Home » ম্যাকডালেন জঙ্গলে আপতন (শেষ পর্ব) // সামিহা মাহজাবিন অর্চি

ম্যাকডালেন জঙ্গলে আপতন (শেষ পর্ব) // সামিহা মাহজাবিন অর্চি


সহেলি নিজের বাড়ি ফিরে গেল। ঊষা আর অয়ন কিছুক্ষণ থেকে বাড়ি চলে গেল। তাদের দুজনের বাড়িও কাছাকাছিই। ফ্লোরেন্স পার্কের উত্তর দিকে সহেলির বাড়ি, পার্কের দক্ষিণ দিকে ঊষার ও কিছুদূরে টেমস নদীর পাড়ে অয়নের বাড়ি। এখানে এসে ভাড়া নিয়েছে তারা।
তারা যতক্ষণ ছিল তাদের সাথে তেমন কথা বলেনি সহেলি। বেশ গম্ভীর হয়ে ছিল। তারা চলে যাওয়ার পর কাপড় বদলে বেডরুমের রকিং চেয়ারে গা এলিয়ে দিল সে। তার কপালে ভ্রুকুটি বিদ্যমান। চেহারা গম্ভীর। সে মোবাইল হাতে নিয়ে কানে ইয়ার পডস লাগিয়ে নিল।

ছুটির দিন বলে তখনও ঘুমিয়ে ঊষা। ঘড়িতে সকাল নয়টা। সাধারণত সে সকাল ছটায় ওঠে। তবে আজ ছুটির দিন বলে ওঠেনি।
আরামের ঘুমের বারোটা বেজে গেল ফোন বেজে উঠতেই। ঊষা ঘুম চোখে উঠে ফোনে নাম ভালো করে না দেখেই কল রিসিভ করে কানে দিল, ‘হ্যালো?’
‘গুড মর্নিং। ঘুম ভাঙেনি এখনো?’
‘কে…?’
‘সহেলি বলছি। একটু পর বের হবো। চলে এসো। অয়নকেও কল করে দিয়েছি।’
‘কোথায়..?’
‘জন রেডক্লিফ হসপিটাল।’
ঊষা ভালোভাবে চোখ মেলল এই কথা শুনে। বিষ্মিত ভাব লুকিয়ে স্বাভাবিক স্বরে বলল, ‘হ্যাঁ। আসছি।’

জন রেডক্লিফ হসপিটাল, সকাল দশটা।
জ্যাক বারবেরি এখনও অবজারবেশনে আছেন। কালই রিলিজ পাবেন। তার কেবিনে উপস্থিত আছেন রবার্ট ব্রাউন, ঊষা, অয়ন, মিসেস বারবেরি ও প্রফেসর সহেলি সরকার। এছাড়াও একজনের সাথে তাদের নতুন পরিচয় হয়েছে। সে হলো মি. বারবেরির শ্যালক রবিন ট্রেভার। লম্বায় ছ’ ফুট থেকে কিছুটা কম, মুখে সমান করে ছাঁটা দাঁড়ি, চুল গাঢ় বাদামি রঙের। চোখে-মুখে কিছুটা গোপন-গোপন ভাব।
‘টমাসকে এখনো পুলিশ অ্যারেস্ট করেনি কেন রবার্ট?’ রাগি গলায় জিজ্ঞেস করলেন র‌্যাচেল বারবেরি।
‘করা হবে..তার আগে..’
‘এরপরও কোনো প্রমাণের দরকার আছে?’ বললেন তিনি,‘ও ওর ছেলেকে দিয়ে দশ বছর আগের শোধ তুলেছে ওর ওপর! এটা তো সহজ ব্যাপার! জ্যাক বলছে যে ওদের গাড়ি সে দেখেছে! ওদের গাড়ি সেসময়ে ওই জঙ্গলের মধ্য দিয়েই গিয়েছে! এরপরও আর কী জানতে চাও?’
‘একটা কথা জিজ্ঞেস করি মি বারবেরিকে মিসেস বারবেরি যদি কিছু মনে না করেন?’ বলল সহেলি।
মিসেস বারবেরি সহেলির দিকে কটাক্ষ দৃষ্টিপাত করে বলল,‘করো! করেই তো যাচ্ছো!’
