Home » মাস্টার কর্নিইয়ের রহস্য । আলফঁস দোদে ।। ফরাসি থেকে ভাষান্তর: আহমেদ সজীব

মাস্টার কর্নিইয়ের রহস্য । আলফঁস দোদে ।। ফরাসি থেকে ভাষান্তর: আহমেদ সজীব

ফ্রঁসে মামাই নামে একজন বৃদ্ধ বংশীবাদক মাঝে মাঝে আমার এখানে মিষ্টি ওয়াইন পান করতে করতে সন্ধ্যাগুলো কাটায়, সেদিন রাতে তিনি আমাকে গ্রামের একটি ছোট্ট নাটকীয় ঘটনার কথা বলেছিলেন যার সাক্ষী ছিল আমার এই হাওয়া কলঘর, আজ থেকে প্রায় বিশ বছর আগে। লোকটির বলা সেই গল্পটি আমার হৃদয় ছুঁয়ে গেছে, আর তাই যেভাবে আমি গল্পটি শুনেছি ঠিক সেভাবেই আপনাদের কাছে তা বলার চেষ্টা করব।

এক মুহূর্তের জন্য কল্পনা করুন, আপনি  সুগন্ধে ভরা এক জগ ওয়াইন নিয়ে বসে আছেন আর সেই বৃদ্ধ বংশীবাদক বলে চলেছেন।

আমাদের এই এলাকাটা, প্রিয় মহাশয়, সব সময় এমন মরা আর নামডাকহীন জায়গা ছিল না, যেমনটা আজ দেখছেন। আগেকার দিনে এখানে আটা পেষার এক বিশাল কারবার চলত আর ৪৫ কিলোমিটার দূরের আশেপাশের খামারবাড়ী থেকেও লোকজনেরা তাদের গম নিয়ে আসত আমাদের এখানে ভাঙানোর জন্য… গ্রামের চারপাশের পাহাড়গুলো তখন হাওয়া কলঘরে ঢাকা থাকত। ডানে-বামে যেদিকেই তাকাতেন, দেখতেন পাইন গাছের মাথা ছাপিয়ে প্রভোঁসের প্রবল ঝড়ো বাতাসে হাওয়াকলের পালগুলো ঘুরছে, পুরো পথ জুড়ে আটার বস্তা পিঠে ছোট ছোট গাধার দল সার বেঁধে কখনো উপরে উঠছে, কখনো নিচে নামছে; সারা সপ্তাহ ধরে পাহাড়ের ওপর থেকে চাবুকের শব্দ, হাওয়াকলের ডানার ফরফরানি আর মিল-মজদুরদের সেই হাঁকডাক ‘হেইও’… শুনতে কী যে ভালো লাগত! আর রবিবার হলে আমরা দলে দলে ওই হাওয়া কলঘরগুলোতে যেতাম। সেখানে পাহাড়ের ওপর মিলের মালিকরা আমাদের মিষ্টি ওয়াইন দিয়ে আপ্যায়ন করত। মিল মালিকদের বউদের দেখতে ঠিক রানীদের মতো সুন্দর লাগত; তাদের পরনে থাকত লেসের ওড়না আর গলায় ঝকঝকে সোনার ক্রস। আর আমি, আমি সাথে করে নিয়ে যেতাম আমার বাঁশিটা, আর ঘুটঘুটে রাত না হওয়া পর্যন্ত চলত আমাদের সেই ‘ফারান্দোল’ নাচ। বিশ্বাস করুন, ওই হাওয়া কলঘরগুলোই ছিল আমাদের দেশের আনন্দ আর সমৃদ্ধির উৎস।

