সামিহ আল কাসিম (Samih al-Qasim, ১৯৩৯–২০১৪) ফিলিস্তিনি সাহিত্যের এক উজ্জ্বল, তীক্ষ্ণ এবং গভীরভাবে মানবতাবাদী কণ্ঠ। তাঁকে বলা হয় ‘প্রতিরোধের মহাকবি’। তাঁর জীবন ছিল ফিলিস্তিনিদের সংগ্রাম আর আধ্যাত্মিক উপলব্ধির এক মহাকাব্যিক দলিল।
তিনি এমন এক কবি, যিনি রাজনীতি থেকে শুরু করে আত্মার গভীরতম স্তর পর্যন্ত একটানা সেতু নির্মাণ করেছেন। তাঁর কবিতায় সংগ্রাম আছে, কিন্তু সেই সংগ্রাম শেষ পর্যন্ত আত্মার মুক্তি ও মানবিক ঐক্যের দিকে ইঙ্গিত করে।
তাঁর জীবন কেবল একজন কবির জীবন নয়, বরং এটি একটি জাতির টিকে থাকার লড়াই আর একজন মরমি সাধকের সত্য অনুসন্ধানের দীর্ঘ পথচলা।
সামিহ আল কাসিম ১৯৩৯ সালের ১১ মে জর্ডানের জাসিন শহরে একটি দ্রুজ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। দ্রুজ সম্প্রদায় তাদের গোপন মরমি জ্ঞান ও পুনর্জন্মের বিশ্বাসের জন্য পরিচিত। কাসিমের দর্শনে এই ‘অবিনশ্বর আত্মা’র ধারণাটি শৈশব থেকেই প্রোথিত ছিল।
তিনি হাইফা ও নাজারেথে বড় হন। তাঁর পিতা ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে অফিসার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ফলে শৈশব থেকেই তিনি একটি সুশৃঙ্খল কিন্তু রাজনৈতিকভাবে সচেতন পরিবেশে বেড়ে ওঠেন।
কাসিমের বয়স যখন মাত্র ৯ বছর, তখন ১৯৪৮ সালের ‘নাকবা’ (বিপর্যয়) সংঘটিত হয়। ইসরায়েল রাষ্ট্র গঠনের সময় লক্ষ লক্ষ ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হয়। কাসিমের পরিবার তাদের গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয় এবং পরে আবার ফিরে আসে।
শৈশবের এই ট্রমাই তাঁর কবিতার মূল ভিত্তি তৈরি করে দেয়। এটি তাঁর কবিতায় গভীর ক্ষত ও আধ্যাত্মিক একাকীত্ব তৈরি করেছে। তিনি অনুভব করেন যে, তাঁর আসল পরিচয় কেবল একটি নাম নয়, বরং এই মাটি।
১৯৪৮ সালের পর তিনি এবং তাঁর পরিবার ‘অভ্যন্তরীণ ফিলিস্তিনি’ (ইসরায়েলের ভেতরে থাকা আরব) হিসেবে পরিচিত হন। এই সময়কালটি ছিল তাঁর জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়।
মাহমুদ দারবিশ ও তৌফিক জায়াদের সাথে মিলে তিনি ‘প্রতিরোধের কবিতা’র আন্দোলন গড়ে তোলেন। তাঁর কবিতার তেজ দেখে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ তাঁকে বহুবার কারাগারে নিক্ষেপ করে। তাঁকে নিজ বাড়িতে বছরের পর বছর নজরবন্দি করে রাখা হয়। কিন্তু তিনি বলতেন, “কারাগার আমার শরীরকে আটকে রেখেছে, কিন্তু আমার কবিতাকে নয়।” এটিই ছিল তাঁর মরমি বিজয়ের ঘোষণা।
সামিহ আল কাসিম কেবল কবি ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন তুখোড় সাংবাদিক ও সম্পাদক। তিনি বিখ্যাত পত্রিকা ‘আল-ইত্তিহাদ’ ও ‘আল-জাদিদ’-এর সম্পাদনা করেছেন। তিনি ফিলিস্তিনি লেখক ইউনিয়নের প্রধান ছিলেন। ‘আরাবেস্ক’ নামক একটি প্রকাশনা সংস্থাও গড়ে তুলেছিলেন তিনি।
সামিহ আল কাসিম ৭০টিরও বেশি গ্রন্থ রচনা করেছেন। তাঁর কাজের ব্যাপ্তি ছিল বিশাল। তাঁর কবিতার বইগুলোর মধ্যে আছে, ‘বিদ্রোহের গান’ (Songs of the Streets), ‘মৃত্যুর মিছিল’ (The Procession of Death) ইত্যাদি। তিনি ‘আধ্যাত্মিক থিয়েটার’ বা রূপকধর্মী নাটকের মাধ্যমে ফিলিস্তিনের দুর্দশা তুলে ধরতেন।
সামিহ আল কাসিম আর মাহমুদ দারবিশ ছিলেন মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। দারবিশ যখন নির্বাসনে চলে যান, কাসিম তখন ফিলিস্তিনের ভেতরে থেকে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তাঁদের একে অপরকে লেখা চিঠিপত্রগুলো ‘আল-রাসা-ইল’ (The Letters) নামে প্রকাশিত হয়, যা আধুনিক আরবি সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ নিদর্শনগুলোর একটি। এই চিঠিগুলোতে তাঁদের গভীর মানবিকতা ও আধ্যাত্মিক সংযোগ ধরা পড়ে।
২০১৪ সালের ১৯ আগস্ট ক্যান্সারের সাথে দীর্ঘ লড়াইয়ের পর ৭৪ বছর বয়সে এই মহান কবির মৃত্যু হয়। তার শেষ ইচ্ছে অনুযায়ী তাঁকে তাঁর প্রিয় শহর রামে-এর পাহাড়ে সমাহিত করা হয়। তাঁর জানাজায় হাজার হাজার মানুষ অংশগ্রহণ করেছিল। এতেই প্রমাণিত হয়, তিনি কেবল কবি ছিলেন না, ছিলেন এক জাতির কণ্ঠস্বর।
সামিহ আল কাসিমের অমর উক্তিতে তাঁর জীবনদর্শন প্রস্ফুটিত : ”আমি হার মানিনি। আমি কেবল আমার অবস্থান পরিবর্তন করেছি—মাটির উপর থেকে মাটির নিচে। কিন্তু আমি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছি।”
সামিহ আল কাসিমের দর্শন কেবল রাজনৈতিক স্লোগান নয়, এটি তিনটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। প্রথমত, অস্তিত্ববাদী মরমিবাদ। তিনি মনে করতেন মানুষের অস্তিত্ব কেবল শরীর নয়, বরং তাঁর আত্মা ও আদর্শ। কারাগারে থেকেও তিনি নিজেকে মুক্ত ভাবতেন, কারণ তার ‘স্বপ্ন’ ছিল অবিনশ্বর।
দ্বিতীয়ত, দ্রুজ ঐতিহ্যের প্রভাব। দ্রুজ দর্শনে ‘পুনর্জন্ম’ একটি মূল বিশ্বাস। কাসিমের কবিতায় বারবার ঘুরে আসে যে, একজন যোদ্ধা মারা গেলে তিনি প্রকৃতির উপাদান হয়ে পুনরায় ফিরে আসেন।
তৃতীয় স্তম্ভ হলো সর্বজনীন মানবতাবাদ। তিনি কেবল আরবদের জন্য নয়, বরং সারা বিশ্বের নির্যাতিত মানুষের হয়ে কথা বলতেন। তাঁর কাছে ‘প্রতিরোধ’ ছিল একটি আধ্যাত্মিক ইবাদত।
তাঁর কবিতায় মরমিতা বা মিস্টিসিজম প্রথাগত সুফিবাদের মতো নয়, বরং এটি রাজনৈতিক বাস্তবতা ও অস্তিত্ববাদের এক অনন্য সংমিশ্রণ। তিনি যখন আধ্যাত্মিক রূপক ব্যবহার করেন, তখন তার উদ্দেশ্য থাকে নিছক ঈশ্বরপ্রেম নয়, বরং স্বদেশের মুক্তি এবং মানবাত্মার অবিনশ্বরতাকে তুলে ধরা।
মরমিবাদের একটি বড় দিক হলো মৃত্যুভয় জয় করা। কাসিমের কবিতায় মৃত্যু বারবার এক নতুন জীবনের শুরু হিসেবে আসে। তিনি মৃত্যুকে আলৌকিক বা মরমি আঙ্গিকে দেখেন, যেখানে শহিদ বা সংগ্রামী ব্যক্তি কখনো ফুরিয়ে যান না; বরং প্রকৃতির উপাদানে মিশে অমর হয়ে থাকেন। এটি অনেকটা সুফি দর্শনের ‘ফানা’ (বিলয়) এবং ‘বাকা’ (অমরত্ব) ধারণার সমান্তরাল।
মরমি কবিদের মতো কাসিমও প্রাচীন মিথ ও ধর্মীয় প্রতীকে আশ্রয় নিয়েছেন। তিনি প্রায়ই বাইবেল বা কোরআনের আধ্যাত্মিক চরিত্রগুলোকে (যেমন আইউব কিংবা ন্যায়বিচারের-এর প্রতীক হিসেবে যিশু) বর্তমান সময়ের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দাঁড় করান। তাঁর কাছে আধ্যাত্মিকতা হলো শোষণের বিরুদ্ধে এক ধরনের ‘মেটাফিজিক্যাল পাওয়ার’।
কাসিমের বিখ্যাত কাব্যনাট্য বা কবিতায় মাঝে মাঝে এমন এক নির্জনতা ও ধ্যানের সুর পাওয়া যায় যা সুফি কবিদের কথা মনে করিয়ে দেয়। তিনি ফিলিস্তিনের মাটিকে শুধু ভূখণ্ড হিসেবে দেখেননি, বরং একে এক পবিত্র ‘মরমি সত্তা’ হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। তাঁর ভাষায় দেশপ্রেম আর স্রষ্টাপ্রেম অনেক সময় একাকার হয়ে গেছে।
তাঁর অনেক কবিতায় তিনি নিজেকে এমন এক পথচারী হিসেবে বর্ণনা করেন, যে কি না সত্যের সন্ধানে মহাজাগতিক এক যাত্রায় বেরিয়েছে। এই ‘যাত্রা’ বা ‘সফর’ মরমিবাদের একটি মূল ভিত্তি।
সুতরাং সামিহ আল কাসিমকে ‘রাজনৈতিক মরমিবাদ’-এর একজন প্রতিনিধি হিসাবে গণ্য করা যায়, যেখানে আধ্যাত্মিকতা কেবল ব্যক্তিগত মোক্ষ নয়, বরং একটি জাতির মুক্তি সংগ্রামের ‘মরমি জ্বালানি’।
”আমি হারাতে পারি আমার রুটি, আমার পোশাক, আমার শয্যা…
তবু আমি কোনো আপস করব না—
আমার শিরায় শেষ স্পন্দন থাকা পর্যন্ত
আমি প্রতিরোধ করে যাব।”
এখানে ‘শেষ স্পন্দন থাকা পর্যন্ত প্রতিরোধ’ কেবল রাজনীতি নয়, বরং এটি আত্মার সেই অটল সংকল্প যা জাগতিক সব কিছুর মায়া ত্যাগ করে এক উচ্চতর আদর্শের (যা তার কাছে স্বাধীনতা) সাথে যুক্ত হতে চায়।
তাঁর কবিতার ভাষা ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী, ও ভাবপ্রকাশ আবেগবিধুর। তাঁর একটি কবিতার (ছিন্ন ওষ্ঠ) বিখ্যাত একটি অংশ :
”আমি যদি চাইতাম, তবে আমার ওষ্ঠ দিয়ে গান গাইতাম,
কিন্তু তারা আমার ঠোঁট কেটে ফেলেছে;
এখন আমি আমার ক্ষত দিয়ে গান গাই!”