‘আচ্ছা মি বারবেরি,’ জ্যাক বারবেরির দিকে তাকিয়ে বলল,‘আপনি বলেছেন যে আপনার গাড়িতে যে গাড়িটা ধাক্কা দিয়েছিল সেটা টমাস রাইটের গাড়ি। তাই তো?’
‘হ্যাঁ। সেটাই ছিল।’ ঠান্ডা গলায় বললেন তিনি।
‘আচ্ছা…যখন উনি আপনার সাথে কাজ করতেন, তখন তার গাড়ি ছিল?’
‘না। ও ট্যাক্সিতে যাতায়াত করত। কেন?’ অবাক হয়ে বললেন মি বারবেরি।
‘আচ্ছা গাড়িটা কেমন?’
‘সাদা রঙের টয়োটা, গাড়ির ভেতরে ব্যাক মিরর থেকে একটা ছোট সাদা পায়রার পুতুল ঝোলানোা। নাম্বার বি ডি সিক্স ওয়ান, এস এম আর।’ আত্মবিশ্বাসের সুরে বললেন তিনি।
‘গ্রেট!’ প্রশংসা করে বলল সহেলি,‘আপনার দৃষ্টিশক্তি তো দেখছি শার্লক হোমসকেও হার মানিয়ে দেবে! ব্রিজ নাইট ক্লাবের এতগুলো সাদা টয়োটা কারের মধ্যে আপনি টমাস রাইটের গাড়ি চিনে নিলেন, আবার এর সব তথ্যও মুখস্থ করে রেখেছেন! শুধু তাই নয়, ম্যাকডালেন উডসের অন্ধকারের মধ্যে আপনি সেই গাড়ি চিনেও নিলেন! বিড়ালের চোখ বলতে হবে আপনার!’
‘বিড়ালের চোখের তো কিছু নেই’, ভ্রæ কুঁচকে বিরক্তিসূচকভাবে বললেন মি বারবেরি,‘যাকে মানুষ ভুলে যেতে চায়, তাকে অবচেতন মন আরও বেশি করে মনে করায়। আমার ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। ওর সাথে ব্রিজ নাইট ক্লাবে দেখা হওয়ার পরই ওর গাড়ি দেখি আমি। দেখে মনে গেঁথে যায়। যেহেতু আমি জানি কে আমার শত্রু, তাই অন্ধকারেও গাড়িটা চিনতে পেরেছি।’ তার কন্ঠে অত্যন্ত দৃঢ়তা লক্ষ করা গেল।
সহেলি হেসে বলল,‘তা যুক্তিযুক্ত। তবে, একটা জিনিস মোটেই যুক্তিযুক্ত নয়। একেবারেই অযৌক্তিক।’
‘কী?’ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন মিসেস বারবেরি।
সহেলি সকলের থেকে পেছন ফেরে জিজ্ঞেস করল,‘ফিজিক্স পড়েছেন নিশ্চয়ই?’
‘কেন পড়ব না? এসব কী বলছো বলবে?’ রেগে গিয়ে বললেন মিসেস বারবেরি। মি বারবেরিও বেশ বিরক্ত হয়ে গিয়েছেন।
‘শুধু মুখস্থই করেছেন। কিছু বোঝেননি। বুঝলে এই ভুলটা করতেন না কখনোই।’
সহেলির অযৌক্তিক কথার অর্থ কেউই বুঝতে পারল না। মি বারবেরি এবার বলে উঠলেন,‘দেখো এটা মজা করার সময় না! তোমাদের গোয়েন্দা কাহিনি না এটা! একটা ওপেন এন্ড শাট কেস।’
সহেলি এই কথায় কান না দিয়ে মি বারবেরিকে প্রশ্ন করল,‘আচ্ছা, আপনি তো ফোনে কথা বলছিলেন না আপনার স্ত্রীর সাথে অ্যাকসিডেন্টের সময়ে?’
‘হ্যাঁ।’
‘ফোনটা কোথায় ছিল?’
‘আমার হাতে।’ রাগি গলায় বললেন মি বারবেরি,‘আমি সিটে রেখে কল রিসিভ করিনি। এক হাতে কানে ফোন রেখে আরেক হাতে ড্রাইভ করছিলাম।’
‘আচ্ছা।’ সহেলি একটু চিন্তা করে বলল,‘গাড়িটা নিচের দিকে কিছুটা নেমে গাছের সাথে ধাক্কা খেল। আর আপনি পড়ে গেলেন।’
‘হ্যাঁ!’