দুর্ভাগ্যবশত, পারী থেকে আসা কিছু ফরাসির মাথায় বুদ্ধি এল তারাসকঁ রোডে এক বাষ্পচালিত আটার কল বসানোর। নতুন জিনিসের প্রতি মানুষের আকর্ষণ তো থাকেই! মানুষজন তখন তাদের গম সেইসব বাষ্পচালিত কলের মালিকদের কাছে পাঠাতে শুরু করল, আর অসহায় হাওয়া কলঘরগুলো কাজ হারিয়ে বেকার হয়ে পড়ল। কিছুদিন তারা টিকে থাকার লড়াই করেছিল, কিন্তু বাষ্পশক্তিই শেষ পর্যন্ত জয়ী হলো। আর একে একে, হায়! সবগুলো কল বন্ধ করে দিতে বাধ্য হলো হাওয়া কলঘরের মালিকেরা… সেই ছোট ছোট গাধাদের আর আসতে দেখা গেল না… মিল মালিকদের সুন্দরী বউয়েরা তাদের সোনার ক্রস বিক্রি করে দিল… নেই সেই মিষ্টি ওয়াইন! নেই সেই ফারান্দোল নাচ!… প্রভোঁসের প্রবল ঝড়ো বাতাস আগের মতোই বয়ে যেত, কিন্তু কলগুলোর ডানা আর ঘুরত না… তারপর, একটি উজ্জ্বল দিনে, পঞ্চায়েত থেকে এই জরাজীর্ণ কুটিরগুলো গুঁড়িয়ে দেওয়ার আদেশ এল, আর সেই জায়গায় রোপণ করা হলো আঙুর আর জলপাইয়ের গাছ।

এত বিপর্যয়ের মাঝেও, একটি হাওয়া কলঘর হাল ছাড়েনি আর পাহাড়  চূড়ায় দাঁড়িয়ে সেটি কারখানার মালিকদের নাকের ডগায় সাহসের সাথে তখনও ঘুরে যাচ্ছিল। সেটি ছিল মাস্টার কর্নিইয়ের কলঘর, ঠিক এই যে কলঘরটা যেখানে বসে আমরা এখন রাত জেগে আড্ডা দিচ্ছি।

মাস্টার কর্নিই ছিলেন আটাকলের এক বৃদ্ধ মালিক, যিনি গত ষাট বছর ধরে আটা-ময়দার মাঝেই জীবন কাটিয়েছেন এবং নিজের পেশার প্রতি তিনি ছিলেন প্রচণ্ড অনুরাগী। বড় বড় ওই আধুনিক আটার কারখানাগুলোর প্রতিষ্ঠা তাকে প্রায় পাগল করে দিয়েছিল। টানা আট দিন ধরে তাকে গ্রামের পথে পথে দৌড়ে বেড়াতে দেখা গেল; তিনি মানুষকে জড়ো করতেন আর চিৎকার করে বলতেন ওই কারখানার ময়দা পুরো প্রোভঁস অঞ্চলকে বিষিয়ে দেবে। তিনি বলতেন, ‘ওদের কাছে যেও না! ওই চোরগুলো বাষ্প ব্যবহার করে, যা শয়তানের নিশ্বাস; আর আমি কাজ করি ঈশ্বরের নিশ্বাস- প্রোভঁসের প্রবল ঝড়ো বাতাস দিয়ে।’ তিনি হাওয়াকলের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হতেন, কিন্তু কেউ তার কথা শুনত না।

তখন, প্রচণ্ড রাগে আর অভিমানে বুড়ো নিজেকে নিজের হাওয়া কলঘরের ভেতর বন্দি করে ফেললেন এবং এক বন্য পশুর মতো একাকী জীবন কাটাতে লাগলেন। তিনি এমনকি তার নাতনি ভিভেতকেও নিজের কাছে রাখতে চাইলেন না। পনেরো বছর বয়সী সেই মেয়েটির বাবা-মা মারা যাওয়ার পর দুনিয়ায় তার এই দাদু ছাড়া আর কেউ ছিল না। বেচারি ছোট্ট মেয়েটিকে নিজের জীবন ধারণের জন্য বাধ্য হয়ে এদিক-সেদিক খামারে খামারে কাজ করতে হতো, কখনও ফসল কাটার জন্য, কখনও রেশম চাষের কাজে, আবার কখনও জলপাই পাড়ার মৌসুমে। অথচ তার দাদু কিন্তু এই মেয়েটিকে খুব ভালোবাসতেন বলে মনে হ্ত। মাঝেমধ্যেই তপ্ত রোদের মধ্যে প্রায় ১৬ কিমি পথ হেঁটে তিনি তাকে সেই খামারে দেখতে যেতেন যেখানে মেয়েটি কাজ করত, আর যখন তিনি তার পাশে থাকতেন, ঘণ্টার পর ঘণ্টা শুধু তার দিকে তাকিয়ে থেকে নীরবে কাঁদতেন…

