০১.
আমার পরিবার আমাকে নিয়ে বেশ বিপাকে আছে। বিশেষ করে আমার স্ত্রী-সন্তানরা। মানুষের স্বামীর কত পরিচয় থাকে। ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, অধ্যাপক, আমলা, ব্যবসায়ী কত কী! সন্তানরাও বুক ফোলায় বাবার গর্বে। অথচ আমার পরিবারের হয়েছে জ্বালা। কোনো কারণে স্বামী কিংবা বাবার পরিচয় দিতে গেলেই রাজ্যের বিষাদ এসে ভর করে চোখেমুখে। তাদেরই বা কী দোষ? কী পরিচয় দেবে আমার? এই পরিচয় কি দেওয়ার মতো? একজন রিকশাচালক পরিচয়টিও মুখে তোলা যায় নির্দ্বিধায়। কিন্তু স্বামী একজন উঁচুজাতের সারমেয় বা বাবা একজন দক্ষ বুলডগ-এ কথা বলতে যে কারোই মুখে বাঁধে।
আমরাও যে উপায় আছে তাতো নয়। জীবনে তো আর কিছু হতে চাইনি। আবার সারমেয়ই যে হতে চেয়েছিলাম তা-ও তো নয়। পূর্বজদের এই রূপান্তর দেখে সতর্ক ছিলাম পায়ে পায়ে। অথচ এসবই ছিল বৃথা চেষ্টা। অজান্তেই মানুষ থেকে হয়ে উঠলাম গাবদাগোবদা একটা সারমেয়। কত কিছুই তো মানুষের অজান্তে হয়! যখন দেখলাম যে, আশপাশের উঁচুজাতের সারমেয়রা মাথায় হাত বুলিয়ে বলছে, ‘নেড়িকুত্তা থেকে এত অল্প সময়ে বুলডগ হয়ে ওঠা চাট্টিখানি কথা নয়। পরিশ্রম, একনিষ্ঠতা, আনুগত্য বজায় থাকলে একজন নামকরা অ্যালসেশিয়ান হতে পারবে।’ তখন আনন্দে উদ্বেলিত মন। ভেতর থেকে স্বগতোক্তির মতো বেরিয়ে আসে ‘ঘৌ’। সেই থেকে বুঝলাম, আমি এখন জাতের সারমেয় হয়ে উঠেছি।
তবে এনিয়ে সিনিয়র গ্রে হাউন্ডদের বেশুমার ঈর্ষা। একজন গ্রে হাউন্ড হয়ে উঠতে তাদের যে কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে, সে তুলনায় আমি খুব কম সময়েই নজরে এসেছি অ্যালসেশিয়ান তুল্য কর্তাদের। ঈর্ষার জন্য এটি যথেষ্ট কারণই বটে।
একবার একজন বিশিষ্টজন আলাপের এক পর্যায়ে বলেছিলেন, ‘একবার খোঁজ নিয়ে দেখুন, গত দেড় দশকে অ্যালসেশিয়ান আমদানীর কী হাল। অনেক কমেছে। যখন থেকে আপনারা নিজেরা দায়িত্ব নিলেন, তখন থেকে এই খাতে আমদানী ব্যয় কমেছে। একটু খাটলে ভালো একটা রিপোর্ট হবে। লিখতে পারলে বাহবা পাবেন।’ আমি তখন নেড়ি থেকে খেঁকি হয়ে উঠছি কেবল। যে কারণে অর্থ ধরতে পারিনি তার কথার। আজ ঠিক পারছি।
সারমেয় হয়ে ওঠার এই মহান পেশায় আমি নিজে থেকেই এসেছি। কৈশোর থেকেই অগ্রজদের দেখে লোভ হতো। তাদের সে কী তেঁজ! লোকে কত সমীহ করে! তারপর ওই বাক্যটি যখন রপ্ত হলো, ‘অসির চেয়ে মসি বড়।’ সেই থেকে মসি নিয়েই আছি। মসি পিষতে পিষতে আজকের থেবড়ানো মুখের বুলডগ।
