Home » মণিপদ্ম দত্ত-র ৫টি কবিতা

মণিপদ্ম দত্ত-র ৫টি কবিতা

মৃত নক্ষত্রের চাপে 

ক্রমাগত বেঁকে যাচ্ছে পৃথিবীর পিঠ 

মুছে যাচ্ছে অপরাহ্ন  

বিষাদ সময় 

ভালবাসতে ভয় হয় 

ছায়াময় অন্ধ ঝংকারে  

তোমাকে বিদেহী লাগে 

ওষ্ঠ শুকিয়ে মরা দাগ জাগে

গভীর নিদাঘে অপেক্ষা করি 

কে ধরবে হাত 

লুকনো বিকেলে জুড়ে  

ত্রস্ত প্রণিপাত 

সময়ের কাছে 

অসহ্য লাগে এই মৃত প্রেতযোনি পথ 

তবুও তোমাকে চাওয়ার শপথ 

আমাকে প্রোথিত রাখে।

আমি তো সত্যিই চাই 

তুমিও তো চাইবে আমাকে। 

এভাবেই চলুক যুদ্ধ

বৃদ্ধ মৃত নক্ষত্রদের সাথে। 

নীরব নক্ষত্রবীথি মোহপর্দাহীন

রুদ্ধশ্বাস নৈঃশব্দ্যও ছিল শব্দময়

বাতাস এখন গাঢ় স্থির সমাসীন

ঘন নিঃশ্বাসবায়ু মঞ্চ স্মৃতিময়।

কী অব্যয় উৎকণ্ঠা দিকচক্রবালে

সন্ধ্যাকালে সূর্যোদয় এও কি সম্ভব!

কিন্তু সূর্য উঠলেন সেই ব্রহ্মক্ষণে

শুদ্ধ স্নিগ্ধ জ্যোতিচ্ছটা আকাশের গায়।  

মায়া-আলো বৃন্দাবনি সারঙের তান

বৃষ্টি-স্নাত হেমন্তের রুপশালি ধান।

অলৌকিক বিভঙ্গের মূর্ত কারুকাজ

মঞ্চ জুড়ে থিরবিজুরি বিরজু মহারাজ।

এই যে তারাবীথি নিয়ত স্থবিরতা

আকাশ ঢেকেছে  পরম প্রজ্ঞায়

তবুও তুমি আসো ঘাসের সরসতা

ছাপ তো বুকে রাখে গভীর আলতায় ।.

যাহারা ভালবাসে রক্ত উত্তাপ

যাহারা দিয়েছিল আমের বোল

রক্ত আলতার যৌগ চন্দনে

তারাই বেঁচে থাকে, কী কল্লোল।

আজ এ বর্ষার ঘোলাটে জলসায়

তোমাকে মনে পড়ে প্লাবিত খেত

না হয় দুমুঠো গ্রাসও খসে যাবে

তবুও থেমে যাক অশ্বমেধ।

এখানে এন্তার সর্পগন্ধার

এলানো বাতাসের চক্রবাল

এবারে বাঁহাতেও পুজিবে না আর

সর্বহারা চাঁদ সওদাগর।

সেতো আমি তাকে অহরহ বলে গেছি

মেঘ আসে মেঘ বারবার ফিরে যায়

ছুঁয়ে ছুঁয়ে দিয়ে ভাঙ্গা চিলেকোঠা ছাদ

গর্ভের জল গর্ভেই মৃতপ্রায়।

তাহলে কি সেই রাতগুলো বীজহীন

অথবা সেচন নিয়ে গেছে গিরিখাত

আমরা ছিলাম নিজের কোটরাগত

বন্যা আসেনি, ভাসে নি মধ্য রাত!

