Home » সুকুমার রায়ের দ্রিঘাংচু আসলে কে? // মাহীন হক

সুকুমার রায়ের দ্রিঘাংচু আসলে কে? // মাহীন হক

একটা ভান-ধরা, আত্মম্ভরি রাজদরবার। এর মাঝখানে এক আচানক তালভঙ্গকারী আওয়াজ। সিংহাসনের ডানদিকের থামের ওপর বসে এক কাউয়া ডাক ছাড়ে, “কঃ”। তাতে মন্ত্রীর বক্তৃতার খেই হারিয়ে যায়, কারো হাতের চামর গিয়ে পড়ে মহারাজের মাথায়, ঘুমে ঢুলুঢুলু রাজার তন্দ্রা ছুটে যায়। একটা বিশ্রী বিঘ্ন। ডিসরাপশন। কার এত বড় সাহস, কে এই অনাহূত কাক? মন্ত্রী, পণ্ডিত, কর্মচারী সবার মাথা নষ্ট হয়ে যায় তার পরিচয় বের করতে। এরমধ্যে এক “রোগা সুঁটকো লোক” দরবারে ঢুকে রাজাকে জানায়, সেই কাক সাধারণ কেউ না, দ্রিঘাংচু। সে রাজাকে একটা মন্ত্র শিখিয়ে যায়, যা দ্রিঘাংচুর সামনে পড়লে সে তার আসল রূপে হাজির হবে: “হলদে সবুজ ওরাং ওটাং/ইঁট পাটকেল চিৎ পটাং/মুস্কিল আসান উড়ে মালি/ধর্মতলা কর্মখালি।” তাতে কী লাভ হলো? দ্রিঘাংচুর পরিচয় এতে রাজাও বা কী বুঝলো আর আমরাও বা কী বুঝলাম?   

যাক, দ্রিঘাংচুর প্যাঁচটা পরে ছোটানো যাবে, তার আগে একটু পথভোলা হই, একটা ডিট্যুর নেই। বলি অন্য আরেকজনের কথা। একজন না আদতে, বরং চৈতন্যের এমন এক দশা, যা ভিন্ন ভিন্ন যুগ ও জায়গার গল্পে আলাদা আলাদা রূপ নিয়ে হাজির হয়। দ্য ট্রিকস্টার। একজন আর্কেটাইপ। ধূর্ত, চতুর, ধুরন্ধর একটা চরিত্র। গ্রিসে সে হাজির হার্মিস কিংবা প্রমিথিউসরূপে। দেবতাদের অমান্য করে, নাকের ডগা দিয়ে আগুন নিয়ে আসে মানুষের জন্য যে। নর্স মিথে সে লোকি, চূড়ান্ত ফটকা ও নানা বেশধারী। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দেবতাদের দাপট ক্ষীণ হয়ে আসলেও সে হারিয়ে যায় না। চিবিলে ঢুকে পড়ে রাজদরবারে, ভাঁড় হয়ে। দ্য ফুল। হাসিঠাট্টার আড়ালেই রাজার গাম্ভীর্যের ভানে ফাটল ধরাতে থাকে। ভাঁড় যতবার মুখ খোলে, ততবারই রাজার সমস্ত গাম্ভীর্যে সংশয় রুয়ে দেয়, তার নিশ্চয়তার নির্দ্বিধ পর্দায় ফুটার পর ফুটা করে দিয়ে যায়, যাবতীয় মসৃণ সার্ফেস হযবরল করে দেয়। ক্যাম্পবেল বলেন, অচেতনের মতই ট্রিকস্টার আচানক উপচে ফেটে বের হয়, সচেতন বুদ্ধির সমস্ত শৃঙ্খলা ওলটপালট করে দিয়ে। রাজা তা সহ্যও করে। তার নিজের অস্তিত্বের পূর্বশর্ত ভাঁড়ের গায়ে হেলান দিয়ে থাকে। রাজা তাকে বেতন দেয়ই এজন্য যেন, দরবারের গুমোট আবহাওয়া, হাই টেনশন একটু ছাড়া পায়। হাসিমজার আড়াল দিয়ে যেন ভেন্টিলেশনটা হয়ে যায়। কেননা, হাসি হলো পারস্পরিক নিরস্ত্রীকরণ। জানোয়ার-জগতেও তা সত্য: যে হাসে, সে কামড়াতে পারে না। ফলে, রাজদরবারের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সদস্য এই ফুল। এরই ফাঁক দিয়ে যে নীতির ওপর রাজার শাসন দাঁড়িয়ে আছে, তা এই দরবারি ভাঁড়, কিংবা সভাকবি প্রশ্নে টলমল করে দেয়। দেখিয়ে দেয় যে, প্রতিটা সরলরেখার গায়ে আছে অসংখ্য খাঁজকাটা, প্রতিটা পরিপূর্ণ যন্ত্রের ভেতর বহু অকেজো নাটবল্টু, যেকোনো গম্ভীর বয়ানের অন্তরালে বিশদ আবোলতাবোল। দুনিয়ার তাবৎ গল্পে এই যুগলকে আপনি একসাথে পাবেন। কৃষ্ণচন্দ্রের বগলে গোপাল ভাঁড়, আকবরের সাথেই বীরবল, অষ্টম হেনরির পাশে উইল সমার্স।

রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের ওয়াদা মোতাবেক পুরস্কারের আশায় যখন এক গরিব চাষা মাঘ মাসের সারা রাত দিঘীতে গলা চুবিয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন, তখন রাজা বলেন যে দূরের প্রাসাদের মশালের উত্তাপে নাকি সে উষ্ণ রেখেছিল নিজেরে, ফলে পুরস্কার বাতিল। পরদিন গোপাল দরবারে যায় না, বলে, তালগাছের আগায় বাঁধা খিচুড়ির হাঁড়ি যখন গোড়ার আগুনে রান্না হবে, তখনই যাবে। রাজার যুক্তি বাঁকিয়ে তার দিকেই তাক করে গোপাল। বীরবলকে বাদশাহ আকবর তার মজার স্বপ্নের কথা শোনায়, যে দুইজন একসাথে হাঁটতে হাঁটতে বীরবল পড়ে গেল পায়খানার গর্তে, আর নিজে পড়ল মধুর গর্তে। বীরবল বলে, স্বপ্নের বাকি অংশটুকু তিনি দেখেছেন, যে দুইজন গর্ত থেকে উঠে একে অপরের শরীর চেটে পরিষ্কার করে দেয়। এই স্ক্যাটোলজিকাল উপাদান, হাগুমুতু, খুবই স্বাভাবিক অনুষঙ্গ ট্রিকস্টারদের গল্প। সভ্য দুনিয়া যাকিছু নজরের আড়ালে, মাটির তলে চালান করে দিতে চায়, তারেই উপরিতলে ভাসিয়ে আনে সে। আবার, পারস্যের শাহ যখন জিজ্ঞেস করেন যে দেশে খাদ্যসংকট চলছে কিনা, করিম শি’রেই মাথা নেড়ে বলেন, জি মহারাজ, সেজন্যই তো আপনি দিনে মাত্র পাঁচ বেলা খাচ্ছেন।