‘আপনার ফোনটা কোথায় গেল এরপর?’
‘কোথায় আবার থাকবে? এটা কী ধরনের প্রশ্ন? গাড়ি বেসামাল হতেই হাত থেকে পড়ে গেছে! ভেঙে গেছে!’
‘কী হচ্ছেটা কী রবার্ট!’ বলে উঠলেন মিসেস বারবেরি,‘ও এভাবে জ্যাককে প্রশ্ন কেন করছে?’
মি ব্রাউন নিজেও বিভ্রান্ত হয়ে গিয়েছেন। উনি কোনো উত্তর না দিয়ে সহেলির দিকে তাকালেন।
সহেলি মাথা নামিয়ে শব্দ করে হাসল। মিসেস বারবেরি চোখ গরম করে বললেন,‘হাসছ কেন?’
সহেলি আর কিছু না বলে নিজের মোবাইল বের করল। এরপর বলল,‘দুটো ভয়েস রেকর্ড শোনাবো। কেউ কোনো কথা বলবেন না প্লিজ। মন দিয়ে শুনুন।’
১ম রেকর্ডিংটা ছিল মি বারবেরির অ্যাকসিডেন্টের সময়ের কল রেকর্ডিং, দ্বিতীয় রেকর্ডিংটা হলো টমাস রাইটের বাড়িতে করা রেকর্ডিঙের শেষাংশ। টমাস রাইটের শেষ দুএকটা কথা আর যে সময়ে সহেলি ‘হুম…আচ্ছা..আজ তাহলে আসি?’ বলে উঠে গেল। এরপরই রেকর্ডিং শেষ হয়ে গেল।
টমাস রাইটের সাথে সহেলি দেখা করেছে জেনে কিছুটা অবাক হলেন মি বারবেরি ও মিসেস বারবেরি। সেটা লুকিয়ে মি বারবেরি শীতল গলায় বললেন, ‘এগুলোর কী মানে দাঁড়ায়?’
‘ভালোভাবে শুনলে বুঝবেন।’
‘সহেলি, যা বলার খুলে বলো।’ ইতস্তত করে বললেন মি ব্রাউন।
‘ঠিক আছে।’ বলল সহেলি, ‘খুলেই বলছি। মি রাইটের সাথে আমাদের সাক্ষাতের রেকর্ডিঙের শেষের দিকে একটা জিনিস খেয়াল করেছেন?’
‘কিছুই ছিল না। শুধু তুমি বিদায় নিয়েছ।’ বললেন মি বারবেরি।
‘এরপর?’
‘আরেকজন, বোধহয় ও,’ ঊষাকে দেখিয়ে বললেন মিসেস বারবেরি,‘সরি বলল। এরপর তো শেষ!’
‘আমার কথার দিকটা খেয়াল করুন।’ বলে সে আবার সেই জায়গাটা চালাল। ঊষা খেয়াল করল, সহেলির ‘ঠিক আছে আজ’ এই জায়গাটা ও ‘তাহলে আসি।’ বলা জায়গাটা, দুটো জায়গা কিছুটা আলাদা শোনাচ্ছে!
সে এটা বলল। সহেলি হেসে বলল,‘গুড জব ঊষা! ঠিক বলেছো!’ এরপর সকলের দিকে তাকিয়ে বলল,‘এই জায়গায় আমার কথা কিছুটা দূর থেকে শুনিয়েছে রেকর্ডিঙে, কারণ এই সময়ে ঊষার হাত থেকে ফোনটা পড়ে গিয়েছিল। দূরে চলে যাওয়ায় কথাও দূরে শোনাচ্ছে। কিন্তু মি বারবেরির ফোন কোন অতলে ছিটকে পড়েছে কেউ জানে না, গাড়িটা বেসামাল হতেই তার হাত থেকে ফোনটা পড়ে যায়, অথচ তার গলার আওয়াজ পুরোটা সময়ে একই জায়গা থেকেই শোনা গেল! এটা তো বিজ্ঞান বিরুদ্ধ! গাড়ি ব্রেক করলে মানুষ সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ে। তার ফোন হাত থেকে পড়ে গেলে গলা কী একই দুরত্বে শোনাবে? যেখানে আমার বলা মাত্র দুটি শব্দও সামান্য দূরে থেকে আলাদা শোনা গেল!’
