Home » নাক-দপ্তর ও মৃত প্রোফাইল // আশানুর রহমান।

নাক-দপ্তর ও মৃত প্রোফাইল // আশানুর রহমান।

[ রুশ ঔপন্যাসিক, ছোটগল্পকার এবং নাট্যকার নিকোলাই গোগোলের (১৮০৯-১৮৫২) সাহিত্য অদ্ভুতের ভেতর দিয়েও সবচেয়ে নির্মম বাস্তবকে আমাদের দেখতে শিখিয়েছে। তাঁর রচনায় দপ্তর, পদমর্যাদা, পরিচয়ের সংকট, মানুষের ক্ষুদ্র আকাঙ্ক্ষা এবং ক্ষমতার প্রহসন এমনভাবে ধরা পড়ে যে, হাসতে হাসতেই পাঠক হঠাৎ এক গভীর অস্বস্তির মুখোমুখি দাঁড়ায়। গোগোলের সেই ব্যঙ্গময়, বিষণ্ন এবং তীক্ষ্ণ শিল্পভাষা আজও সমান প্রাসঙ্গিক।

আশানুর রহমানের ‘নাক-দপ্তর ও মৃত প্রোফাইল’ গল্পটি সেই গোগোলীয় উত্তরাধিকারের প্রতি এক সৃজনশীল শ্রদ্ধাঞ্জলি। এখানে গোগোলের পরিচিত প্রতীক ও অনুষঙ্গ নতুন সময়ের বাস্তবতায়, বিশেষত ডিজিটাল জীবন, আমলাতন্ত্র, স্মৃতি, পরিচয় ও ক্ষমতার সমকালীন সংকটে, নতুন অর্থে ফিরে এসেছে। গল্পের ভেতরে যেমন আছে রূপক, তেমনি আছে আমাদের চারপাশের অদ্ভুত কিন্তু চেনা বাস্তবের প্রতিধ্বনি। এই গল্পে ব্যক্তিগত সত্তা, সামাজিক মুখোশ, রাষ্ট্র, বাজার ও প্রযুক্তির জটিল সম্পর্ক এক ধরনের কৌতুকময় অন্ধকারে উন্মোচিত হয়। ফলে এটি শুধু গোগোলকে স্মরণ করে না, বরং তাঁর সাহিত্যিক দৃষ্টিকে আমাদের সময়ের ভেতরে পুনর্নির্মাণ করে।

গোগোলপ্রেমী পাঠকের কাছে যেমন এটি হবে পরিচিত অনুরণনের এক নতুন পাঠ, তেমনি সমকালীন গল্পপাঠকের কাছেও এটি হয়ে উঠতে পারে এক তীক্ষ্ণ, ব্যঙ্গাত্মক এবং স্মরণযোগ্য।]

সকালে ঘুম ভাঙতেই দেখি, আমার নাক নেই। আয়নায় তাকিয়ে দেখি, কপালের মাঝখানে এক অদ্ভুত সমতল নীরবতা। পৃথিবীকে বুঝার সেই অপরিহার্য জানালাটি আজ চুপচাপ বন্ধ হয়ে গেছে। যেন অনুভূতির কোনো গোপন পথ হঠাৎই নিভে গেল।

নাক উধাও। এমন নয় যে কেউ কেটে নিয়েছে। বরং সে নিজেই নীরবে পদত্যাগ করে, রাতের অন্ধকারে দপ্তর বদলে ফেলেছে। বালিশের পাশে পড়ে আছে একখানা ছোট কাগজ। টিকটিকির লেজের মতো চিকন, দীর্ঘ হরফে লেখা—

“মান্যবর,
দীর্ঘদিনের গন্ধজনিত অবমাননা আর সইতে পারলাম না।
অতএব, স্বেচ্ছায় ‘উচ্চপদে’ যোগ দিলাম।
— নাক”

আমি কাগজটা হাতে নিয়ে বারান্দায় যেতেই নিচের রাস্তায় পুলিশের সাইরেন, আকাশে একলা ভেসে থাকা পাখি, আর ডানদিকে গলির মোড়ে ওভারকোট সেন্টারের নতুন দোকানটা নজরে এল। দোকানটা গত সপ্তাহেই খুলেছে। সাইনবোর্ডে লেখা: ‘স্বপ্নের কোট—কিস্তিতে!’

কি মনে করে বারান্দা থেকে ফিরে দোকানটায় গেলাম। দোকানদার একদম গোগোলীয় হাসিতে বলল, ‘স্যার, নাক হারালে কোটই ভরসা। কাঁধে একটু ওজন না থাকলে মানুষ নিজের অস্তিত্বও টের পায় না। শরীর যেন তখন হাওয়ায় ভাসা এক নামহীন ছায়া।’ আমি বললাম, ‘আমার নাক কোথায় গেল, বলুন তো?’ সে বলল, ‘উর্ধ্বতন কোনো পদেই যাবে। ওটা এখন আপনার নাগালের বাইরে।’

আমার কর্মস্থলের নাম ‘ডিজিটাল মৃতপ্রোফাইল ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ’, সংক্ষেপে ডিএমবি। নামটা শুনলেই যেন এক ধরনের অদ্ভুত নীরবতার আভাস মেলে। কাজটাও তেমনই—নিঃশব্দ, অথচ গভীর।

আমরা তাদেরই খুঁজি, যারা বাস্তবে এখনো হেঁটে বেড়ায়, শ্বাস নেয়, কথা বলে। কিন্তু অনলাইনের অদৃশ্য জগত থেকে বহু আগেই তারা হারিয়ে গেছে। কারও পাসওয়ার্ড হারিয়েছে, কারও অ্যাকাউন্ট ছায়ার আড়ালে নির্বাসিত, কেউবা চিরস্থায়ী রিভিউয়ের অন্তহীন অপেক্ষায় থেমে আছে। তারা আছে, আবার থেকেও নেই।

আমরা সেই বিস্মৃত প্রোফাইলগুলো কিনে নিই। যেন পরিত্যক্ত কোনো ঘর কিনে নেওয়া। তারপর ধীরে ধীরে সেখান থেকে তুলে আনি জমে থাকা সব স্মৃতি, তথ্য, চিহ্ন—অদৃশ্য জীবনের স্তব্ধ নথিপত্র। সেই নীরব ডেটাকে আমরা আবার ব্যবহারযোগ্য করে তুলি। তাকে নতুন অর্থ দিই, নতুন গন্তব্যে পাঠাই।