এটি একটি উচ্চতর মরমি স্তর। সুফি কবিরা যেমন ‘বিরহ’ বা ‘যন্ত্রণা’ থেকে গান তৈরি করেন, কাসিম তার রাজনৈতিক ক্ষতকে সুর ও আধ্যাত্মিক শক্তিতে রূপান্তর করেছেন। তাঁর কাছে রক্তপাত মানে পরাজয় নয়, বরং নতুন সৃষ্টির সূচনা।
’মৃত্যুর ডাক’ কবিতায় তিনি মৃত্যুকে ভয় পাননি, বরং মৃত্যুকে সম্বোধন করে বলেছেন, তুমি আমাকে নিতে এসেছ? কিন্তু আমি তো আগে থেকেই আমার জাতির ইতিহাসে মিশে আছি। এটিই হলো সেই ‘বাকা’ বা অমরত্ব যা তিনি তাঁর কবিতায় প্রতিষ্ঠা করেছেন।
সামিহ আল কাসিমের কবিতায় দ্রুজ মরমিবাদ ও ‘পুনর্জন্ম’-এর ব্যবহার অত্যন্ত গভীর। এটি কেবল একটি ধর্মীয় বিশ্বাস নয়, বরং তাঁর কবিতার একটি শক্তিশালী কাব্যিক কৌশল। এটি মরমিবাদের সাথে ‘অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই’-কে এক সুতোয় গেঁথেছে।
দ্রুজ বা ‘মুওয়াহিদুন’ (Unitarians) ইসলামের একটি ফেরকা। এই সম্প্রদায়ের দর্শন অত্যন্ত গোপন ও আধ্যাত্মিক। কাসিমের কবিতায় এর প্রভাব তিনটি প্রধান দিক থেকে দেখা যায়।
তাকিয়া বা আধ্যাত্মিক সতর্কতা হলো এই ধর্মাদর্শের একটি দিক। দ্রুজরা বিশ্বাস করে যে সত্যকে সব সময় সরাসরি বলা যায় না, অনেক সময় তা রূপকের আবরণে রাখতে হয়। কাসিম যখন ইসরায়েলি সেন্সরশিপের মুখে ছিলেন, তখন তিনি মরমি রূপক ব্যবহার করে তাঁর রাজনৈতিক বার্তা পৌঁছে দিতেন।
দ্বিতীয় দিক হলো ঐশী একত্ববাদ। তাদের মতে খোদা সর্বত্র বিরাজমান। কাসিম এই ধারণা থেকে বিশ্বাস করতেন যে, ফিলিস্তিনের মাটির প্রতিটি কণা পবিত্র এবং এতে ঐশ্বরিক শক্তির উপস্থিতি আছে।
তৃতীয় বিষয় হলো প্রাচীন জ্ঞান। দ্রুজ দর্শনে প্লেটো, এরিস্টটল ও পিথাগোরাসের মতো গ্রিক দার্শনিকদের মরমি ব্যাখ্যার প্রভাব আছে। কাসিম তার কবিতায় এই ‘ধ্রুপদী মরমিবাদ’-কে আধুনিক প্রেক্ষাপটে ব্যবহার করেছেন।
দ্রুজ বিশ্বাসে ‘তাকাম্মুস’ বা আত্মার দেহান্তর বা পুনর্জন্ম একটি কেন্দ্রীয় বিষয়। কাসিম এই তত্ত্বকে তাঁর কবিতায় ‘প্রতিরোধের প্রতীক’ হিসেবে ব্যবহার করেছেন। কাসিমের কবিতায় বীরেরা মরে যায় না। তিনি লিখতেন যে, আজ যে শহিদ হচ্ছে, সে কাল একটি জলপাই গাছ হয়ে জন্মাবে, অথবা একটি নবজাতকের চিৎকারে তার কণ্ঠস্বর ফিরে আসবে।
তাঁর একটি বিখ্যাত কবিতায় তিনি বলেছিলেন— “আমাকে কবর দিও না, বরং আমাকে রোপণ করো।” এটিই পুনর্জন্মের মরমি প্রকাশ। রোপণ করলে যেমন গাছ হয়, তেমনি তাঁর রক্ত থেকে শত শত সংগ্রামী জন্ম নেবে। তিনি মনে করতেন ফিলিস্তিনিদের ইতিহাস কেবল বর্তমানের নয়, এটি হাজার বছরের আত্মার এক অবিচ্ছিন্ন যাত্রা।
তাঁর একটি রূপকধর্মী কবিতার সারমর্ম হলো :
”তারা আমার শরীরকে লোহার শিকলে বাঁধল,
তারা ভাবল আমি শেষ।
কিন্তু আমি তো সেই হাজার বছর আগের আত্মা,
যে বারবার ফিরে আসে স্বাধীনতার তৃষ্ণা নিয়ে।”
এখানে ‘হাজার বছর আগের আত্মা’ বলতে তিনি পুনর্জন্মের সেই মরমি ধারণাকে বোঝাচ্ছেন। একজন শাসকের পক্ষে একজন মানুষকে মারা সম্ভব, কিন্তু সেই অবিনশ্বর ‘আইডিয়া’ বা ‘আত্মা’কে মারা সম্ভব নয় যা বারবার পৃথিবীতে ফিরে আসে।
কাসিমের এই দর্শনকে আমরা ‘Metaphysics of Resistance’ বা ‘প্রতিরোধের অধিবাস্তববাদ’ বলতে পারি। তাঁর পুনর্জন্মের ধারণাটি মানুষের মৃত্যুভয় দূর করে। ব্যক্তিগত জীবনের চেয়ে জাতীয় সত্তাকে বড় করে তোলে। প্রকৃতি — মাটি, গাছ, পাথর — এবং মানুষের মধ্যে এক আধ্যাত্মিক যোগসূত্র তৈরি করে।
সামিহ আল কাসিমের মরমি চেতনাকে আরেকটু বিশ্লেষণ করা যাক। সুফিদর্শনে ‘ফানা’ (নিজেকে বিলীন করা) এবং ‘বাকা’ (অমরত্ব লাভ) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কাসিম এই ধারণাকে রাজনীতির ময়দানে নিয়ে এসেছেন। তাঁর কাছে একজন সংগ্রামী যখন দেশের জন্য প্রাণ দেন, তখন তিনি ফুরিয়ে যান না। শরীর ছিন্নভিন্ন হলেও আত্মা মহাবিশ্বের শক্তিতে রূপান্তরিত হয়। তিনি মৃত্যুকে দেখেন একটি ‘দীর্ঘ যাত্রা’ হিসেবে। তাঁর কবিতায় রক্ত গোলাপ হয়ে ফোটে, আর হাড় হয়ে ওঠে পাহাড়ের পাথর। এই যে পদার্থের রূপান্তর—এটি একটি গভীর মরমি দৃষ্টিভঙ্গি, যেখানে মৃত্যু কেবল একটি স্তরের পরিবর্তন মাত্র।
ইবনে আরাবির দর্শনে ‘আল-ইনসান আল-কামিল’ বা পূর্ণ মানবের যে ধারণা আছে, কাসিম তাকে একজন অপরাজেয় বিপ্লবীর চরিত্রে রূপ দিয়েছেন। তাঁর বিখ্যাত কবিতা ‘বিজয়ের মূর্ত রূপ’-এ তিনি এমন এক সত্তার কথা বলেন, যাকে বন্দি করা যায় না, যার কণ্ঠরোধ করা সম্ভব নয়। এই সত্তাটি অনেকটা উপনিষদের ‘আত্মা’ বা সুফিবাদের ‘রূহ’-এর মতো অবিনশ্বর। কাসিম যখন বলেন, “তুমি আমার হাত বেঁধে রাখতে পারো, কিন্তু আমার স্বপ্নকে নয়”, তখন তিনি আসলে শরীরের ওপর আত্মার শ্রেষ্ঠত্বকেই ঘোষণা করেন—যা মরমিবাদের মূল ভিত্তি।
মরমি ঐতিহ্যে প্রকৃতিকে ‘মা’ ও পবিত্র সত্তা হিসেবে দেখা হয়। সামিহ আল কাসিমের কবিতায় ফিলিস্তিনের মাটি কেবল ‘রিয়েল এস্টেট’ নয়, এটি একটি জীবন্ত মরমি সত্তা। তিনি মাটিকে দেখেন এমন এক মন্দির হিসেবে, যেখানে জলপাই গাছগুলো হলো উপাসক। তাঁর কবিতায় প্রকৃতির প্রতিটি উপাদান (পাথর, গাছ, বাতাস) এক অলৌকিক ভাষায় কথা বলে। এটি অনেকটা ‘প্যানথেইজম’ বা সর্বেশ্বরবাদের কাছাকাছি, যেখানে তিনি ঈশ্বরকে খুঁজছেন স্বদেশের ধূলিকণায়।
