Home » ‘টিয়াদুর’ উপন্যাসের উৎস অধ্যায়: তরুমা চি // ইচক দুয়েন্দে

‘টিয়াদুর’ উপন্যাসের উৎস অধ্যায়: তরুমা চি // ইচক দুয়েন্দে

আনন্দ। তাহ্তি দুর্দিক আসার পর থেকে ঝিমকাননে বৃষ্টি ঝরছে তো ঝরছেই। দুর্দিকচিরমা আড্ডায় মশগুল। ‘ঈল্লিচিল্লি চৌদ্দভুজ’ বহুকাল পর আনন্দে নাচে।

তারপর সেই দিনটিতে রোদ ওঠে। এমনই পাগলপারা রোদ যে ঘরকে বাহির ডেকে নেয়। চিরমাদুর্দিক বাগানে যায়। যেদিকে তাকাও বৃষ্টিভেজা সবুজ। কচি কলাপাতা থেকে গাঢ় সবুজ। সবুজে ঢাকা সবকিছু। বড়বড় গাছ। ঝোপঝাড়। মাটি নরম। কোথাও কাদা। মাথা ঠুকে যাচ্ছে থোকাথোকা সবুজ আমের সাথে। ঘাস খাচ্ছে দুটি দুধ-আলতা-রঙা গরু। গায়ে গোলাপি আভা ছড়ানো একটা বাছুর তাদের সাথে ঘুরছে। দুর্দিক মুহূর্তের আবেগে বাছুরকে আদর করতে গেলে, সে দৌড়ে পালিয়ে যায়।

চিরমা চি বাগানের গাছপালার একটার পর একটা নাম বলে যায়। দুর্দিক শোনে বা শোনে না। সে ঠিক করতে পারে না, বাগান দেখবে না চিরমাকে দেখবে। এর মধ্যে যখন ওরা একটা আতা গাছের নীচ দিয়ে যাচ্ছে দুটো তোতাপাখি ডেকে ওঠে ‘চিরমাদুর্দিক’। তারপর ময়না টিয়ে যে পাখির সাথে দেখা হয়, তারা ওদের নাম ধরে ডাকে। দুর্দিক পুরোপুরি মুগ্ধ। বাগান ঘেরা ‘ঈল্লিচিল্লি চৌদ্দভুজে’ ওর চিরকাল থেকে যেতে ইচ্ছে করে।

ওরা বাগানের নির্জন কোণে কুয়ার কাছে যায়। ছোট্ট গোল কুয়া। বেতে বোনা ঢাকনা তোলে চিরমা। কুয়ার জলে নিজেদের ছবি দেখে ওরা অবাক। চিরমা বলে, চলো দুজনে ঝাঁপ দেই। এই কুয়া চলে গেছে পাতালে। পাতালপুরি খুব সুন্দর। সেখানে মাথা ঠাণ্ডা থাকে। তুমি না এলে আমি একাই পাতালপুরি চলে যেতাম।’

চিরমা’র কথার হালকা প্রতিধ্বনি ভেসে আসে কুয়ার ভেতর থেকে। বর্ষায় কুয়ার পানি অনেক ওপরে উঠে এসেছে। তাই প্রতিধ্বনি হয় আস্তে। ঐটুকুতেই দুর্দিকের গা ছমছম করে। চিরমা বলে, ‘কব্বে চলে যেতাম পাতালপুরি। কিন্তু এই মা-কে নিয়ে আর পারি না। কাঁদবে। থাক্ চলো যাই তুমিআমি সতের্বাঠার পরীর মেলায়। খুব মজা। আমি রাস্তা চিনি। কোনো ভয় নেই। তোমাকে পিঠেও নিতে পারি।’

ওরা ঘরে ফিরলে তরুমা ওদের ঘোল খাওয়ান। এই ঘোল খেলে ওদের ছটফট ভাব কেটে যাবে। বাইরে যেতে ইচ্ছে করবে না। ঘোল খেয়ে দুর্দিক কল্পনাতীত আনন্দ পায়। ঘোলে গোলাপের মনমাতানো সুবাস! ঘোলের কাঁচের গ্লাসের গা ঘেমে ফুটে উঠেছে বরফগলা পানির ফোঁটা। গ্লাসের মুখ মাখনবৎ দইয়ের পুরু সরে ঢাকা। বরফকুচি এবং বাদাম ও কিচমিচের গুঁড়ো ছিটনো। প্রথম তিন চুমুকে মেলে বাতাবি লেবুর স্বাদ ও সুবাস। পরের তিন চুমুকে আমড়ার স্বাদ। তার পরের তিন চুমুকে আতা। আতা এত সুস্বাদু হয়? তারপর লিচু ও আমের স্বাদ। সবচেয়ে জাম। গ্লাস বিশাল। এক গ্লাস খেয়েই দুর্দিক তৃপ্ত। চিরমা খায় আধ গ্লাস।