এক অর্থে, আমরা মৃত ডিজিটাল ভূখণ্ডে হেঁটে বেড়ানো সংগ্রাহক। যারা শূন্যতার ভেতর থেকেও সম্ভাবনার চিহ্ন খুঁজে আনে।

আমাদের নীতিমালার প্রথম পঙ্‌ক্তিতে লেখা আছে যে, ‘প্রোফাইলের কোনো মৃত্যু ঘটে না; তারা শুধু সময়ের ভেতর নিজেকে গুটিয়ে নেয়, এক অস্থায়ী নীরবতার অন্তরালে।’ আমাদের অফিসের যিনি প্রধান, তার নাম পাভেল রহমান। এক সময় পৈত্রিক সূত্রে বামপন্থী রাজনীতি করতেন। পড়াশেনা রাশিয়ায়, সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের বৃত্তি নিয়ে। তাই আমরা তাকে ঠাট্টা করে বলি পাভেলোভিচ। নিকোলাই গোগলের ‘ওভারকোট’-এর এক চরিত্র।
তার কানে সবসময় ব্লুটুথ, চোখে জলের মতো স্বচ্ছ হাসি। তিনি বলেন, ‘মরার পরও যে কথা বলে, তাকে বেচো। এখন বাজারে সবচেয়ে দামি হলো মরা কণ্ঠ।’

আমার টেবিলের পাশের কিউবিকলে বসে আকিব আকিবুজ্জামান। আমি বলি আকাকি আকাকিয়েভিচ। কাগজের ওপর ক্ষুদ্র তর্জনী আঙুল বুলিয়ে সে সারাদিন ভাষার ভঙ্গি শোধরায়। কমা, পূর্ণচ্ছেদ, ফন্ট, ড্যাশ; যেন শব্দের শরীরে শৃঙ্খলা পরিয়ে দেয়। তাকে দেখলেই মনে পড়ে গোগলের ‘ওভারকোট’-এর আকাকিকে। আর তার সেই নীরব, ক্ষুদ্র, অথচ গভীর আকাঙ্ক্ষা—একটি উষ্ণ কোটের।

আমাদের আকিব ছয় মাস ধরে ‘ওভারকোট সেন্টার’ থেকে আনা কোটের কিস্তি শোধ করছে। লম্বা সেই কোট। ভেতরে হালকা, বাইরে চোখে পড়ার মতো ঝলমলে; যেন আড়ম্বরের এক পাতলা আবরণ। কোটের ভেতরের লেবেলে নিঃশব্দে লেখা, ‘বড়লোকা’। প্রথম দিন কোটটি গায়ে চাপিয়েই সে বলেছিল, এই শহরে কোটহীন মানুষকে সবাই নীতিহীন বলে, আর কোট থাকলেই নীতিবান। যেন ঠান্ডাকে সম্মান জানানোই এখানে নীতির প্রথম শর্ত।
কিন্তু আমার নাক গেল কোথায়? অফিসে ঢুকতেই গার্ড মাথা নেড়ে জিজ্ঞেস করল, ‘আপনি কি সুপারিন্টেনডেন্ট নাক-সাহেবকে চেনেন? সকাল থেকেই তিনি মিটিংয়ে।’ আমি থমকে দাঁড়ালাম। নাক-সাহেব!
লিফটে উঠে নবম তলায় নামতেই এক কক্ষের দরজায় চোখ আটকে গেল। লেখা—‘গন্ধনীতি অনুবিভাগ, প্রধান: নাক’।

কাচের ভেতর দিয়ে উঁকি দিতেই দেখি—আমারই নাক, স্যুট-টাই পরে গম্ভীর মুখে বসে আছে। পাশে ফিঙ্গারপ্রিন্ট স্যানিটাইজার। করমর্দনের প্রশ্নই ওঠে না। তার তো হাতই নেই। তবু অদ্ভুত ভঙ্গিতে সে যেন সবাইকে হাত নাড়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। চোখ রগড়ে আবার তাকালাম। ভুল দেখছি না। আমার নাক এখন এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। গায়ে তার পাতলা বেইজ রঙের একটি ওভারকোট। দেখে মনে হলো সেটিও হয়তো কিস্তিতে কেনা।

রিসেপশনে গিয়ে বললাম, “উনি আমার…”, শব্দটা গলায় এসে থেমে গেল। ‘উনি’ যে আসলে ‘নাক’, তা বোঝানোর ভাষা নেই। রিসেপশনিস্ট নির্বিকার গলায় বলল, “এখানে ‘আপনি/আপনার নাক’-জাতীয় আত্মীয়তা স্বীকৃত নয়। আপনার পরিচয়?”
আমি পরিচয়পত্র বাড়িয়ে দিলাম। ছবিতে স্পষ্টই নাক আছে। সে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলল, ‘ছবি আর বাস্তবের মধ্যে যথেষ্ট অমিল। প্রমাণ দিন যে, এই আপনি-ই সেই আপনি।’
‘কী প্রমাণ?’
‘আপনার গন্ধের প্রোফাইল।’
আমি একটু হেসে বললাম, ‘আমার তো নাকই নেই।’
সে মৃদুস্বরে বলল, ‘তাই তো। গন্ধহীন মানুষ আসলে অর্ধেক অনুপস্থিত।’
আমি বললাম, ‘তাহলে… আমি কি কাজ করতে পারি?’
সে বলল, ‘কাজ তো করতে পারেন। তবে গন্ধ-অকার্যকর হিসেবে। আজকাল রিপোর্টে গন্ধ-ডেটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ‘
সে একটু থেমে আবার বলল, ‘গন্ধ ছাড়া তথ্য এখন অসম্পূর্ণ ধরা হয়। আপনি লিখবেন, ঠিকই কিন্তু আপনার বাক্যগুলোতে গন্ধ থাকবে না। আর গন্ধহীন বাক্য এই দপ্তরে অর্ধেক সত্যের মতো।’

আমি চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকলাম। মনে হলো, শব্দগুলো এখনও আমার আছে। কিন্তু তাদের ভেতরের আসল সত্তাটা যেন কোথাও হারিয়ে গেছে। দূরে কাচের ওপাশে আমার ‘নাক’ ব্যস্ত। ফাইল উল্টাচ্ছে, নির্দেশ দিচ্ছে। নিজের নতুন জীবন নিয়ে নির্বিকার।

আর আমি, নিজেরই এক অসম্পূর্ণ সংস্করণ হয়ে, ভাবতে থাকলাম যে, মানুষ কি শুধু মুখের অবয়বেই হারায়, নাকি তার গন্ধ চলে গেলেই সে সত্যিই অদৃশ্য হয়ে যায়?