আমরা তাহলে শপিং মলের মতোই

করেছি কেবল শারীরিক বেচাকেনা

এক আর একে দুই হয়ে ছিঁড়ে গেলো

তীব্র মেহনে। বাকিটুকু প্রতারণা।

আসলে আমরা নিজেরই ছদ্মবেশে

জমিয়ে ফেলছি এতো মৃত সিলিকন

জরায়ু ছিটকে বীজহীন বীজ বোনা

কীই বা করবে গাভীন বৃষ্টি জল।

এরপরে এক চৈত্র দিনের সেলে

বঞ্চিত ভ্রূণ, আঁটসাঁট ক্রোমোজোম

বেচাকেনা হবে লাভের কড়ার ধরে

আমাদের হাতে শুধু দোজখের ওম।

হাসপাতালটি যথেষ্ট ভালই  মনে হোল। বেশ ঝকঝকে তকতকে। দূরে  সুবেশ ডাক্তারবাবু ও নার্সদের নিঃশব্দ আনাগোনা। ভিজিটরদের বসার পরিচ্ছন্ন ব্যাবস্থা। ভাল ক্যাফে। কফি স্ন্যাক্স। আজকাল সব ভাল হাসপাতাল্গুলই নাকি এমনই সাজানগোছান। কাউন্টারে সুশৃঙ্খল কেনাবেচা। রিসেপশনের ম্রিদুভাষিণীর থেকে বন্ধুর ক্যাবিন নাম্বার জেনে নিয়ে এক কাপ কফি খেতে ইচ্ছে হোল। হাসপাতাল মানে যে সন্তাপ ক্ষেত্র এ ধারণা এবার সত্যিই পালটাতে হবে। কফি খেয়ে লিফট ধরলাম। নিশ্চয়ই ভাল আছে শুভময়। হাতের ফুলের গোছাটায় আলতো চাপ দিলাম।

পরিচ্ছন্ন বেডে মুখে মাস্ক র হাতে দ্রিপ। একজন, নার্সই মনে হোল, প্রেশার মাপছেন। হয়ে গেলে বন্ধুপত্নির সঙ্গে নীচু গলায় কী যেন বলে গেলেন। টেবিলের এক কোণে আমার আনা ফুলটুকুও রেখে এবার বন্ধুর মাথায় ভরসার হাত রাখি। চোখদুটো ঘোলা। উদ্দেশ্যহীন। বলি অত ভাবিস না। শিগগিরি ভাল হয়ে জাবি। এতো বড়ো হাসপাতাল। ওর চোখ বেয়ে এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়লো যেন। আবার অভয় দিয়ে বৌদির দিকে তাকালাম। সমরথনের আশায়। ইন্তু দেখলাম গভীর কালিমাখা মুখ ভাবলেশহীন। বন্ধুপুত্রও বাবার পায়ের কাছে স্থির ও স্থাণু। দুজোড়া চোখ ই যেন বোবা ধমকাচ্ছে। অপ্রস্তুত জিজ্ঞাসা নিয়ে বন্ধুপত্নির পানে চাই।

আসলে মেডিক্লেমর টাকা শেষ। প্রভিডেন্ট ফান্ডের লোন ও। উনি চোখ নামিয়ে মেঝে দেখেন। ছেলেটিও। শুভময়

অস্থির হাঁসফাঁস করে। আমার দম বন্ধ হয়ে আসে। আমি কিছু বলার চেষ্টা করি। কিন্তু কিছুই বলে উঠতে পারি না। এসময় ভিজিটিং আওয়ার শেষের বেল বাঁচায়। কোন চিন্তা করবেন না। আবার আসব বলে এক ছুটে বেরিয়ে  সোজা রাস্তায়।

রাস্তা ধরে ছুটি। বাস স্ট্যান্ডটা পিছোতে থাকে! হাঁফ ধরে।

ঘোলাটে হচ্ছে দ্রুত দিকচক্রবাল।  

আমাকেও গিলে নিচ্ছে অমোঘ হাসপাতাল।

মণিপদ্ম দত্ত

কবি, সম্পাদক, প্রাবন্ধিক ও সমালোচক। বর্তমানে দিল্লি থেকে প্রকাশিত ‘কক্ষপথ’ সাপ্তাহিক ওয়েব্জিনের মুখ্য সম্পাদক। দুই বাংলার পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত তাঁর কবিতা ও প্রবন্ধ। পেশায় অধ্যাপক-গবেষক, ম্যানেজমেন্ট কন্সাল্টান্ট। পেশার সূত্রে পৃথিবীর নানা প্রান্তে ঘুরেছেন ও মানুষের সাথে মিশেছেন। সদ্য অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক উপাচার্য। এখন মূলত সাহিত্য সংস্কৃতি চর্চায় নিয়োজিত। ২০২৬ কলকাতা বইমেলায় প্রকাশিতব্য দুটি কাব্যগ্রন্থ, দালির ঘড়ি ও অন্যান্য কবিতা, এবং, অন্ধকারের সিঁথি। আগেকার সংকলন, শ্রাবণশরবরি ওম সূর্য পরিক্রমা। দিল্লিস্থিত সেন্টার ফর বিজনেস অ্যান্ড সোশাল রিসার্চের মুখ্য পরিচালক।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ভাষা
Scroll to Top