তাঁর একটি কবিতায় (‘ঘড়ি’) তিনি সময়কে একটি বৃত্তাকার মরমি অভিজ্ঞতার সাথে তুলনা করেছেন। শাসকগোষ্ঠী সময়কে নিয়ন্ত্রণ করতে চায় ঘড়ি দিয়ে, কিন্তু কবি সময়কে দেখেন এক আদি-অন্তহীন প্রবাহ হিসেবে।
”আমার ঘড়ি দেয়ালে ঝোলে না,
তা ধ্বনিত হয় বন্দীর নাড়ির স্পন্দনে,
জলপাই গাছের শিকড়ে লুকিয়ে থাকে তার সময়।”
এখানে তিনি সময়কে যান্ত্রিকতা থেকে বের করে এনে মরমি অনুভূতিতে স্থাপন করেছেন। তাঁর এই মরমিতা হলো সামষ্টিক মুক্তির জন্য আকুতি, যেখানে ‘বিপ্লব’ হলো তাঁর উপাসনা এবং ‘স্বদেশ’ হলো তাঁর পরমাত্মা।
সামিহ আল কাসিমের ‘অবাঞ্ছিত ব্যক্তি’ (Persona Non Grata) কবিতাটি তাঁর মরমি ও অস্তিত্ববাদী দর্শনের এক অনন্য দলিল। এই কবিতায় তিনি নিজেকে একজন মহাজাগতিক পথিকের রূপকে উপস্থাপন করেছেন, যার গন্তব্য কোনো নির্দিষ্ট দেশ নয়, বরং এক পরম সত্য।
কবিতার একটি অংশ বলছে :
”আমি মেঘের সন্তান,
আমি বিদ্যুতের ভাই,
আমার হৃদয় সূর্যের দিকে খোলা এক জানালা…
আমার কোনো ঘর নেই, কিন্তু এই মহাবিশ্বই আমার নিবাস।”
এই কয়েকটি পংক্তিতে কাসিম প্রথাগত রাজনৈতিক কবির গণ্ডি পেরিয়ে একজন ‘কসমিক মিস্টিক’ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছেন। নিজেকে ‘মেঘের সন্তান’ বা ‘বিদ্যুতের ভাই’ বলা কেবল কবিত্ব নয়। এটি সুফি ও প্রাচীন মরমিবাদের সেই দর্শনের প্রতিফলন যেখানে মানুষকে ক্ষুদ্র ব্রহ্মাণ্ড (Microcosm) মনে করা হয়। তিনি বলতে চাইছেন, তাঁর অস্তিত্ব জাগতিক কোনো মানচিত্রের সীমাবদ্ধ নয়, বরং তিনি প্রকৃতির আদিম ও অবিনশ্বর শক্তির অংশ।
“আমার হৃদয় সূর্যের দিকে খোলা এক জানালা” — এই রূপকটি অনেকটা সুফি সাধকদের ‘কালব’ বা হৃদয়ের স্বচ্ছতার মতো। সাধকরা বিশ্বাস করেন, হৃদয়ের আয়না পরিষ্কার হলে সেখানে আধ্যাত্মিক জ্যোতি বা ‘নুর’ প্রতিফলিত হয়। কাসিমের কাছে সেই নুর হলো ‘সত্য’ ও ‘ন্যায়বিচার’।
যখন একজন মানুষ বলে “মহাবিশ্বই আমার নিবাস”, তখন তার ভেতরের সংকীর্ণ অহং বা ইগো বা ‘নফস’ বিলীন হয়ে যায়। কাসিম এখানে রাজনৈতিক নির্বাসনকে ‘আধ্যাত্মিক ভ্রমণে’ রূপান্তর করেছেন। তাঁকে পৃথিবী থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হলেও তিনি মহাবিশ্বের নাগরিক হয়ে উঠেছেন।
সামিহ আল কাসিম এবং মাহমুদ দারবিশের মধ্যবর্তী পত্রালাপ আধুনিক বিশ্বসাহিত্যের এক অনন্য সম্পদ। ১৯৮০-র দশকে তাঁরা একে অপরকে যে চিঠিগুলো লিখেছিলেন, তা কেবল দুই বন্ধুর ব্যক্তিগত আলাপ ছিল না; বরং তা ছিল দুই মরমি আত্মার এক দার্শনিক লড়াই ও সংলাপ।
মাহমুদ দারবিশ ছিলেন ফিলিস্তিনের বাইরে, যা ছিল ‘ভৌগোলিক নির্বাসন’। সামিহ আল কাসিম ছিলেন ফিলিস্তিনের ভিতরে, যা ছিল ‘মানসিক ও রাজনৈতিক অবরুদ্ধতা’। তাঁদের এই পার্থক্যের কারণে তাঁদের আধ্যাত্মিক উপলব্ধিতেও এক চমৎকার বৈপরীত্য দেখা যায়।
চিঠিগুলোতে তাঁরা একে অপরকে প্রায়ই ‘নিজেরই অন্য একটি রূপ’ হিসেবে সম্বোধন করতেন। সুফি দর্শনে যেমন দুই বন্ধুর মধ্যে একাত্মতা দেখা যায় (যেমন রুমি ও শামস তাবরিজি), কাসিম ও দরবেশের সম্পর্ক ছিল তেমনই। কাসিম একবার লিখেছিলেন, “মাহমুদ, তুমি যখন লেখো, তখন মনে হয় আমার হৃদপিণ্ড তোমার কলমের ডগায় স্পন্দিত হচ্ছে।”
নির্বাসিত জীবনে দারবিশ যখন একাকীত্বে ভুগতেন, কাসিম তাঁকে আধ্যাত্মিক শক্তি জোগাতেন। তাঁরা ‘শূন্যতা’ নিয়ে আলোচনা করতেন। মরমিবাদে ‘শূন্যতা’ হলো পরম সত্যে পৌঁছানোর একটি ধাপ। কাসিম তাঁকে বুঝিয়েছিলেন যে, ফিলিস্তিন কেবল একটি মানচিত্র নয়, এটি একটি ‘মানসিক অবস্থা’ যা আত্মার সাথে সবসময় থাকে।
মরমি সাধনায় ‘দুঃখ’ বা ‘বিরহ’ হলো স্রষ্টার কাছে পৌঁছানোর পথ। কাসিমের চিঠিতে এই দুঃখ ছিল সংগ্রামের জ্বালানি। তিনি দারবিশকে লিখেছিলেন যে, তাঁদের দুঃখগুলো আসলে সাধারণ কান্না নয়, এগুলো হলো “পবিত্র অশ্রু” যা তাঁদের কাব্যিক পুনর্জন্ম ঘটাচ্ছে।
এক চিঠিতে সামিহ আল কাসিম দারবিশকে লিখছেন : ”আমার ভাই মাহমুদ, আমরা কি কেবল শব্দ দিয়ে তৈরি? নাকি আমাদের শব্দগুলোই আমাদের আত্মা? যখন আমি কারাগারে একা থাকি, তখন আমি দেয়ালের সাথে কথা বলি না, আমি তোমার সাথে কথা বলি। কারণ আমি জানি, আমাদের গন্তব্য এক—তা হলো মুক্তি, যা শেষ পর্যন্ত এক মরমি আলোয় গিয়ে মিশেছে।”
এই বক্তব্যে কাসিম ‘শব্দ’কে একটি পবিত্র মরমি মাধ্যম হিসেবে দেখছেন। মরমি ভক্তিবাদীরা যেমন ‘শব্দ’ বা ‘নাম’ জপের মাধ্যমে সত্য খুঁজতেন, কাসিম ও দারবিশের কাছে তাঁদের ‘কবিতা’ ছিল সেই জপ বা সাধনা।
এই পত্রালাপটি যেন ত্রুবাদুর ঐতিহ্যের সেই ‘প্লেটোনিক প্রেম’ বা ‘উচ্চতর আদর্শের প্রতি আনুগত্যের’ আধুনিক রূপ। মরমিরা যেমন ভক্তির মাধ্যমে মুক্তি চেয়েছেন, কাসিম ও দরবেশ এই পত্রালাপের মাধ্যমে একে অপরের সাহচর্যে ‘রাজনৈতিক ও আধ্যাত্মিক মোক্ষ’ খুঁজেছেন।
সামিহ আল কাসিমের জীবন ছিল নাটকীয়তা, হাস্যরস ও গভীর আধ্যাত্মিকতায় ভরপুর। তাঁর ব্যক্তিত্ব বুঝতে নিচের অ্যানেকডোটস বা জীবনের ছোট ছোট গল্পগুলো সাহায্য করবে।
১.