অফিসে ফিরতেই বস পাভেল আমাকে ডেকে পাঠালেন। কনফারেন্স রুমে ঢুকতেই দেখি সবাই জড়ো হয়েছে। মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে আমার নাক। এখন সে-ই চীফ। খসখসে কাগজে জমে থাকা গন্ধ টেনে নিয়ে সে গম্ভীর কণ্ঠে বলল, ‘সাম্প্রতিক নির্দেশ হলো দেশজুড়ে কোটাভিত্তিক গন্ধ-তালিকা নতুন করে সাজাতে হবে। কোন অঞ্চলে কোন গন্ধ প্রাধান্য পাবে, তার মানচিত্র তৈরি জরুরি।’

সে থামল। যেন বাতাস থেকেই তথ্য শুষে নিচ্ছে। তারপর আবার বলল, ‘মসজিদের আগরবাতির ধোঁয়া, মন্দিরের ধূপ, ফুটন্ত চায়ের বাষ্প, কালি আর ঘামের মিশ্র গন্ধ, এমনকি স্থির জলের বাসি গন্ধ—সবই এখন কেবল গন্ধ নয়, রাজনৈতিক উপাত্ত।’
আমি ধীর স্বরে বললাম, ‘স্যার, আমি তো কোনো গন্ধই পাই না।’
নাক-সাহেবের ভঙ্গি সঙ্গে সঙ্গে গম্ভীর হয়ে উঠল। ‘তাই তো,’ তিনি বললেন, ‘আপনি বুঝি আপনার সবচেয়ে মৌলিক স্বাধীনতাটাই হারিয়েছেন—গন্ধের স্বাধীনতা।’
আমি একটু এগিয়ে এসে বললাম, ‘তাহলে… আপনি ফিরে আসুন।’
নাক-সাহেবের ঠোঁট নেই, তাই বাঁকানোরও উপায় নেই। তবু তার ভেতর থেকে যেন একরকম তাচ্ছিল্যের ফুঁ বেরোল। সেই অদৃশ্য ফুঁয়ে টেবিলের কাগজগুলো হালকা কেঁপে উঠল।

তিনি স্থির গলায় বললেন, ‘ব্যক্তিগত আবেদন গ্রহণযোগ্য নয়। আমি এখন প্রতিষ্ঠানের অংশ, একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা।’
তার কণ্ঠে এমন এক শীতল স্থিরতা ছিল, যেন মানুষ নয়, কোনো নীতিমালাই কথা বলছে।

আমি আর কিছু বললাম না। কেবল দাঁড়িয়ে রইলাম। নিজের মুখের দিকে মনে মনে হাত বাড়িয়ে দেখলাম—যেখানে একসময় নাক ছিল, এখন সেখানে এক অনুচ্চারিত শূন্যতা।
কনফারেন্স রুমের ভেতর গন্ধের আলোচনা চলতেই থাকল। কোন গন্ধ সংরক্ষণযোগ্য, কোনটা মুছে ফেলতে হবে, কোনটা রাষ্ট্রের পক্ষে নিরাপদ। আর আমি বুঝতে পারলাম, এই দুনিয়ায় গন্ধ হারানো মানে শুধু অনুভূতি হারানো নয়; নিজের অস্তিত্বের প্রমাণটুকুও ধীরে ধীরে বিলীন হয়ে যাওয়া।

সেদিন বিকেলেই আকিবের কোটটা চুরি হলো, অফিস থেকে ফেরার পথে। সে হাঁপাতে হাঁপাতে এসে বলল, ‘ভাই, আমি শেষ! কোট ছাড়া আমি তো কিছুই না।’ আমি তার কাঁধে হাত রাখলাম। তার চোখ ভেজা ভেজা, জলে। সে বলল, ‘আমি কিস্তি দিচ্ছিলাম। শুধু একটা বোতাম-এর কিস্তি বাকি ছিল। অথচ আজ থেকে হাঁটার সময় কেউ আমার দিকে তাকাবে না। আমাকে কেউ মানুষই ভাববে না।’

আমি তার হাত ধরে ওভারকোট সেন্টার-এ নিয়ে গেলাম। দোকানদার বলল, ‘কোট চুরি? সেটা দুর্ভাগ্যজনক। তবে আমাদের কিস্তি মাফ হবে না। ওটা চলবে। কারণ চুক্তি সবকিছুরই উর্দ্ধে।’
আকিব বলল, ‘আমি এখন কী পরবো?’
দোকানদার মুচকি হেসে বলল, ‘সমাজেরও তো ওভারকোট আছে। তার নাম ভদ্রতা। সেটাই না হয় পরে থাকুন।’

আকিব কাঁপতে কাঁপতে বেরিয়ে গেল। রাতের দিকে তাকে আর পাওয়া গেল না। পরদিন ভোরে খবর এল বনানীর ১১ নম্বর ব্রীজের নিচে একটি মানুষ-সদৃশ হালকা ছায়া দেখা গেছে। কোটহীন, শব্দহীন, তবে থেকে থেকে বাতাসে মিলিয়ে যাচ্ছে। কেউ একজন বলল, ‘দেখেছেন? ওভারকোট হলো জীবনের পরিগ্রহ। সেটা না থাকলে মানুষ নিজের দেহকেও চেনে না।’

