Home » মৃত্যুলগ্ন // নূর এ আলম সিদ্দিকী

মৃত্যুলগ্ন // নূর এ আলম সিদ্দিকী

বলা হয়ে থাকে, মৃত্যুর আগের সর্বশেষ মুহূর্তটি সেকেন্ডেরও কম সময় হলেও, মৃত্যুর স্বাদ আস্বাদনকারীর কাছে সেটা এক জীবনের চাইতেও লম্বা সময়। এই সময়ে পুরো জীবনের প্রতিচ্ছবি সে তার চোখের সামনে দেখতে পায়।

সাহেলার ক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম কিছু ঘটছে না। আর এক মুহূর্ত পরেই তার হৃদস্পন্দন চিরকালের জন্য বন্ধ হয়ে যাবে। আজ মানুষ চাষের খামারে তার জন্য বরাদ্দকৃত এই ঘরটিকে তার খুব আপন মনে হচ্ছে। পুরো জীবন ধরে এই ঘর থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য প্রার্থনা করেছে সে। কিন্তু, আজ মনে হচ্ছে, খামারের এই ছোট্ট ঘরটি না হয় জেলখানাই ছিল, এখানে না হয় সে একেবারেই পরাধীন ছিল, এমন কোনো নির্যাতন নেই যা এখানে তাকে সহ্য করতে হয়নি। তারপরও, পৃথিবীতে তার নিজের বলতে কেবল খামারের এই ছোট্ট ঘরটিই ছিল। এছাড়া তো আর তার নিজের বলতে কিছু ছিল না। এমনকি তার নিজের সন্তানদের ওপরও তার কোনো অধিকার নাই। তাই আজ পৃথিবী ছেড়ে যাবার পথে, তার এই মৃত্যুলগ্নে, এই ঘরটির জন্য বড়ই মায়া হচ্ছে। এই ঘরটির সাথে জড়িত সকল স্মৃতি তার মনে পড়ছে। মনে পড়বে নাই বা কেন? বলতে গেলে, সারাটা জীবন সে এই ঘরের মধ্যে বন্দি অবস্থায় কাটিয়েছে। তাই তার স্মৃতি বলতে যা কিছু আছে, তার সব কিছুই মূলত ঘরটির সাথে জড়িত। 

মনে পড়ছে ঐ দিনটির কথা, যেদিন তার আগের মালিক তার বাবা-মাসহ, তাকে আর তার আরো চার ভাই-বোনকে তার বর্তমান মালিকের কাছে বিক্রি করে দিয়েছিল। মনে পড়বে নাই বা কেন? তার পুরো জীবনে সুখের স্মৃতি বলতে শুধু ঐ একটা দিনই ছিল। ঐদিন প্রথমবারের মতো সে আগের খামারের ঘরটি থেকে বাহিরে বের হওয়ার সুযোগ পেয়েছিল। সুযোগ পেয়েছিল দুচোখ ভরে পৃথিবী দেখার। দিনটির কথা মনে পড়তেই সাহেলার মন খুশিতে ভরে গেল। তার আগের মালিকের আর্থিক সমস্যার কারণে অবশ্য তাদের বিক্রি করে দিতে হয়েছিল। তবে সেই আর্থিক সমস্যার বদৌলতে সাহেলা তার জীবনের সবচেয়ে বড় ইচ্ছাটা পূরণ করতে পেরেছিল। এক ঝলকের জন্য পৃথিবীকে দেখার ইচ্ছাটা হয়তো তার আর কখনোই পূরণ হত না। 

ঐদিনের ঘটনাটা যেন সাহেলার চোখের সামনে জল জল করে উঠল। তার আগের বাইনারি নামের যে রূংথা মালিক ছিল, তার ব্যবসায়ের কাজে অনেক টাকার দরকার পড়েছিল। তাই বাইনারি সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, সাহেলার মধ্য বয়সী বাবা-মা সহ তার অন্য ভাইবোনের মধ্যে তিন বোন আর এক ভাইকে বিক্রি করে দেবে। সে কারণে, তাদের সবাইকে নিয়ে সে মানুষ কেনা-বেচার হাটের উদ্দেশ্যে বের হয়। সাহেলার বয়স তখন মাত্র আট বছর। বয়স কম হওয়ার কারণে, তার মায়ের সাথে তাকেও বিক্রি করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল বাইনারি। সেই সুবাদে সাহেলাকেও বাকি সবার সাথে হাটে নিয়ে আসা হয়েছিল। হাটে আসতে আসতে সাহেলা বাহিরের সুন্দর পৃথিবীটা দেখেছিল। কত রং দিয়ে সাজানো এই পৃথিবী! লাল, নীল, সবুজ, হলুদ, কমলা, বেগুণী কত রকমের রং। যদিও লোহার শেকল দিয়ে তার হাত-পা বেঁধে রাখা হয়েছিল, তাই সে জানত, কোনোভাবেই এই শেকল ভাঙ্গা সম্ভব নয়। তবুও, সাহেলার অবুঝ মন তখন তাকে বলছিল, যদি সে একবার এই শেকল ভাঙ্গতে পারত, একবার মুক্ত-স্বাধীনভাবে পৃথিবীর এই শত শত রঙয়ের মাঝে হারিয়ে যেতে পারত, তবে কতই না ভালো হত! এভাবেই চোখে মুখে খুশি আর অন্তরে আক্ষেপ নিয়ে পৃথিবী দেখতে দেখতে সাহেলা বাজারে পৌঁছে গিয়েছিল।