এ তো গেল কেবল দরবারি ভাঁড় কিংবা বিদূষক হিসেবে ট্রিকস্টারের অবতারদের কয়েকটা গল্প। এমন বহুবিধ যে চরিত্রের অবতার, তার ব্যাপারে নিশ্চিত করে কিছু বলাও তো মুশকিল। তাদের গল্পগুলারও অকাট্য কোনো সূত্র সবসময় পাওয়া যায় না। গল্পগুলা নিজেদের মধ্যেই তালগোল পাকিয়ে, সীমা মুছে দিয়ে এ-ওর গায়ে লেপ্টে যায়। একই গল্প হোজ্জার এবং তেনালি রামার বয়ানে পাওয়া বিরল কিছু না। কোন গল্প যে বীরবল থেকে গোপাল ভাঁড়ে গেছে, আর কোনটা যে ভাইস-ভার্সা, তাও বলা যায় না। তবুও, সব গল্পের মধ্যে মোটাদাগে এই ভাঁড়ের কিছু নিরেট খাসলত তো শনাক্ত করাই যায়: ক্ষমতার বিপরীতে একটা বিকল্প ভাষা তৈরি করা, যেইখানে সম্রাটের সার্বভৌমত্ব মুখ থুবড়ে পড়ে; নিশ্ছিদ্র রাজদরবারের দেয়ালে একটা চোরা জানলা কাটা, যেইখান থেকে জনগণের কথা গলে আসে চামেচুমে। ইয়ুং বলতেন, ট্রিকস্টার হলো চৈতন্যের সেই আদিম, ইতরবোধবিবর্জিত দশা, যা সমাজ সামষ্টিকভাবে পিছে ফেলে আসলেও, ব্যক্তির গহীনে তার অবশেষ থেকেই যায়। খামখেয়ালি। চিকনা বুদ্ধি দিয়ে ধরাশায়ী করে প্রবলকে। জাস্ট ফর দ্য সেইক অফ ইট। সে ভালো বা খারাপ না। নীতিনিরপেক্ষ, শিশুর নীতিবোধ দিয়ে চালিত। ফলে ইব্রাহিমি ধর্ম, তুলনামূলকভাবে যা শুভ-অশুভ’র মধ্যে স্পষ্ট ফারাক টানতে বেশি তৎপর, তা ট্রিকস্টারের বসার জন্য অতটা সাদর পাটি বিছাতে পারে না। যদিও ইবলিস কিংবা লুসিফারকেও কখনো কখনো সে আওতায় ভাবা হয়। তবে ট্রিকস্টারের সবচেয়ে স্পষ্ট যে বৈশিষ্ট্য, তা হল এদের ভোলবদলক্ষমতা ও সর্বত্রগামিতা। কোনো অর্গল নাই তারে রোধে, কোনো দুয়ার নাই তার দৃষ্টির অভেদ্য। স্মরণ করেন, কেমন বুদ্ধি খাটিয়ে আকবরের ঘুষখোর দারোয়ানকে ভুংভাং বুঝিয়ে ঠিকই দরবারে ঢুকে পড়ে সে, মারও খাওয়ায়। সবকিছুই তার নজরের সামনে স্বচ্ছ ঝিল্লি হয়ে পড়ে। দুনিয়ার তাবৎ চিপাচাপার অজস্র গল্পে অজস্র রূপে সে হাজির হয়। কমিকের দুনিয়ায় ব্যাটম্যানের সামনে দাঁড়িয়ে সে ঘোষণা দেয় যে সে এজেন্ট অফ কেওস। তাসও বাদ যায় না। তাসের ডেকগুলাতে যে জোকার কার্ড থাকে, বেশিরভাগ খেলাতেই তার তেমন কোনো কাজ নাই। অন্য কার্ড হারিয়ে গেলে সে ওই কার্ডের প্রক্সি দেয়। শেপশিফটার। ট্রিকস্টারের আদিম চরিত্রের একটা। ইতালিতে প্রবাদই ছিল, কেউ যদি সবখানে অনায়াসে ঢুকে মিলেমিশে যেতে পারত, তাকে বলা হত তারোচ্চির [ট্যারোট] ফুল। ট্যারোট কার্ডে তার কার্ড নম্বর শূন্য। তারে দিয়েই শুরু হয় ফুল’স জার্নি, কিন্তু সে নিজে সেই সংখ্যাক্রমে নাই। ট্রিকস্টার নিজে এরকমই। লিমিনালিটিতে তার নিবাস, দুই চূড়ান্ত প্রান্তের মধ্যিখান—প্রজ্ঞা ও পোংটামির, হাজিরা ও গায়েবানার। একটা অনিবার্য অবান্তর। অ্যান ইনেভিটেবল অক্সিলিয়ারি।