গ্রামের মানুষ ভাবত যে, বুড়ো আটা-কলমালিক লোভের বশবর্তী হয়েই ভিভেতকে বিদায় করে দিয়েছে; নিজের নাতনিকে এভাবে এক খামার থেকে অন্য খামারে ঘুরে বেড়াতে দেওয়াটা তার জন্য সম্মানের ছিল না, যেখানে মেয়েটিকে খামারের তদারককারীদের রূঢ় আচরণ এবং দাসত্ব খাটা তরুণীদের মতো যাবতীয় লাঞ্ছনা সহ্য করতে হতো। লোকে এটাও খুব খারাপ চোখে দেখত যে, মাস্টার কর্নিইয়ের মতো একজন স্বনামধন্য মানুষ, যিনি এতদিন যথেষ্ট আত্মসম্মান নিয়ে চলেছেন, তিনি এখন পথে পথে যাযাবরের মতো ঘুরে বেড়াচ্ছেন, পায়ে জুতো নেই, মাথায় ফুটো হয়ে যাওয়া টুপি, আর কোমরের কাপড়টা ছিঁড়ে ফালি ফালি হয়ে আছে…আসল ব্যাপার হলো, রবিবার দিন যখন আমরা তাকে গির্জায় প্রার্থনা করতে আসতে দেখতাম, আমাদের মতো বয়স্ক ব্যক্তিদের তার জন্য লজ্জা হতো; কর্নিই নিজেও সেটা খুব ভালোভাবে টের পেতেন, তাই তিনি আর সামনের সম্মানিত আসনে বসার সাহস পেতেন না। তিনি সবসময় গির্জার একদম শেষ প্রান্তে, পবিত্র জলের পাত্রের কাছে গরিব-দুঃখীদের সাথেই দাঁড়িয়ে থাকতেন।

মাস্টার কর্নিইয়ের জীবনের কোনো একটা বিষয় একদম পরিষ্কার ছিল না গ্রামের মানুষদের কাছে। গ্রাম থেকে দীর্ঘকাল ধরে কেউ আর তার কাছে গম নিয়ে যেত না, অথচ তার হাওয়াকলের ডানাগুলো আগের মতোই সবসময় সচল থাকত… সন্ধ্যার দিকে পথের ধারে দেখা যেত, বুড়ো আটাকল মালিক তার সামনে একটি গাধাকে তাড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছেন, যার পিঠে চাপানো রয়েছে ময়দাভর্তি বড় বড় সব বস্তা।

— শুভ সন্ধ্যা, মাস্টার কর্নিই!  কৃষকরা তাকে চিৎকার করে ডাকত; তা আপনার কলের কাজকাম ঠিকঠাক চলছে তো?

— ও হ্যাঁ ভালোই চলছে, ছেলেরা, বুড়ো বেশ হাসিখুশি মেজাজে উত্তর দিতেন। সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ, আমাদের কাজের কোনো অভাব নেই।

তখন, যদি কেউ তাকে জিজ্ঞেস করত যে শয়তানের কোন চেরাগ থেকে এত কাজ আসছে, তিনি ঠোঁটে আঙুল দিয়ে গম্ভীরভাবে বলতেন: ‘চুপ! একদম চুপ, আমি দূর দেশে পাঠানোর জন্য কাজ করছি…’ এর বেশি তার মুখ থেকে আর কখনোই কিছু বের করা যেত না।

আর ওই কলের ভেতর নাক গলানো? ওসব ভাবাই যেত না। এমনকি ছোট ভিভেতও সেখানে ঢুকতে পারত না…

