১. সুবর্ণরেখা
পুরনো চাবিটা মা এখনও চালের কৌটোয় রাখে
চাল ঝাড়তে গিয়ে মাঝে মাঝে একটা দুপুর বেজে ওঠে
সেই দুপুরে জামা শুকোয়, বাবা খেতে বসে আরও একটু নুন চায়—
অথচ আমাদের এই ঘরে বহুদিন হলো নুনের কোনও অভাব নেই।
তুমি চাবিটা হাতে নিয়ে দরজার দিকে তাকাও
যেন কাঠের ওপারে কেউ আমাদের জন্য ভাত নিয়ে বসে আছে।
যারা এসেছিল, তারা প্রত্যেকে নিজের নিজের বিছানা পেয়ে গেছে
তবু কেনো ঘুমের মধ্যে এখনও একজন আরেকজনের গায়ে উঠে পড়ে। তুমি তাদের সরাতে গিয়ে দেখো
দুজনের মাঝখান দিয়ে একটা গোটা উঠোন চলে গেছে।
সেই থেকে তোমার সমস্ত জানলা একটু তেরছা
ঘর আঁটতে গিয়ে বাইরে পড়ে থাকে মানুষের পা
আমরা পর্দা টানি, তুমি আবার খুলে দিলে
মা বলল, চাবিটা ফেরত দাও, চাল বসাতে হবে—
তোমার মুঠো খুলতেই মেঝের ওপর কেবল ঝরনার মত জল ঝরে পড়ে।
২. মেঘে ঢাকা তারা
মেয়েটা খুব আস্তে আস্তে কথা বলছিল, তখনও চায়ের জল ফোটেনি
টেবিলে মাসকাবাড়ি হিসেব পড়ে আছে, কারও নতুন জুতোর মাপ
তুমি শুধু কাপের ভাঙা কানটা দুটো আঙুলে তুলে নিলে
পাশের ঘরে তখন কেউ দাঁত দিয়ে সুতো কাটছে।
মেয়েটি ছুটির দিনেও বারান্দায় কাপড় মেলে দেয়
সে একটা জামা মেললেই আকাশ খানিকটা ছোট
শেষ গামছাটা মেলার পরে আকাশে আর পাখি দেখা যায় না।
তুমি ঢাকা আকাশের নীচে একটা চেয়ার পেতে দাও
তাকে বসতে বলো, সে হাঁটুর ওপর কাজ নিয়ে বসে পড়ে
পাহাড়ের কথা উঠলে তুমি হেসে উঠো, যাওয়ার ভাড়া জানতে চাও না
তুমি শুধু বলো, অত দূরে চলে গেলে কাপড় গুলো তুলবে কে?
ততক্ষণে চা ফুটে উপচে উঠছে, কেউ ওঠেনি
শুধু দেখলাম কাপের ভাঙা কানটা তোমার আঙুলের ডগায় একবার মাত্র কেঁপে ওঠল।
লোহার দরজা বন্ধ হতেই আমরা পিছন ফিরি—
মেয়েটি সেই ফাঁকে ভাঙা কাপেই নিজের জন্য চা ঢেলে নেয়।
৩. অযান্ত্রিক
বাতিল জিনিসের দোকানে লোকটা একটা হর্ন বাজাচ্ছিল
ছেলেটা হাসছিল, মাড়িতে এখনো তার সবকটা দাঁত ওঠেনি
শব্দ শুনে তুমি পকেট হাতড়াও—
আজ সকালে কোথাও কি যাওয়ার কথা ছিল, পকেটে তোমার কোনও ঠিকানা নেই।
মিস্ত্রি বলেছিল, সব খুলে বিক্রি করে দেওয়াই ভালো
তুমি তার সামনেই বনেটের গায়ে হাত রেখেছিলে
জ্বরের সময় আমরা যেমন কারও কপালে হাত রাখি।
এখন চাকা একদিকে, দরজা অন্য দোকানে
পিছনের আসনটা কারও বারান্দায় বৃষ্টির ছাঁট খাচ্ছে।ছেলেটা আবার হর্ন বাজায়, দোকানদার দাম বলে।তুমি শব্দটার সঙ্গে দর কষাকষি করতে পারো না।
কত রবিবার আমরা তোমার জন্য দরজা খুলিনি
ঘরের ভিতর ছুটি ছিল, বাইরে তোমার হাঁটার শব্দ
আজ ছেলেটা হর্ন দিতে দিতে গলির মোড়ে অদৃশ্য হয়ে গেল
আর তুমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হাতের ধুলো ঝাড়তে ঝাড়তে দেখলে—
অনেক দূরের একটা গাড়ি এখনও তার চালককে ডাকছে।
৪. ছবির পরে
তোমাকে বুঝেছি বলে ঘরে আলো জ্বেলে ভাত খেতে বসলাম
তবু তুমি কেন আমার পাতের পাশে দাঁড়িয়ে পড়লে
তোমার জন্য তো আলাদা কোনও থালা রাখিনি।
নিজের বিছানায় শুয়ে একদিন পিঠে খড় বিঁধলে
দেখি, ঘরের ভিতরেও কত দূর হেঁটে যেতে পারি।
তোমার রাগের পাশে একটু বসতে গিয়ে দেখি
আমাদের চেয়ারের নীচে কার আঙুলগুলো চাপা পড়ে আছে।
সে হাত সরিয়ে নিলে বসব কোথায়, ভাবতে গিয়ে
আমি তোমার ছবির প্রশংসা করতে লাগলাম।
মাতাল বললে তোমাকে রাত্রে একা ছেড়ে আসা নিরাপদ।
প্রতিভাবান বললে নিজের দরজায় খিল দেওয়া হয়ে যায়।
আমি তাই দুটো কথাই বলেছি, তারপর জল খেতে উঠে দেখি
আমার গ্লাসের তলায় অল্প একটু কাদা লেগে আছে। শুধু তুমি বলে যাও কোন ভিটে থেকে তুমি জল তুলেছিলে—আজও তোমাকে জিজ্ঞেস করিনি কেন ?
অয়ন মুখোপাধ্যায়
পেশায় একজন শিক্ষক এবং পশ্চিমবঙ্গের একজন পরিচিত কবি, গল্পকার ও প্রাবন্ধিক। তাঁর লেখা বিভিন্ন কবিতা, গল্প ও প্রবন্ধ বিভিন্ন সাহিত্যপত্রিকা এবং ওয়েবসাইটে নিয়মিত প্রকাশিত হয়। তাঁর লেখা ও কবিতা বিভিন্ন সময় যেমন 'গণশক্তি'র মুক্তধারা, 'জ্বলদর্চি', 'আপনপাঠ' ও 'পরম্পরা' সহ বিভিন্ন ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর রচনার মধ্যে 'কারখানার বদলে মন্দির' (কবিতা), 'ট্রানজিস্টারের শেষ অক্ষাংশ', এবং 'রঙিন ছাতার রহস্য' (ছোটগল্প) বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।