এই ঢাকা শহরে এক আগস্টে ক্ষমতার পট বদলেছিল। শহর দেখল নতুন ব্যানার, নতুন স্লোগান, তবে টর্চলাইটগুলো পুরোনো। এখন নাগরিকের নাক, কোট, ছায়া; সবই চুক্তিনির্ভর। রাতে যখন রাস্তার কোণায় টহলদার দাঁড়ায়, তাদের বুকপকেটে নতুন রঙের কার্ড মিললেও তাদের টর্চের আলো সেই পুরনোই। আমরা আলো দেখে হাত তুলে দাঁড়িয়ে বলি, ‘আমরা কোট পরেছি, নাকও আছে।’ এই মিথ্যাটা বলা সহজ। সত্য বললেই কষ্ট। কারণ ‘আমার কোট ছেঁড়া, নাকও উধাও।’

ডিএমবি-তে আমাদের নতুন প্রজেক্টের নাম—‘মৃত প্রোফাইলের আত্ম-ব্যবসা’। কোডনাম: ডেড সোলস ২.০। কাজটা শুনতে অদ্ভুত, কিন্তু উদ্দেশ্য খুব পরিষ্কার—যারা দেশে নেই, কিংবা আছে কিন্তু অনলাইনে নেই, তাদের নাম, ছবি আর পুরোনো ‘আমি’-গুলোকে সাজিয়ে-গুছিয়ে উপযুক্ত সংবেদনশীলতার মোড়কে বিভিন্ন ক্যাম্পেইনে ব্যবহার করা।

একদিন বস পাভেল বললেন, ‘চিচিকভ নামে এক রাশিয়ান কনসালট্যান্ট এসেছে। প্রোফাইল কেনাবেচায় তিনি ওস্তাদ।’

দেখলাম, ভদ্রলোক স্মার্ট স্যুট পরে আছেন, গলায় নীল টাই, সামনে ল্যাপটপে খোলা স্প্রেডশিট। হেসে বললেন, ‘মৃত ডেটার স্পিরিটই সেরা KPI। জীবিতরা অস্থির, মৃতরাই সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য।’
আমি জানতে চাইলাম, ‘আপনি আসলে কী বিক্রি করেন?’
তিনি একটু থেমে বললেন, ‘স্বস্তি। মানুষকে বুঝাই যে, তোমরা একা নও, মৃতরাও তোমাদের সঙ্গেই আছে, ডেমোগ্রাফিক্সে।’
আমি আবার প্রশ্ন করলাম, ‘মৃতদের অনুমতি লাগে না?’
চিচিকভ কাঁধ ঝাঁকালেন, ‘মৃতরা অনুমতি দেয় না, এই কারণেই তাদের ব্যবহার করা সবচেয়ে সহজ।’

আমার মাথায় গোগোলের চিচিকভ ঘুরে বেড়ায়। যে গ্রামে গ্রামে ঘুরে মৃত আত্মা কিনতো। ঢাকা শহরে আত্মারা ওটাই। তারা এখন ডিএমবি-এর সার্ভারে। যাদের পাসওয়ার্ড হারিয়েছে, কিংবা ভুলে গেছে, কিংবা ভুলিয়ে দেওয়া হয়েছে, তাদের আত্মা এখন ৯৯ বছরের জন্য লিজ নেয়া। দলিলে পরিস্কার লেখা আছে—চুক্তিপত্র: ‘জনক্ষোভ প্রতিরোধে উপকারী কনটেন্ট।’

এইসবের মাঝেই খবর ছড়িয়ে পড়ল যে, একজন পরিদর্শক আসছেন। অফিসে শুরু হলো আতঙ্ক। সবাই ফাইল গুছাচ্ছে, দেয়ালে ‘আচরণবিধি’ পোস্ট করছে। পরিদর্শকের নাম কেউ জানে না। গুজব ছড়ালো যে, তিনি নাকি ‘নাক সাহেবেরও উর্ধ্বতন’। আমি মনে মনে খুশি হলাম এই ভেবে যে, তিনি হয়তো আমার নাককে কঠোরভাবে বলবেন, ‘নিজের জায়গায় ফেরো, এটা হুকুম!’

দুপুর গড়াতেই একজন এসে ঢুকল অফিসে। নাম বলল—হেলাল হাফিজ, বয়স পঁয়ত্রিশের মতো। খাটো গড়ন, চোখে যেন চিরস্থায়ী এক ঠাট্টার রেখা। রিসেপশন থেকে ফিসফিসে গুজব ছড়িয়ে পড়ল। এই যে লোকটি এসেছে, এ-ই নাকি সেই ‘পরিদর্শক’, নাম তার হেলাল, লোকে বলে হ্লেস্তাকভ।
নিজেকে ‘পরিদর্শক’ বলে পরিচয় দিয়ে সে অনায়াসে বড় চেয়ারে গা এলিয়ে বসল। বস পাভেল প্রায় শ্রদ্ধাভরে তাকে ভিআইপি কফি এগিয়ে দিলেন। তারপর গর্বের সঙ্গে দেখাতে লাগলেন ‘ডেড সোলস ২.০’।
হেলাল অর্থাৎ হ্লেস্তাকভ ঠোঁটের কোণে এক অস্পষ্ট হাসি টেনে সবকিছু দেখল, যেন আগেই জানত কী দেখবে। তারপর ধীরে বলল, ‘মন্দ না। তবে কোটগুলো বদলান। নতুন যুগে কোট পাতলা হওয়াই ভালো। যাতে প্রয়োজনে সহজে খুলে ফেলা যায়।’
আমি চুপিচুপি তার কাছে গিয়ে বললাম, ‘স্যার…, আপনি কি সত্যিই পরিদর্শক, নাকি কেবল অভিনয়?’
সে চোখ কুঁচকে তাকাল। ‘তোমার নাক আছে?’
‘না।’
সে হালকা হেসে বলল, ‘তাহলে আমি তোমার কাছে আসল। যারা গন্ধ পায় না, তারা শেষ পর্যন্ত শব্দকেই সত্যি বলে মানে।’

সন্ধ্যার দিকে আরেকজন এলেন। নিজেকে আসল পরিদর্শক বলে পরিচয় দিলেন। কিন্তু ততক্ষণে ‘আসল’-এর সংজ্ঞা বদলে গেছে। কেউ তাকে বিশ্বাস করল না; বরং ভুয়া ভেবেই এড়িয়ে গেল।
তিনি কাগজপত্র চাইলেন। ডেটা, দরখাস্ত, প্রমাণ—কেউ কিছুই এগিয়ে দিল না। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে তিনি নীরবে ফিরে গেলেন।