অকৃতদার জার্মান দার্শনিক আর্থার শোপেনহাওয়ারের সঙ্গী ছিল কুকুর। জেঁদ হলে ওকে নাকি ‘মানুষ’ বলে গালি দিতেন। পৌরাণিক কাহিনি ঘাটলেও নিজেকে নিয়ে খেদ খুব একটা হয় না। সেই যে দেবরাজ ইন্দ্রের প্রহরী ছিল কুকুর। দেবকুকুরী সারমার দুই ছেলে সারমেয়। দুজনই ছিল যমের প্রহরী। চারটি করে চোখ ছিল তাদের। ঋগে¦দ খুললে জানা যায়, মিথ্যাবাদী, হিংসুক ও অত্যাচারী পণি জাতি একবার ইন্দ্রের গাভি চুরি করেছিল। খুঁজে খুঁজে হন্যে হলেও যখন তার সন্ধান মিলছিল না, তখন দায়িত্ব পড়ে সারমার ওপর। সে ঠিকই দেবরাজের গাভির সন্ধান এনেছিল।
আবার মহাভারতে যুধিষ্ঠির ভক্ত কুকুর। যাকে ছাড়া সে স্বর্গে যাবে না বলে গো ধরেছিল। পরে দেখা গেল, কুকুর বেশ ধরে তার সঙ্গে ছিলেন ধর্মদেবতা। ভক্তের প্রতি তার ভালোবাসা দেখে, ধর্মদেবতা বেড়িয়ে এলেন কুকুরের রূপ ছেড়ে। বললেন, যুধিষ্ঠির তোমার সমান স্বর্গে দ্বিতীয় কেউ নেই। আবার গুহায় আশ্রয় নেওয়া সেই আসহাবে কাহাফের কুকুর। যে বেহেশতে যাবে বলা আছে। তারমানে যুগ যুগ ধরে সারমেয়দের একটা সম্মানের স্থানও আছে বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থে।
মানুষ থেকে রূপান্তরিত এই আমরা সারমেয় শ্রেণি পরকালে স্বর্গ কিংবা বেহেশতের দেখা পাবো কিনা, তা যদিও নিশ্চিত নয়। সন্দেহ আছে এই কারণে যে, প্রকৃত সারমেয়দের সাথে আমাদের শারীরিক একটা বড় তফাত দৃশ্যমান। তাদের লেজ আছে। আমাদের নেই। ছোট হলেও যদি একটা থাকতো তবে হাশরের মাঠে তাদের দলে দাঁড়িয়ে কিছু একটা বন্দোবস্ত করা যেত হয়তো। শুনেছি, তাদেরও পুনরুত্থান হবে। স্বজাতির মধ্যে ইহকালের ন্যায়-অন্যায়ের সুরাহাও হবে সেদিন।
প্রভুর প্রতি আনুগত্য দেখাতে পারলে এই ইহকালে কিছুটা হলেও স্বর্গের স্বাদ পাওয়া সম্ভব বটে। সিনিয়র অ্যালসেশিয়ানদের জীবনের দিকে তাকালে তা বোঝা যায়। নেড়ি আর খেঁকি স্তরে ঘুরপাক খেলে তা দূর অস্ত।
০২.
বউ ইদানীং আমার সঙ্গে এক বিছানায় শুতে আপত্তি করছে। তার অভিযোগ আমার শরীর থেকে এক ধরনের বোটকা গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে চারপাশে। সেই গন্ধ মেখে যাচ্ছে বিছানার চাদরে, বালিশে, কম্ফোটারেও। আমার নিঃশ্বাস থেকেও নাকি গন্ধটা গণশৌচাগারের ফাঁকফোকর গলে ভুরভুরে বেরিয়ে আসছে আঁরশোলার মতো। নাক ডাকার অভ্যাস আমার। গভীর তন্দ্রায় গেলে সেই আওয়াজ নাকি পাড়ার মোড়ে ছাল থেকে পশম খসা বেওয়ারিশ খেঁকিটার আর্তনাদের মতো শোনায়। সন্তানরাও বাবার কাছে আসে না খুব একটা। দূরত্ব বজায় রাখে যতটা সম্ভব। তাদেরও অভিযোগ, বাবা কথার ফাঁকে হঠাৎ হঠাৎ ‘ঘৌ’ করে ওঠে। যা শুনলে তাদের ভয় হয়। প্রথম প্রথম বিশ্বাস হতো না। পরে যখন গোপনে আমার ভয়েস রেকর্ড করে ওরা শোনালো, তখন লজ্জায় লাল হয়ে উঠলো কান দুটো। একটা-দুটো বাক্য পর পর ‘ঘৌ’ শব্দটা বেরিয়ে আসছে মুখ থেকে। অথচ শব্দটির ওপর নিজের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই!