এত রূপান্তরের পরও, তার একটা আদিম হুলিয়ার খোঁজ পাওয়া যায়: দাঁড়কাক। কিংবা কাক। রামদয়াল দারোয়ান যারে কৌয়া বলে ডাকে। যেকোনো কাকের দিকে একবার তাকালেই বোঝা যাবে কেন। একটা সংযমী আভিজাত্য, আত্মপ্রসন্ন নাক-উঁচুপনা। তোমাদের যত বীর আছে, যত মহান পথিকৃৎ, যাদের বিরাট বিরাট ভাস্কর্য বানিয়ে খাড়া করায়ে রাখো, সে তাদের সবার মাথার ওপর হাগে। চারুকলায় এক থাল মাংসভাত এক মুহূর্তের জন্য অরক্ষিত রেখে দেখো না, পলকের মধ্যে কার পেটে যায় তোমার আমিষের উৎস। কমলাকান্তের বিলাইয়ের মত, সে জানে নিজের ভাগটুকু কেমনে বুঝে নিতে হয়। নিয়মকানুন সব ভেস্তে যাক। তারে নিয়ে অমিনাস আখ্যানেরও অভাব নাই। অস্ট্রেলিয়ার আদিম গল্পগুলিতে সর্বপ্রথম স্পষ্ট হয় তার চিহ্ন। তারপর সে উড়াল দেয়, পাড়ি দেয় আরো বহু ভূগল্প। খোদার ওপর খোদাগিরি করে। সৃষ্টিজগতকে তার খুঁতেল মনে হয়। সে পাল্টা নিজের মহানকশা সাজায়, বোনে স্বকীয় ক্রিয়েশন মিথ। সে আদমপুত্ররে শেখায় নিজের ভাইকে কবর দেয়ার তরিকা। নূহের জাহাজে সে ফেরত আসে না, প্লাবিত লাশ খেয়ে বাঁচে। এখানকার পুরাণে কাকভূশণ্ডি সে, ত্রিকালজ্ঞ; সময়ের ঢেউ তার উড়ালের তল দিয়ে বয়ে যায়, তার গায়ে কালের ছিটাও লাগে না। ঘটির তলানির পানিতে নুড়ি ফেলে ফেলে তৃষ্ণা মেটায়। পো’র জানলা দিয়ে ঢুকে মরা প্রেমিকার স্মৃতি ঘুটে দেয়, নিজ নিশ্চল ছায়ার ভারমগ্ন করে রাখে তার আত্মারে। জন্মদুয়ারে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করে নাঈভ নবাগত, কে আছে মৃত্যুর চেয়েও পরাক্রমশালী? বিটলা বায়স জবাবে বলে, আমি, আর কে?