আর অফিসপাড়ায় তখন এক অদ্ভুত হাসির ঢেউ ছড়িয়ে পড়েছে। যেন সবাই মিলে ভুলটাকেই সত্যি হিসেবে উদ্‌যাপন করছে।

হেলাল ওরফে হ্লেস্তাকভ ফাঁকে অর্ডার সই করিয়ে নিল। আমাদের ডেড সোলস ২.০ তার কোম্পানির সাবকন্ট্রাক্টর হয়ে গেল। সে চলে যাওয়ার সময় আমাকে বলল, ‘নাককে ফিরে পেতে চাইলে কোট কিনো না। নাক দপ্তরে গিয়ে ফাইলে নিজের গন্ধ জমা দাও।’
‘গন্ধ কোথায় পাব?’
সে বলল, ‘তুমিই গন্ধ, শুধু কাগজ নেই।’

সেই রাতেই আমি গন্ধনীতি অনুবিভাগে গেলাম। গার্ড বলল, ‘আজ নথি গ্রহণ বন্ধ।’ আমি বললাম, ‘খুব জরুরি।’
তিনি বললেন, ‘এখানে জরুরির বালাই নেই।’
আমি চুপ করে গেলাম।

তখনই করিডোরে এক জীর্ণ মানুষকে চোখে পড়ল। মলিন কোট গায়ে, হাতে এক পুরোনো টুপি ধরা। ধীরে ধীরে হেঁটে যাচ্ছিলেন। তাকে দেখে মনে হলো, আগে কোথায় যেন দেখেছি! তিনি আকিব নন, তবু যেন আকাকির এক অদ্ভুত ছায়া।
হঠাৎ থেমে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘কোট নেই?’
আমি উত্তর দিলাম, ‘নাক নেই।’
তিনি মৃদু হেসে বললেন, ‘আমারও কোট নেই। দোকানদার কিস্তি বন্ধ করে দিয়েছে। তবে একটা কথা মনে রেখো। তোমার নাক যতদিন উর্ধ্বতন, ততদিন তুমি নিজেরই অধস্তন।’
আমি কিছুটা বিভ্রান্ত হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘তাহলে আমি এখন কী করব?’
তিনি শান্ত স্বরে বললেন, ‘গল্প লেখো।’
‘গল্প?’
‘হ্যাঁ, গন্ধের গল্প। গন্ধকে গল্প করলে অফিস হয়তো গ্রহণ করবে না। কিন্তু নাককে মাধ্যম করে লিখতে পারো। ওরা তো গল্পের গন্ধই বেশি পছন্দ করে।’

ঘরে ফিরে আমি ‘নাক-দপ্তর’ শিরোনামে লিখতে বসি। লিখি

“এক শহরে সব নাক উর্ধ্বতন পদে যোগ দিল। নাগরিকেরা হয়ে গেল গন্ধহীন। অথচ ভোটে গন্ধ, বাজারে গন্ধ, পত্রিকায় গন্ধ—সবখানেই গন্ধের প্রভাব। এরা সবাই এখন উর্ধ্বতন। একদিন এক নাকবিহীন নাগরিক গিয়ে বলল, ‘আমার নাক ফেরত চাই।’
নাক জবাব দিল, ‘আমাদের নৈতিকতা আছে। আমরা ব্যক্তিগতভাবে কারও কাছে ফিরি না।’
নাগরিক বলল, ‘আমি ব্যক্তি নই, আমি গল্প।’
এই কথা শুনে নাক যেন একটু নড়ে বসল।”

লিখতে লিখতে হঠাৎ খেয়াল করলাম যে, জানালার কাঁচে এক হালকা আবছা দাগ। যেন কেউ আঙুল বুলিয়ে গেছে। দাগটা ভেজা, একটু নোনতা।

এই শহরে অফিসের বাইরে সেন্ট পিটার্সবার্গের নেভস্কি প্রসপেক্ট নেই বটে, তবু গুলশান এভিনিউ আলোয় ঝলমল করছে। সেই আলোয় মানুষগুলো কোটের ভেতর নিজেদের ছোট ছোট উচ্চতায় নিয়ে হাঁটে। ফেসবুকে তাদের হাজারো বন্ধু, কিন্তু হাঁটার সময় তাদের ছায়াও যেন সংকুচিত হয়ে আসে।

আমিও হাঁটতে বেরোলাম। রাস্তার মাঝখানে এক বিশাল বিলবোর্ডে চোখ আটকে গেল— ‘তোমার নাক তোমার সাথেই আছে, সুগন্ধির মাসিক সদস্য হও।’

অজান্তেই হেসে ফেললাম। আমরা এমন এক সময়ে বেঁচে আছি, যেখানে গন্ধও কিনতে হয়। গন্ধের মালিকানা এখন কোম্পানির হাতে। শুধু স্মৃতিগুলোই এখনও আমাদের নিজস্ব।

পরের দিন সকালেই ‘ডেড সোলস ২.০’-এর উদ্বোধন। পাভেল মঞ্চে বসে আছেন, তার পাশে চিচিকভ। পেছনের বিশাল স্ক্রিনে মৃত প্রোফাইলগুলোর ‘হৃদস্পন্দন’। ছোট ছোট সবুজ বার উঠানামা করছে, যেন নিঃশ্বাস নিচ্ছে।

ঘোষণা ভেসে এল—‘দেশের গল্প, দেশের ডেটা।’

হঠাৎ নিজেকে সামলাতে না পেরে মাইকের সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। বললাম, ‘এই প্রোফাইলগুলো কার? কেউ কি অনুমতি দিয়েছে?’
পাভেল মৃদু হেসে বললেন, ‘তুমি খুবই আবেগপ্রবণ।’
চিচিকভ ঠান্ডা গলায় যোগ করলেন, ‘মৃতেরা রাগ করে না।’
আমি থামলাম না—‘তাহলে জীবিতদের রাগ?’
পাভেল কাঁধ ঝাঁকিয়ে বললেন, ‘তারা ব্যস্ত।’