যখন কেউ কলের সামনে দিয়ে যেত, দেখত দরজাটা সবসময় বন্ধ হয়ে আছে, হাওয়া কলঘরের বিশাল ডানাগুলো অবিরাম ঘুরছে, সেই বুড়ো গাধাটা চত্বরের ঘাস চিবোচ্ছে, একটা বড়সড় রোগা বিড়াল জানালার কার্নিশে রোদ পোহাচ্ছে আর পথচারীদের দিকে এক দৃষ্টিতে ক্রুদ্ধভাবে তাকিয়ে আছে।

এই সবকিছুর মধ্যেই রহস্যের গন্ধ ছিল এবং লোকে এটা নিয়ে খুব কানাকানি করত। প্রত্যেকে মাস্টার কর্নিইয়ের রহস্য নিজের মতো করে ব্যাখ্যা করত, তবে সাধারণ রটনা ছিল এই যে—ওই কলের ভেতর আটার বস্তার চেয়ে মুদ্রার বস্তাই বেশি ঠাসা আছে।

তবে শেষ পর্যন্ত দীর্ঘকাল পর সবকিছুই ফাঁস হয়ে গেল; আর তা ঘটল ঠিক এইভাবে:

একদিন কিশোর-কিশোরীদের এক অনুষ্ঠানে বাঁশি বাজানোর সময় আমি খেয়াল করলাম আমার বড় ছেলে আর ছোট ভিভেত একে অপরের প্রেমে পড়েছে। মনে মনে আমি অখুশি ছিলাম না, কর্নিই  নামটা আমাদের গ্রামে বেশ সম্মানের ছিল। আর তা ছাড়া, ওই মিষ্টি চড়ুইপাখির মতো পুঁচকে ভিভেত যখন আমার বাড়ির চারপাশটা টগবগিয়ে মাতিয়ে রাখত, তখন সেটা দেখতেও আমার বেশ ভালো লাগত। কিন্তু যেহেতু আমাদের এই প্রেমিক-প্রেমিকা যুগল মাঝেমধ্যেই মেলামেশার সুযোগ পেয়ে যাচ্ছিল, তাই কোনো অঘটন ঘটার ভয়ে আমি চেয়েছিলাম বিষয়টা এখনই মিটিয়ে ফেলতে আর সেই কারণেই বুড়ো দাদুকে দু-কথা বলবার জন্য আমি ওই হাওয়া কলঘর অবধি চড়াই ভেঙে উঠলাম… আহারে! বুড়ো যেন এক আস্ত জাদুকর! একবার ভাবো, সে আমাকে কী কায়দায় অভ্যর্থনা জানাল! কোনোমতেই তাকে দিয়ে দরজা খোলাতে পারলাম না। অগত্যা ওই চাবির ফুটো দিয়েই আমি কোনোমতে তাকে আমার কারণগুলো বোঝালাম; আর আমি যতক্ষণ কথা বলছিলাম, ওই পাজি রোগা বিড়ালটা শয়তানের মতো আমার মাথার ঠিক ওপরে সমানে ফোঁসফোঁস করে যাচ্ছিল।

সেই বুড়ো আমাকে কথা শেষ করার সময়টুকুও দিল না, উল্টো খুব অভদ্রভাবে চিৎকার করে জানালো যে আমি যেন নিজের বাঁশি বাজানো নিয়েই থাকি; আর আমার ছেলের বিয়ে দেওয়ার জন্য যদি এতই তাড়াহুড়ো থাকে, তবে যেন ওই ময়দার কলের (আধুনিক মিলের) মেয়েদের মধ্যে গিয়ে খুঁজি… একবার ভাবো তো, এই কুৎসিত কথাগুলো শুনে আমার রক্ত মাথায় চড়ে গিয়েছিল; কিন্তু তারপরও কোনোমতে মাথা ঠান্ডা রাখার মতো বুদ্ধি আমার ছিল, আর তাই ওই বুড়ো পাগলটাকে তার জাঁতাকলের কাছে ফেলে রেখেই আমি ফিরে এলাম বাচ্চাদের কাছে আমার এই ব্যর্থতার খবর দিতে… বেচারা নিষ্পাপ বাচ্চা দুটো তো বিশ্বাসই করতে পারছিল না; ওরা আমাকে অনুরোধ করল যেন অন্তত একবারের জন্য হলেও ওরা দুজনে মিলে ওই হাওয়া কলঘরে গিয়ে দাদুর সাথে কথা বলতে পারে… আমার আর না বলার ক্ষমতা ছিল না, আর ব্যস! অমনি আমার প্রেমিক যুগল রওনা দিল সেই দিকে।