কিন্তু এতক্ষণে আমরা আমাদের ভ্যান্টেজ পয়েন্ট থেকে এতদূর সরে আসছি, যে আমাদের ইটিনেরারি হয়ে উঠেছে প্রায় সেই ট্রিকস্টারের যাত্রাপথের মতই কুটিল। কিন্তু দুনিয়া তো গোল। সকল ভ্রমণ আমাদেরকে প্রথম ভ্রমের কাছেই নিয়ে আসে। কে এই দ্রিঘাংচু, সে কোথা থেকে আসলো? এতক্ষণে আমরা জানি, ট্রিকস্টার হলো চিরায়ত ছিদ্রান্বেষী, উভয় অর্থেই। সে খুঁত ধরে সৃষ্টিজগতে, আবার সমস্ত নিরন্ধ্র পরিসরে ছিদ্র করে ঢুকে পড়তে চায়। সিমশিয়ান আখ্যানে, দাঁড়কাক প্রথম পৃথিবীতে এসে দেখে সমস্ত জগৎ অন্ধকারে ঢাকা। সে আকাশে ফুটা করে স্বর্গে পৌঁছে যায়। একটা দারূপাতার রূপ নিয়ে স্বর্গের সরদারের কন্যার পেটে ঢুকে যায়, তাকে পোয়াতি বানিয়ে নিজে তার পুত্ররূপে ভূমিষ্ঠ হয়। স্বাভাবিকভাবেই, স্বর্গের সরদার নাতিকে ভালোবাসেন, আদরে রাখেন। কিন্তু নাতি খালি কাঁদে। নাতির কান্না ভোলানোর জন্য তাকে খেলতে দেয়া হয় একটা কৌটা, যার মধ্যে দিবালোক ভরা। এরপর একদিন বেচারা নানার আদর-ভালোবাসার বিনিময়ে পয়লা সুযোগেই নিজের আসল রূপে ফিরে সেই দিবালোক-পোরা কৌটা নিয়ে স্বর্গ হতে চম্পট দেয় আমাদের দাঁড়কাক। ট্রিকস্টার একজন অপোর্চ্যুনিস্ট। শব্দটার মধ্যিখানে যে ‘পোর’ আছে, তার অর্থও ফুটা, দুয়ার। এই দ্রিঘাংচুও এমন কোনো ব্যাখ্যাতীত ফুটা দিয়ে ঢুকে পড়ে রাজদরবারে। রাজাকে ব্যাকুল করে দিয়ে ফের হদিসহারা হয়ে পড়ে। এই হলো ট্রিকস্টারের দ্বিতীয় স্বভাব। যেসব ছিদ্র দিয়ে সে নিজে যাতায়াত করে, তার হদিস অন্যকেউ পেয়ে গেলে তো সে নিজে এমন বেশরা বোলচাল বজায় রাখতে পারবে না। তার পথ অননুসরণযোগ্য। তার পিছু নেয়া যায় না। যে রন্ধ্র সে তৈরি করে, বের হওয়ার পথে তা সে বন্ধ করে দিয়ে যায়। ‘পোর’-এর বিপরীত হলো অ্যাপোরিয়া। গ্রিক শব্দ, যার অর্থ মীমাংসাতীত দ্ব্যর্থকতা, কূটাভাস। সব দ্বার আচানক বন্ধ হয়ে যাওয়া। ল্যাদা হার্মিস সৎভাই অ্যাপোলোর গবাদিপশু চুরি করে যাওয়ার পথে এমন একটা খড়ম বানায় যাতে তার পায়ের চিহ্ন দেখে মনে হয় সে দশদিকেই যাচ্ছিল, হাঁটে আঁকা-বাঁকা করে, কিছুদূর পরপর সব চিহ্ন মুছে দেয়। অ্যাপোলো যেখানে দিব্যদৃষ্টির দেবতা, সকল ঘটনার গূঢ়ার্থ পাঠোদ্ধারে সক্ষম, হার্মিস সেখানে ঘোল-পাকানোর, পাক-খাওয়ানোর প্রতিভা হয়ে ওঠে। তার কাজকর্ম অ্যাপোলোর বিদ্যার আওতার বাইরে, যাবতীয় আক্ষরিকতা থেকে দূরে, যেমনটা আমরা আরো দেখি। অ্যাপোলো বেচারা বেবোধ হয়ে পড়ে। ট্রিকস্টারের ফেলে যাওয়া পদছাপ যে অনুসরণ করতে যায়, সে এমন গ্যাড়াকলেই পড়ে। রাজাও তেমনই কূলকিনারাহীন, মানসিক রুদ্ধতায় ফেঁসে যান দ্রিঘাংচুর ফেলে যাওয়া ডাকের অর্থোদ্ধার করতে গিয়ে, তার পিছু নিতে গিয়ে।