বাজারে আসা মাত্র রূংথা ক্রেতারা নানাভাবে সাহেলার পরিবারকে পরীক্ষা করতে শুরু করেছিল। কেউ এসে জিজ্ঞেস করছিল, সাহেলার ভাইয়ের বীর্য পরিপক্ক হয়েছে কিনা? তখন বাইনারি উত্তরে তার ভাইয়ের ভোকাল কডে হাত দিয়ে বলছিল, ‘দেখুন, কতটা ফুলে গিয়েছে দেখেছেন, এছাড়াও দাড়ি-গোঁফ কত বড় হয়ে গেছে।’ তারপর ক্রেতাদের দিকে তাকিয়ে একটু মুচকি হেসে  বাইনারি আবার বলতে শুরু করেছিল, ‘দেখেন পুরুষাঙ্গের চুল কত ঘন আর বড় হয়ে গেছে, পুরুষাঙ্গটাও কত বড় হয়েছে দেখেন।’ অনেক রূংথা তাতে সন্তুষ্ট হচ্ছিল আবার অনেকেই সন্তুষ্ট না হয়ে সাহেলার ভাইয়ের উরুর ব্যাস  হাত দিয়ে মাপামাপি করছিল, অনেকেই পুরুষাঙ্গে হাতিয়ে দেখছিল সেটা আসলেই কত বড়। তারপর সবাই সাহেলার বোনদের ঋতুস্রাব হয়েছে কি না জানতে চাচ্ছিল। কারণ ঋতুস্রাব না হলে তারা সন্তান ধারনের জন্য উপযুক্ত না হওয়ার তাদের কিনে খামারীদের কোনো ফায়দা হবে না। ক্রেতাদের প্রশ্নের উত্তরে বাইনারি হেসে বলতে শুরু করেছিল, ‘আপনারা সবই জানেন, অনেক দালাল মেয়েদের যৌনাঙ্গের ভেতর চাকু দিয়ে খুচিয়ে রক্তাক্ত করে বাজারে নিয়ে আসে। কিন্তু, এরা আমার খামারের মানুষ। এদের ওপর নির্যাতন করা আমার নৈতিকতার বাইরে। তাই আমি এমনটা করিনি’। সব রূংথা বাইনারির কথায় সহমত পোষণ করে মাথা নেড়ে জবাব দিচ্ছিল ‘ঠিক আছে বুঝলাম’। বাইনারি সন্তুষ্ট হয়ে ভদ্রভাবে হেসে সাহেলার মায়ের স্তনে চাপ দিয়ে কিছুটা দুধ বের করে বলেছিল, ‘এই যে দেখেন, স্তনে এখনো দুধ আছেই’। তারপর তার মায়ের যৌনাঙ্গে দুই আঙ্গুল চালিয়ে দিয়ে বলেছিল, ‘দেখেছেন কত ঢিলে ঢালা’। তারপর, সাহেলার দিকে দৃষ্টি দিয়ে বলছিল, ‘এই বাচ্চা মেয়েটি এরই’। তারপর, মুচকি হেসে সাহেলার অন্য তিন বোনের দিকে দৃষ্টি দিয়ে বলেছিল, ‘মিথ্যা বলব না, এই দুই জনের ঋতুস্রাব হয়েছে’। বলে তার দুই বোনের স্তনে হাত দিয়ে কয়েকবার চাপ দিয়ে বলেছিল, ‘দেখেছেন, কত নরম হয়ে গিয়েছে?’ এরপর যৌনাঙ্গের ভেতর দুই আঙ্গুল চালিয়ে দিয়ে বলেছিল, ‘দেখেন কত ঢিলে-ঢালা’। তারপর সাহেলার আরেক বোনের স্তনে হাত দিয়ে বলতে শুরু করেছিল, ‘দেখেন এরটা তেমন নরম হয়নি, সত্যি বলতে আর দুই বছর পরে ঋতুস্রাব হবে’। তারপর তিন বোনের যৌনাঙ্গের দিকে দৃষ্টি দিয়ে ক্রেতাদের বুঝিয়ে বলেছিল, ‘দেখেন, এই দুইজনের যৌনাঙ্গের চুল কত ঘন হয়েছে, আর এর অতটা হয়নি, তবে দুই বছর পর হয়ে যাবে।’ বাইনারির কথায় ক্রেতারা সন্তুষ্ট হয়ে যাচ্ছিল। তাই তারা সাহেলার বোনদের স্তন একটু চাপ দিয়ে দেখছিল আর যৌনাঙ্গ একটু হাতিয়ে ভালো করে দেখে নিয়ে জিজ্ঞেস করেছিল, ‘সব তো বুঝলাম, দাম কত রাখবেন?’ জবাবে বাইনারি সাহেলা বাদে অন্য সবাইকে দেখিয়ে বলেছিল ‘এই ছয়টার দাম বিশ করে দিয়েন।’ তারপর সাহেলাকে দেখিয়ে বলেছিল, ‘আর এই বাচ্চার দাম দশ দিলেই হবে, মোট এক লাখ ত্রিরিশ হাজার রুঙ্গি দিবেন, তাহলেই হবে’। ক্রেতারা তখন মুখে বিরক্তির ছাপ এনে বলেছিল, রুঙ্গি কি চাইলেই পাওয়া যায়? সব মিলিয়ে এক লক্ষ রুঙ্গি দিতে চেয়েছিল। বাইনারি তাতে রাজি হচ্ছিল না। অনেক ক্রেতা আবার মাত্র ৯০ হাজার রুঙ্গি দিতে চাচ্ছিল। এই ভাবেই চলছিল। সবাইকে একই বর্ণনা দিতে দিতে আর একই দাম বলতে বলতে বাইনারি একেবারে হাঁপিয়ে উঠেছিল। কেউই এক লাখ ত্রিরিশ হাজার রুঙ্গিতে রাজি হচ্ছিল না।

রুঙ্গির কথা মনে পড়াতে সাহেলার রুঙ্গির রঙগুলো মনে পড়ে গেল। কাগজের ওপর সাদা, লাল, কমলা আর সবুজের মিশ্রণে আঁকা একটা ছবি হল এই রুঙ্গি। এটা রূংথারা লেনদেনের কাজে বিনিময়ের মাধ্যম বা মুদ্রা হিসেবে ব্যবহার করে। একেক রুঙ্গির ছবি একেক রকম, আর একেক ছবির একেক মান। কিন্তু, একই মানের রুঙ্গির ছবি আবার অবিকল একই রকম। কতই না সুন্দর সেই ছবি! ভাবতেই মনে শান্তি চলে এলো সাহেলার। তার মনে হল, আসলেই রূংথাদের কত বুদ্ধি, তারা কত সুন্দর সুন্দর রুঙ্গি বানিয়েছে। তাদের এত বুদ্ধির জন্যই তো তারা এত বড় একটা পৃথিবী শাসন করছে। লক্ষ লক্ষ প্রজাতির প্রাণীদের মধ্যে তারাই শ্রেষ্ঠ। কত সুন্দর তাদের সৃষ্টি কর্ম, কত সুন্দর তাদের রঙ-বেরঙের পোশাক। তারপর, তার মন বলে উঠল, আর রূংথারাও তো কম সুন্দর নয়। সাহেলাও তার মনের কথায় সায় দিয়ে ভাবতে শুরু করল, আসলেই, রূংথাদের নীলাভ সাদা বর্ণের শরীরে মানুষের মতই হাত, পা, মাথা, মুখ, চোখ, কান সবই আছে। তবে