সবশেষে তরুমা করলা স্বাদের ঘোল খাওয়াতে চান দুর্দিককে। মর্মান্তিক তেতো হবে ভেবে দুর্দিক আঁতকে উঠে ক্ষমা চায়। পুচকে পাত্রে করে সেই ঘোল তরুমা ও চিরমা মজা করে খায়। তাই না দেখে সেই ঘোল দুর্দিকেরও খেতে ইচ্ছে করে। ততক্ষণে শেষ।

দুর্দিক বলে, ‘আমার মনে হচ্ছে আমি ও চিরমা প্রজাপতি হয়ে গেছি। মেঘের মধ্যে ঘুমাচ্ছি।’ চিরমা বলে, ‘আমি ও দুর্দিক কাঠবেড়ালি হয়ে গেছি।

বাগানের গাছেগাছে ছুটোছুটি করছি।’

তবুমা চি মুগ্ধ চোখে তাঁর সখী সুশম্পা শরতি’র ছেলে তাহ্তি দুর্দিককে দেখেন। দুর্দিক ও চিরমাকে পাশাপাশি দেখে তাঁর আশ মেটে না।

তরুমা বলেন, ‘আমার মনে হচ্ছে, আমি দুটো ডিম পেড়েছি। একটির ভেতর চিরমা। আরেকটির ভেতর তুমি। বাসা বানালাম। ডিম দুটো রেখে তা দিচ্ছি। অপেক্ষা করছি কখন তোমরা ডিম ফেটে বের হবে।

একটু পর তরুমা’র দেয়া উপহার সব পোশাক, জুতো পরে দুর্দিক আসে। পাশে চিরমা। চোখধাঁধানো সৌন্দর্য। দুর্দিক বলে, ‘খালা, চিরমাকে নিয়ে সতের্বাঠার পরীর মেলায় বেড়াতে চললাম। যাব আর আসব।’

তবুমা চি বলেন, ‘যাও বাবা। তাড়াতাড়ি ফের।’

তরুমা চি একটু পর মৃদু ছদ্মবেশ নিয়ে দুর্দিক ও চিরমা’র পেছনপেছন চলেন। পুরোটা পথ ওদেরকে ঠিকঠাক অনুসরণ করে একটু আগে ওদের হারিয়ে ফেলে এখন তরুমা চি কিংকর্তব্যবিমূঢ়।

সংবিৎ ফেরার পর তরুমা চি আবিষ্কার করেন তিনি বোবাডোম বৃক্ষমালার গহীনে নরম ঝরাপাতার শয্যায় শুয়ে আছেন। চারদিকে যাদুআলোঅন্ধকার।

মাটিতে পড়ে আছে একটিদটি তরতাজা বোবাডোম পাতা। মহাকায় পাতার সূর্যমুখী পিঠ এমনি ঝকমকে যে তুমি সেখানে তোমার সবচেয়ে সুন্দর চেহারাটি দেখতে পাবে। তরম্য যেই না অমন একটি পাতায় চোখ মেলেছেন ওমনি পাতাটা যেন তাকে চুম্বকের মতো টেনে নেয়। তিনি একদৃষ্টে আপনার দিকে তাকিয়ে থাকেন। ফিসফিস উচ্চারণ করেন, ‘আমি এত্ত সুন্দর।’ আপনাতে মুগ্ধ তরুমা’র ইচ্ছে করে সেখানে শুয়ে থাকতে অনন্তকাল। বৃক্ষমালার উজ্জ্বল বেগুনি ডালপালায় ঝুলে আছে অজস্র টিয়াদুর। তাদের ধূসর গোটানো পাখনার আড়ালে সবুজ পেটপিঠ ও লাল ঠোঁঠের আভাস তিনি আনমনে দেখেন।

তাঁর পুরো জীবনটা কেটেছে মানুষের মুখে তাঁর সৌন্দর্যের অকৃপণ প্রশংসা শুনে। যারা তাঁর সৌন্দর্যের প্রশংসা করেছে তাঁদেরকে তাঁর ঈর্ষা হয়েছে। ওরা তাঁর সৌন্দর্য পান করছে অথচ তিনি তাঁর পুরো সৌন্দর্য ভাল করে দেখতেই পেলেন না। আজ সেই বাসনা হল পূর্ণ।