তো, দ্রিঘাংচু একজন ট্রিকস্টার। যার তারস্বর বিপন্ন করে রাজার দরবার। সিংহাসনের ডানদিকের থামের ওপর বসে, মাথা নিচু করে ডাক দেয়। হি লুকস ডাউন আপোন দ্য থ্রোন। আদতে সে কাক না, কাকের রূপ নিয়ে আসে। “দ্রিঘাংচু যখন রাজার সামনে আসে, তখন তাকে দেখতে দেখায় দাঁড়কাকের মতো।” অর্থাৎ, সে অন্যকেউ। আমার অনুমান, সেই রোগা লোক নিজেই দ্রিঘাংচু, রূপ বদলে আসছে। নাইলে রাজার রুদ্ধ দরবারে এত অনায়াসে কেমনে সে ঢোকে? রাজারে শিখিয়ে যায় অনর্থক একটা মন্ত্র। দ্রিঘাংচুরে ডাকার মন্ত্র নিশ্চয়ই কোনো গভীর বিদ্যাবুদ্ধি-বোঝাই পদ্য হবে না, হবে এমনকিছু যা নন-সেন্সের কিনারায়। তাই হয়। আর সেই হাস্যকর মন্ত্র রাজা যতবার আওড়ায়, ততবার সে নিজেই হয়ে ওঠে ভাঁড়, বিলক্ষণ হাস্যস্পদ। আমরা কি জানি না এইসব কাণ্ড কে ঘটায়? ট্রিকস্টার স্বয়ং।   

এইটা কষ্টকল্পিত কিছুও না। আশ্চর্য হওয়ার কিছু নাই যে, আখ্যান-ইতিহাসের সবচেয়ে পোংটা প্রত্নচরিত্রটা ঠাই পাবে বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে ফটকা লেখকের গল্পে। দ্রিঘাংচু তো একা না। ‘আবোল তাবোল’, ‘বহুরূপী’, ‘হযবরল’, সুকুমারের সবচেয়ে বিখ্যাত বইয়ের নামগুলা শুনেই তো মনে হয় একেকটা ট্রিকস্টার-প্রকল্প থেকে নেয়া। এবং কোনোভাবেই এদেরকে তার সময়ের ঔপনিবেশিক আছরের বাইরে থেকে পাঠ করা সম্ভব না। ১৮৫৭ সালের বিপ্লবের পর ইংরেজরা যখন প্রথম টের পায় খুব ছোট্ট একটা শিক্ষিত শ্রেণির বাইরে এই অঞ্চলের একটা বড় অংশের মানুষের ধ্যানজ্ঞান, লোকবিশ্বাস, আচার-আচরণ তাদের আওতার বাইরে, তথা অনিয়ন্ত্রণযোগ্য রয়ে গেছে, তারপর থেকে এই উপেক্ষিত দিকগুলাও ইংরেজরা নিজেদের একরোখা বয়ানের আওতায় নিয়ে আসার বহু কসরত শুরু করে, বলাই বাহুল্য, তাদের আরো কব্জায় আনার জন্য। এখানকার রূপকথার সংকলন হতে শুরু করে বাচ্চাদের শিশুসাহিত্যের দিকে মনোযোগী হওয়া সেই যজ্ঞেরই অংশ।