তারা মানুষের মত পঞ্চাশ থেকে আশি বছরের মধ্যেই মারা যায় না। একেক জন রূংথা কমপক্ষে হাজার বছর বাঁচে। নীলাভ বর্ণের মুখের মাঝে সবুজ আর হলুদ বর্ণের ছোপ ছোপ তাদের চোখের মণি। সবুজ বর্ণের মণির মাঝে হলুদের ছোপগুলো দেখলে মনে হয় যেন সৃষ্টিকর্তা নিজ হাতে একেঁছেন। চোখের উপরের ভ্রুগুলোর প্রতেকটি চুল রংধনুর সাতটি রঙের মিশ্রণে তৈরি। একেক চুলের রং একেক রকম। কোনটি লাল তো কোনটি হলুদ আবার কোনটি সবুজ। শুধু ভ্রুই নয়, চোখের পাতা, মাথার চুল থেকে শুরু করে শরীরের প্রত্যেকটি লোম রংধনু রঙের, কিন্তু প্রত্যেকটি ভিন্ন ভিন্ন রঙে সাজানো। দেখলে যেন মনে হয়, পৃথিবীর সব রং দিয়ে সৃষ্টিকর্তা নিজ হাতে সেগুলোকে সাজিয়েছে্ন। তাদের থুতু নীলাভ বর্ণের, রক্তের রং নীল, আর ত্বকের রং সাদা হওয়ায়, শরীর নীলাভ সাদা বর্ণের দেখায়। দেখলে মনে হয় যেন আকাশের মতই বিশালতা আছে সেই শরীরে। তবে তারা আকারে আকাশের মত বিশাল নয়। গড়ে রূংথা মেয়েরা সাড়ে সাত ফুট হয় আর ছেলেরা আট ফুট। তাদের শরীরের সবচেয়ে সুন্দর অঙ্গটি হল তাদের ঠোঁট। ১২টি রঙে তাদের ঠোঁটগুলো সাজানো। দেখলে মনে হয়, সৃষ্টিকর্তা যেন রূংথাদের উপরের আর নিচের ঠোঁটদুটিকে কোন ক্যানভাস মনে করেছিলেন। কিন্তু কি আঁকাবেন তা বুঝতে পারছিলেন না। তাই যখন যে রং মনে হয়েছে ইচ্ছা মত সেই রং ঢেলে দিয়েছেন। ১২ রকমের রং কখন কোনটা ঢেলেছেন, তিনি নিজেও জানেন না। সেই রংগুলো সব সময় ঠোঁটের চামড়ার নিচে এমনভাবে ভাসতে থাকে যেন মনে হয়, রংগুলো একে অন্যের সাথে মিশতে চায়, কিন্তু পারছে না। ঠোঁট নড়াচড়া করলে, অথবা কথা বলার সময় রংগুলোর এই মিশতে চাওয়ার আকুতি যেন শত গুণ বেড়ে যায়। তাই রংগুলো ঠোঁটের মধ্যে রীতিমত ছুটোছুটি শুরু করে দেয়।  দেখলে মনে হয় রংগুলো সব একত্রিত হয়ে যেন নতুন এক রঙিন পৃথিবী গড়তে ব্যাকুল হয়ে উঠেছে। সবমিলিয়ে কতই না সুন্দর রূংথারা, কতই না বুদ্ধিমান! কতই না সুন্দর তাদের ঠোঁট! কতই না সুন্দর তাদের চোখ, সাদা চোখের মাঝখানে সবুজ রঙের মণি, সেই মণিতে হলুদের ছাপে কতই না সুন্দর লাগে তাদের চক্ষু জোড়া!

রূংথাদের চোখের কথা মনে হওয়াতে সাহেলার তার বর্তমান মালিক জাভার ছেলে লিনাক্সের কথা মনে পড়ে গেল। ঐদিন মানুষ কেনা-বেচার বাজারে যখন একই বর্ণনা দিতে দিতে আর একই দাম চাইতে চাইতে তার আগের মালিক বাইনারির অবস্থা নাজেহাল হয়ে গিয়েছিল। তখন, তার নতুন মালিক জাভার আগমন ঘটে। সবার মত একই রকমভাবে তাকেও বাইনারি সবকিছু খুঁতিয়ে খুঁতিয়ে দেখিয়েছিল। জাভা খুশি হয়ে দাম জিজ্ঞেস করলে, সবার মত তার কাছেও বাইনারি এক লাখ ত্রিরিশ হাজার রুঙ্গি চেয়েছিল। জাভা সবার মত এই দামে রাজি হয়নি। তখন বাইনারি তাকে বলেছিল, ‘ভাই, আমি এক লাখ বিশ হাজার রুঙ্গি দিয়ে সওদা করতে রাজি আছি, মানে মায়ের সাথে সাহেলাকে ফ্রি দিয়ে দিব, সাহেলার যে দশ হাজার রুঙ্গি দাম সেটা দেওয়া লাগবে না’। জাভা দেখল, বাইনারির প্রস্তাব খারাপ কিছু না। তাই সে সাহেলাদের কিনে এই খামারে নিয়ে এসেছিল। বাজার থেকে খামারে আসার রাস্তায় সাহেলা দুচোখ ভরে পৃথিবীর রং দেখে নিয়েছিল। কিন্তু, খামারে এসে সাহেলা তার দেখা রূংথাদের সবচেয়ে সুন্দর চোখ দুটো দেখেছিল। আর সেই চোখ দুটো হল জাভার ছেলে লিনাক্সের। লিনাক্স মূলত খামারের নতুন মানুষদের দেখতে পরিবারের অন্য সবার সাথে খামারে এসেছিল। তার মায়ের পাশে দাঁড়িয়ে সে উঁকি দিয়ে সাহেলাদের দেখছিল। তখনই সাহেলা প্রথমবারের মত লিনাক্সের চোখ জোড়া দেখেছিল। সাহেলা বাইনারির খামার থেকে বাজারে আসার পথে শত শত রূংথাদের চোখ দেখেছিল, বাজারে এসে দেখেছিল আরো শত শত, বাজার থেকে তাদের বর্তমান খামারে যাবার পথে আরো শত শত। কিন্তু, সব রূংথার চোখ সুন্দর এটা ঠিক, তবে সেসব চোখে যেন হিংসা, বিদ্বেষ, মিথ্যা আর হানাহানি। কিন্তু, জাভার আট বছর বয়সী এই ছোট্ট বাচ্চা লিনাক্সের চোখে সাহেলা কেন যেন মায়া আর চাপা দুঃখ দেখতে পেয়েছিল। যেন