মি বারবেরির চোখ-মুখ লাল হয়ে উঠল। তিনি স্থির দৃষ্টিতে সহেলির দিকে চেয়ে রইলেন। বেশ কিছুক্ষণ পর বললেন,‘কী বলতে চাইছো তুমি? আমি মিথ্যে বলেছি? মাতাল হয়ে গাড়ি চালিয়েছি, এটাই ভাবছো?’ চেঁচিয়ে বললেন তিনি।
‘তা তো বলেছেনই, মি বারবেরি।’ শীতল কন্ঠে বলল সহেলি।
‘আর ওই হুমকি চিঠি!’ বলে উঠল অয়ন।
‘উনিই লিখেছেন।’ বলল সহেলি।
‘মানে? জ্যাকের হাতের লেখার সাথে তো ওই লেখার কোনো মিল নেই!’ বললেন ব্রাউন।
‘পাঁচ আঙুল যেমন সমান হয় না, তেমনি,’ গলা নামিয়ে বলল সহেলি,‘সব্যসাচীদের দু’ হাতের লেখাও এক হয় না। তাই না মি বারবেরি?’
জ্যাক বারবেরি বিস্ফোরিত চোখে সহেলির দিকে তাকিয়ে রইল। মিসেস বারবেরি ধীরে ধীরে বললেন,‘তুমি..কী করে জানলে..যে ও সব্যসাচী?’
সহেলি মিসেস বারবেরির দিকে সটান তাকিয়ে বলল,‘ব্যাপারটা আগে খেয়াল করলে হয়তো আপনাদের চালাকি আগেই ধরতে পারতাম।’ বলে তার পার্স থেকে একটা কার্ড বের করল। বারবেরি শো-রুমের কার্ড, যেটা মি বারবেরি নিজ হাতে দিয়েছিলেন তাকে প্রথম সাক্ষাতের দিন।
সে কার্ডের পেছন দিক দেখিয়ে বলল,‘এখানে আপনার ঠিকানা আর নাম্বার লিখে দিয়েছিলেন। জানি না আপনার বাড়িতে কোনোদিন দাওয়াত করতেন কি না, কিন্তু ঠিকানাটা আমাকে লিখে দিয়ে নিজের জন্য দাওয়াত ছাড়াই বিপদ ডেকে আনলেন।’ তাদের ভয়ার্ত চোখ থেকে চোখ সরিয়ে মি. ব্রাউনের দিকে তাকিয়ে সে বলল,‘আপনাকে মি বারবেরি যে উইলটা দিয়েছিলেন, সেখানে তার হাতের লেখা আর হুমকি চিঠির লেখা আলাদা। কেননা, উইলটা উনি লিখেছেন ডান হাতে। আর হুমকি চিঠিটা, বাঁ হাতে। বলে কার্ডের পেছনের দিকটা ব্রাউনের সামনে নিয়ে ধরল। ঊষা অবাক চোখে দেখল, কার্ডের পেছনে লেখা আর হুমকি চিঠিতে লেখা, দুটো লেখার ধাঁচ একদম এক! সে ভালো করে মনে করে দেখলো, সেদিন মি বারবেরি বাঁ হাতে কার্ডে ঠিকানাটা লিখেছিলেন!