ঔপনিবেশিক আমলের কমিশনড শিশুসাহিত্যের মধ্যে মোটাদাগে প্রবল ছিল ভালো বাচ্চা বনাম খারাপ বাচ্চার একটা ট্রোপ সাজানোর প্রবণতা। গোপাল ভালো ছেলে, কারণ সে সময়মত পড়ালেখা করে, বড়দের কথা শোনে, নিয়মকানুন মেনে চলে, ফলে সে বড় হয়ে সফলকাম হবে। রাখাল বদখত, কেননা সে সারাদিন খেলে, নিয়ম মানে না, তার পরিণতি হবে ভয়াবহ। এতটুকু বাচ্চাদের মধ্যে এত বিরাট তফাৎ করাটা এমনিতেই ঝামেলার কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন করা গেলেও, কিছু কিছু ক্ষেত্রে উদ্দিষ্ট পাঠকদের নীতি-নৈতিকতা শেখানোর জন্য এইসব রাখাল চরিত্রের যে নির্মম নিয়তি দেখানো হত তা বাড়াবাড়ি ছিল নিঃসন্দেহে। আর অবশ্যই, এই নীতি-নৈতিকতার ছবকটা ইংরেজ প্রভুদের মর্জিমতই দেয়া হত। যারা নিয়ম মানে না, কেবল ঝামেলা পাকায়, অবশ্য, তারা তো বহিরাগত শাসকদের জন্য উৎপাতই। তারচেয়ে বরং ভালো নম্র, অনুগত, কানুনের তাপে ইস্ত্রিকৃত পোলাপান। পড়াশোনা নিজেও তো বেশ মোক্ষম এক পোষমানানো মন্ত্র। ১২৭৮ বঙ্গাব্দে ‘এডুকেশন গেজেটে’ তো ছাপাই হয়েছিল এক ইংরেজ সংবাদপত্রের কথা, যেখানে লেখা ছিল, “কোনো ইংরাজী ভাষাভিজ্ঞ ভারতবর্ষীয় লোক সিপাহী বিদ্রোহে যোগ দেন নাই। ইহাতেই সপ্রমাণ হয় যে ইংরাজী শিখিলে ইংরাজ গবর্ণমেণ্টের প্রতি দৃঢ়ভক্তি জন্মিয়া থাকে।” যাকগে, এই বিষয়ে পণ্ডিতি করা আমার অওকাতের বাইরে। আগ্রহীদের জন্য শিবাজী বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘গোপাল-রাখাল দ্বন্দ্বসমাস’ পড়ে দেখার আহ্বান থাকলো।

তো, সুকুমারের দুনিয়া তো সেই রাখালদের দিয়ে ভরা। তার প্রধান চরিত্র হল পাগলা দাশুরা, যারা পড়াশোনার চাইতে খুচরা বিটলামিতে বেশি আগ্রহী। যারা “ডানপিটে ছেলে/নির্ঘাত মার খাবে, নয় যাবে জেলে।” যেইখানে যেকোনো বিদ্যায়তনিক আঙিনাই ক্ষমতাবর্গের ফাঁদা ছক, সেইখানে সুকুমারের চরিত্ররা খুঁটি গাড়ে সকল ডিস্কার্সিভ আওতার বাইরের এক পাগলা পরিসরে। ডাকে, “আয় বেয়াড়া সৃষ্টিছাড়া/নিয়মহারা হিসাব্‌হীন” যেইখানে “খ্যাপার গানে/নাইকো মানে নাইকো সুর।” ট্রিকস্টারে গিজগিজ করে তার অমনিবাস, আর দ্রিঘাংচু তাদেরই একজন।

একসময় আমাদের শহরটাও এমন ছিল। জটপাকানো তারে, বাড়ির ছাদে, গাছের ডালে অজস্র উড়ুক্কু ট্রিকস্টার দুনিয়ার ভোঁতা গরিমাকে চেকে রাখত। আমাদের গোধূলি ও ভোরের স্যাঙাত হয়ে আসত তাদের কাকারব। এই কাকস্য কেওসের ওপর দিয়ে আমরা আরো ভারি কোনো ক্যাকোফনির মাদুর দিয়ে ধামাচাপা দিতে সক্ষম হয়ে গেছি। কেমনে পারলাম তা? কোথা হতে আমদানি করলাম এমন সর্বশক্তিমান কাকতাড়ুয়া, যে তারা সব পালিয়ে গেল চিকন চঞ্চু হতে মাংসের ক্ষীণ টুকরা ফেলে দিয়ে? আমরা কি সগর্বে পিঠ চাপড়ে দেব নিজেদের, যে আমাদের নগর-পরিকল্পনা এমনই পরিচ্ছন্ন ও নিশ্ছিদ্র, যে সহস্র বছরের সর্বত্রগামী এই সার্ভাইভরও আর কোনো ফাঁকফোঁকর পাচ্ছে না ঢোকার?

