১. মোহনা
মৌন প্রস্তাব এসেছিল রাতের অন্ধকারে,
স্রোতের মতো বহমান জীবনের কৌলিন্য দিয়েছিল
মোহনার দিকে যাওয়ার ঝোঁক,
শুকিয়ে যাওয়া পথ খুঁজে পায় না নিজের পরিচয়
শুধু হাতড়ে যেতে হয় অদৃশ্য কারণ
আমাদের শপথ ছিল মানুষের সঙ্গে থাকা
কোন এক মনকে জড়িয়ে নেওয়া ভালোবাসায়,
বিস্তৃর্ণ জলরাশির গভীরে হারিয়ে যায় মোহনার মুখ
তবুও মাটি পায় কোনো ইন্দ্রিয় ভালোবাসা,
পারে আটকে থাকা স্থির নৌকা
দাঁড়িয়ে থাকে নতুন মোহনার অপেক্ষায়
২. উদ্বাস্তুর মা
এভাবে শোক পেরিয়ে আসে অজস্র মা
বসন্তের আনন্দ আর জীবনের যন্ত্রণা মুছে
আগলে নেয় নিজের সম্ভ্রম
দুটো ভাত আর ভাতের জন্য সকাল থেকে গভীর রাত
একাকী জীবন;
কেউ দেখে আড় চোখে, ভাবে আছে পড়ে
রাস্তার উদ্বাস্তু জঞ্জাল;
চেনা পথ, চেনা রাস্তায় এসে অপরিচিত মুখ
কঠিন থেকে কঠিনতর হয়ে আছে
যে ভাঙা আয়নার কাচ
যেখানে সব কিছুই দোদুল্যমান,
জীবন হোক বা অনন্ত পরাভব,
ঘরের মাও আজ মহানগরের রাস্তায়
ছিন্ন বিচ্ছিন্ন ভিটে মাটি আর মাথার ওপর আকাশ;
নতজানু হয়ে থাকে উদ্বাস্তুর মা
মাটি হাতড়ে রাস্তা পার হয়
শহরের ব্যস্ত কোলাহল সরিয়ে;
ফুটপাতের দেওয়াল জুড়ে লেখা ভোট প্রচার-
নতজানু হয়ে থাকে উদ্বাস্তুর মা
৩. ক্ষোভ
আগলে রেখেছি এই অন্ধকার পথ নেশার মতো,
আর
ঘর ফেরা যুবকটি
আজও একটা কবিতার জন্য পড়ে থাকে ল্যামপোস্টের নিচে,
কে জানতো এই শহর জুড়ে জারি হবে কারফিউ;
অজস্র মায়ের কোল ঘেঁষে উঁকি দেবে রাতের পুলিশ;
কে জানত আদালতের রায় ঘোষণা করবে শিরচ্ছেদ
এভাবে সঞ্চিত ব্যথা একটু একটু করে জন্ম দেবে
এক আন্দোলনের;
যেসব ঘরে দেখা গেছে সামান্য আলো,
সেখানেই ঘরের মানুষ হয়েছে সন্তানহারা,
রাতের পর রাত যাঁরা ইস্তেহারের কাগজ খেয়েছে গুলে,
আজ হয়তো তারাই নিয়েছে আফিম..