আরেকদিনের ঘটনা। টয়লেটে ঢুকেছি। তাড়াহুড়োয় ভুলে গেছি লক করতে। হঠাৎ দরজা ঠেলে তারস্বরে চেঁচিয়ে উঠল বউ। ‘ছি! ছি! একি করছো তুমি? সত্যি সত্যি কুকুর হয়ে গেলে নাকি?’
হকচকিয়ে তাকালাম নিজের দিকে। বাঁ পা’টা তখনো হাই কমোডের ওপর উঁচু হয়ে শূন্যে ঝুলছে।
ওর চিৎকারে আশেপাশে কাক না থাকায় মুখ এঁটে গেল মূত্রনালীর। ভাগ্যিস ছেলে-মেয়েরা স্কুলে ছিল। তা না হলে কী কেলেঙ্কারি অপেক্ষা করছিল কে জানে!
‘ভুলেও আর এ মুখো হবে না বলে দিচ্ছি।’ বউয়ের কণ্ঠ পুড়ছে দাবানলে। ‘এখন থেকে সার্ভেন্ট টয়লেটে যাবে।’
দিন যত যাচ্ছে সারমেয়র সব ধরনের বৈশিষ্ট্য স্পষ্ট হচ্ছে আমার চলনেবলনে। বউ, ছেলেমেয়েরা তিতিবিরক্ত। এভাবে একটা কুকুরের সঙ্গে একই ছাদের নিচে, একই বিছানায় বসবাস বেশ পীড়াদায়ক হয়ে উঠেছে তাদের জন্য। বলা নেই, কওয়া নেই একদিন বউ গলা চড়াল সপ্তমে। ‘তুমি ডাক্তার দেখাবে, না আমরা এই বাড়ি ছেড়ে চলে যাবো? আর তো পারছি না।’
আমি তখন পড়ার ঘরে। বনফুলের শ্রেষ্ঠ গল্পের বই হাতে। মুখ তুলে বললাম, ‘ডাক্তার তো দেখিয়েছি। কোনো রোগ তো খুঁজে পাচ্ছে না।’
‘বললেই হলো কোনো রোগ পাচ্ছে না?’ বউয়ের পাল্টা জবাব। ‘একটা জলজ্যান্ত মানুষের চালচলন কুকুরের মতো হয়ে গেছে। এটা কোনো রোগ নয়? ডাক্তার বদলাও।’
‘আচ্ছা দেখব।’
‘দেখব না, কালই যাও।’ ওর কণ্ঠে হুকুম। ‘আর যে কদিন রোগ না সাড়ছে এ ঘরেই তক্তপোশ বিছিয়ে নাও। খাবার খেতেও টেবিলে আসার দরকার নেই। যেভাবে লালা ঝরে তোমার গাল বেয়ে, বাচ্চাদের বমি পায়।’
ঘরে এত সমস্যার ভেতর দিয়ে যেতে হচ্ছে, অথচ বাইরে দিব্যি ঘুরে বেড়াচ্ছি। কোনো সমস্যা নেই। বাইরে কে কাকে এত খেয়াল করে নিবিড়ভাবে? রমনী হলে অবশ্য ভিন্ন কথা। গেল ছমাসে দুটো পদোন্নতিতে সহকর্মীদের চক্ষুশূল হলেও কর্তা সারমেয়দের আনুকূল্যের ছাতা আমার মাথার ওপর। মালিকপক্ষের কয়েকটা অ্যাসাইনমেন্ট