‘সব বাজে কথা! এর কোনো অর্থ নেই!’ ক্ষেপে গিয়ে বললেন মিসেস বারবেরি,‘জ্যাক নিশ্চয়ই যেচে নিজের হাত-পা ভাঙবে না! এখন এটা বোলো না যে এটাও মিথ্যে! ডাক্তার নিজে চিকিৎসা করেছেন ! আর উনি শহরের বিখ্যাত একজন ডাক্তার।’
সহেলি মুচকি হাসল। আগেই বলেছি, বিশেষ কারণ ব্যতীত তার হাসি দেখা যায় না। নিশ্চয়ই, আরেকটি চমক হতে চলেছে, ভাবল ঊষা।
‘মি ব্রাউনের এজেন্সির একজন গোয়েন্দাকে লাগানো হয়েছিল ডাক্তারের পেছনে। সে বেশ ভালো ছবি তোলে। অ্যাকসিডেন্টের আগের দিন রাতের বেলা হসপিটালের বাইরে দেখা করে যে টাকার ব্যাগ দিয়েছিলেন, তার পরিষ্কার ছবি তুলেছে সে। ক্যামেরাটা আপনার বিড়াল চোখের থেকেও পরিষ্কার!’ বলল সহেলি।
‘কী সব বলছ!’ চেঁচিয়ে উঠলেন জ্যাক বারবেরি,‘ওর সাথে আমি রাতে দেখা করিনি! ওকে আমি দিনের বেলা ওর বাড়িতে গিয়েই সেদিন টাকা দিয়ে দিয়েছি! আর কেউ ছিল না সেখানে-’ বলেই থেমে গেলেন।
‘একজন মানুষ এক নাগারে মিথ্যে বলতে বা শুনতে পারে না। বিশেষ করে দাম্ভিক প্রকৃতির মানুষরা। নিজের ব্যাপারে মিথ্যে কথা সে বেশি সময়ের জন্য সহ্য করতে পারে না।’ ক্ষীণ হেসে বলল সহেলি।
জ্যাক বারবেরি আর র‌্যাচেল বারবেরি একদম চুপ হয়ে গেলেন। সহেলি একটা অদ্ভুত কাজ করল। সে বেডের পাশে রাখা একটা ফলের ঝুড়ি থেকে ছুরি তুলে নিল। এরপর মি. বারবেরির প্লাস্টার করা পায়ে আঘাত করতে উদ্যত হলো। নিমেষের মধ্যে নিজেকে বাঁচাতে মি বারবেরি পা সরিয়ে নিয়ে ভাঁজ করে প্লাস্টার করা হাত দিয়ে জড়িয়ে নিলেন। সেকেন্ডের মধ্যে তার ঘাম পড়তে শুরু করেছে।
সহেলি হাসল। এরপর বলল,‘ওয়ালটন স্ট্রিটে মি ব্রাউনের বাড়ি থেকে বের হয়ে আপনি যান ব্রিজ নাইট ক্লাবে। সেখানে ছিলেন আপনার মিসেস র‌্যাচেল বারবেরি আর আপনার শ্যালক রবিন ট্রেভার।’ সে রবিনের দিকে তাকাল। তার দিকে এগিয়ে গিয়ে গলা নামিয়ে বলল,‘রাতে মি ব্রাউনের গোয়েন্দার মাধ্যমে খোঁজ নিয়েছিলাম, সাইবার সিকিউরিটি ইনচার্জ হিসেবে কাজ করার পাশাপাশি আপনি বিটবক্সিংও করেন। আবার, বিভিন্ন রকম সাউন্ড এফেক্ট ক্রিয়েট করার এক্সপার্ট আপনি। তাই না?’
রবিন ট্রেভার ঢোক গিলল। মৃদু কন্ঠে বলল, ‘আ..হ্যাঁ!’
সহেলি মাথা নামিয়ে বলল, ‘সেদিন নাইট ক্লাবের একটা খালি রুম একদিনের জন্য নিয়েছিলেন মি বারবেরি। সেখানে বসেই আপনারা তিনজন একটা ফেক কল রেকর্ডিং তৈরি করেন। মি বারবেরি আর মিসেস বারবেরির কথা, সাথে আপনার তৈরি হর্ন, গাড়ি পড়ে যাওয়া ও কাঁচ ভাঙার শব্দ তৈরি; এই সব মিলিয়ে তৈরি হয়ে যায় একটা কল রেকর্ডিং। তবে ভুল একটাই ছিল। আপনারা ঠিক মতন বিজ্ঞান পড়েননি।’ রবিন ট্রেভার একটা কথাও বলল না।
সহেলি হতভম্ব ও নিশ্চুপ মি ব্রাউনের দিকে তাকিয়ে বলল,‘এই সব করার মূল কারণ ছিল টমাস রাইটের বদনাম করা। কারণ, বের করে দেওয়া সেক্রেটারিকে নিজের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখতে তার মোটেই ভালো লাগছিল না।’
মি ব্রাউন রাগের আগুনে জ্বলতে থাকা মি বারবেরির দিকে সটান তাকিয়ে বললেন,‘টমাস রাইট আর ওর ছেলের পেছন গোয়েন্দা লাগিয়ে ছিলাম। তাদের বাড়ির দারোয়ানকে যে তুমি টাকা দিয়ে বাড়ির লোকজনের বাড়িতে আসা-যাওয়ার খোঁজখবর নিয়েছিলে, সেটা গোয়েন্দারা জানতে পেরেছে। আর,’ তিনি একটু থেমে বললেন,‘রাইট ব্র্যান্ডের ওয়াশিংটন শাখার ম্যানেজারকে ধরা হয়েছে। সে বলেছে..তুমিই তাকে টাকা দিয়েছিলে ট্রাকের ব্রেক নষ্ট করে দিতে আর গা ঢাকা দিতে।’
জ্যাক বারবেরি বিস্ফোরিত চোখে ব্রাউনের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। এবারে আমতা আমতা করে বললেন,‘না! না! এটা হতে পারে না! এটা..হতে পারে না!’

