সন্ধ্যার সতেজ হাওয়া নিতে বাইরে পা বাড়াতেই দেখি মনোরম ঝলমলে আকাশ। গেদুর ঘন কুয়াশাময় আবহাওয়ায় এক বিরল দৃশ্য উপস্থিত। বাড়ির বারান্দা থেকে আমি নিচে তাকিয়ে ছিলাম ছোট্ট শহরটির দিকে। বিপজ্জনক থিম্পু-ফুয়েন্টসোলিং মহাসড়কের উপর চোখ পড়ল। গত গ্রীষ্মের ভারী বর্ষণ আর ভূমিধসে সড়কটি বেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।
দেখি, প্রবীণ এক লোক সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে আসছে আমার বাড়ির দিকে। বয়স তাঁর ষাটের বেশি হবে। পরনে মলিন মেরুন পোশাক। কাঁধে বাদামী রঙের ব্যাগ ঝোলানো। হাতে একটি ছোট নোটবুক আর একটি কলম। সম্পূর্ণ কামানো মাথা।
মাথানত করে অভিবাদন জানিয়ে কাছে এগিয়ে এলেন। কিছুক্ষণ দ্বিধাগ্রস্ত রইলেন দাঁড়িয়ে। তারপর বললেন যে, ধর্মের নামে দান করার অনুরোধ নিয়ে আমার কাছে এসেছেন তিনি।
প্রবীণ লোকটিকে আমি বাড়ির ভেতরে আসতে বললাম। স্ত্রীকে ডেকে বললাম আমাদের জন্য চা করতে। চায়ের জন্য অপেক্ষা করার সময়ে তিনি তার পরিচয় বর্ণনা করলেন। আমিও আমার পরিচয় দিলাম। মংগরের খেংখর গ্রামের বাসিন্দা তিনি। ফুয়েন্টসোলিং এসেছিলেন তার পুত্রকে বিদায় জানাতে। তার পুত্র লেখাপড়া করে ভারতের এক মঠে। বৃদ্ধের কথা বলার ভঙ্গিতে স্বাভাবিক সরলতা, চেহারায় সততার আভা।
‘ ‘ লোপন [ভুটানি ভাষায় সম্ভাষণ], আমি আপনার কাছে আর্থিক সাহায্য প্রার্থনা করতে এসেছি। আমার বাড়িতে একটি বজাগুরু ডুংকোর প্রার্থনাচক্র স্থাপনের পরিকল্পনা করেছি,’ বললেন তিনি, ‘নিজের হাতে যেটুকু ছিল তা দিয়ে একটি আন্ন দেবা আর একটি মণি প্রার্থনাচক্র তৈরি করেছি। কিন্ত এই শেষ কর্মটি, বজাগুরু ডংকার প্রার্থনাচক্রটি তৈরি করার ব্যয় সন্নিবেশ করতে পারছি না। আমার পিতার অন্তিম ইচ্ছে ছিল এই চক্রগুলি তৈরি করার। আসলে তাঁরই অন্তিম ইচ্ছে পূরণে আমার এই ক্ষুদ্র প্রয়াস।’
‘আপনার পিতা কি ধর্মাচারী ছিলেন?’ জিজ্ঞেস করলাম।
‘ ‘হ্যাঁ’, তিনি উত্তর দিলেন, ‘তিনি ছিলেন আমাদের গ্রামের প্রধান পুরোহিত। আমার পরিবার বহু প্রজন্ম ধরে ধর্মাচারে নিবেদিত। আমি হলাম আমাদের পরিবারের ষষ্ঠ প্রজন্ম। আমি আমার গ্রামের একটি ছোট্ট মঠ দেখভাল করি।’
‘ ‘বাহ, খুব ভালো,’ আগ্রহের সাথে আমি বললাম, ‘তাহলে নিশ্চয়ই আপনি তিন বছরের ত্যাগী বাস সম্পন্ন করেছেন?’
‘ ‘হ্যাঁ, তিন বছরের ত্যাগী বাস আমি সম্পন্ন করেছি।’ প্রবীণ লোকটি বললেন।
আমার স্ত্রী চা ও বিস্কুট পরিবেশন করলেন।
‘ ‘আপনি কোন পরম্পরা অনুসরণ ও চর্চা করেন?’ প্রশ্ন করে বিনীতভাবে চায়ের কাপ নিতে ইশারা করলাম।
চায়ের কাপে এক চুমুক দিয়ে প্রবীণ মানুষ বললেন, ‘লংচেন নির্ঘিগ’।
ওদিকে অন্ধকার জমতে শুরু করেছে। আমার স্ত্রী রাতের খাবার রান্না করছিলেন।
‘ ‘আজ রাতে কোথায় থাকবেন?’, জানতে চাইলাম।
তিনি বললেন, ‘আমার এক আত্মীয় আছেন তালায়। অবশ্য আমি জানি না তিনি বাড়িতে আছেন কি না।’
গেদু থেকে তালা কয়েক কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।
‘ ‘মানুষজন কেমন টাকা দেয় আপনাকে?’