বিশ্বাস আর চেতনা নিংড়ে শুধু বাড়িয়ে দিয়েছে প্রেমের হাত
বহু বছর প্রতীক্ষা ছেড়ে আমরা খুঁজেছি
গঙ্গার জল —
আমরা হাত ধরতে পারিনি,
শুধু জায়গা জমিন পরিমাপ করে নিলাম করেছি অর্থের লোভে;
রাস্তায় রাস্তায় ব্যারিকেড ভেঙে যে স্রোত এসেছিল
এই শহরে স্বাধীনতার জন্য, আজ হারিয়ে গেছে সবটুকু।
ছায়চাপা হয়ে পুঞ্জিত হয়েছে একে অপরের ক্ষোভ…
৪. একটি রঙিন ফুলের বাগান
নির্জনতা ভেদ করে আসে যেভাবে উচ্ছ্বাস,
বিমূর্ত ধারণা বয়ে নিয়ে চলা অনন্ত শোক
এসব কিছুই দূরের পড়ে থাকা শুকনো গাছটির মতো,
বিপন্ন হয়েও বেঁচে আছে পরিত্যক্ত শূন্যতায়।
যেখানে ছিল মরশুমের ভরা বৃষ্টি, হেমন্তের হিমেল হাওয়া,
বসন্তের প্রেম আর মাঠ ভরা বায়বীয় উষ্ণতা;
ওইটুকু জীবন আর মৃত্যুর ফাঁদ আছে অদৃষ্টে,
সময়ের স্থিরতা দিয়েছে এক পুরনো সাক্ষাৎকার;
জল মাটি বায়ুর সমীকরণ খুঁজেই তোমার আমার পরিকল্পিত পথ…
আজও সময় এক অদ্ভুত নিশাচরের হাত ধরে
তোমাকে আমাকে নিয়ে যায় বিকেলের কোনো নদীর ধারে,
উত্তাল স্রোত, ভাঙন ধরা পার আমাদের শেখায় অমরত্ব;
এভাবে পেরিয়ে যায় এক সংসার যুগ, স্রোত বাঁক নেয়,
নিয়তি হাতড়ে চলে জলের গভীরতা;
নৈঃশব্দের ভালোবাসা আরও জুড়ে আছে আমাদের যাপনে;
রং বদলে গেছে যে নীতির,
সূর্যাস্তের আলো যেভাবে ফিরে যায় পশ্চিম পারে,
সেভাবে ফুল ফোটে তোমার আমার সাজানো বাগানে…
আমরা হাতে কালি মেখে বুঝে নিতে পারি
একে ওপরের ভালোবাসা,
সারা মাঠ আজ কেমন বর্ষার জলে বাগান হয়েছে
থোকা থোকা লাল ফুল ফুটে আছে
অজস্র ঝোপঝাড় উপেক্ষা করে…
৫. কেন কথা বলব
কেন কথা বলব এই সময়ে, একটু বসি
বিস্তৃত পরিসর জুড়ে সান্ত্বনা দি মনকে।
যে আব্রু আস্তানা খুঁজেছে সময়ের বাঁকে,
অজস্র ভিড়ে চিনে নিয়েছে রক্তের সম্পর্ক,
সেই আততায়ী অপেক্ষা করেছে পক্ষকাল অবসাদের…
এই যে সবুজ মাঠের ফসল,জল-মাটি-দূরের গাছপালা
সবাই জেনে গেছে লোভ আর পাপের প্রায়শ্চিত্তের কথা।
আমাদের মাটির নিচে ঘরের সিন্দুকে লুকোনো প্রায়শ্চিত্তের কথা,
সব আজ খোলা আকাশের নিচে পড়েছে প্রতিহিংসার ভাঙনে,
যে মাটি চষে ছিল কালো চামড়ার মানুষ,
বাড়ির মেয়েরা চড়া রোদে জুগিয়েছিল পান্তাভাত,
আবেগ ছিল তন্দ্রাহীন চোখে, আজ চোখে জল,
মাথার ওপর ছাদ নেই, আছে বিরাট আকাশ
প্রতিজ্ঞা ছিল চলাচলের পথে দিয়ে যাবে এক
অপরের প্রতিশ্রুতি;
আজ কত রং,
আমার তোমার প্রকৃতির আর সবার
মনের মধ্যে ছিল সংযমী জেদ
একদিন ঝোড়ো হাওয়ায় সব হারিয়ে গেল
রইল প্রকৃতির অভিমান।
ধীমান ব্রহ্মচারী
জন্ম ১৯৮৭ সালে। বাংলায় স্নাতকোত্তর। চাকরি করেছেন আনন্দবাজারে এবং দ্য টেলিগ্রাফে। এখন চাকরি ছেড়ে প্রকাশনা ও সম্পাদনার কাজে পূর্ণ সময়ের জন্য নিযুক্ত। মূলত কবিতা লিখলেও, লিখতে ভালোবাসেন প্রবন্ধ, গদ্য এবং বই-আলোচনা। প্রথম সম্পাদনা: কবিতা বুলেটিন। পরবর্তী সময়ে ম্যানিউস্ক্রিপ্ট নামক একটি লিটল ম্যাগাজিন সম্পাদনা করেছেন। তারপর এবং অধ্যায় পত্রিকা। এই পত্রিকার নামেই করেছেন প্রকাশনা।