ঘরসর শব্দে তাঁর ভাবনা ভাঙে। একটা মহাকায় বোবাডোম পাতা বৃক্ষ থেকে পড়ে ছুটে আসছে তাঁর দিকে। দুহাত বাড়িয়ে বেশ একটা লাগবে অনুভব করে পাতাটা কাছে আসতেই খপ করে ধরে ফেলেন তরুমা। বাহ্ বেশ তো। একদম নরম। হাতে একটুও লাগে না। পাতার সবুজ রঙা পিঠ মাটিতে পেড়ে, কমলা রঙা পিঠে বসে তিনি তাকান পাতার ডগার দিকে। দৃষ্টি দেন পাতার বোঁটার কাছের এক ছোট্ট বিশেষ অংশে। ডিম্বাকৃতি জায়গাটা বিশেষ প্রকৃতির। তুমি তাকিয়ে সেখানে যা ইচ্ছে কল্পনা কর। দেখতে পাবে।

তরুমা চি সাঁতরে পুকুরে যান। তোলেন পদ্মফুল।

তরুমা রক্তজবার কাছে গিয়ে ফুল চান। রক্তজবা বলে, ‘বাড়ি গিয়ে আগে আমায় ফোটাও।’

কেউ ফেরায়, কেউ দেয়, এমনি করে হয় চিরমা’র বিয়ের আয়োজন। তারপর তরুমা মনের আনন্দে গান নাচ কাব্য যা ইচ্ছে করে চলেন সেই মায়াবি পুলকের জগতে। তাঁর উদ্দীপনা ক্রমে বাড়ে।

চিরিটাৎ।

চিরিটাৎ।

চিরিটাৎ।

কোথা থেকে ঐ ধ্বনি আসছে? এদিক ওদিক তাকিয়ে উৎস সন্ধান করেন তরুমা।

চিরিটাৎ।

চিরিটাৎ।

চিরিটাৎ ধ্বনি চলতে থাকে।

সরব হয়ে ওঠে অজস্র টিয়াদুর। টুই টুই ডাকে।

উজ্জ্বল বেগুনি ডালপালা হতে তারা ডিগবাজি দিয়ে নেমে উড়তে থাকে। মহাকায় বোবাডোম পাতায় ছাওয়া আকাশ ফুঁড়ে ওরা বেরুতে পারে না। ওরা একদেড় মানুষ ওপর দিয়ে উড়ে কোথায় যেন চলে যেতে থাকে।

তাদের ধূসর পাখনা থেকে ছড়ানো অন্ধকার চলে যেতে থাকে। ওরা হারিয়ে যাচ্ছে। ওদের গতি ধীর। গম্ভীর। চিন্তাশীল ওরা। তবুমা ওদের অনুসরণ করেন মসৃণ উজ্জ্বল কমলা রঙের কাণ্ডগুলির মধ্য দিয়ে পথ বের করে। কমলা রঙের মাটির ওপর দিয়ে।

তরুমা বোবাডোম বৃক্ষমালায় পথ হারানোর পর থেকে কিছু শরীরী ও অশরীরী প্রাণী তাঁর আকর্ষণে ঘোরে। এছাড়া ঘিয়ে-রঙা তবন ও ধূসর-রঙা কোট পরা একটি মানুষও ফেউ হয়ে লেগে আছে তার পেছনে। হঠাৎ সেই মানুষটি ছুটে যায় তরুমা’র পাশ দিয়ে চিৎকার করে, ‘পরীর মেলায় এটম বোমা পড়েছে। বাঁচতে হলে আমার পেছনপেছন ছুটুন।’

মেলায় এটম বোমা পড়ার সংবাদ শোনার সাথেসাথে তরুমা’র পৃথিবী অন্ধকার হয়ে যায়। তিনি কয়লা হয়ে পড়ে থাকতে দেখেন চিরমা, ও দুর্দিকের দেহ। শুধু ওদের চোখ দুটি হীরার মতো জ্বলছে। তরুমা চি একটি ভীষণ মর্মান্তিক ‘চিরিটাৎ’ ধ্বনি শোনেন। তারপর বিবশ করা গন্ধে, ক্লান্তিতে, বিহ্বল হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন।

এডমিন

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ভাষা
Scroll to Top