ঠিক তখনই মঞ্চের নিচ থেকে যেন আকিবের কণ্ঠ ভেসে এল। দূর, খুব দূর থেকে— ‘আমার কোটটা ফেরত দাও।’
আমি তাকালাম। কোথাও কেউ নেই।

শুধু মনে হলো, বাতাসে ভেসে আছে এক ওভারকোটের সূক্ষ্ম সুতো; জলের উপর হালকা দুলছে।
সেই রাতে পরিদর্শকের নোটিশ এল—‘আপনার গন্ধ-প্রোফাইল জমা দিন।’

আমি ফাইল খুলে লিখতে শুরু করলাম: “ভোরের মাটির গন্ধ যেন ভেজা রুটির উষ্ণতা ছুঁয়ে যায়। ভোঁদড়মাছের বাজারের তীব্রতা—অদম্য কোনো ইচ্ছার মতো নাকে লাগে। বৃষ্টির আগে বিদ্যুতের গন্ধে মনে হয় ভেতরে কোথাও খসখসে অস্থিরতা জমছে।
শোকের কাপড়ে লেগে থাকা ন্যাপথলিন আমাকে মনে করিয়ে দেয় দীর্ঘস্থায়ী রাজনীতির স্তব্ধতা। কফির উষ্ণতাকে আজকাল মিথ্যা বন্ধুত্বের মতো মনে হয়; কিছুটা কাছের, তবু ভেতরে ফাঁপা।
চায়ের স্টলে ভেজা খবরের কাগজের কালি যেন অফিসে পরিদর্শকের আগমনের পূর্বাভাস। ওভারকোটের আস্তরণের প্লাস্টিক যেন স্রেফ ভদ্রতার শব্দহীন আবরণ। আর ডেড সোলস সার্ভারের কুলিং ফ্যান, সেটা যেন অধীর আত্মাদের অদৃশ্য শ্বাস।”

ফাইলটি আপলোড করলাম। কিছুক্ষণ পর রিসিভ মেইলে উত্তর এল, ‘আপনার গন্ধ-চরিত্র সন্তোষজনক।’
বিস্মিত হলাম। নাক না-থেকেও গন্ধ-চরিত্র! তখনই যেন বুঝতে পারলাম যে, গন্ধ আসলে শরীরের নয়, স্মৃতির।

পরদিন অফিসে গিয়ে দেখি নাক-সাহেব বদলি হয়ে গেছেন। তার নতুন পোস্টিং জেনারেল ম্যানেজার হিসেবে। তার চেম্বারের দরজায় এখন এক অদ্ভুত শূন্যতা ঝুলে আছে।
রিসেপশানিস্ট নিচু গলায় বলল, ‘তিনি আর কারও ব্যক্তিগত নাক নন; এখন তিনি জাতীয় নাক। একটা ব্র্যান্ড অ্যাসেট।’

আমি দরজার কাঁচে নিজের প্রতিচ্ছবি দেখলাম। কপাল সমতল, কিন্তু দৃষ্টিতে যেন অচেনা এক তীক্ষ্ণতা। মনে হলো, দেশে যত নাকই উর্ধ্বতন হয়ে উঠুক না কেন, আমরা যারা নাকহীন, তাদের গল্প তবুও থেকে যায়। আর সেই গল্পে গন্ধ থাকে। আর গল্পে গন্ধ থাকলে, নাকেরাও অস্বস্তি বোধ করে।

একদিন হেড অফিস থেকে এমডি সাহেব এলেন। পেছনে পেছনে আমরা তাকে ডাকি মহান ফাঁপা ব্যক্তি বলে।
এসেই তিনি স্যাঁতসেঁতে, ভারী কণ্ঠে বললেন, ‘কনটেন্টে উচ্ছ্বাস কম কেন?’
কথাটা শুনে সবাই যেন আঁতকে উঠল। তার উপস্থিতিই এমন যে, ভয় যেন নিঃশ্বাসের সঙ্গে ছড়িয়ে পড়ে। এ-ই তার কাজ, ভয়কে নিয়মে পরিণত করা।
তিনি আবার বললেন, ‘রাস্তার স্ল্যাবের ফাঁক দিয়ে হাসি বেরোচ্ছে। ওগুলো সিমেন্ট দিয়ে বন্ধ করে দাও।’
আমি একটু থেমে বললাম, ‘হাসি কি ফাঁক দিয়ে বেরোয়?’
তিনি নির্লিপ্ত স্বরে জবাব দিলেন, ‘হাসির কোনো জায়গা নেই। এখন শুধু ইমোজি আছে।’

আমি চুপ করে গেলাম। মনে মনে ভাবলাম যে, নিকোলাই গোগল যদি আজ বেঁচে থাকতেন, তাকে দেখে কী লিখতেন? হয়তো লিখতেন: ‘মহান ব্যক্তি আসলে ফাঁপা; তার ওভারকোটের ভেতর কেবল বায়ু। সেই বায়ুতে কোনো ঘ্রাণ নেই, শুধু শব্দ আছে।’

এইসবের মাঝেই আমি ডায়েরি লেখা শুরু করলাম। শিরোনাম দিলাম—’এক নাকহীন লোকের পাগলামি’। সেখানে ছোট ছোট পিঁপড়ের সারির মতো বাক্য সাজালাম—
“আজ পয়লা বৈশাখ। আমি কোনো গন্ধ পাইনি। তবু দেখেছি মিষ্টির বাক্সের ভেতর ন্যাপথলিন লুকিয়ে আছে। আজ রাস্তায় অদ্ভুত শান্তি, কারণ মানুষ নেই। আজ স্বপ্নে মাকে দেখলাম। তিনি ওভারকোট গায়ে চাপিয়ে বললেন, ‘বাবা, কাঁধে কোট রেখো, কিন্তু ভেতরে কব্জির রক্ত যেন গরম থাকে।’”

একদিন দেখি, আমার সেই ডায়েরিটা নেই। কেউ চুরি করে নিয়ে গেছে। এখন নিয়মই এমন যে, চুরি যাওয়া ডায়েরিও পণ্য হয়ে ওঠে। আমার পাগলামি রূপ নিল কনটেন্ট সিডিউলে। নাকহীন শহরের নোটস।
পাভেল হেসে বলল, ‘দারুণ! তোমার পাগলামি বেশ ক্লিক পাচ্ছে।’