‘দুরকম হাতের লেখা, আর একটা কল রেকর্ডিং, দুটো ধরেই কেস সলভ্ড! ’ বলল অয়ন।
‘কিন্তু তুমি বুঝলে কী করে যে জ্যাক অন্য হাতে হুমকি চিঠিটা লিখেছে?’ প্রশ্ন করলেন ব্রাউন।
সহেলি মৃদু কন্ঠে বলল,‘আমি মি রাইটের বাড়িতে গিয়েছিলাম এই ব্যাপারটাই শিওর হতে।’
‘কী?’ জিজ্ঞেস করলেন মি রাইট। তার ওপর থেকে মিথ্যে অপবাদ তুলে দেওয়ার খুশিতে সহেলি, ঊষা, অয়ন আর মি ব্রাউনকে তিনি নিজের বাড়িতে কফির দাওয়াত দিয়েছেন। তাদের আসল পরিচয় জেনেও, রাগ করেননি তিনি।
ঊষা বলল,‘আমরা আপনাদের হাতের লেখা সংগ্রহ করতে মূলত এসেছিলাম।’
সহেলি বলল,‘তবে আমার উদ্দেশ্য শুধু হাতের লেখা ছিল না। এটা দেখার ছিল যে, আপনাদের মধ্যে কেউ সব্যসাচী কি না।’
সে বলে চলল,‘মি রাইট ডান-হাতি, কিন্তু হাত ভীষণ কাঁপে। অন্য হাতটির দু আঙুল বিকল, সেহেতু তা দিয়ে লেখা সম্ভব নয়। অন্যদিকে মিসেস রাইট ও জেমস দুজনেই বাঁ-হাতি। খাবার ডান হাতে খেলেও, আমাদের কফির কাপ দিয়েছিলেন বাঁ হাতে। আবার লিখেছিলেনও বাঁ হাতে। জেমসও বাঁ হাতে লিখেছিলেন, আবার মানিব্যাগ থেকে কার্ড বের করে মি রাইটের হাতে দিয়েছিলেনও বাঁ হাতে। যেহেতু অভিযুক্তদের কারোর লেখার সাথে হুমকি চিঠির লেখার মিল নেই আবার কেউ সব্যসাচীও নন যে অন্য হাতের লেখা আলাদা হবে, সেহেতু আপনাদের কেই এটি লেখেননি। সেক্ষেত্রে হতে পারে অন্য কাউকে দিয়ে লিখিয়েছেন, বা মি বারবেরি নিজেই লিখেছেন। কেননা উনি সব্যসাচী। কিন্তু তার এক হাতের লেখার নমুনাই আমি দেখেছি। অন্য হাতের লেখা কীভাবে সংগ্রহ করব সেটা চিন্তা করছি, তখনি ঊষাকে ‘‘জড়তা’’ বোঝাতে গিয়ে আমার একটা কথা মনে হয়। আপনাদের সাথে কথা বলার রেকর্ডিংটা শুনলাম, সাথে ওই কল রেকর্ডিংটাে শুনলাম। সেখান থেকেই খটকা লাগে। বাড়ি ফিরে ওটার শেষের জায়গাটা আর মি বারবেরি আর মিসেস বারবেরির কল রেকর্ডিংটা বারবার শুনতে শুনতে, ব্যাপারটা আবিষ্কার করি।’
‘মি ব্রাউন সে সময়ে কল করেন। রাইট হাউসের দারোয়ান আর ম্যানেজারের ধরা পড়ার খবরটা বলেন। তাতেই সম্পূর্ণ পরিষ্কার হয়ে যায়।’
‘কিন্তু আমি ওই জঙ্গল দিয়ে যাওয়ার সময়ে..’ বলতে গিয়ে থেমে গেল জেমস,‘মনে পড়েছে! পাশের ঘন জঙ্গলের ভেতর থেকে একটা ফ্লাশ লাইট জ্বলতে দেখেছিলাম! একবারের জন্য থামিয়ে ছিলামও। থামাতেই সেটা বন্ধ হয়ে যায়। মনের ভুল ভেবে চলে যাই।’