ঠিকঠাক শেষ করায় তারা বেশ খুশি। কাজগুলো সহজ ছিল না যদিও। মার্ডার কেস। মাস দুয়েক আগে একটা মেয়ের ডেডবডি পাওয়া গেল উপরওয়ালার একটি ফ্ল্যাটে। বেশ বেকায়দা। সারা দেশের চোখ সেদিকে। যে করেই হোক খুনির বিচারের দাবি উঠেছে চারদিকে। অভিযোগের তীর আমাদের উপরওয়ালার দিকে। অফিসের বড় চশমিস অ্যালসেশিয়ান কর্তা ডেকে পাঠালেন তার কামড়ায়। বললেন, ‘মাসুদ, বড় সাহেব তোমার ওপর আস্থা রাখতে চান। যা যা করা প্রয়োজন করতে হবে ভাই।’
কী করতে হবে। বুঝিয়ে দিলেন তাও। মসির কৌশলী ব্যবহার আর দৌড়ঝাপে সপ্তাহখানেকের মধ্যে ঘটনার মোড় গেল ঘুরে। উপরওয়ালার ওপর থেকে সন্দেহের তীর গেল সরে। সেই তীর গিয়ে যার গাঁয়ে বিঁধল সে উপরওয়ালার দীর্ঘদিনের পথের কাঁটা। এক ঢিলে দুই পাখি বদ করার উপঢৌকন হিসেবে আমি পেলাম দ্বিতীয় পদোন্নতি। মাসকাবারি মাইনের স্বাস্থ্য বাড়ল। একটা চার চাকার যানও জুটে গেল সহজেই। মুখ থোবড়ানো বুলডগ হলেও অফিসে আমাকে দেখে নেড়ি, খেঁকিদের মতো গ্রে হাউন্ড, ডালমেশিয়ানরাও ভয়ে থাকে বেশ।
০৩.
আমার সাথে শুতে, খেতে আপত্তি থাকলেও আমার চার চাকার বাহন প্রাপ্তিতে বেশি খুশি হলো আমার বউ, ছেলেমেয়েরা। ‘যাক শপিংয়ে যাওয়ার ঝক্কি কমলো। পাবলিক বাসে বাদুর ঝোলা হতে হবে না অন্তত।’ স্ত্রীর চোখমুখ চকচক করে উঠল কিছু সময়ের জন্য।
‘কী মজা! কী মজা! আমরা গাড়িতে করে স্কুলে যাবো।’
ঘরময় ছেলেমেয়েরা কপট গাড়ি চালানোর ভঙ্গিতে আনন্দ উদযাপনে মত্ত। বউ ভুলে গেল তার স্বামী একজন প্রতিষ্ঠিত সারমেয়। ওর ঘরে না নিলেও আমার ঘরে এলো দু-এক রাত। ছেলেমেয়েরাও মনে রাখল না যে তাদের বাবার গায়ের বোটকা গন্ধে, মুখ থেকে ঝরা লালায় তাদের বমি পায়। ওদের ক্ষণিকের আনন্দ দেখে মিহিদানার মতো মোলায়েম শব্দে কাইকুই করে উঠলো ভেতরের কুকুরটা। মুখে হাত চেপে আমি তার টুটি ধরলাম। পাছে ওদের কানে শব্দটা না পৌঁছে যায়!