‘ ‘ দেয়। কেউ দশ নগুলট্রাম। আবার কেউ বিশ। কেউ কেউ একটু বেশিও দান করেন,’ তিনি বললেন, ‘আজ কয়েকখানা বাড়িতে যেতে পেরেছি মাত্র। বাকি বাড়িগুলো কাল ঘুরে দেখব।’
আমি মাথা নাড়লাম এবং বৃদ্ধের চা শেষ হবার অপেক্ষায় থাকলাম।
‘ ‘লোপন,’ তিনি বললেন, ‘আজ রাতে কি আমি একটু আশ্রয় পেতে পারি?’
‘ ‘অবশ্যই, কোনো সমস্যা নেই,’ বললাম আমি, ‘সত্যি বলতে, গেদুর সব বাড়িতে গিয়ে দান সংগ্রহ শেষ না হওয়া পর্যন্ত আপনি আমাদের সাথে থাকতে পারেন।’
‘ ‘ অনেক ধন্যবাদ, লোপন! আপনার প্রতি চিরকাল কৃতজ্ঞ থাকব।’ প্রবীণ লোকটি বললেন।
তারপর তিনি মাটিতে বসলেন এবং গেদু ও আশেপাশের বাড়িগুলো থেকে পাঁচ, দশ, বিশ ও পঞ্চাশ নগুলট্রামের যে নোটগুলো তিনি সংগ্রহ করেছিলেন, সেগুলো বের করলেন। নোটগুলো তিনি পরিপাটি করে আলাদা আলাদা সাজালেন এবং হিসাব করলেন।
‘ ‘সুম জা সুমচু সো ঙা’ , উচ্চারণ করলেন। [এই হলো সর্বমোট তিনশত পঁয়ত্রিশ]
টাকাগুলো তুলে আবার তিনি ব্যাগে রাখলেন। তাপর আমাকে তার নোটবুকটি দেখালেন। সেখানে তিনি দাতাদের নাম লিখে রেখেছেন।
‘ ‘ কাল আমি গেদুর আরও কিছু বাড়িতে যাব। তারপর তালায় চলে যাব’, প্রবীণ লোকটি বললেন।
প্রবীণ এই মানুষটার চোখের সরলতা, কথার নম্রতা আমাকে আবিষ্ট করেছিল। ভালো মানুষের মধ্যে এমন গুণাবলী থাকে। সৎ মানুষের মধ্যে এমন ভাব থাকে। আমার খুব আনন্দ হচ্ছিল যে, তিনি আমাদের বাড়িতে রাত্রিযাপন করছেন।
তারপর, রাতের খাওয়া-দাওয়া শেষ হলে, তিনি আমাকে তার এক বন্ধুর মৃত্যুর গল্প বললেন। তিনি আমাকে বললেন যে কীভাবে তিনি গ্রামের প্রধান পুরোহিত হিসেবে সেই প্রয়াত বন্ধুর শেষকৃত্য অনুষ্ঠান পরিচালনা করেছিলেন।
‘ ‘আমি আমার বন্ধুকে বারবার স্বপ্নে দেখেছিলাম,’ বললেন তিনি। তারপর চুপ করে রইলেন। তখন আমি তার সাথে কথা বলার চেষ্টা করলাম। তিনি অন্যদিকে মুখ ফিরে রইলেন। অনেকক্ষণ পরে বললেন, ‘দেখুন, স্বপ্নে আমরা সাধারণত মৃতদের মুখ ফুলে ওঠা অবস্থায় দেখি। আমিও স্বপ্নে আমার বন্ধুকে তেমনটাই দেখেছিলাম। তিন-তিনবার তিনি আমায় স্বপ্নে দেখা দিয়েছিলেন, কিন্তু কিছুই বলেননি।’
ঘড়িতে নয়টা বাজল। আমার স্ত্রী আর আমি মিলে তাঁর বিছানা করে দিলাম আমাদের পূজার ঘরে। তারপর আমরাও শুয়ে পড়লাম।
গভীর রাতে আমার ঘুম ভেঙে গেল মন্ত্রপাঠের শব্দে। আমি আমার মোবাইল ফোনটা বিছানার কিনার থেকে নিয়ে সময় দেখলাম। তিনটা বাজে। পূজার ঘর থেকে মন্ত্রপাঠের সুর ভেসে আসছিল। তিনি মধুর কণ্ঠে প্রার্থনা করছিলেন। মাঝে মাঝে হাততালি দিচ্ছিলেন। আঙুলের ফট ফট শব্দে তাল তুলে সুরে সুরে গাইছিলেন প্রভাত প্রার্থনা-সংগীত। আমি যেন আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ সুরেলা কণ্ঠ শুনলাম। সে কণ্ঠে চরাচরে শান্তি নেমে এসেছিল।
আমাদের সাথে এক সপ্তাহ থাকলেন তিনি। দিনে তিনি দান সংগ্রহ করতে বেরিয়ে যেতেন, রাতে ফিরে আসতেন। সেই সপ্তাহজুড়ে আমাদের পূজার ঘর থেকে প্রতি ভোরে ভেসে আসত তার প্রার্থনাস্বর। ভোর তিনটায়। জাগিয়ে দিত আমাকে আর আমার স্ত্রীকে। আমাদের তাতে একটুও বিরক্ত লাগেনি। একবারও না। বরং, প্রতি প্রভাতের ভক্তি-সংগীতে মন ভরে যেত আমাদের, মনে জেগে উঠতো আনন্দ-অনুভব।