একবার সামিহ আল কাসিম খুব অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। তাঁর মৃত্যুর গুজব ছড়িয়ে পড়েছিল। সুস্থ হয়ে ফিরে আসার পর তিনি এক সাক্ষাৎকারে হেসে বলেছিলেন : “শত্রুরা ভাবছে তারা আমাকে কবরে পাঠাবে। কিন্তু তারা জানে না যে আমি দ্রুজ পরিবারের সন্তান। আমরা বিশ্বাস করি মৃত্যুর পর আত্মা আবার ফিরে আসে। তাই আমি তাদের বলে দিয়েছি, আমাকে কবর দিও না, বরং রোপণ করো। গাছ হয়ে আমি আবার তাদের সামনে দাঁড়িয়ে থাকব!” এটি কেবল রসিকতা ছিল না, এটি ছিল তাঁর পুনর্জন্মবাদী মরমি দর্শনের বহিঃপ্রকাশ।
২.
একবার একটি বড় জনসভায় সামিহ আল কাসিম কবিতা পড়ছিলেন। মাহমুদ দারবিশ তখন নির্বাসনে। জনতা কাসিমকে বারবার অনুরোধ করছিল দারবিশের কবিতা পড়ার জন্য। কাসিম তখন নিজের কবিতা থামিয়ে দারবিশের একটি বিখ্যাত কবিতা আবৃত্তি করতে শুরু করেন। পরে তিনি চিঠিতে দারবিশকে লিখেছিলেন : ”যখন আমি তোমার কবিতা পড়ছিলাম, আমার মনে হয়নি আমি অন্য কারো কথা বলছি। মনে হচ্ছিল আমার আত্মা তোমার শরীরে গিয়ে কথা বলছে।” এই অ্যানেকডটটি তাঁদের ‘মরমি ভ্রাতৃত্ব’ ও আত্মার একাত্মতার এক বড় প্রমাণ।
৩.
ইসরায়েলি কারাগারে থাকাকালীন একবার একজন জেলার তাঁকে বলেছিলেন, “সামিহ, আমরা তোমার কলম কেড়ে নেব, কাগজ কেড়ে নেব, দেখি তুমি কীভাবে কবিতা লিখো!” কাসিম শান্তভাবে উত্তর দিয়েছিলেন : ”তুমি কি আকাশের পাখির গান কেড়ে নিতে পারো? আমি আমার কবিতা জেলের দেয়ালে নখ দিয়ে আঁচড় কেটে লিখব। আর যদি হাত বেঁধে রাখো, তবে আমি আমার রক্ত দিয়ে বাতাসে কবিতা লিখব।” তাঁর এই উত্তরটি আজ ফিলিস্তিনি প্রতিরোধের অন্যতম সেরা উদাহরণ হিসেবে গণ্য হয়।
৪.
কাসিম প্রায়ই বলতেন তিনি এই পৃথিবীর একজন ‘টিকিটবিহীন যাত্রী’। একবার এক বিদেশি সাংবাদিক তাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, “আপনার পরিচয় কী? আপনি কি ইসরায়েলি নাগরিক নাকি ফিলিস্তিনি?” কাসিম উত্তর দিয়েছিলেন : ”আমার পরিচয় তো কোনো আইডি কার্ডে নেই। আমার পরিচয় হলো সেই মেঘে, যা কোনো সীমানা মানে না। আমি বৃষ্টির মতো, যেখানে তৃষ্ণা সেখানেই যে ঝরে পড়ে।” এটি তাঁর সর্বজনীন মরমিবাদের একটি বড় উদাহরণ।
৫.
কারাগারে থাকাকালীন কাসিম একটি ঘড়ি পরে থাকতেন। কিন্তু তার ঘড়ির ব্যাটারি শেষ হয়ে গিয়েছিল। তিনি তা ঠিক করেননি। সহবন্দিরা জিজ্ঞেস করলে তিনি বলতেন : ”বন্দিশালায় সময় স্থির হয়ে থাকা ভালো। কারণ আমার স্বাধীনতার ঘড়িটি বাইরে আমার জনগণের হৃদপিণ্ডের সাথে টিকটিক করছে। এই লোহার ঘড়ির সময় দিয়ে আমার কী হবে?”
৬.
একবার এক দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদের পর ইসরায়েলি গোয়েন্দা কর্মকর্তা কাসিমকে মানসিকভাবে ভেঙে দেওয়ার জন্য বলেছিলেন, “সামিহ, তোমার আয়নার দিকে তাকাও। তোমার যৌবন শেষ হয়ে যাচ্ছে এই জেলেই। তুমি কি চাও না শান্তিতে বাঁচতে?” কাসিম শান্তভাবে উত্তর দিয়েছিলেন : “আমি যখন আয়নায় তাকাই, আমি কেবল নিজেকে দেখি না। আমি আমার হাজার বছরের পূর্বপুরুষদের দেখি এবং আমার হাজার বছর পরের উত্তরসূরিদের দেখি। আমি যদি শান্তিতে বাঁচার জন্য সত্য ত্যাগ করি, তবে আয়নার সেই প্রতিচ্ছবি আমার মুখে থুতু দেবে। আমি একা নই, আমি এক অবিরাম মিছিল।”
৭.
একবার এক প্রতিবাদ সমাবেশের সময় সৈন্যরা গুলি চালানো শুরু করলে চারদিকে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। সবাই পালাচ্ছিল, কিন্তু কাসিম মঞ্চে দাঁড়িয়ে অবিচলভাবে কবিতা পড়ে যাচ্ছিলেন। পরে একজন তাকে জিজ্ঞেস করেছিল, “আপনার কি ভয় লাগছিল না?” কাসিম হেসে বলেছিলেন : ”একটি বুলেটের গন্তব্য কেবল একটি শরীর, কিন্তু একটি কবিতার গন্তব্য হলো লক্ষ লক্ষ মানুষের আত্মা। বুলেট শরীরকে বিদ্ধ করতে পারে, কিন্তু আত্মাকে নয়। আমি কেবল আমার ডিউটি পালন করছিলাম।”
৮.
সামিহ আল কাসিম তাঁর দ্রুজ পরিচয় নিয়ে খুব গর্বিত ছিলেন। একবার এক সাংবাদিক তাঁকে দ্রুজদের ‘গোপন আধ্যাত্মিক শিক্ষা’ সম্পর্কে প্রশ্ন করেছিলেন। কাসিম রহস্যময় হাসিতে উত্তর দিয়েছিলেন : ”আমাদের সবচেয়ে বড় গোপন শিক্ষাটি হলো—মৃত্যু বলে কিছু নেই। এটি কেবল এক ঘর থেকে অন্য ঘরে যাওয়ার মতো। আমি এখন এই ঘরে (শরীরে) কথা বলছি, কাল হয়তো অন্য কোনো রূপে আপনার জানালার পাশের জলপাই গাছ হয়ে কথা বলব।”
৯.
একবার ইসরায়েলি সেন্সর বোর্ড তাঁর একটি কবিতার প্রায় পুরোটা কেটে দেয়। কাসিম দমে না গিয়ে পরদিন সংবাদপত্রে তাঁর কলামের জায়গায় কেবল একটি সাদা কাগজ ছাপিয়ে দেন এবং নিচে নিজের নাম সই করেন।
মানুষ সেই সাদা কাগজ দেখেই তাঁর নীরব প্রতিবাদ এবং তাঁর ‘অব্যক্ত আধ্যাত্মিক হাহাকার’ বুঝতে পারে। এটি ছিল এক অদ্ভুত ‘নীরব মরমি প্রতিবাদ’।
১০
মাহমুদ দারবিশের মৃত্যুর কিছুদিন আগে কাসিম তাঁকে দেখতে গিয়েছিলেন। দারবিশ তখন খুব অসুস্থ। কাসিম তাঁকে দেখে বলেছিলেন, “মাহমুদ, তুমি আগে যেও না, আমি আগে যাব।” দারবিশ হেসে উত্তর দিয়েছিলেন, “সামিহ, তুমি তো জানো আমি তোমাকে ছাড়া কোথাও যাই না।” দারবিশের মৃত্যুর পর কাসিম ভেঙে না পড়ে বলেছিলেন : ”সে মারা যায়নি। সে কেবল কবিতার অন্য একটি চরণে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছে।”
১১.
একবার এক সাক্ষাৎকারে কাসিমকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, তিনি নিজের এপিটাফ বা সমাধিফলকে কী লিখে যেতে চান? কাসিম হেসে উত্তর দিয়েছিলেন : ”আমি চাই সেখানে লেখা থাকুক— ‘এখানে একজন টিকিটহীন যাত্রী শুয়ে আছে, যে কি না ট্রেনের প্রতিটি স্টেশনে নেমে এক কাপ করে কফি খেতে চেয়েছিল, কিন্তু ট্রেনের গার্ড তাকে বারবার তাড়া করেছে। শেষ পর্যন্ত সে ট্রেনের বাইরে লাফ দিয়ে নিজের গন্তব্য খুঁজে নিয়েছে।'” এটি তার জীবনের সেই দর্শনকে নির্দেশ করে যেখানে তিনি জাগতিক নিয়ম-শৃঙ্খলার চেয়ে আত্মার স্বাধীন ভ্রমণকে বেশি গুরুত্ব দিতেন।
১২.