ওদিকে উপঢৌকন দাতাদের উপর্যুপরি উৎপাত। গ্রীষ্মের দুপুরে হাড়জিরজিরে পথের কুকুরের মতো জিব বেরিয়ে যাবার জোগাড় আমার। রাতের আঁধারে বন্দর থেকে বিদেশি অবৈধ মাল খালাস, বড় বড় দরপত্রের ঠিকাদারি বাগানো, গভীর সমুদ্রে মাছ ধরার জাহাজের লাইসেন্স, ব্যাংক লুট, মাদকের বড় চালান নিয়ে ধরা খাওয়া ক্যাডারদের ছাড়ানো, বিমানবন্দরে আটক সোনা চোরাচালানের খবর গোপন, ছোট চালান বিসর্জনের কৌশলে পেছন দিয়ে বড় চালান পার করানো, জমি দখল, জনশক্তি রপ্তানির রমরমা বাণিজ্যের সিন্ডিকেটে অন্তর্ভুক্তি ছাড়াও রাজ্যের সেরা সেরা ক্লাব, অ্যাসোসিয়েশনের মাথায় বসার মতো বায়না মেটানোর ফরমায়েশ খাটতে হচ্ছে দিনরাত। অবশ্য কোনটাই মুফতে নয়। তবে ‘মজা মারে ফজা ভাই। আমরা শুধু বৈঠা বাই।’ বড়কর্তা অ্যালসেশিয়ানদের উদর পূর্ণ হওয়ার পর উচ্ছিষ্ট হাড়গোড় জুটতো আমার মতো বুলডগের ভাগ্যে।
পেশার বন্ধুদের কেউ কেউ আবার কায়দা-কানুনে বেশ পটু। রাজ্য সভায় মুখ দেখিয়ে, তেলেভাজা স্তুতি উগড়ে দিয়ে হাতিয়েছে মওকা। গাড়ি-বাড়ি-নারী কমতি নেই কিছুতেই। যার কিছু জোটেনি সেও একটা প্লট কিংবা চওড়া ফ্ল্যাটে ঠিকানা গেড়েছে। কেউ কেউ আবার শিল্পিত ও আধুনিক নাম রেখেছে বাড়ির। সারমেয় নিবাস, কুকুরালয়, ডগহাউস ইত্যাদি।
মাদি কুকুরের পেছনে ঘুরঘুর করা সারমেয়দের নাক আরও এককাঠি সরেস। এখন তাদের সারাবছরই ভাদ্রমাস। দু-একজন ‘মাইনকার চিপায়’ আটকেও গেল। ভিডিও বেরোলো। হইচই হলো। চাকরি গেল, সংসার ভাঙল। কেউ কেউ বউয়ের ঝাটা-ঝাড়–র সোহাগ থেকে বাঁচতেস আঁটল নানা কৌশল। বউকে খুশি করতে উত্তরাঞ্চল, পশ্চিমাঞ্চল আবাসিক এলাকায় পাওয়া ফাঁকা প্লটে শুরু করল আলু, পটল, কদু, চালকুমড়ার চাষ। ছোট্ট কুঠুরিও তুলল যাদের সাধ্যে কুলোয়। আদতে নিরাপদ বিনোদন আশ্রম। ঝুলে গেল সাইনবোর্ড। টুনটুনি আশ্রম, খেঁদির মার ক্ষেতখামার, পাটেশ্বরীর বাগান বিলাস ইত্যাদি। বোকা বউগুলোর তাতেই বিমলানন্দ।
কদিন আগেও যারা গলি-গুপচির টং দোকানের চায়ের কাপে উষ্ণতা খুঁজতো, এখন তারা তারকা হোটেলের নিয়মিত খদ্দের। নামিদামি ক্লাবে নিত্য গতায়াত। ছেলেমেয়েরা হয় বিদেশে নয়তো নাম তুললো দেশের বিত্তবানদের সন্তানদের জন্য তৈরি স্কুল-কলেজের খাতায়। আর আমার মতো মুখ থোবড়ানো বুলডগ আদতে বাংলার আদি ও আসল কুত্তাই রয়ে গেলাম। উপরওয়ালা দয়া করে কিছু দিলে খুশিতে জিবটা লম্বা করে গালিচা বিছাই। কিছু না পেলে বসে থাকি পায়ের কাছে। ‘আমি মানুষের পায়ের কাছে কুকুর হয়ে বসে থাকি-তার ভেতরের কুকুরটাকে দেখবো বলে।’ আহ্ সুনীল দ্য গ্রেট!