এই চোখ সাহেলার মতই দুঃখী, সেও মুক্তি চায়। পৃথিবীর সব রং একেবারে কাছ থেকে দেখতে চায়। ঐ মুহূর্তে সাহেলার লিনাক্সকে বিশ্বাস করতে ইচ্ছা করছিল। মনে চাইছিল সব শেকল ভেঙ্গে লিনাক্সের হাত ধরে পালিয়ে যেতে। পৃথিবীর এত এত রঙের মধ্যে হারিয়ে যেতে। যেখানে কেউ তাদের আর কখনো খুঁজে পাবে না। এটা হতে পারে প্রেম, বন্ধুত্ব বা অলীক কল্পনা। কিন্তু এটাই মনে হয়েছিল সাহেলার। তবে এই অনুভূতিটা যে আসলেই কি ছিল তা সাহেলা আজও জানে না। জানতে চায়ও না। উপরন্তু, ঐ আট বছরের বাচ্চা সাহেলা তো এটাও জানত না যে প্রেম আসলে কি, আর বন্ধুত্বই বা কি? প্রেম বা বন্ধুত্ব বলে যে কিছু হয়, এটা যে একটা মানবিক অনুভূতি সে ব্যপারে সাহেলা প্রথম জেনেছিল তার নয় বছর বয়সে। জাভার খামারে আসার ঐ দিনে, সবাইকে দেখানোর জন্য খামারে ভেতর উঠানে সাহেলাদের কিছুক্ষণ বেঁধে রাখা হয়েছিল। এর কিছু সময় পর, জাভার পরিবারের রূংথারা সবাই চলে গিয়েছিল। তাদের সাথে চলে গিয়েছিল লিনাক্সও। তারপর, জাভা সাহেলার বড় আর মেজ দুই বোনকে দুইটি আলাদা ঘরে বন্দি করেছিল। এরপর, তার ভাই আর বাবাকে তাদের দুই বোনের ঘরে নিয়ে গিয়ে বন্দি করেছিল। তার মাকে নিয়ে গিয়েছিল অন্য আরেকটি ঘরে। যেখানে আগে থেকেই অন্যকোনো পুরুষ ছিল। এরপর, সাহেলা আর তার সেজ বোনকে বন্দি করেছিল আরেকটি ঘরে। সেই ঘরে বন্দি অবস্থায় সাহেলা আর তার বোন মিলে তার মায়ের গল্প করত, বাবা আর ভাইয়ের গল্প করতো, অন্য দুই বোনের গল্প করত, পৃথিবীর নানা রকম রঙের গল্প করতো। ঘরে অতিথি হিসেবে আসা ইঁদুর, তেলাপোকা, টিকটিকি, মাছি, পিঁপড়া, মশা, ফড়িং আর প্রজাপতির দিকে তাকিয়ে থাকত। তারাও সাহেলাদের দিকে তাকিয়ে থাকত। তারপর ঘরের বাইরে চলে যেত। এসবের মাঝে সাহেলা মাঝেমাঝেই লিনাক্সের কথা বলত। লিনাক্সের সেই মায়া ভরা চোখে যে দুঃখ সে দেখেছিল, সেই দুঃখের কথা বলত। এই ছিল সাহেলা আর তার বোনের কাজ। জাভা প্রতিদিন দুইবেলা এসে তাদের খাবার দিয়ে যেত। তারা খাবার খেত আর এসব গল্প করত। তবে লিনাক্সের কথা বললে সাহেলার বোন বেশ বিরক্ত হত। কিন্তু, কিছু না বলে চুপচাপ শুনে যেত। এভাবেই এক বছর পার হয়ে গিয়েছিল। তবে একদিন আর ধৈর্য্য ধরে রাখতে না পেরে সাহেলার বোন তাকে বলেছিল, ‘তুই আবার ঐ লিনাক্সের প্রেমে পড়ে যাসনি তো? দেখ মানুষ আর রূংথা দুইটা আলাদা প্রাণী, এদের মধ্যে প্রেম হয় না। তাই এইসব আকাশ-কুসুম চিন্তা বাদ দে।’ সাহেলা তার বোনের কথার মাথা মুণ্ডু কিছু বুঝতে না পেরে জিজ্ঞেস করেছিল, ‘প্রেম কি আপু?’ উত্তরে তার বোন হেসে বলেছিল, ‘প্রেম, বন্ধুত্ব এই সব মানবিক অনুভূতি।’ সাহেলা এবারো কিছু না বুঝে প্রশ্ন করেছিল, ‘ অনুভূতি কি আপু?’ তার বোন হাসতে হাসতে জবাব দিয়েছিল, ‘বড় হলে বুঝবি।’ এরপর থেকে সাহেলা প্রায় প্রতিদিন তার বোনকে একটাই প্রশ্ন করত, ‘প্রেম কি আপু?’ প্রতিবার উত্তর আসত, ‘বড় হলে বুঝবি।’

এভাবেই আরো এক বছর কেটে যায়। একদিন হঠাৎ করেই সাহেলার বোনের যৌনাঙ্গ দিয়ে রক্ত পড়তে শুরু করে। এটা দেখে সাহেলা ভয় পেয়ে যায়। তার মনে হয়, তার বোন কি এখন তবে মারা যাবে? আতঙ্কে, ভয়ে সে কানাকাটি শুরু করে দিয়েছিল। সে সময় সাহেলার বোন মুচকি হেসে বলেছিল , ‘আরে, ভয়ের কিছু নাই, আমার ঋতুস্রাব হয়েছে, এটা বড় হলে বুঝবি।’ কথাটা শোনার পর সাহেলার ভয়টা কেটে যায়, কিন্তু, প্রচুর রাগ হচ্ছিল তার বোনের ওপর, তার বোন সব সময় শুধু, বড় হলে বুঝবি, বড় হলে বুঝবি বলতে থাকে। আর কত বড় হলে সাহেলা তবে বড় হবে? তাই সেদিন সাহেলা তার বোনকে প্রশ্নটা করেই ফেলে। উত্তরে তার বোন বলেছিল ‘বেশি না আর একটু বড় হ, তাহলেই হবে।’ সাহেলা কথাটা শুনে তার বোনের দিকে উদ্দেশ্য করে মুখে ভেংচি কাটে। এটা সাহেলার বোনের মুখের এক কোণে এক মুহূর্তের জন্য মৃদু হাসির একটা রেখা একেঁছিল ঠিকই, তারপর সে মুখ ভার করে বলেছিল, ‘একটু পরেই আমাকে এখান থেকে নিয়ে গিয়ে অন্য কোনো ঘরে বন্দি করা হবে। এটাই তোর সাথে আমার শেষ দেখা।’ সাহেলা এটা শুনে অবাক হয়ে গিয়েছিল। তার বোন কি বলছে সে যেন বুঝে উঠতে পারছিল না। নিজেকে একটু সামলে নিয়ে বিষয়টি বোঝার পর ছটফট করতে শুরু করেছিল। তার মনে হচ্ছিল যেন পায়ের নিচের মাটি সরে যাচ্ছে। সে আকুল হয়ে প্রশ্ন করা শুরু করেছিল, ‘তোমাকে অন্য ঘরে নিয়ে যাবে কেন, তোমার সাথে কি করবে, আমিও যাব তোমার সাথে, একা একা এই বন্ধ ঘরে কি করবো।’ তার বোন উত্তরে কিছুই বলেনি। কিছু সময় পরে জাভা এসে সাহেলার বোনকে অন্য রুমে নিয়ে গিয়েছিল। সাহেলার বোনকে নিয়ে যাবার সময় সাহেলা অঝরে কাঁদতে শুরু করেছিল। কিন্তু, তার বোনের চোখে কোনো পানি ছিল না। দুঃখ পাওয়া যখন জীবনের অতি সাধারণ বিষয় হয়ে দাঁড়ায়, তখন দুঃখ আর ব্যথিত করতে পারে না। সাহেলার বোনের অবস্থাও ঠিক তেমন হয়েছিল। যাবার সময় তার বোন তাকে উদ্দেশ্য করে শুধু একটা কথাই বলেছিল, ‘ভালো থাকিস।’

বোন চলে যাওয়াতে সাহেলা পুরো একা হয়ে গিয়েছিল, সে কি করবে কিছুই ভেবে উঠতে পারছিল না। কিন্তু, তার এই একাকীত্বকে জাভা খুব একটা দীর্ঘস্থায়ী হতে দেয়নি। বোনকে নিয়ে যাওয়ার কিছু সময় বাদেই সাহেলার ঘরে জাভা  তার সমবয়সী ঝুমু নামের এক মেয়ে এবং সজীব নামের এক ছেলেকে নিয়ে এসেছিল। ঝুমু আর সজীবের সাথে খুব তাড়াতাড়িই সাহেলা ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল। ঝুমু, সজীব দুজনেই এই খামারেই বড় হয়েছে, তাই তাদের তেমন কোনো গল্প নেই। এর আগে তারা যে ঘরে বন্দি ছিল, সেই ঘরে সাহেলার বোনকে রাখা হয়েছিল। তাই অবধারিতভাবেই তাদের সাহেলার ঘরে নিয়ে আসা হয়েছিল। তবে ঝুমু আর সজীব দুজনেই অনেক মজার ছিল। সজীব ইচ্ছা করেই জাভা যে খাবার দিয়ে যেত সেই খাবারের ওপর পেসাব করে দিত, জাভা এসে মারধোর করত, সে চুপ-চাপ সহ্য করত। তারপর, তার হাতে পায়ে যে শেকল বাধা ছিল, সেই শেকলগুলো দিয়ে মেঝেতে জোরে জোরে আঘাত করে শব্দ করত। দেয়ালে শেকল দিয়ে আঁচড় কেটে দানবের ছবি আঁকত। একেকটা দানবের অনেক বড় বড় চোখ, লম্বা লম্বা জিভ। তাদের হা এত বড় করে আঁকত যে মনে হত দানবেরা একশ জন মানুষকে একবারেই গিলে খাবে। সাহেলা বুঝে উঠতে পারত না, এমন সব দানবের ছবি সজীব কল্পনা করত কীভাবে, যেখানে সে এগুলোকে কোনোদিন দেখেইনি। ছবিগুলো এত ভয়ংকর হত যে, ঘুমের ঘোরে ছবিগুলো চোখে পড়তেই সাহেলা আঁতকে উঠত। তো এই সব ছিল সজীবের রোজকার দিনের কাজ। আর ঝুমু সারাদিন ধরে ঘরের ভেতর ইঁদুর, তেলাপোকা, প্রজাপতিসহ আরো যে সকল পোকামাকড় আর প্রাণী আসত তাদের সাথে বসে বসে গল্প করত। তাদের আদর করত। তারা শরীরে ময়লা লাগালে বকে দিত। খেয়েছে কিনা শুনত। নিজের খাবার তাদের খাওয়াত। সজীবও মাঝে মাঝে ঝুমুর সাথে যোগ দিত। তাদের দেখাদেখি, সাহেলাও পোকা-মাকড়ের সাথে কথা বলা শিখে গেল। যদিও পোকামাকড় কোনো উত্তর দিত না। তারপরও সাহেলা তাদের কাছে পৃথিবী কোন কোন নতুন রঙে সেজেছে তা জানতে চাইত। তার মা-বাবা, ভাই-বোনের খবর জানতে চাইত। লিনাক্সের খবর জানতে চাইত। ঐযে প্রথম দিন সে লিনাক্সে দেখেছিল, এরপর কত বছর কেটে গেছে, কিন্তু লিনাক্সকে সে আর দেখতে পায়নি। তাই লিনাক্সের কথা তার প্রায়ই মনে পড়ত। যখনই তার মনে হত এই বন্দি জীবন থেকে মুক্তি পাওয়া দরকার। তখনই তার লিনাক্সের কথা মনে আসত। সে ঝুমু আর সজীবের সাথে তার মা-বাবা, ভাই-বোন আর পৃথিবীর কত শত রঙের গল্প বলার পাশাপাশি লিনাক্সের কথাও বলত। এভাবেই কেটে যায় আরো তিনটি বছর। তারপর, জাভা সজীবকে মানুষ কেনা-বেচার বাজারে নিয়ে গিয়ে বিক্রি করে দিয়ে কিনে এনেছিল পুষ্পাকে। পুষ্পা মেয়েটাও সাহেলা আর ঝুমুর সমবয়সী ছিল। রোগা-পাতলা কিন্তু অনেক সুন্দর চেহারা। পুষ্পা আসার পর সাহেলা জানতে পেরেছিল সজীবকে কসাইয়ের কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। পুষ্পা আর পুষ্পার মাকেও কসাইয়ের কাছে বিক্রি করে দেওয়ার জন্য পুষ্পার আগের মালিক নিয়ে গিয়েছিল। এই