একবার একটি রাজনৈতিক কবিতার জন্য তাঁকে আদালতে তোলা হয়েছিল। বিচারক তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, “আপনি কি জানেন আপনার এই কবিতা দেশের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করতে পারে?” কাসিম শান্তভাবে পকেট থেকে একটি ছোট কাগজের টুকরো বের করে বললেন : “মাননীয় বিচারক, নিরাপত্তা বিঘ্নিত করে আমার কবিতা নয়, বরং আপনাদের ভয়। আমার এই কয়েক লাইনের কবিতা যদি আপনাদের বিশাল সৈন্যবাহিনী আর অস্ত্রশস্ত্রের চেয়ে বেশি শক্তিশালী হয়, তবে দোষটা কবিতার নয়, আপনাদের কাঠামোর।”
১৩.
দীর্ঘদিন নির্জন কারাবাসে থাকার সময় কাসিম মানসিকভাবে শান্ত থাকার জন্য একটি অদ্ভুত কাজ করতেন। তিনি তার ঘরের কোণে থাকা পিঁপড়াদের খাবার দিতেন এবং তাদের সাথে কথা বলতেন। পরে তিনি লিখেছিলেন : ”আমি আবিষ্কার করলাম যে, একটি ক্ষুদ্র পিঁপড়াও মহাবিশ্বের নিয়মে চলে। তারা কখনো হতাশ হয় না। আমি জেলারের সাথে কথা বলা বন্ধ করে পিঁপড়াদের ভাষা শেখার চেষ্টা করছিলাম। কারণ মানুষের ভাষা তখন মিথ্যায় ভরে গিয়েছিল, কিন্তু প্রকৃতির এই ক্ষুদ্র প্রাণীদের নীরবতা ছিল সত্য।”
১৪.
একবার এক দরিদ্র লোক কাসিমকে এসে বললেন, “আপনার কবিতা পড়ে আমার পেট ভরে না, আমার রুটি চাই।” কাসিম পকেট থেকে যা ছিল সব তাকে দিয়ে দিলেন এবং বললেন : ”তুমি ঠিক বলেছ। কবিতা রুটি দেয় না, কিন্তু কবিতা সেই ক্ষুধার জন্ম দেয় যা তোমাকে কারো কাছে মাথা নত না করে রুটি অর্জন করতে শেখায়। আমি তোমাকে রুটি দিলাম আজ, কিন্তু কবিতা দিলাম যাতে তুমি সারাজীবন সম্মানের সাথে রুটি খুঁজে নিতে পারো।”
১৫.
জীবনের শেষ দিনগুলোতে যখন তিনি লিভার ক্যান্সারে আক্রান্ত ছিলেন, তখন তাঁর বন্ধু ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা খুব ভেঙে পড়েছিলেন। কাসিম বিছানায় শুয়ে তাদের সান্ত্বনা দিয়ে বলতেন : ”ক্যান্সার আমার লিভার খেতে পারে, কিন্তু আমার হাসিকে নয়। আমি তো আগেই বলেছি, আমি এক অমর মিছিলে যোগ দিয়েছি। এই শরীরটা একটা পুরোনো জামার মতো, ছিঁড়ে গেছে বলে ফেলে দিচ্ছি। নতুন জামা পরে আবার আসব।”
১৬.
একবার ইসরায়েলি সৈন্যরা তাঁর বাড়িতে তল্লাশি চালাতে আসে। তারা তাঁর বইপত্র সব তছনছ করছিল। একজন সৈন্য তাঁর একটি বাঁশি খুঁজে পায় এবং কর্কশ স্বরে জিজ্ঞেস করে, “এটা দিয়ে কী করো?” কাসিম শান্তভাবে উত্তর দিয়েছিলেন : ”এটা দিয়ে আমি সেই সুর বাজাই, যা তোমাদের বন্দুকের আওয়াজ ছাপিয়ে আকাশে পৌঁছে যায়। তোমরা বন্দুক দিয়ে শরীর মারতে পারো, কিন্তু বাঁশির সুর বাতাসের আত্মা হয়ে ঘুরে বেড়ায়। তাকে গ্রেপ্তার করার ক্ষমতা তোমাদের জেলের নেই।”
১৭.
একবার এক সাংবাদিক তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, “আপনি কি নোবেল পুরস্কার না পাওয়ায় হতাশ?” কাসিম তাঁর জানালার বাইরে দিগন্তের দিকে তাকিয়ে হেসেছিলেন এবং বলেছিলেন : ”আমার নোবেল পুরস্কার তো প্রতিদিন দেওয়া হয়। যখন কোনো ছোট বাচ্চা রাস্তায় আমার কবিতার লাইন আওড়ায়, কিংবা কোনো বৃদ্ধ মা তার চোখের জল মুছে আমার কবিতা শোনেন—সেটাই আমার শ্রেষ্ঠ পুরস্কার। আলফ্রেড নোবেলের ডিনামাইট শরীর ধ্বংস করতে পারে, কিন্তু আমার কবিতা আত্মা গড়ে তোলে। আমি ধ্বংসের পুরস্কার দিয়ে কী করব?”
১৮.
দীর্ঘদিন নির্জন কক্ষে থাকার সময় যখন মানুষের সাথে কথা বলা নিষিদ্ধ ছিল, কাসিম দেয়ালে নিজের ছায়ার দিকে তাকিয়ে কবিতা আবৃত্তি করতেন। জেলারেরা ভাবত তিনি পাগল হয়ে গেছেন। কাসিম পরে লিখেছিলেন : ”আমি পাগল ছিলাম না। আমি আমার ছায়ার সাথে কথা বলতাম কারণ সে-ই ছিল একমাত্র সত্তা যা জেলের দেয়াল ভেদ করে আমার সাথে ঢুকেছিল। আমি আমার ছায়াকে বলতাম— ‘দেখো, আমাদের শরীর এখানে আটকে থাকলেও আমাদের ছায়া কিন্তু এখনো সূর্যের আলোয় স্বাধীন।’”
১৯.
একবার তাঁর জন্মদিনে বন্ধুরা তাকে উইশ করতে এলে তিনি খুব মজার একটা কথা বলেন। তিনি বলেন : ”আমি আসলে কত বছর আগে জন্মেছি তা জানি না। কারণ দ্রুজ হিসেবে আমি জানি, আমি এই প্রথমবার পৃথিবীতে আসিনি। হয়তো আমি কোনো এক আদিম প্রান্তরে কবি ছিলাম, হয়তো আমি আন্দালুসিয়ার কোনো ট্রুবাদুর ছিলাম। তাই আমার বয়স তো হাজার বছর!”
২০.
হাসপাতালে যখন তিনি মৃত্যুশয্যায়, একজন নার্স তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলেন তিনি কেমন আছেন। অত্যন্ত কষ্টকর শ্বাসপ্রশ্বাসের মধ্যেও তিনি ফিসফিস করে বলেছিলেন : ”আমি এক মহাসমুদ্রের দিকে যাচ্ছি। শরীরটা ভারী হয়ে গেছে, তাই ওটা এখানেই ফেলে যাচ্ছি। কিন্তু আমার কবিতাগুলো সমুদ্রের ঢেউ হয়ে ফিরে আসবে বারবার। তোমরা ভয় পেয়ো না।”
সামিহ আল কাসিমের উত্তরাধিকার কেবল ফিলিস্তিনি সাহিত্যের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা বিশ্বজুড়ে অধিকারবঞ্চিত মানুষের কাছে এক আধ্যাত্মিক ও রাজনৈতিক আলোকবর্তিকা।
আগেই বলা হয়েছে, কাসিমকে বলা হয় ‘প্রতিরোধের কবি’। মাহমুদ দারবিশের সাথে মিলে তিনি ফিলিস্তিনি সাহিত্যের এমন এক ধারা তৈরি করেছেন, যেখানে কবিতা কেবল নন্দনতত্ত্ব নয়, বরং একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক অস্ত্র। আজ বিশ্বের যে-কোনো প্রান্তে যখন নিপীড়িত মানুষ স্লোগান দেয়, তখন কাসিমের কবিতার ছন্দ বা তাঁর ভাবধারা সেখানে প্রতিধ্বনিত হয়। তিনি শিখিয়েছেন যে, একটি কলম একটি কামানের চেয়েও বেশি শক্তিশালী হতে পারে।
সামিহ আল কাসিমের সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার হলো ধর্মের গণ্ডি পেরিয়ে মরমিবাদকে লড়াইয়ের ময়দানে নিয়ে আসা। তিনি প্রমাণ করেছেন যে, আধ্যাত্মিকতা মানে জগৎ ত্যাগ করা নয়, বরং জগতের অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য ভেতর থেকে শক্তি সঞ্চয় করা। তাঁর ‘পুনর্জন্ম’ তত্ত্ব সংগ্রামীদের মৃত্যুভয় জয় করতে শেখায়।
কাসিম আরবি ভাষাকে যেভাবে ব্যবহার করেছেন, তা আধুনিক আরবি সাহিত্যে এক নতুন মানদণ্ড তৈরি করেছে। তিনি তাঁর কবিতায় ধ্রুপদী আরবি আর আধুনিক লোকজ ভাষার এক অদ্ভুত মিশেল ঘটিয়েছেন। তাঁর মৃত্যুর পর আরব বিশ্বের তরুণ কবিরা তাঁকে তাদের ‘আধ্যাত্মিক পিতা’ হিসেবে গণ্য করেন।
কাসিম বিশ্বাস করতেন কবির জীবন আর তার কবিতা আলাদা কিছু নয়। তিনি বারবার কারাবরণ করেছেন, ইসরায়েলি নাগরিকত্ব থাকা সত্ত্বেও নিজেকে সবসময় ফিলিস্তিনি হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন। তাঁর এই নৈতিক দৃঢ়তা বর্তমান প্রজন্মের বুদ্ধিজীবীদের জন্য এক বড় শিক্ষা। তিনি শিখিয়ে গেছেন যে, একজন কবির আপোষহীনতাই তার কবিতার স্থায়িত্ব নিশ্চিত করে।
তাঁর উত্তরাধিকার হলো : শরীর ধ্বংস হলেও আদর্শের ‘পুনর্জন্ম’ ঘটে বারবার। তাঁর মৃত্যুর পর রামাল্লা ও গাজার দেয়ালে দেয়ালে তাঁর কবিতার পঙক্তি লিখে দেওয়া হয়েছিল। এমনকি তাঁর জানাজায় হাজার হাজার মানুষ যখন সমবেত হয়েছিল, তারা শোক পালন করেনি; বরং তাঁর কবিতা আবৃত্তি করে এক উৎসবের আমেজ তৈরি করেছিল। এটিই তাঁর আসল উত্তরাধিকার : মৃত্যুকে উৎসবে রূপান্তর করা।
সামিহ আলকাসিম এর মরমি কবিতা
সামিহ আল কাসিমের কবিতা কেবল রাজনৈতিক শ্লোগান নয়, বরং তা মহাজাগতিক এক উপলব্ধির বহিঃপ্রকাশ। তাঁর কিছু মরমি ভাবাপন্ন কবিতার সাবলীল বাংলা গদ্যে ভাবানুবাদ আমরা পাঠ করতে পারি।
১.