সত্যি বলতে পেলেও যে খুব আরাম হয় আমার, তা নয়। এই যেমন চার চাকার বাহনাটা। যেমন দিয়েছে, তেমন তেল বের করে নিচ্ছে খাঁটিয়ে। তাও ভালো। বউ-ছেলেপুলে তো খুশি অন্তত। দারা-পুত্র-পরিবারের জন্যই তো এতসব আড়তদারি।
প্রভুভক্তি বিদ্যায় যারা এক কাঠি সরেস, তাদের মধ্যে দু-একটা সারমেয় বড় বড় পদ বাগিয়ে বসেছে রাজ্যের বাইরেও। রাজ্যের হয়ে অন্য রাজ্যে গেছে কর্তাগিরি ফলাতে। এই কার্য হাসিলে তৈলাক্ত সংস্রবের বাইরেও তাদের পায়ে ফেলতে হয়েছে মাথার নোনা। সারমেয় সমাজের অধিকার আদায়ের নামে জারিজুরি ছিল বলেই নজরে এসেছে রাজ্য প্রধান আর তার চ্যালাচামুণ্ডাদের। অথচ দলদাসের বাইরে অবাধ্য, স্বাধীন সারমেয়দের খোঁয়াড়ে ভরে যে অমানুষিক নির্যাতন হয়েছে তার কোনো প্রতিকার মেলেনি আজও। বরং এর মাধ্যমে একটি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে ক্ষমতা। ‘ভালো চাও তো কথা মেনে চলো। দেখতেই তো পাচ্ছো অবাধ্য হলে কী তার পরিণাম।’
আমাদের মতো খেঁকিদের নিরাপত্তার ছুতোয় ‘ডগ সিকিউরিটি অ্যাক্ট’ নামে একটি আইনও করা হলো কায়দা করে। আদতে তা নিরাপত্তা নয়, নিরাপদে জব্দ করার কৌশল। শুরুতে না বুঝে যারা ঘৌ ঘৌ করে রাজ্যকে সাধুবাদ জানিয়েছিলেন, দিন গড়াতে তারাও বুঝলেন কী ফাঁদে পা দিয়েছেন তখন। পান থেকে চুন খসলেই সারমেয়দের গলায় ঝুলতো ওই আইনের বেড়ি। নির্যাতনে নিষ্পেষিত সারমেয় সমাজ আইনের নাম ব্যাঙ্গ করে বলতে লাগলো, ‘ডগ ক্যাচার অ্যাক্ট।’ কয়েকটি সারমেয় মরে গেল খোঁয়াড়েই। ভয়ে গুঁটিয়ে গেল গন্ধ শুঁকে শুঁকে ময়লা-আবর্জনার সন্ধান বের করা অনুসন্ধানী সারমেয়রাও। অলস, অব্যবহারে তাদের তীক্ষè নাকগুলো ভোঁতা হয়ে পড়ল দিনকে দিন। এখন এই নাক দিয়ে তারা মনিবের জুতোর ময়লা শুঁকে চেটে নেয় জিব দিয়ে।
সূর্য উঠছে নিত্য। রাতের নিকশ কালো অন্ধকারের পেট ফুঁড়ে বেরোচ্ছে দিন। সেই আলোয় সব হচ্ছে। খুন হচ্ছে, ধর্ষণ হচ্ছে, বাদ যাচ্ছে না শিশুরাও। চুরি হচ্ছে, ছিনতাই হচ্ছে, কোথাও কোথাও ডাকাতিও। নীতির মুখে খই ফুটছে, তলে তলে দুর্নীতিও। এসবের মধ্যেই মানুষ আছে বেঁচেবর্তে। কাজ করছে, খাচ্ছেদাচ্ছে, হাগুমুতু করছে। আদমশুমারী না হলেও পয়দা হচ্ছে বেশুমার। সংসর্গে মাতাল হচ্ছে রাত। ক্লান্তিতে বুজে আসছে চোখও।