তখনই ঠিক করলাম, চিচিকভকে একটু ফাঁকি দেব। ডেড সোলস ২.০-এর কারখানায় ঢুকে মৃত প্রোফাইলগুলোর জন্য একটা ফেরার পথ আঁকলাম। ছোট্ট একটা বাটন— Un-ghost। সেটায় চাপ দিলে তাদের পুরোনো ইমেইলে যাবে এক মৃদু বার্তা:
‘ফিরে আসতে চান?’
প্রথম রাতেই দশজন ফিরে এল। তারা পোস্ট করল: ‘আমরা মরি নাই।’

পরদিন অফিসে তোলপাড়। পাভেল রাগে লাল। আর চিচিকভ ঠান্ডা স্বরে বলল, ‘ফিরে আসারাও উপকারী। ওরা লাইভ রিগর মর্টিস। অর্থাৎ জীবিত অবস্থায় মৃতের মতো শক্ত, নিস্তেজ।’

হঠাৎ ভীষণ ক্লান্ত লাগল। বুঝলাম, আমার বিদ্রোহও এখন বিপণনের অংশ হয়ে গেছে।

ঠিক তখনই যেন দূর থেকে নিকোলাই গোগলের হাসি ভেসে এল। সেই হাসির ভেতরে অদ্ভুত এক কান্নার সুর মিশে আছে।

সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরতেই নাক-দপ্তর থেকে একটি চিঠি পেলাম। খাম খুলে দেখি যে, ভেতরে এক অদ্ভুত গন্ধ-কার্ড। তাতে লেখা: “আপনার নাক আপনাকে ১৫ মিনিটের জন্য ফেরত দেওয়া হলো। এটি আপনার মনুষত্ব যাচাই।
সময়: আজ রাত ১২টা–১২টা ১৫। শর্ত: কোনো রেকর্ডিং নয়, কোনো রিপোর্ট নয়। আপনি কেবল গন্ধে সাক্ষ্য দেবেন।”

আমি ঘড়ির দিকে তাকালাম। রাত বারোটার ঠিক আগমুহূর্তে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালাম। শহর তখন আধো-ঘুমে ঢুলছে। মসজিদের মিনারের ফাঁক গলে বাতাস নেমে আসছে—ধীরে, নিঃশব্দে।

বারোটা বাজতেই বাতাস যেন একটু উষ্ণ হয়ে উঠল। আর তারপর…হঠাৎই নাক ফিরে এল। ফিরেই সে আমাকে গন্ধে ভরে দিল।

আমি গন্ধ পেলাম—মাটির, দূরের ঝড়ের, ভেজা কাঁথার, শিশুর বুকের ঘামের; লজ্জার, অপরাধের, কাঁদতে-চাওয়ার, থেমে-যাওয়ার। তখন বুঝলাম যে, গন্ধে শহর লেখা থাকে। অথচ সেই লেখা কোথাও লিপিবদ্ধ নয়।

কাঁপতে কাঁপতে ডায়েরি খুলে লিখলাম, “আজ এক বৃদ্ধার চুলে সরিষার তেলের গন্ধ। তিনি বোধহয় সন্তানের অপেক্ষায়। আজ কোর্টের করিডোরে স্পিরিটের গন্ধ, যেন অভিযোগগুলো ধুয়ে ফেলা হয়েছে। আজ ওভারকোট সেন্টারে নতুন কোটগুলোর প্লাস্টিকের গন্ধে পুরোনো স্বপ্নের ছদ্মবেশ। আজ সার্ভারের কুলিং ফ্যান যেন মৃত ডেটার নিঃশব্দ ঘুম। আজ রিকশার সিটে চুন-সিমেন্ট যেন নতুন দেয়াল উঠছে, কথা আটকে যাবে। আজ নদীর ধারে ডুমুর গাছের ফল পচে মিষ্টি হয়ে উঠছে। এই তো জীবন।”

ঘড়িতে ১২টা ১৫। নাক আবার উর্ধ্বতনের দিকে ফিরতে চাইল।
আমি ফিসফিস করে বললাম, ‘আরেকটু থাকো…’
সে শান্ত স্বরে বলল, ‘আমাকে প্রটোকল মানতে হবে।’
‘তুমি তো আমারই।’
‘না, আমি জাতীয় সম্পদ।’
আমি থেমে গিয়ে বললাম, ‘তাহলে সেই জাতীয় সম্পদকে বলো যে, আমাদের জীবনে যেন একটু গ্রামোফোনের পুরোনো গান ঢুকতে দেয়… গন্ধের ভাষায়।’
নাক কিছুক্ষণ নীরব রইল।
তারপর ধীরে বলল, ‘শর্ত ভেঙো না। তবে তুমি লিখে যাও।’

নাক চলে গেল। কপালের জায়গায় আবার নেমে এল একধরনের শান্তি—নিঃশব্দ, কিন্তু অর্থহীন। তবু বুঝলাম, গন্ধ হারিয়ে যেতে পারে, স্মৃতি নয়।

হঠাৎই দৌড়ে গেলাম ওভারকোট সেন্টারের দিকে। রাত অনেক হয়েছে, দোকান বন্ধ। তবু ভেতরে আলো জ্বলছে। দরজা ঠেলে ঢুকতেই দেখলাম যে, দোকানদার নেই। দেয়ালে ঝোলানো কোটগুলোও যেন আর কোট নয়; নিজেদের ছায়ার ভেতর নিঃসাড় হয়ে ঝুলে আছে।
এক কোণে পড়ে আছে একটি পুরোনো, ছেঁড়া কোট। এ কি আকিবের? ধীরে হাত বুলালাম। কোটটা নরম। কাঁধ ভেজা। আমি সেটি গায়ে তুলে নিলাম।

আর তখনই বুঝলাম যে, কোট মানুষকে ঢাকে না; মানুষই কোটকে উষ্ণতা দেয়।
কোট পরে বাইরে বেরোলাম। রাস্তায় বাতাস বইছে। সেই বাতাসে নীরবতা। আর নীরবতার নিচে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র শব্দ—অস্পষ্ট, তবু স্পষ্টের চেয়েও সত্য।
কেউ বলছে, ‘আমরা মরি নাই।’ কেউ ফিসফিস করে, ‘আমরা বাঁচি নাই।’ কেউ কেবল দীর্ঘশ্বাসের মতো বলে ওঠে—‘হুঁ…’

পরদিন সকালে ডিএমবি-তে গিয়ে পদত্যাগপত্র জমা দিলাম। পাভেল অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘কেন?’

আমি বললাম, ‘মৃত প্রোফাইলে আর কালির গন্ধ দিতে পারছি না।’

চিচিকভ হাততালি দিয়ে উঠল, ‘চমৎকার! তুমি অথেন্টিসিটি খুঁজছো। এসো, আমার দলে যোগ দাও। আমরা জীবিত প্রোফাইল কিউরেট করব।’

আমি মাথা নাড়লাম, ‘না। আমি গল্প কিউরেট করব—গন্ধে।’

পাভেল হেসে বলল, ‘বেশ রোম্যান্টিক।’
আমি শান্ত গলায় বললাম, ‘গন্ধ ছাড়া রাজনীতি অন্ধ। আর গল্প ছাড়া সরকারি বিজ্ঞপ্তিও হাস্যকর।’

আমি বেরিয়ে এলাম। রাস্তায় একদল মানুষ সাদা কাগজ উড়াচ্ছে। সব কাগজ ফাঁকা, তবু অদ্ভুতভাবে গরম। কাগজগুলো হাতে নিলেই ছ্যাঁকা লাগে। যেন অদৃশ্য কোনো লেখা ভেতরে জ্বলছে। মনে পড়ল—গোগোলের শহরে কাগজও ছিল চরিত্র। আর আমাদের এই ঢাকা শহরে, পিডিএফ-ও এখন চরিত্র হয়ে গেছে—নিঃশব্দ, অথচ প্রভাবশালী।

রাস্তার শেষে গুলশান লেকের ধারে ছোট্ট এক পার্ক। নাম— মরুভূমির সিঁড়ি। এমন নাম কে দিয়েছে? আহমদ ছফা, নাকি সলিমুল্লাহ খান? নাকি কোনো নামহীন পথিক?

সেখানে এক শিশু বেলুনে ফুঁ দিচ্ছে। বেলুনের গায়ে লেখা: “আকাশ জনসাধারণের সম্পত্তি।”

আমি তার কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম। বললাম, ‘তুমি গন্ধ পেতে চাও?’
সে চুপচাপ মাথা নাড়ল।

আমি বললাম, ‘চোখ বন্ধ করো। গভীর শ্বাস নাও… এখন তুমি পাবে—চায়ের দোকানের ধোঁয়া, বইয়ের কালি, মায়ের আঁচল, নদীর সোঁদা, ওভারকোটের আস্তরণ, স্পিরিটের তীব্রতা—সব একসাথে… দম ধরে রাখো… আরেকটু… এই তো… এবার চোখ খুলো।’

শিশুটি চোখ মেলে তাকাল। তার হাসি ভোরের শিশিরের মতো নরম। সে ধীরে বলল—‘এটা বাংলাদেশ।’

রাতে ফিরে কুয়াশা-ঢাকা জানালার কাঁচে লিখলাম: “আজ নাক ছিল পনেরো মিনিট; বাকি সময়টুকু স্মৃতি।”

তার পাশে: “আজ গায়ের কোট ছিল দ্বিধায়; বাকি সময়টা কাঁধ নিজেই।”

আর একটু দূরে: “আজ মৃত প্রোফাইলেরা বলল যে, আমাদের নাম ধরে ডাকো। আমরা ফিরতে চাই। আমরা গল্প হতে চাই।”

জানতাম, এই লেখার কোনো ফাইল নম্বর নেই। কোনো কিউআর কোড নেই। তবু এটাই আমার ওভারকোট। আমি সেটাকে কাঁধে চাপালাম। পাতলা, তবু ভেতরের রক্ত গরম রাখে। তারপর গভীর নিঃশ্বাস নিলাম। গন্ধ নেই, কিন্তু স্মৃতি আছে।

মাথার ভেতর গোগোলের হাসি ভেসে উঠল। সেই হাসি মৃদু, তীক্ষ্ণ, কোমল। এক অদ্ভুত গম্ভীরতায় ভরা, যেন কোনো কার্টুনের মুখে লুকানো গভীর সত্য।
আমার নাসিকা রয়ে গেল ঊর্ধ্বমুখী অহংকারে। কোটের ভাঁজে জমে থাকল নীরবতার সুর। ডায়েরির পাতায় লেগে থাকল গোপন চুরির ছাপ।

আর শহর—

সে ঘুমিয়ে রইল ডেড সোলস ২.০-এর ব্যস্ত পাখার একঘেয়ে গুঞ্জনে। যেখানে স্বপ্নগুলো ক্লান্ত, তবু জেগে থাকে— অদৃশ্য, অনামা গল্পের প্রহরায়।
কিন্তু আমার জানালার ফাঁকে, রাত যখন শেষ হয়ে ভোরের দিকে ঢলে পড়ে, এক অদৃশ্য পরিদর্শক এসে খুব নিচু স্বরে ফিসফিস করে বলে, ‘তুমি গন্ধ দিয়ে লিখেছ। তুমি সাক্ষ্য দিয়েছ। এখন শুধু লিখে যাও।’

আশানুর রহমান

পেশায় ব্যাংকার আশানুর রহমান ছাত্র জীবনে পরিবর্তনবাদী রাজনীতির সাথে যুক্ত ছিলেন। তার একমাত্র উপন্যাস "লেনিন" পাঠকমহলে ব্যাপক সাড়া ফেলে এবং এ উপন্যাসের জন্য তিনি আন্তর্জাতিক ক্রিয়েটিভ আর্টস অ্যাওয়ার্ডে ভূষিত হয়েছেন। এছাড়া প্রকাশিত হয়েছে তার গল্পগ্রন্থ "ভোর ও বারুদের গল্প" এবং এক মলাটে দুটি নভেলা "প্রথম প্রেম ও ছায়ার আঙিনা"। তিনি লেখালেখির উঠানের সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ভাষা
Scroll to Top