আমি মেঘের সন্তান, আমি বিদ্যুতের সহোদর। আমার হৃদয় সূর্যের দিকে খোলা একটি জানালা। আমার কোনো নির্দিষ্ট ঘর নেই ঠিকই, কিন্তু গোটা মহাবিশ্বই আমার নিবাস। আমার কোনো পাসপোর্ট নেই, কারণ বাতাসের মতো আমি সব সীমানা ছাড়িয়ে যাই। আমাকে বন্দি করবে কোন শিকল দিয়ে? আমি তো সেই আলো, যা অন্ধকারের বুক চিরে পথ খুঁজে নেয়।
২.
তোমরা আমাকে মন্দিরের দেয়ালে খুঁজতে যেয়ো না, আমাকে পাবে না মসজিদের গম্বুজেও। আমি এক অদৃশ্য মন্দিরের উপাসক, যার দেওয়াল তৈরি হয়েছে মানুষের ভালোবাসা আর স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা দিয়ে। সেখানে কোনো পুরোহিত নেই, কোনো মধ্যস্থতাকারী নেই; সেখানে আত্মা সরাসরি সত্যের মুখোমুখি হয়। আমার প্রতিটি দীর্ঘশ্বাস সেই মন্দিরের ধূপ, আর আমার প্রতিটি রক্তবিন্দু সেখানে এক একটি পবিত্র বাতি। তোমরা যদি আমাকে খুঁজতে চাও, তবে মানুষের চোখের মণির ভেতর তাকাও—সেখানে আমি এক মরমী জ্যোতি হয়ে বেঁচে আছি।
৩.
আমি এমন এক যাত্রী যার গন্তব্য কোনো মানচিত্রে নেই। জেলখানার এই চার দেয়াল আমাকে আটকাতে পারেনি, কারণ আমার আত্মা দেয়াল ভেদ করে দূর দিগন্তে নীলিমা হয়ে মিশে আছে। আমি সময়ের হাতঘড়ি দেখি না, কারণ আমার সময় বইছে নদীর স্রোতে। যখন পৃথিবী ঘুমিয়ে থাকে, আমি তখন তারার সাথে কথা বলি। তারা আমাকে বলে— ‘সামিহ, তুমি তো একা নও; তুমি তো সেই অনাদি কাল থেকে বয়ে চলা এক মহাজাগতিক সুরের একটি তান মাত্র।’
৪.
আমি কোনো আগন্তুক নই, আমি এই প্রাচীন জলপাই গাছেরই এক মরমি রূপান্তর। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে আমি এখানে দাঁড়িয়ে আছি, রোদ আর বৃষ্টি পান করে বড় হয়েছি। আমার শেকড় মাটির অন্ধকারে কী খোঁজে জানো? তারা খোঁজে সেই আদিম সত্যকে, যা সময়ের চেয়েও প্রাচীন। কুড়াল দিয়ে আমার ডাল কাটতে পারো, কিন্তু আমার ভেতরে যে প্রাণরস বইছে, তা স্বর্গের ঝরনার মতো অবিনশ্বর। আমি মরে গিয়েও আবার মাটির বুক চিরে সবুজ হয়ে জন্ম নেব।
৫.
রাত নেমেছে জেলের প্রকোষ্ঠে, কিন্তু আমার ভেতরে এক অদ্ভুত সূর্যোদয় ঘটছে। লোহার শিকলগুলো এখন আর ভারী ঠেকছে না, মনে হচ্ছে ওগুলো যেন আমার বীণার তার। এই যে নিস্তব্ধতা, এ কোনো শূন্যতা নয়—এ হলো সেই পবিত্র নীরবতা যার ভেতর দিয়ে মহাবিশ্বের ফিসফাস শোনা যায়। আমি যখন চোখ বন্ধ করি, তখন আমি আর এই চার দেয়ালের মাঝে নেই; আমি তখন নক্ষত্রের মিছিলে হেঁটে চলছি। কারাগার আমার শরীরকে বন্দি করেছে ঠিকই, কিন্তু আমার ধ্যানকে শিকল পরাবে এমন সাধ্য কার?
৬.
আমার শরীর থেকে যে রক্ত ঝরছে, তা কেবল লাল রঙ নয় — তা হলো এক মরমি মানচিত্র। প্রতিটি বিন্দু মাটিতে মিশে গিয়ে এক একটি লাল গোলাপের জন্ম দিচ্ছে। ঘাতকেরা ভাবে তারা আমাকে শেষ করে দিচ্ছে, কিন্তু আমি তো আমার অস্তিত্বকে প্রকৃতির মাঝে বিলিয়ে দিচ্ছি মাত্র। ফানা হওয়ার এই আনন্দ তোমরা বুঝবে না। আমি মাটির সাথে মিশে যাচ্ছি যাতে আমি গোটা দেশ হয়ে আবার জেগে উঠতে পারি। আমার প্রতিটি রক্তবিন্দু এক একটি শব্দ হয়ে বাতাসের গায়ে অমর হয়ে লেখা থাকবে।
৭.
বাতাস যখন আমার কানে ফিসফিস করে কথা বলে, আমি বুঝতে পারি—আমি আসলে এই নশ্বর শরীরের চেয়েও বিশাল কিছু। আমি বাতাসের পিঠে চড়ে সেই সব পাহাড় আর সমুদ্র ছাড়িয়ে যাই, যেখানে মানুষের তৈরি কোনো কাঁটাতার নেই। জেলখানার প্রহরীরা যখন আমার দরজায় তালা দেয়, আমি তখন বাতাসের ঝাপটা হয়ে জানালার ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে যাই। তারা ভাবে আমি ভেতরে আছি, কিন্তু আমি তখন মহাকাশের নীলিমায় মিশে একাকার হয়ে গেছি। অসীম হওয়ার এই যে স্বাদ, তা কোনো শাসক কেড়ে নিতে পারে না।
৮.
রাস্তার এই যে পড়ে থাকা পাথরটা, ওকে সাধারণ মাটি ভেবো না। এই পাথরের ভেতর ধুকপুক করছে এক আদিম প্রাণ। সে দেখেছে কত সাম্রাজ্যের উত্থান আর পতন, শুনেছে কত শহিদের শেষ দীর্ঘশ্বাস। আমি যখন পাথরটাকে ছুঁই, আমি অনুভব করি আমার পূর্বপুরুষদের স্পর্শ। পাথরের নীরবতা আসলে এক গভীর ধ্যান। ঘাতকেরা ভাবে তারা পাথর ছুঁড়ছে, কিন্তু তারা জানে না—প্রতিটি পাথরই আসলে এক একটি জীবন্ত সাক্ষী, যারা মরমি ভাষায় ইতিহাসের বিচার লিখে রাখছে।
৯.
আমি অন্ধকারের শেষ সীমানায় দাঁড়িয়ে আলোর সাথে কথা বলি। আমি জানি, এই যে জীবন—এ কেবল একটি দীর্ঘ ঘুমের মাঝে দেখা স্বপ্নের মতো। আসল জাগরণ তো ঘটবে তখন, যখন আমি আমার এই মাটির শরীরকে মাটির কাছেই সঁপে দিয়ে শুদ্ধ আত্মা হয়ে যাত্রা করব। আমাকে তোমরা কোথাও খুঁজে পাবে না, অথচ আমি থাকব সবখানে। ঘাসের ডগায় জমে থাকা শিশিরে যেমন সূর্য লুকিয়ে থাকে, তেমনি মানুষের মুক্তির প্রতিটি নিশ্বাসে আমি বেঁচে থাকব এক গোপন মরমি সুর হয়ে।
১০.
মানুষ যখন অন্ধকারের ভয়ে ঘরের দরজা বন্ধ করে দেয়, আমি তখন পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে আলোর জন্য অপেক্ষা করি। আমার চোখ দুটি এখন আর সাধারণ চোখ নয়, ওগুলো সূর্যের তেজ পান করার জন্য দুটি তৃষ্ণার্ত পাত্র। আমি সেই আগুনের সাথে কথা বলি যা কোনোদিন নেভে না। তারা আমাকে বলে আমি পাগল, কিন্তু আমি জানি—যে একবার সেই পরম আলোর স্বাদ পেয়েছে, তার কাছে এই অন্ধকার পৃথিবীটা কেবল এক মায়া ছাড়া আর কিছুই নয়। আমি পুড়ে ছাই হতে রাজি, যদি সেই ছাই থেকে আবার নতুন এক সূর্যোদয় ঘটে।
১১.