আমরা সারমেয়রাও করপোরেট কলুর বলদ বনে গেছি এতদিনে। রাজ্যের রাজ-রাজড়ারা মাঝে মধ্যে রাজবাড়ির বাসি পঁচা ছুড়ে দিলে তাতেই হামলে পড়ে ছিড়েখুঁড়ে খাচ্ছি। ধন্য হচ্ছি। গণ্যমান্য সারমেয় হিসেবে দূরদর্শনেও ডাক পড়ছে আমাদের। ঘেউ ঘেউ করছি যার যার সাধ্যমতো। গোঙাচ্ছি, গর্জন করছি হঠাৎ বিটাত। তারপর কামারের হাঁপরের মতো হাঁপাচ্ছি। এসবই রাজ্যের রাজার প্রতি প্রভুভক্তদের নিবেদন। তার সব দেখা-অদেখা কাজের প্রতি পূর্ণ আস্থা-সমর্থন। এসব নিয়ে রাজা প্রকাশ্যে না বললেও চোখের চাহনিতে ঠারেঠোরে বুঝিয়ে দেন। অনেক সময় আমরা সারমেয় সমাজ সেই বোঝানোর অপেক্ষা না করে ‘ঘৌ ঘৌ’ চালিয়ে যাই বাতাস বুঝে। গলির মোড়ের নেড়িটার মতো। টং দোকানিকে দেখে যেমন কপট ক্রোধে ‘ঘৌ’ করে ওঠে। বোঝায়, দোকানির নিরাপত্তায় বান্দা অটল প্রহরী। লালা ঝড়ায় বাঁসি, ছত্রাকাক্রান্ত পাউরুটি পাবার আশায়। একটা সরু কাঁটাযুক্তপথ পাড়ি দিয়ে আমরাও স্ব-নিয়ন্ত্রণমূলক কৌশল রপ্ত করেছি ভালোই। যাকে ইংরেজিতে সেলফ সেন্সরশিপ বলে বিদ্বৎসমাজ। কোনো সন্দেহজনক গন্ধ পেলেই ‘ঘৌ’ করে উঠি না এখন। বরং নিমীলিত গলায় অস্ফুট শব্দে ‘ঘোৎ’ করে গিলে ফেলি সব। কী যে প্রশান্তি!
এসব কারণে আমাদের ওপর জনসাধারণের বিশ্বাস উবে গেছে প্রায়। তা যাক। জন্মেছে ক্ষোভ। জন্মাক, তাতে কী? খবরের কাগজ থেকে মুখ না তুলে ‘কুত্তার বাচ্চা’ বা ‘বান্দির পোলা’ জাতীয় খিস্তিখেউড় করে তারা। বলে, ‘এই শালারা মাল খাইয়া হলুদ হইয়া গ্যাছে। ওগোর কলমে আর ধার নাই।’
রগড় করতেও ছাড়ে না কেউ কেউ। ‘লেখলেইবা কী হয়? উল্টা ধইরা নিয়া বাটাম দিবো। কার পোন্দে এতো কারেন্ট কন?’
এই জাতীয় অগণন আলাপ-সালাপ দেখেশুনে গা সওয়া হয়ে গেছে আমাদের। এমনকি দূরদর্শনের পর্দায় জ্যেষ্ঠ সারমেয়দের নগ্নতা দেখে কেউ ‘দালাল’ কিংবা ‘মাদারচোদ’ বলে ক্ষোভ ঝাড়লেও কানে বিঁধে না। বরং ব্যঞ্জনা তৈরি করে আর দশটা সাধারণ শব্দের মতোই।
০৪.
এভাবে প্রায় যুগ অতিক্রান্ত হলে অকস্মাৎ নেমে আসে বজ্রাঘাত কিছু বুঝে ওঠার আগেই। হঠাৎ শাহজাহানের সাজানো বাগান তছনছ হয়ে যায় শ্রাবণের ভারি বর্ষায়। মুহূর্তে ভেঙে পড়ে তাসেরঘর। বানের ঘোলা জলে রাজা এবং রাজপরিষদ ভেসে গেলে খেই হারিয়ে ফেলি আমরা সারমেয়রাও। ঠিক যেন বানের জলে ঠাঁই হারানো খেকিকুত্তা। আচমকা খাঁচার দুয়ার খুলে গেলে যেমন কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়ে পাখিরা। দুয়ার খোলা খাঁচা যে বিভ্রম সৃষ্টি করে, বিশ্বাস করতে পারে না যে সে মুক্ত, কতিপয় সারমেয়দের দশা হলো সেই মতো। আর শৃঙ্খলভাঙা, বঞ্চিত দাঁতাল প্রাণিগুলো হিংস্র হয়ে উঠল স্বজাতির প্রতি। একপাড়ার নেড়ি অন্যপাড়ার সীমানায় পা দিলে যেমন সম্মিলিত প্রতিরোধের মুখে পড়ে, তেমনি হামলে পড়া স্বজাতির ধারালো নখ আর দাঁতের আঘাতে রক্তাক্ত হলাম আমরাও। যাদের মস্তিষ্ক তড়িৎ কৌশল খুঁজে নিতে অভ্যস্ত, তারা কায়দা করে সিঁধিয়ে গেল সেই শৃঙ্খলভাঙাদের দলে। গা বাঁচাতে পিছ পা হলো না নিকটবন্ধু, সহকর্মীদের বলি দিতেও।