ঠিক যখন ওরা উপরে পৌঁছাল, মাস্টার কর্নিই তখন সবে বাইরে বেরিয়েছেন। দরজায় ডবল তালা মারা; কিন্তু যাওয়ার সময় বুড়ো তার মইটা বাইরেই রেখে গিয়েছিলেন, আর অমনি বাচ্চাদের মাথায় বুদ্ধি খেলে গেল জানলা দিয়ে ভেতরে ঢুকে দেখা যাক না, ওই বিখ্যাত হাওয়া কলঘরের ভেতরে আসলে আছেটা কী…

কী অদ্ভুত কাণ্ড! জাঁতাকল ঘোরানোর ঘরটা একদম ফাঁকা… একটা বস্তা নেই, এক দানা গম নেই; এমনকি দেওয়ালে বা মাকড়সার জালে ধুলোসম ময়দার ছিটেফোঁটাও নেই… হাওয়া কলঘরগুলোতে গম ভাঙার যে একটা চমৎকার গরম গন্ধ ম-ম করে, তার নামগন্ধও সেখানে নেই… জাঁতাকলের মূল দণ্ডটা ধুলোয় ঢেকে আছে, আর সেই পাজি রোগা বিড়ালটা তার ওপরেই অঘোরে ঘুমাচ্ছে।

নিচের তলার ঘরটার অবস্থাও ছিল ঠিক একই রকম দারিদ্র্য আর অবহেলার ছাপ: একটা ভাঙাচোরা বিছানা, কয়েক টুকরো জীর্ণ ত্যানা কাপড়, সিঁড়ির একটা ধাপের ওপর পড়ে থাকা এক টুকরো রুটি; আর ঘরের এক কোণে পড়ে ছিল মুখ ফেটে যাওয়া তিন-চারটে বস্তা, যেখান থেকে গমের বদলে বেরিয়ে আসছিল ইটের টুকরো আর সাদা মাটি।

এটাই তবে মাস্টার কর্নিইয়ের গোপন রহস্য! এই সেই চুন-বালির আবর্জনা যা তিনি রোজ সন্ধ্যায় রাস্তা দিয়ে বয়ে নিয়ে বেড়াতেন, যাতে হাওয়া কলঘরের সম্মানটুকু বেঁচে থাকে আর লোকে ভাবে সেখানে এখনো গমই পেষা হচ্ছে… হায় বেচারা হাওয়াকল! হায় হতভাগা কর্নিই! অনেক আগেই আধুনিক ময়দার কলের মালিকেরা তাদের শেষ খদ্দেরটিকেও কেড়ে নিয়েছিল। হাওয়া কলঘরের ডানাগুলো এখনো আগের মতোই ঘুরে চলত ঠিকই, কিন্তু জাঁতাকলটা ঘুরত একদম শূন্য বুকে।

বাচ্চারা কাঁদতে কাঁদতে ফিরে এসে আমাকে সব জানাল যা কিছু ওরা দেখেছে। ওদের কথা শুনে আমার বুকটা যেন ফেটে যাচ্ছিল… এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে, আমি প্রতিবেশীদের কাছে ছুটে গেলাম, সংক্ষেপে সব খুলে বললাম, আর আমরা ঠিক করলাম যে, এই মুহূর্তেই গ্রামের সবার ঘরে যেটুকু গম আছে, তার সবটুকু নিয়ে কর্নিইয়ের হাওয়া কলঘরে যেতে হবে…যেমন কথা, তেমন কাজ!