তোমরা আমার কলম ভেঙে ফেলতে পারো, আমার কণ্ঠস্বর স্তব্ধ করে দিতে পারো—কিন্তু আমার শব্দের কী করবে? আমার প্রতিটি শব্দ এখন বাতাসের ভাঁজে ভাঁজে লুকিয়ে আছে, তারা বৃষ্টির ফোঁটা হয়ে ঝরছে তৃষ্ণার্ত জমিনে। শব্দ হলো আত্মার নিঃশ্বাস, আর আত্মার কি কখনো মৃত্যু হয়? আমি যখন থাকব না, তখনো আমার কবিতাগুলো অদৃশ্য এক মরমি সুর হয়ে মানুষের হৃদয়ে বেজে উঠবে। ঘাতকেরা শরীর মারতে জানে, কিন্তু অবিনশ্বর বাণীকে শিকল পরানোর মন্ত্র তারা আজও শেখেনি।
১২.
আমি যখন নাচি, তখন আমি আর এই মাটির মানুষ নই। আমার চারদিকে তখন গ্রহ-নক্ষত্ররা ঘুরতে থাকে। আমি শুনতে পাই মহাবিশ্বের সেই গোপন হৃদস্পন্দন, যা কেবল স্তব্ধতার মাঝে শোনা যায়। আমার এই ঘূর্ণন কোনো সাধারণ নাচ নয়, এটি হলো সীমানা ভেঙে অসীমের সাথে মিলে যাওয়ার এক ব্যাকুলতা। আমি ঘুরছি, ঘুরছি… যতক্ষণ না আমার ‘আমি’ সত্তাটি বিলীন হয়ে কেবল এক বিশাল শূন্যতায় মিশে যায়। সেই শূন্যতাই আসলে পূর্ণতা, যেখানে আমি আর আমার দেশ এক হয়ে মিশে আছি।
১৩.
আমি যখন আয়নার সামনে দাঁড়াই, আমি কেবল এক জোড়া ক্লান্ত চোখ দেখি না। আমি দেখি আমার পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা হাজার বছরের এক দীর্ঘ মিছিল। সেই মিছিলে আছে আমার আদি পিতা আদম, আছে যিশু আর মুহম্মদ। আয়নার কাঁচটা ভেদ করে আমার দৃষ্টি চলে যায় এক অসীম শূন্যতায়, যেখানে রূপের চেয়ে অরূপের মহিমা বেশি। আমি বুঝতে পারি, আমার এই মুখাবয়ব কেবল একটি মুখোশ মাত্র। আসল ‘আমি’ তো বাস করি সেই আলোতে, যা কোনোদিন আয়নায় ধরা পড়ে না।
১৪.
হে জগতবাসী, তোমরা যখন উচ্চস্বরে প্রার্থনা করো, আমি তখন নীরবতার সাগরে ডুব দিই। কারণ আমি জানি, পরম সত্যের কোনো ভাষা নেই। তিনি শব্দে নয়, হৃদয়ের স্পন্দনে ধরা দেন। আমার চোখের জলই আমার শ্রেষ্ঠ মন্ত্র, আর আমার দীর্ঘশ্বাসই আমার পবিত্র পাঠ। যখন আমি চুপ থাকি, তখন সারা বিশ্ব আমার সাথে কথা বলতে শুরু করে। পাহাড়ের স্থিরতা আর নদীর বয়ে চলা—সবই তখন আমার কাছে এক একটি প্রার্থনা মনে হয়। এই নীরবতাই হলো আমার মুক্তি।
১৫.
তোমরা আমাকে রাস্তার সাধারণ ধূলিকণা ভেবে উপেক্ষা করছ? কিন্তু মনে রেখো, এই ধুলোর মাঝেই লুকিয়ে আছে মহাবিশ্বের আদি রহস্য। আমি সেই ধুলো যা নক্ষত্র থেকে ঝরে পড়েছে, আমি সেই ধুলো যা একদিন বিশাল কোনো সৌধ হবে। আমাকে পায়ে মাড়িয়ে তুমি যখন চলে যাও, আমি তখন তোমার পদচিহ্নে আমার পরিচয় লিখে রাখি। কারণ শেষ পর্যন্ত আমরা সবাই এই ধুলোতেই ফিরে যাব। বিনয়ের চেয়ে বড় কোনো আধ্যাত্মিকতা নেই, আর মাটির সাথে মিশে যাওয়ার চেয়ে বড় কোনো মিলন নেই।
১৬.
আমাকে যখন তোমরা মাটিতে শুইয়ে দেবে, হাহাকার কোরো না। আমি তো মরে যাচ্ছি না, আমি কেবল নিজেকে ছড়িয়ে দিচ্ছি। আমার আঙুলগুলো হয়ে উঠবে গমের শিষ, যা ক্ষুধার্তের মুখে অন্ন জোগাবে। আমার রক্ত হবে সেই বৃষ্টির জল, যা রুক্ষ মরুভূমিকে সবুজ গালিচায় ঢেকে দেবে। তোমরা কি শুনছ না? বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দে আসলে আমারই নিঃশ্বাস বইছে। আমি এখন আর একজন মানুষ নই, আমি এখন গোটা দেশের স্পন্দন হয়ে গেছি। এই যে রূপান্তর—এ কোনো বিনাশ নয়, এ এক মহান মুক্তি।
১৭.
আমি এমন এক সময়ে বাস করি যা ঘড়ির কাঁটায় ধরা পড়ে না। এখানে আদি আর অন্ত এক হয়ে মিশে গেছে। আমি যখন চোখ বন্ধ করি, তখন আমি দেখতে পাই সৃষ্টির প্রথম সকালের সেই আশ্চর্য আলো। জেলখানার দেয়ালগুলো আমার কাছে তখন কাঁচের মতো স্বচ্ছ হয়ে যায়, আর আমি দেখতে পাই কাল আর মহাকালের মিলন মেলা। তোমরা আমাকে বর্তমানের শিকল দিয়ে বাঁধতে চাও? কিন্তু আমার আত্মা তো সেই সময়ের যাত্রী যা ইতিহাস হওয়ারও আগে থেকে ছিল এবং যা পৃথিবী ধ্বংস হওয়ার পরেও থাকবে।
১৮.
একটি পাখি যখন ভোরে গান গায়, সে কোনো রাজার স্তুতি করে না; সে গায় আকাশের সেই অনন্ত স্বাধীনতার গান। আমার কণ্ঠস্বরও সেই পাখির মতো। তোমরা আমার জিহ্বা কেটে দিতে পারো, কিন্তু আমার গানকে মারবে কীভাবে? সেই গান তো এখন বাতাসের কম্পনে লেখা হয়ে গেছে। প্রতিটি শিশু যখন প্রথম কথা বলবে, তারা অজান্তেই আমার সেই মুক্তির মন্ত্র উচ্চারণ করবে। এই যে চেতনার উত্তরাধিকার, এটিই হলো আমার আসল জীবন। আমি ফুরিয়ে গেলেও আমার সুর অবিনশ্বর হয়ে মানুষের অন্তরে প্রতিধ্বনিত হবে।
১৯.
আমাকে পোড়াও, আরও পোড়াও! কারণ আমি যত পুড়ছি, আমার ভেতরের নশ্বর অংশগুলো তত ছাই হয়ে যাচ্ছে। যা অবশিষ্ট থাকছে, তা হলো এক বিশুদ্ধ আলোকবর্তিকা—যাকে কোনো আগুনই গ্রাস করতে পারে না। তোমরা ভাবছ আমি যন্ত্রণায় চিৎকার করছি? না, এটি আমার হৃদয়ের এক গোপন জিকির। প্রতিটি আগুনের শিখা আমাকে বলছে, ‘অহং ত্যাগ করো, তবেই তুমি সত্যের দেখা পাবে।’ এই অগ্নিপরীক্ষাই আমার মিরাজ, আমার আধ্যাত্মিক উত্তরণ।
২০.
আমার দেশ কোনো পাথরের দেয়াল নয়, কোনো কাঁটাতারের সীমানা নয়। আমার দেশ হলো এক অনুভূতি, যা সবকিছুর উর্ধ্বে। আমি যখন চোখ বন্ধ করি, তখন আমি এমন এক ভূখণ্ডের দেখা পাই যেখানে মাটি আর আকাশ এক হয়ে মিলে গেছে। সেখানে কোনো পাসপোর্ট লাগে না, কোনো পরিচয়পত্রের প্রয়োজন নেই। কেবল আত্মার স্বচ্ছতাই সেখানে প্রবেশের একমাত্র চাবিকাঠি। তোমরা আমার জমি কেড়ে নিতে পারো, কিন্তু আমার এই নিরাকার স্বদেশকে কেড়ে নেবে কীভাবে? সে তো আমার বিশ্বাসের গভীরে এক অমর মন্দির হয়ে আছে।
২১.
সূর্য যখন ডুবে যায়, সে হারিয়ে যায় না; সে আসলে অন্য কোনো দিগন্তে জেগে ওঠার প্রস্তুতি নেয়। আমার মৃত্যুও ঠিক তেমনই। আমি আজ অন্ধকারে মিলিয়ে যাচ্ছি ঠিকই, কিন্তু কাল আমি ফিরে আসব এক হাজার প্রদীপের শিখা হয়ে। আমি ফিরে আসব মানুষের চোখের মণির উজ্জ্বলতায়, আমি ফিরে আসব সেই সত্যের মাঝে যা কেউ কোনোদিন আড়াল করতে পারেনি। মৃত্যু আমার কাছে এক দীর্ঘ ঘুমের মতো, যা শেষে এক মহান জাগরণ অপেক্ষা করছে। আমি আসছি, বারবার আসছি—যতক্ষণ না এই পৃথিবী আলোর সাগরে প্লাবিত হয়।
২২.