কসাইরা মূলত মানুষকে হত্যা করে মানুষের শরীরের মাংস কেটে বিক্রি করে। রূংথারা সেই মাংস কিনে এনে খায়। পুষ্পার আগের মালিকের সাথে জাভার ঐ কসাইখানাতেই দেখা হয়েছিল। সেখান থেকেই জাভা পুষ্পাকে কিনে এনেছিল। পুষ্পার এসব কথা শোনার পর সাহেলা আর ঝুমুর বোঝার বাকি থাকে না যে, সজীব আর পুষ্পার মাকে কসাইরা হত্যা করে, কেটে টুকরো টুকরো করে ফেলেছিল। আর পুষ্পা বাজার থেকে ঘরে পৌঁছাতে পৌঁছাতে হয়তো রূংথারা ততক্ষণে সজীব ও পুষ্পার মায়ের মাংস খাওয়া শুরু করে দিয়েছিল। তাই সজীব আর পুষ্পার মায়ের জন্য সাহেলা, পুষ্পা ও ঝুমু কান্নাকাটি শুরু করে দিয়েছিল। ঐদিন কাঁদতে কাঁদতেই তারা ঘুমিয়ে পড়েছিল।

পরের দিন সকালে ঘুম থেকে জেগে নিজেদের সামলে নিয়ে সাহেলা আর ঝুমু মিলে পুষ্পার জীবনের গল্প শুনতে শুরু করেছিল। পুষ্পার আগের মালিক নিজেই খেতে পেত না। তাই পুষ্পাদের ঠিকমত খেতে দিত না। বলা যায়, সারাদিন না খেয়ে তারা মা-মেয়ে মিলে কোনোরকম বেঁচে থাকত। এর ওপর আবার প্রতিদিন আগের মালিক তার মায়ের সাথে যৌনমিলন করত। আগের মালিক যৌনাঙ্গে কি যেন একটা পরে নিত। তাই বীর্য বাহিরে যেত না। বাচ্চাও হত না। সাহেলা আর ঝুমু পুষ্পার এই গল্প থেকে মোটামুটি সবকিছুই বুঝেছিল, কিন্তু এই  যৌনমিলন কি সেটাই বুঝতে পেরেছিল না। আর পুষ্পা সেটা ব্যবহারিকভাবে দেখিয়ে যে বুঝিয়ে দিবে সেটাও করতে পারছিল না। তাই এই বিষয়টি তাদের না বোঝাই থেকে যায়। এরপর দেখতে দেখতে আরো এক বছর চলে যায়। এই সময়টা অবশ্য বেশ বিরক্তিকর কেটেছে সাহেলার। ঝুমুর তো বলার মত কোনো গল্পই ছিল না, তাই সে সারাদিন পোকা-মাকড়ের সাথে কথা বলত। আর পুষ্পা আগের মালিকের ওখানে খেতে পেত না, এখানে খেতে পাচ্ছে এটা নিয়েই মহাখুশি ছিল। তার পৃথিবীর রং দেখার কোনো ইচ্ছাই ছিল না। ছিল না শেকল থেকে মুক্তি পাবার কোনো আকাঙ্ক্ষা। সারাটা দিন সে পর্যাপ্ত খাবার পাওয়ার উল্লাস করত। এসব বিরক্ত লাগত সাহেলার। সে পুষ্পার এমন উল্লাসে বিরক্ত হয়ে ঝুমুর কাছে পৃথিবীর রং দেখার গল্প করতে গেলে ঝুমু সেগুলোকে পাত্তা না দিয়ে ইদুর আর তেলাপোকার সাথে গল্প করত। এসবে বিরক্ত হয়ে উঠেছিল সাহেলা। এভাবেই একটা বিরক্তিকর বছর পার করে সে। তারপর, হঠাৎ একদিন সে পেটে ব্যথা অনুভব করল, মনে হচ্ছিল যেন কেউ ছুরি দিয়ে নাড়ি-ভুড়ির ভেতর অনবরত খুচিয়ে যাচ্ছে। কিছুক্ষণ পরে সাহেলার যৌনাঙ্গ দিয়ে রক্ত বের হতে শুরু করে। সাহেলা বুঝল এটা ঋতুস্রাব। ঝুমু দেখে ভয় পেয়ে যায়, কিন্তু, পুষ্পা এ সম্পর্কে মায়ের থেকে সব কিছু শিখে রেখেছিল। তাই পুষ্পা ঝুমুকে সব বুঝিয়ে বলে। কিন্তু, তারা দুজনেই যেটা জানত না, সাহেলা সেটা জানত। সেই গোপন কথাটি হল, এখন সাহেলাকে অন্য ঘরে নিয়ে যাওয়া হবে। তাই সাহেলা বুঝে উঠতে পারছিল না, এই বিরক্তকর জীব দুটি থেকে মুক্ত হয়ে একাকী জীবন অতিবাহিত করাটা কি সুখের হবে, না দুঃখের? কিন্তু, সেটা যে আসলেই কেমন হবে সেটা তো একা একা জীবন না কাটালে বোঝা যাবে না, অন্যদিকে খামারের নিয়ম অনুসারে ঋতুস্রাব হলে একা একাই থাকতে হয়। সাহেলার বোনের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটছিল। সবমিলিয়ে সাহেলা নিজেকে বোঝায়, এখন শুধুই অপেক্ষা করতে হবে।

সাহেলাকে অবশ্য খুব বেশি সময় অপেক্ষা করতে হয়নি। কিছু সময় বাদেই তাকে অবাক করে দিয়ে, লিনাক্স তার বাবাকে এনে সাহেলার ঘরে বেঁধে রেখে ঝুমু আর পুষ্পাকে অন্য ঘরে নিয়ে গিয়েছিল। লিনাক্স যাওয়া মাত্র সাহেলা গিয়ে বাবাকে জড়িয়ে ধরেছিল। তারপর, সে কেমন আছে, কি করেছে ইত্যাদি প্রশ্ন জিজ্ঞেস করেছিল। উত্তরে তার বাবা বলেছিল, এতদিন খামারের নানা ঘরে ছিল, বেঁচে আছে এটাই অনেক, আর সাহেলার সাথে দেখা হয়েছে এটা তার জন্য অনেক কিছু। বাবার সাথে কথা বলা শেষে লিনাক্সের  কথা মনে হয়েছিল সাহেলার। সেই ছয় বছর আগে তাকে প্রথম দেখছিল। এরপর দেখল কিনা ঐ দিন, যেদিন নাকি তার ঋতুস্রাব হয়েছে। কতটা