সারা গ্রাম একসাথে বেরিয়ে পড়ল আর আমরা যখন পাহাড়ের ওপর পৌঁছালাম, তখন আমাদের সাথে গমবোঝাই গাধার এক বিশাল মিছিল—আর এই গমগুলো কিন্তু একদম আসল গম!

হাওয়া কলঘরের দরজাটা হাট করে খোলা ছিল… দরজার সামনে, একটা চুন-বালির আবর্জনার বস্তার ওপর বসে মাস্টার কর্নিই দুই হাতে মুখ ঢেকে কাঁদছিলেন। বাড়ি ফিরে তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, তার অনুপস্থিতিতে কেউ একজন ঘরের ভেতরে ঢুকেছিল এবং তার ওই করুণ গোপন রহস্যটি ধরে ফেলেছে।

— হায় পোড়া কপাল আমার! সে বলছিল। এখন আমার মরে যাওয়া ছাড়া আর কোনো পথ নেই… ধুলোয় মিশে গেল হাওয়া কলঘরের সম্মান।

আর সে এক বুক ফাটানো কান্নায় ভেঙে পড়ল, তার আদরের কলঘরটাকে নানা নামে ডাকতে লাগল, যেন হাওয়া কলঘরটি কোনো জড়বস্তু নয়, বরং রক্ত-মাংসের জ্যান্ত কোনো মানুষ।

ঠিক সেই মুহূর্তে, গাধার দল এসে পৌঁছাল পাহাড়ের সেই চাতালে, আর আমরা সবাই মিলে সেই পুরনো সোনালী দিনের মতো গলা ছেড়ে চিৎকার করে উঠলাম:

— ওহে হাওয়া কলঘর!…ওহে মাস্টার কর্নিই!

আর সাথে সাথেই দরজার সামনে বস্তার পাহাড় জমে গেল, লালচে রঙের চমৎকার সব শস্যদানা মাটিতে ছড়িয়ে পড়তে লাগল, চারিদিকে…

মাস্টার কর্নিই বড় বড় চোখে তাকিয়ে রইলেন। তার বুড়ো হাতের তালুতে কিছুটা গম তুলে নিয়ে তিনি একই সাথে হাসতে হাসতে আর কাঁদতে কাঁদতে বলতে লাগলেন:

— এ তো সত্যি গম!… হে দয়াময় ঈশ্বর!… একদম খাঁটি গম!… আমাকে দেখতে দাও তো, আমি ওগুলো মন ভরে দেখি।

তারপর আমাদের দিকে ফিরে বললেন:

— আহ! আমি জানতাম তোমরা ঠিকই আমার কাছে ফিরে আসবে… ওই ময়দার কলের মালিকগুলো সব চোরের দল।

আমরা চেয়েছিলাম তাঁকে বীরের বেশে কাঁধে তুলে গ্রামে নিয়ে যেতে, কিন্তু তিনি বললেন:

— না, না, বাছারা; তার আগে আমাকে আমার হাওয়া কলটাকে খাবার খাওয়াতে হবে… ভেবে দেখো একবার! কতদিন হলো বেচারা একটা দানাও দাঁতে কাটেনি!

সেই দৃশ্য দেখে আমাদের সবার চোখে জল এসে গিয়েছিল—বেচারা বুড়োমানুষটা উন্মাদের মতো এদিক-ওদিক ছোটাছুটি করছেন, বস্তার মুখ ছিঁড়ছেন, জাঁতাকলটা ঠিকঠাক ঘুরছে কি না তদারকি করছেন; আর ওদিকে গমের দানাগুলো পিষে গিয়ে মিহি ময়দার ধুলো হয়ে ছাদের দিকে উড়ে যাচ্ছে।

আমাদের গ্রামের লোকেদের একটা কৃতিত্ব দিতেই হয়: সেই দিনের পর থেকে আমরা আর কোনোদিন ওই বুড়ো হাওয়া কলঘর মালিককে কাজের অভাবে বসিয়ে রাখিনি।