এক সপ্তাহ শেষে তিনি গেদু সফর সমাপ্ত করলেন। এই সময়ে তিনি সাত হাজার নগুলট্রাম সংগ্রহ করতে পেরেছিলেন। টাকাগুলো তিনি আমার কাছে রাখলেন। তারপর চলে গেলেন তালা, তাঁর পরবর্তী গন্তব্যে।
কয়েকদিন পর তিনি ফিরে এলেন তালা থেকে। আমি তার রেখে যাওয়া টাকা তাকে ফেরত দিলাম। নিজেও কিছু দান করলাম। স্থানীয় বাজার থেকে কেনা একটি শার্ট ও একটি জ্যাকেট তাকে উপহার দিলাম। প্রবীণ লোকটি আমাকে ও আমার স্ত্রীকে ধন্যবাদ জানালেন। তারপর যাত্রা করলেন থিম্পুর উদ্দেশ্যে।
অদ্ভুত! অচেনা, অজানা মানুষের সংগে আমাদের কেমন করে যেন দেখা হয়ে যায়। নানা রকম সম্পর্ক তৈরি হয়। কখনও মানুষ ভালো হয়। কখনও এমন মানুষের সাক্ষাৎ হয় যারা প্রতারণা করে, লুটে নেয়। তবে এই প্রবীণ মানুষটির আগমনে আমার জীবন বদলে গিয়েছিল।
তার আগমনে আমি প্রতিদিন ভোরে উঠতে শিখেছি। ভোরবেলা হাঁটাহাটি করতে শিখেছি। ভোরের সতেজ হাওয়ায় চনমনে হতে শিখেছি। প্রভাত প্রার্থনার অনুপ্রেরণা আমি পেয়েছি। কুড়ি বছর পার হয়ে হয়ে গেল, আমার বদলে যাওয়া জীবনের এই রুটিনে ব্যতিক্রম ঘটেনি।
মনে হয় একদিন আমিও হয়ে যাব উনার মতো প্রবীণ ধর্মাচারী।
===
[লিংচেন দর্জি (Lhichen Dorji) ১৯৬১ খ্রিষ্টাব্দে ভুটানের পেমাগাতেল অঞ্চলে জন্মগ্রহণ করেন। কথাসাহিত্যিক হিসেবে তিনি ভুটানের সংস্কৃতি, সমাজ ও ঐতিহ্যকে গভীরভাবে অন্বেষণ করেন। সমাজের মানবিক মূল্যবোধ, সামাজিক সমস্যাসহ ভুটানের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য তাঁর গল্প-উপন্যাসে নিপুনভাবে উঠে আসে। আধুনিক ভুটানি সাহিত্যকে তিনি নিয়ে যেতে পেরেছেন বিশ্বদরবারে। দ্য গুড ওল্ড ম্যান, দ্য টেন রিডলস, অলাভালসহ তাঁর গ্রন্থগুলো জনপ্রিয় হয়েছে। ভুটানি ভাষায় ভাষার (Dzongkha) এই লেখকের ২১টি গল্প ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন ভুটানের সমাজ, সংস্কৃতি বিষয়ে একজন নিবিষ্ট গবেষক অ্যাডাম এডওয়ার্ডস, যা প্রকাশিত হয় 21 Short Stories from Bhutan নামে প্রিন্সটন ইউনভার্সিটি প্রেস থেকে ২০০৪ খ্রিস্টব্দে। ২০১১ খ্রিস্টাব্দে লিংচেন দর্জি প্রয়াত হন। 21 Short Stories from Bhutan-এ গ্রন্থিত দ্য ওল্ড গুড ম্যান গল্পটির প্রবীণ ধর্মাচারী নামে বাংলায় ভাষান্তর।
নূরুননবী শান্ত
গল্পকার, লোকসংস্কৃতি তাত্ত্বিক ও অনুবাদক। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে এমএ।
প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ: গ্রামে প্রচলিত গল্প, রাস্তা, মেঘের ওপারে আকাশ, প্রিয় দুঃস্বপ্ন, মড়ার মাথা। নিবন্ধ সংকলন: প্রান্তকথা। অনুবাদ গ্রন্থ: আমি তোমাদের ডাক্তার ভাই [মূল: Call me Doctor Bhai, কেইট দে]; গঙ্গা যখন পদ্মা [মূল: When Ganga becomes Padda, কাজী খালিদ আশরাফ]; ফোকলোর বিশ্লেষণ [মূল: Interpreting Folklore, অ্যালেন ডান্ডেস]; Translation of Moloya: 50 Songs of Monomohan Dutto.