মানুষ শূন্যতাকে ভয় পায়, কিন্তু আমি সেই শূন্যতার মাঝেই আমার পরম আশ্রয় খুঁজে পেয়েছি। যখন আমি আমার নাম, আমার পদবী আর আমার অহংকার ঝেড়ে ফেলি, তখনই আমি অনুভব করি এক বিশাল পূর্ণতা। আমি তখন আর কেউ নই, আবার আমিই তখন সব কিছু। এই যে নিঃস্ব হওয়া, এটাই হলো আসল রাজত্ব। যখন আমার কাছে কিছু নেই, তখনই গোটা মহাবিশ্ব আমার দুহাত ভরে দিতে আসে। শূন্যতাই হলো সেই পাত্র, যেখানে সত্যের সুধা পূর্ণ হয়ে ওঠে।
২৩.
যখন আমি একা কাঁদি, তখন মনে হয় আকাশের নক্ষত্রগুলোও আমার সাথে অশ্রু বিসর্জন দিচ্ছে। আমার এই চোখের জল কি কেবল আমার একার? না, এ হলো সৃষ্টির শুরু থেকে জমে থাকা এক আদিম আর্তি। মহাবিশ্বের প্রতিটি কণা একে অপরের সাথে এক অদৃশ্য মরমি সুতোয় বাঁধা। আমি যখন ব্যথায় কুকড়ে যাই, দূর আকাশের কোনো এক ছায়াপথও হয়তো কেঁপে ওঠে। আমরা সবাই এক বিশাল ব্যথার অংশীদার, আবার আমরা সবাই এক মহান আনন্দেরও যাত্রী।
২৪.
তোমরা অন্ধকারকে ঘৃণা করো, কিন্তু আমি অন্ধকারকে ভালোবাসি। কারণ অন্ধকারের নিবিড় কোলেই তো আলোর জন্ম হয়। মাটির নিচের অন্ধকার না থাকলে কি বীজ কোনোদিন অঙ্কুরিত হতো? গর্ভের অন্ধকার না থাকলে কি প্রাণের স্পন্দন শুরু হতো? আমার জীবনের এই যে ঘোর অমানিশা, একে আমি ভয় পাই না। আমি জানি, এই অন্ধকারের ঠিক মাঝখানেই এক গোপন চাবি লুকিয়ে আছে, যা দিয়ে অসীমের দুয়ার খোলা যায়। অন্ধকার কোনো শেষ নয়, এটি হলো এক পরম আলোর নীরব অপেক্ষা।
২৫.
আমি যখন সমুদ্রের তীরে দাঁড়াই, আমি পানি দেখি না; আমি দেখি এক বিশাল আয়না, যা মহাকালের মুখচ্ছবি ধরে রেখেছে। আমার আত্মা ঠিক এই সমুদ্রের মতোই—উপরে উত্তাল ঢেউ, আর অতল গভীরে এক শান্ত নীরবতা। তোমরা পাথর ছুঁড়ে আমার উপরিভাগকে অশান্ত করতে পারো, কিন্তু আমার গভীরের সেই ধ্যানের জগতকে স্পর্শ করার ক্ষমতা কারো নেই। আমি নোনা জলের প্রতিটি ফোঁটায় নক্ষত্রদের ছায়া নিয়ে বেঁচে থাকি। আমিই সেই সমুদ্র, যে কি না তীরের সীমাবদ্ধতাকে অস্বীকার করে অসীমের তৃষ্ণায় বয়ে চলেছি।
২৬.
যে সত্য আমি উচ্চারণ করিনি, তা-ই হলো আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ কবিতা। কারণ শব্দ অনেক সময় সত্যের শরীরকে ঢেকে ফেলে। আমি সেই জবানবন্দি দিতে চাই যা কেবল বাতাসের কাঁপুনিতে শোনা যায়, যা কেবল ঘাসের ডগায় জমে থাকা শিশিরের বিন্দুতে পড়া যায়। ঘাতকেরা আমাকে জেরা করে ক্লান্ত হয়ে যাবে, কিন্তু আমার নীরবতার পাঠোদ্ধার করতে পারবে না। কারণ আমার নীরবতা কোনো ভীরুতা নয়, এ হলো সেই অবিনশ্বর সত্যের গুঞ্জন যা সৃষ্টির প্রথম দিন থেকে গুমরে মরছে। আমি সেই মৌনতার উপাসক, যা মৃত্যুকেও তুচ্ছ জ্ঞান করে।
২৭.
আমি মাটির ধুলো থেকে উঠে এসেছি, আবার একদিন এই ধুলোতেই মিশে যাব। কিন্তু এই যাত্রাপথে আমি চিনে নিয়েছি আমার ভেতরের সেই নক্ষত্রকে, যা কোনোদিন নিভে যায় না। আমার শরীরটা মাটির খাঁচা হতে পারে, কিন্তু আমার চেতনা হলো সেই আলো যা নক্ষত্রপুঞ্জ থেকে ছিটকে পড়েছে। আমি আজ আছি, কাল নেই—এই কথাটি কেবল তাদের জন্য যারা কেবল চোখ দিয়ে দেখে। কিন্তু যারা হৃদয় দিয়ে অনুভব করে, তারা জানে যে আমি কোনোদিন ফুরিয়ে যাই না। আমি কেবল ধূলিকণা থেকে নক্ষত্রে রূপান্তরিত হই, এক জীবন থেকে অন্য জীবনে যাত্রা করি।
২৮.
আমি কোনো মানচিত্রের পথিক নই, আমি সময়ের এক নিরন্তর যাত্রী। যখন পৃথিবী নামের এই গ্রহটির জন্ম হয়নি, তখনও আমি কোনো এক চেতনার আলো হয়ে ভাসছিলাম। আজ আমি ফিলিস্তিনের এক অবরুদ্ধ নগরে বসে কথা বলছি ঠিকই, কিন্তু আমার ভেতরের মানুষটি নক্ষত্রপুঞ্জের ধুলো মেখে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তোমরা যারা কেবল ঘড়ির কাঁটা দিয়ে জীবন মাপো, তারা আমার এই নিরুদ্দেশ যাত্রার খবর পাবে না। আমার এক পা রয়েছে বর্তমানে, আর অন্য পা রয়েছে সেই অতীতে—যা কোনোদিন শেষ হয় না। আমি সেই আদি-অন্তহীন পথের এক মরমী গান।
২৯.
আগুন আমাকে ভয় দেখাবে কী করে? আমি নিজেই তো এক জ্বলন্ত শিখা। আমার ভেতরের দহন যখন বাইরের আগুনের সাথে মিলিত হয়, তখন সেখানে এক অদ্ভুত শান্তির জন্ম হয়। আমি পুড়ে ছাই হতে রাজি, কারণ ছাই মানেই বিলীন হয়ে যাওয়া নয়—ছাই হলো সেই পবিত্র ধুলো যা থেকে আবার নতুন প্রাণের স্পন্দন শুরু হয়। আমি যখন শিখার সাথে কথা বলি, সে আমাকে বলে— ‘সামিহ, যা নশ্বর তা-ই কেবল পুড়ে যায়, যা সত্য তা আগুনের মাঝেই আরও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।’ আমি সেই অবিনশ্বর সত্যের সন্ধানেই নিজেকে বারবার আহুতি দিই।
৩০.
আমাকে যখন তোমরা কবরে নামাবে, তখন শোক কোরো না। বরং ভাবো, তোমরা একটি বীজ রোপণ করছ। আমার হাড়গুলো পাথরের সাথে মিশে পাহাড় হবে, আর আমার রক্ত হবে মাটির নিচের সেই চোরা স্রোত যা জলপাই গাছকে সজীব রাখে। আজ আমি মরে যাচ্ছি বলে তোমরা হাসছ? অথচ তোমরা জানো না, কাল সকালে কোনো এক শিশুর প্রথম চিৎকারে আমিই আবার ফিরে আসব। এই মাটি আমাকে চেনে, কারণ আমি বারবার এখানেই ফিরে আসি।
——-
সৈয়দ তারিক
সৈয়দ তারিক। ১৯৬৩ সালের ১০ অগাস্ট ঢাকায় জন্ম ও ঢাকাতেই বেড়ে ওঠা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগে পাঠ অসমাপ্ত রেখে ছাত্রত্ব ঘোচান। অল্প কিছুকাল সাংবাদিকতার পেশায় ছিলেন। তারপর থেকে পেশামুক্ত। ভ্রমণ করতে ভালোবাসেন। তিনি অসংসারী। বাল্যকাল থেকে কবিতা লেখেন। তিনি একজন সুফিসাধক ও এই ভাবধারা বিষয়ে লেখেন।। তার প্রকাশিত বই: ১. ছুরি হাতে অশ্ব ছুটে যায় (১৯৯৬) ২. মগ্ন তখন মোরাকাবায় (২০০৯) ৩. আমার ফকিরি (২০১১) ৪. নাচে দরবেশ মাস্ত হালে (২০১১) ৫. উনসন্ন্যাসী (২০১৫) ৬. ছুরি হাতে অশ্ব ছুটে যায় ও অন্যান্য কবিতা (২০১৯) ৭. আত্মায় ছিল তৃষ্ণা (২০১৯) ৮. সাহিত্যের আলাপ (২০১৯) ৯. সুফিবাদ ও সাহিত্যের মোহনা (২০২০) ১০. আমার ফকিরি [বর্ধিত সংস্করণ] (২০২১)।