স্লটারহাউজ-ফাইভ বইটার শেষে, একটা পাখি হাজার হাজার টন বোমাবর্ষণের পরকার ড্রেসডেনের এক ধ্বংসস্তূপের ওপর বসে ডাক দেয়, “পু-টু-ইট।” সুকুমারের দ্রিঘাংচু একটা ছিমছাম রাজদরবারে ঢুকে ডাক দেয়, “কঃ।” এরা বিপরীত প্রান্তের কোনো দৃশ্য না, বরং পূর্বাপরের। সকল সাজানো-গোছানো সাম্রাজ্য বা নগর যে ধ্বংসস্তূপ, যে আস্তাকুড় লুকিয়ে রাখে, তারই বাসিন্দা এই কাকেরা। দ্রিঘাংচুর এই সন্ততিদের বিলুপ্তিতে, আমাদের এই স্বস্তির অপরপিঠের অন্ধবিন্দুগুলা দেখানোর কেউ থাকে না, এই সমতল জগতে কোনো বিঘ্ন ঘটানোর, কোনো ঠোকর বসানোর কেউ থাকে না।

হাজার হাজার বছর ধরে যে সিম্বলিক আবহ কাকেদের সঙ্গে জড়িত হয়ে আসছে, তার পেছনে তো তাদের ব্যাপারে মানুষজাতির গভীর কোনো বোঝাপড়াই দায়ী। তাদের ও অপরাপর প্রাণগুলোকে কোণাকাঞ্চিতে ঠেলে দিয়ে যে দুনিয়া আমরা নির্মাণ করছি, তা ইঙ্গিত দেয় যে সেইসব প্রাচীন প্রজ্ঞাকে নাকচ করে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি। হাস্যবোধহীন, একরোখা, ডিস্টোপিক। হ্যামলেটের ডেনমার্ক যেমন। সেখানে কোনো ফুল নাই। না, আছে। মৃত ইয়োরিক। জীবনানন্দের “পাড়াগাঁর সেই সব ভাঁড়”দের মতন, যারা “উপেক্ষা করিয়া গেছে সাম্রাজ্যেরে, অবহেলা ক’রে গেছে সব সিংহাসন।” হ্যামলেট সেই ইয়োরিকের খুলি আবিষ্কার করে। মরণের ওইপার থেকেও রাজবর্গকে পেরেশান রাখার কাজ এই ফুল এমন নিপুণভাবে করে যে সেই মড়ার খুলি দেখেও হ্যামলেট ভয়ানক বোধাক্রান্ত নড়বড়ে হয়ে পড়ে। “সামথিং ইজ রটেন ইন দ্য স্টেট অফ ডেনমার্ক,” আমরা জানি। সেই পচন ও ইয়োরিকের দেহের পচন একইসঙ্গে ঘটমান। ফুল মারা গেছে। সমস্ত একরৈখিকতার সঙ্গে কৌশলী কোন্দল করার কেউ নাই, আরামে আঢুল রাজার কাকতন্দ্রা ছোটানোর কেউ নাই।

আমাদেরও পচনের সমস্ত আলামত দৃশ্যমান। এই মসৃণ ও মনুষ্যকেন্দ্রিক মনোকালচার আমাদের নিয়ে যাবে এমনই মর্মান্তিক এক ভবিতব্যের দিকে, যা গ্রিম ও গম্ভীর। কায়েম হবে এমন আরো বেরসিক রেজিম, যে আক্ষরিকতা থেকে বিন্দুমাত্র বিচ্যুতি সইবে না। ন্যূনতম ব্যঙ্গে যে হাজার দেড়েক লাশ ফেলে দেবে। বারবার উপড়ালেও বারবার গজাবে। আমরা টেরও পাব না। অনর্থক মন্ত্র পড়ে পড়ে নিজেরাই হয়ে উঠব একেকজন ঊনভাঁড়।

মাহীন হক

পাঠক, লেখক ও অনুবাদক। সাহিত্যের ছাত্র।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ভাষা
Scroll to Top