছ’টায় বাড়ি ফেরে।

টাং! টাং! টাং! টাং! টাং! টাং!

ছ’বার ঘণ্টা বাজল। দূরে পাখির ডাক। রিমি বাসায় ফিরছে। তার শাড়ির আঁচল নড়ছে। নির্মলবাবু রেজিস্টার বন্ধ করছেন; শব্দে একটি ক্লান্তি। মায়া চুলায় আলুর তরকারি চড়িয়ে দিলেন। খেজুর তার জায়গায় বসে আছে।

সেদিন সন্ধ্যায় শহরের ওপর আলো নামল। বাল্বের নয়, বৃষ্টির পরে যে আকাশ তার। আমি ডাক-বিভাগের ঘরে ফিরে হারমোনিয়ামের বেলোসে হাত দিলাম। একটি ‘সা’ মাঝখানে আটকে রইল, যেন কাউকে ডাকছে, কাউকে বসাচ্ছে।
চিঠির বাক্য, ‘ঘণ্টা বাজলে বুঝবে, আমি ফিরে এসেছি’। এই কথাটাই যেন আজ শহরের গায়ে ছাপ রেখে গেল। কে ফিরল? হয়তো কেউ নয়; হয়তো আমরা, নিজেদের কাছে।

২১

শেষ রাতে আমি জানালার কাছে দাঁড়িয়ে খেজুরের দিকে তাকালাম। সে তখন ঘুমাচ্ছে। দূরে ছোট একটা তারার মতো আলো; স্টেশন। ট্রেনের হুইসেলটা যেন দূর থেকে নরম কুয়াশার ভেতর ভেসে এলো। চোখে জল এলো না, তবু গলার ভেতরটা যেন হঠাৎ শক্ত হয়ে গেল।

আমি ভাবলাম, চেখভ হলে এখানে কী লিখতেন? হয়তো লিখতেন, ‘আকাশে তারা ছিল না; তবু লোকজন মাথা উঁচু করে হাঁটছিল।’ অথবা ‘কেউ ঘড়ি দেখল না; তবু সময় ঠিক ছিল।’

আমি কিছুই লিখলাম না। শুধু ঘুমাতে গেলাম। ঘুমের ভেতর ছোট ছোট টিকটিক শব্দ। এর মধ্যে একটা কাঁটা নিজের মুখের ভেতরের ঘণ্টা ছুঁয়ে গেল।

পরদিন আমি কারো কাছ থেকে বিদায় নিলাম না। আদালতভবনের বারান্দা মাড়িয়ে চায়ের দোকানে গিয়ে চিনি ছাড়া চা খেলাম। রিমিকে বললাম, ‘টিকটককে আজ ছুটি দিন।’ নির্মলবাবুকে বললাম, ‘রেজিস্টারের কালি বদলান।’ মায়াকে বললাম, ‘খেজুরকে দুটি নামই দিয়ে ফেলুন।’

টাওয়ারে দাঁড়িয়ে পেন্ডুলামের ওপর হাত রাখলাম। লোহা ঠান্ডা, কিন্তু তাতে লুকিয়ে ছিল অদ্ভুত এক উষ্ণতা। যেন জীবন নিজেই বলছে, সব বিপরীত মিলেই সম্পূর্ণতা।

নিচে নামতেই খেজুর লেজ নেড়ে কাছে এলো। আমি তার মাথায় হাত বুলিয়ে বললাম, ‘চলো। সময় হয়েছে হাঁটার।’

এ শহরে কোনো ঘটনা এমনি এমনি ঘটে না। প্রতিটি যেন বেঁচে থাকার শব্দ। ঘড়িতে বাজে বারোটা, ছ’টা। কেউ কেবল সময় দেখে যায়, কেউ আবার নিজে হারিয়ে যায় মুহূর্তের মধ্যে। কিন্তু শহরটা থামে না, নিজের জীবন যেন চালিয়ে যায়।

শিরিন আপা নেই। তবু লাইব্রেরির ঘড়ি টিকটিক করে। খেজুর কারও নাম ধরে ডাকে না, তবু সব নাম শোনে। আর আমার পকেটে এখন কোনো চিঠি নেই কেবল একটি ছোট পেন্সিল নীরবে, ভাঙা মেরুদণ্ডেও সোজা দাঁড়িয়ে আছে। আমি হেঁটে চললাম। টাউন হলের সামনে দিয়ে ডিসি’র বাংলো হয়ে সোজা স্টেশনের দিকে।

বৃষ্টির পরে বাতাস গায়ে হালকা চিনির মতো লাগে। আর দূরে টাওয়ার ঘড়ি নরম হয়ে নিয়মিত বাজে। কিছু জিনিস বাজতেই হয়। কিছু জিনিস বাজলে চুপ থাকা ভালো। আর কিছু জিনিস, যেমন নিজের ভেতরের ঘণ্টা, সেটা বাজলেই তবে না আমরা মানুষ হই।

আশানুর রহমান

পেশায় ব্যাংকার আশানুর রহমান ছাত্র জীবনে পরিবর্তনবাদী রাজনীতির সাথে যুক্ত ছিলেন। তার একমাত্র উপন্যাস "লেনিন" পাঠকমহলে ব্যাপক সাড়া ফেলে এবং এ উপন্যাসের জন্য তিনি আন্তর্জাতিক ক্রিয়েটিভ আর্টস অ্যাওয়ার্ডে ভূষিত হয়েছেন। এছাড়া প্রকাশিত হয়েছে তার গল্পগ্রন্থ "ভোর ও বারুদের গল্প" এবং এক মলাটে দুটি নভেলা "প্রথম প্রেম ও ছায়ার আঙিনা"। তিনি লেখালেখির উঠানের সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ভাষা
Scroll to Top