পতনের পর খুব দ্রুতই বদলে যাচ্ছে সময়। বিশেষ করে অ্যালসেশিয়ান, ডালমেশিয়ান, গ্রে হাউন্ড, জার্মান পয়েন্টার, বুলডগদের পদগুলো বেদখল হলো রাতারাতি। গর্তজীবী সারমেয়রা বেরিয়ে এলো ভুরভুরে তেলাপোকা হয়ে। ক্ষমতার বুদবুদ বাতাসে মিলিয়ে গেলে কার্পাস তুলো হয়ে উড়ে গেল পুরনোরা। অতীত গর্তজীবীদের শূন্য গুহায় আশ্রয় খুঁজলেন কেউ কেউ। এর মধ্যে খবর আসছে ধর পাকড়ের। খবর আসছে, নদীতে ভেসে উঠছে নিথর সারমেয়রা। গলাকাটা সারমেয়দেরও পাওয়া গেল বনবাঁদাড়ে। আবর্জনার ভাগাড়ে। ওদিকে নব্য মিউনিসিপ্যালের কর্মীরা বেড়ি, জাল আর চেতনানাশক নিয়ে চষে বেড়াচ্ছে রাজ্যের অলিগলি। একটা সারমেয় পেলেই দৌঁড়ে জাল ফেলে সাথে সাথে বিঁধিয়ে দেওয়া হচ্ছে চেতনানাশক। নির্জীব দেহগুলো তোলা হচ্ছে চারপাশ বদ্ধ কফিন গাড়িতে। তারপর কোথায় নেওয়া হচ্ছে, কী হচ্ছে, কেউ জানে না তার হদিস।
অল্প সময়ে বুলডগ হিসেবে খ্যাতি আর ক্ষমতার শীতল ছায়া পাওয়া আমিও গা ঢাকা দিয়েছি মিউনিসিপ্যালের কর্মীদের ভয়ে। স্ত্রী, সন্তানরা ভয়ে তটস্থ। আমার মতো সারমেয়র কারণে আজ তাদের জীবনও বিপন্ন প্রায়। আলোতে ভয় হয়। আয়নায় নিজের প্রতিবিম্ব দেখে চমকে উঠি। দিনরাত বাতি নিভিয়ে পড়ে থাকি অন্ধকারে। সেই থকথকে অন্ধকারে আবছায়া অবয়ব দেখে চিৎকার করে উঠতেই বউ বলল, ‘আহ্! চেচাচ্ছ কেন? আমি।’
তারপর ঘরের বাতি জ্বালতেই আঁতকে উঠলাম, ওর হাতের চকচকে ছুরি-কাঁচি দেখে।
‘এসব কেন?’
বউ আদুরে গলায় বলল, ‘এসো, তোমার গায়ের কুকুরের ছালটা ছাড়িয়ে দিই। দেখো, কেউ আর তোমায় চিনতে পারবে না।’
০৩.০৪.২০২৫
হাবিবুল্লাহ ফাহাদ
গল্পকার ও সাংবাদিক।
প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ : খৈয়া গোখরার ফণা, বজলু জানে লাশের পরিচয়, দরজার ওপাশে ভোর, দানামাঝির বউ। উপন্যাস : জলপাই রঙের দিনরাত।
সাক্ষাৎকার সংকলন : দুই ভাষাসংগ্রামীর মুখোমুখি (আহমদ রফিক ও রফিকুল ইসলাম), আলাপের সুবাসে সন্জীদা খাতুন, তিন যোদ্ধার মুখোমুখি।
জন্ম বগুড়ায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজকল্যাণে স্নাতকোত্তর।