রোমাঞ্চকর ব্যাপার। এতদিন পরে দেখা হল তাও আবার ঋতুস্রাবের দিনে, উপরুন্ত, উপহার হিসেবে বাবাকে ঘরে দিয়ে গেছে লিনাক্স। সে কতই না ভালো! ভাবতেই চোখমুখ খুশিতে লাল হয়ে গিয়েছিল সাহেলার। এরপরের চারদিন কোনো খাবার আসেনি। সাহেলা আর তার বাবা দুজনেই না খেয়ে ছিল। ঘরে ছড়ানো ছিটানো যে বাসি খাবার ছিল সেগুলিই কুড়িয়ে কুড়িয়ে খেয়ে কোনো রকম বেঁচে ছিল। চার দিনের মাথায় সাহেলার রক্তক্ষরণ বন্ধ হয়ে যায়। সাহেলা আর তার বাবার অবস্থা তখন আধমরা, তার বাবা, তাকে বলেছিল দুই উরু ফাক করে শুয়ে পড়তে। সাহেলা তার বাবার কর্মকাণ্ডের কিছুই বুঝে উঠছিল না। তাই সে বাবাকে প্রশ্ন করেছিল, ‘কেন?’ তার বাবা উত্তরে বলেছিল, ‘এখন যেটা করতে যাচ্ছি, সেটাকে যৌনমিলন বলে, এটা না করা পর্যন্ত তারা আমাদের খাবার দিবে না। তাই করতেই হবে। কীভাবে করব, সেটা তোমার বুঝতে হবে না, শুধু আমার কথা মত কাজ করবে তাহলেই হবে।’ এরপর, সে আর তার বাবা মিলে যৌনমিলন শেষ করার কিছু সময় বাদে লিনাক্স এসে তাদের খাবার দিয়ে যায়। খাবার খাওয়া শেষে সাহেলার বাবা সাহেলাকে বুঝিয়ে বলেছিল, ‘এই যৌনমিলনের কারণেই বাচ্চা হয়, এই বাচ্চা বিক্রি করেই রুংথারা রুঙ্গি রোজগার করে, সেই রুঙ্গি দিয়েই তারা খায়, সাহেলাদের খাওয়ায়। তাই এটা না করলে তারা খাবার দিয়ে যাবে না।’ সাহেলা তখন বিষয়টি পুরোপুরি বুঝে যায়। খাওয়া আর বোঝান শেষে সাহেলার বাবা আবার যৌনমিলন শুরু করে, এভাবেই দিনে তিন চার বার করে যৌনমিলন করত, যার ফলে তিন চার বার করে খাবার পেত। প্রতিবার লিনাক্স এসে খাবার দিয়ে যেত। লিনাক্সের চোখে সাহেলা তখনো সেই মায়া আর দুঃখ দেখতে পেত। কিন্তু, আগের মত বিশ্বাস করে তার হাত ধরে পালিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা করত না। মাঝেমাঝে রাগ হত লিনাক্সের ওপর, তার কারণে, আজ সাহেলাকে তার বাবার সাথে যৌনমিলন করতে হচ্ছে। অবশ্য লিনাক্সও নিরূপায়। আবার তার জায়গায় অন্য কেউ হলে হয়তো সাহেলা আরো কষ্ট পেত। তাই সাহেলার রাগটা বেশিক্ষণ স্থায়ী হয় না। লিনাক্স যতবার খাবার দিতে আসত, ততবার তাকে দেখলে মনের মধ্যে একটা শান্তি পেত সাহেলা। এভাবে এক মাস চলার পর সাহেলা গর্ভবতী হয়ে পড়ে। তারপর, তার বাবাকে সরিয়ে নিয়ে যায় লিনাক্স। মূলত, সাহেলার ঋতুস্রাবের দিন থেকে পুরো খামার জাভার পরিবর্তে লিনাক্স পরিচালনা করা শুরু করেছিল। সাহেলার বাবাকে অন্য ঘরে বেঁধে আসার পর লিনাক্স সাহেলাকে খাবার দিয়ে চলে গিয়েছিল। এরপর সাহেলা একেবারে একা হয়ে যায়। বছরে দুইবার তার রক্তক্ষরণ হত। একবার বাচ্চার জন্ম দিতে গিয়ে আর অন্যবার ঋতুস্রাব ও ঋতুস্রাবের পর করা অতিরিক্ত যৌনমিলনের কারণে। আর এই দুই সময়েই সাহেলা ভালো ভালো খাবার পেত। লিনাক্সকে বেশ খুশি দেখাত। তাতে সাহেলা এটা বুঝে গিয়েছিল, মেয়ে মানুষের জন্ম যে কারণেই হোক না কেন, শুধুমাত্র তাদের রক্তক্ষরণেই পৃথিবী খুশি হয়। এই উপলব্ধিটা অবশ্য অনবরত পীড়া দিত সাহেলাকে। তবে যখন লিনাক্সকে দেখত, কেন জানি মনে আলাদা রকমের শান্তি আসত। তবে  বছরে বছরে রক্তক্ষরণ আর লিনাক্সকে দেখা ছাড়াও সাহেলা অন্য কিছুও করত। যেমন ঘরের মধ্যের তার পুরনো বন্ধু ইদুর, তেলাপোকাদের সাথে গল্প করত। তার যে বাচ্চাগুলো হত, তাদের এক বছরের জন্য সাহেলার কাছেই রাখা হত, তাই তত দিন তাদের দেখভালের দায়িত্বও থাকত সাহেলার। এক বছর পর তার বুকের মানিকদের যে কোথায় নিয়ে যাওয়া হত, সাহেলা তার কোনো খবর জানে না। এভাবেই দেখতে দেখতে ৯টি বছর পার করে দিয়ে সাহেলা এখন মৃত্যুলগ্নে। এই নয় বছরের মধ্যে বাচ্চা জন্ম দেওয়া ছাড়া তেমন কোন ঘটনা সাহেলার জীবনে ঘটেনি। শুধু প্রথম বছর আর পরের বছর যৌনমিলনের জন্য তার বাবাকে আনা হয়েছিল, আর এরপর থেকে প্রতিবার তার বড় ভাইকে নিয়ে আসত লিনাক্স। সাহেলা তার বড় ভাইকে বাবার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করায় তার ভাই বলেছিল, ‘বাবাকে কসাইয়ের কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে।’ এছাড়া প্রায় তিন বছর আগে লিনাক্স একদিন তার বিয়ে উপলক্ষে খামারের সবাইকে ভালো খাবার খাইয়েছিল। তবে বিয়ের পরের দিনই তার বউ মারা যায়। মেয়েটার বয়স নাকি তের বছর ছিল। তাই রক্তক্ষরণ হয়ে মারা যায়। এর পর অবশ্য লিনাক্স গেল বছর আর একটা বিয়ে করেছে। এই মেয়ের বয়সও অনেক কম, সবে নাকি ষোল, তাই এটাই সৌভাগ্য যে সে এখনো মরেনি। এইতো, এগুলো ছাড়া সেই একইভাবে চলেছে সাহেলার বিগত নয়টি বছর। অবশেষে আজ সে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে যাচ্ছে। তার মূলত আজ নতুন এক বাচ্চার জন্ম দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু, বাচ্চার মাথা বের না হয়ে পা আগে বের হয়েছে। আর বাচ্চার সেই পা দুটো ধরে জাভা আর তার বউ মিলে এত টানাটানি করেছে যে, অনেক বেশি রক্তক্ষরণ হয়েছে। এখন সাহেলার মৃত্যু অবধারিত। এই মৃত্যুকালে তার একটাই ভয় হচ্ছে, এই টানাটানিতে তার বাচ্চা মারা যায়নি তো? তাই সে সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করল, সে মারা যায় যাবে, কিন্তু তার বাচ্চা যেন না মারা যায়। এরপর তার মনে হল, আসলেই তাহলে মারা যাচ্ছে সে। কিন্তু, তার এই জীবন আসলে কেন সৃষ্টি করা হয়েছিল। একটাই তার ইচ্ছা ছিল, পৃথিবীর সব রং দেখার। কিন্তু, সারাজীবন তো বন্দী হয়েই কাটিয়ে দিল। প্রেম আসলেই কি, লিনাক্সের সাথে তার কিসের সম্পর্ক সেটাও তো জানা হল না। শুধু, জন্মের সময় মায়ের রক্তক্ষরণ ঘটিয়েছে আর বড় হয়ে নিজের রক্তক্ষরণ ঘটিয়ে আজ শেষমেষ মরেই যাচ্ছে। খামারের মধ্যে কতই না করুণ জীবন কাটিয়েছে। তারপর মনে হল, আসলেই যদি সে মানুষ না হয়ে কোনো রূংথা হত। তাহলে কতই না স্বাধীন জীবনযাপন করতে পারত। পরক্ষণেই মনে হল, রূংথাদের জীবনও আসলে জানোয়ারদের মতই। যাকে ইচ্ছা বিয়ে করে নেয়, তারপর তাদেরও তো সাহেলার মত রক্তক্ষরণেই মৃত্যু হয়। রূংথা মেয়েদেরও তো আসলে বাচ্চা উৎপাদন আর যৌনমিলন ছাড়া অন্য কিছু করতে দেয়াই হয় না। লিনাক্সের আগের বউয়র কথা মনে পড়লো সাহেলার, তের বছরের বাচ্চা মেয়ে, কত কষ্টে মারা গিয়েছে। আর এই নতুন বউও একদিন ধুকে ধুকে কষ্ট পেয়ে পেয়ে সাহেলার মত আস্তে আস্তে রক্তক্ষরণ ঘটিয়ে শরীরের সব রক্ত নিঃশেষ করে মরবে। আর লিনাক্সের চোখেও তো কত বিশাল একটা দুঃখ দেখতে পায় সাহেলা। সেই চোখ চায় পৃথিবীর সব রং দেখতে। আর তাকে মানুষ চাষের খামারের পরিচালক বানিয়ে রাখা হয়েছে এই খামার নামক জেলখানায়। সাহেলা বুঝে গেল যে সে মানুষ হয়েই ভালো জীবন অতিবাহিত করেছে। কারণ, সে না হয় মানুষ চাষের খামার নামক দৃশ্যমান কারাগারের আরামদায়ক একটি ঘরের মধ্যে বন্দি ছিল। কিন্তু, রূংথারা তাদেরই গড়া সমাজের আইনকানুন আর ঐতিহ্য নামক যে অদৃশ্য কারাগারে বন্দি থাকে, সেই অদৃশ্য কারাগারের চাইতে মানুষ চাষের ঘর শতগুণ ভালো। এটা ভেবে একটু স্বস্তি পায় সাহেলা। তারপর তার মন বলে উঠে, ‘প্রেম মানেটা কি আসলে? লিনাক্সের সাথে তার কি সম্পর্ক?’ সে মনের কথায় সায় না দিয়ে নিজেকে শান্তনা দিয়ে বলে, ‘এখন তার মৃত্যুলগ্ন, এখন মৃত্যুকে আলিঙ্গন করার সময়। এখন সে এসব অযথা কথা ভাবছে কেন?’ তাই সে সবকিছু ভাবা বাদ দিল। কিন্তু, সাথে সাথেই তার মন বলে উঠল, বাচ্চাটা কি বাচবে? সে আবার নিজেকে বোঝাল, ‘সব কিছু ভাবা বাদ।’ এমন সময় সে তার ঊরুতে এক ফোটা পানি পড়া অনুভব করল। সে অনেক কষ্টে চোখ মেলে দেখল লিনাক্স তার পাশে দাঁড়িয়ে কাঁদছে। সেটা দেখে সাহেলা ঠোঁটের কোণে মৃদু একটা হাসি আকাঁর চেষ্টা করে চোখ বন্ধ করল।

নূর এ আলম সিদ্দিকী

জন্ম- ১১ নভেম্বর ১৯৯৮ (২৬ কার্তিক ১৪০৫ বঙ্গাব্দ), ব্রহ্মপুর, নলডাঙ্গা, নাটোর।
বিশেষ অনুরাগ- দার্শনিক এবং মেটাফরিক্যাল সাহিত্য রচনা, কবিতা, গল্প, উপন্যাস রচনা।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ভাষা
Scroll to Top