তারপর, একদিন সকালে মাস্টার কর্নিই মারা গেলেন, আর আমাদের শেষ হাওয়া কলঘরটির ডানাগুলো ঘোরা বন্ধ হয়ে গেল, এবারকার মতো চিরতরে… কর্নিই মারা যাওয়ার পর, তাঁর সেই কাজ এগিয়ে নিতে আর কেউ এগিয়ে এলো না। কী আর করা যাবে মহাশয়!… এই পৃথিবীতে সবকিছুরই একটা শেষ আছে, আর আমাদের মেনে নিতেই হবে যে, হাওয়া কলঘরের দিন ফুরিয়ে এসেছে- ঠিক যেমন ফুরিয়ে গেছে রোন  নদীর সেই যাত্রীবাহী নৌকা, পুরনো আমলের পার্লামেন্ট ভবন কিংবা বড় বড় ফুল আঁকা সেই সেকেলে জ্যাকেটগুলোর দিন।
———-
আলফঁস দোদে(Alphonse Daudet) উনবিংশ শতাব্দীর একজন প্রখ্যাত ফরাসি ঔপন্যাসিক ও ছোটগল্পকার। ১৮৪০ সালে ফ্রান্সের নিম(Nîmes) শহরে জন্মগ্রহণ করেন। বিশ্বজুড়ে সমাদৃত আলফঁস দোদের রচনার একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে দক্ষিণ ফ্রান্সের প্রভোঁসের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং সাধারণ মানুষের জীবনসংগ্রাম। ‘Lettres de mon moulin’ (আমার হাওয়া কলঘর থেকে লেখা চিঠিগুলো) এবং ‘Tartarin de Tarascon’ (তারাসকঁ-এর তারতারাঁ) তাঁর অন্যতম রচনা। বিশেষ করে তাঁর ছোটগল্প ‘La Dernière Classe'(শেষ পাঠ) বিশ্বসাহিত্যের এক অমর সৃষ্টি, যা দেশপ্রেম ও মাতৃভাষার গুরুত্বকে অত্যন্ত নিপুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছে। ফরাসি সাহিত্যে স্বাভাবিকতাবাদ (Naturalisme) আন্দোলনের সাথে যুক্ত থাকলেও তাঁর  রচনাশৈলী ছিল অন্যদের তুলনায় অনেক বেশি মানবিক ও গীতিধর্মী। ১৮৯৭ সালে তিনি পারীতে মৃত্যুবরণ করেন।

[এখানে আলফঁস দোদের Le secret de Maître Cornille(মাস্টার কর্নিইয়ের রহস্য) গল্পটি মূল ফরাসি থেকে কবি আহমেদ সজীবের ভাষান্তরে বাঙলায় প্রকাশ করা হলো- সম্পাদক, উঠান]

আহমেদ সজীব

আহমেদ সজীব জন্মগ্রহণ করেছেন ৮ আগষ্ট ১৯৯২ সালে। পৈত্রিক নিবাস ঢাকার নবাবগঞ্জ উপজেলার মুন্সিনগর গ্রামে। কৈশোর কেটেছে পুরান ঢাকার ওয়ারী ও নবাবপুরে। একসময় ফ্রান্সের La Régie Autonome Des Transports Parisiens, RATP-তে চাকরি করেছেন। বর্তমানে সুইজারল্যান্ডের অদূরে আলজাসে সেচ্ছানির্বাসিত। প্রকাশিত কবিতার বই 'বেপথু এই পথে' (দিব্যপ্রকাশ, ঢাকা, ২০২২)। ফরাসি থেকে বাঙলায় ভাষান্তর করেছেন আর্হেন্তিনার কবি আন্তোনিও পোর্কিয়ার 'স্বর’(উজান, ঢাকা, ২০২৪) ও ফরাসি কবি জেরার ল গ্যুইকের 'দ্বীপ ও লবনের কবিতা' (উজান, ঢাকা, ২০২৫)। স্বপ্ন একদিন বেহালা বাজাবেন পুরো পৃথিবী জুড়ে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ভাষা
Scroll to Top