‘তারা তখন অ্যাকসিডেন্ট সিন তৈরিতে ব্যস্ত ছিল বোধহয়।’ বললেন ব্রাউন,‘ওদের ফোন বন্ধ ছিল অনেকটা সময়। ফোন বন্ধ রেখেই রবিন আর জ্যাক জঙ্গলে চলে যায়। কল করে, কোনো কথা না বলে নির্দিষ্ট সময় পর কল কেটে দেয়। আর আমাকে পাঠায় ভয়েস রেকর্ড হিসেবে রাখা রেকর্ডিং।’
‘আমাদের সত্যিই অনেক বড় সৌভাগ্য এটা।’ হেসে বললেন মিসেস রাইট,‘এদিকে এই অপবাদ ঘুচল, অন্যদিকে একজন ইনভেস্টারের সাহায্যে আমাদের টাকার ঘাটতি পূরণ হয়ে গেল। একটা বড় অর্ডারও এসে পড়েছে!’
‘দুঃখের পরই সুখ আসে, মিসেস রাইট।’ হালকা হেসে বলল সহেলি। টমাস রাইটকে লক্ষ করে বলল,‘একটা কথা বলতে পারি, মি রাইট?’
‘হ্যাঁ নিশ্চয়ই। বলো।’ হাসিমুখে বললেন মি রাইট। তার চোখে-মুখে যে দুশ্চিন্তার ছাপ তারা আগেরবার দেখেছিল, তা মুছে গিয়ে তাঁর আসল চেহারা বেরিয়ে এসেছে।
‘আমি কয়েক মাস পর বাংলাদেশে যাব। আমার পরিবারের সদস্যদের জন্য ড্রেস আর কসমেটিকস কিনব। ভেবেছিলাম ‘বারবেরি’ শো-রুম থেকে নেব। তবে এখন মনে হচ্ছে ‘রাইট’ শো-রুম থেকে নিই। বাজেটের মধ্যে পাওয়া যাবে নিশ্চয়ই?’ হেসে বলল সে।
‘নিশ্চয়ই!’ ভীষণ খুশি হয়ে বললেন তিনি,‘তোমার পছন্দমতো সবই পাবে তুমি কোনো চিন্তা করো না! তোমার জন্য ডিসকাউন্টের ব্যবস্থাও করে দেব!’
সহেলি বলল,‘ডিসকাইন্ট না হলেও চলবে। ধন্যবাদ।’
‘নতুন গল্প কিন্তু শুরু করে দিয়েছি।’ এমন সময়ে বলে উঠলেন লেখিকা ঊষা, ‘তবে একটু ভিন্নতা আছে।’
‘কী?’ কৌতুহল নিয়ে জিজ্ঞেস করল অয়ন।
ঊষা হেসে বলল,‘আগেরবারের মতনই দুটো ভাষাতেই লিখব। আগে বাংলা, এরপর ইংরেজি। তবে, এবার মূল গোয়েন্দা রমনা না।’
‘তাহলে কে?’ জিজ্ঞেস করল মি ব্রাউন। তার ঠোঁটে সবসময়ের প্রাণবন্ত হাসি।
ঊষা সবার চেহারায় একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে সহেলির দিকে তাকাল। সে উত্তরের অপেক্ষায় স্থির দৃষ্টিতে চেয়ে আছে তার দিকে।
সে হেসে বলল,‘অক্সফোর্ডের সাইকোলজি প্রফেসর সহেলি সরকার নিজে। এতদিন তার মতন একজন তার কেসের মতনই একটি কেস পেত আর সে যেভাবে যা করেছে তাই করতো। কিন্তু এই গল্পে সরাসরি সহেলিই আর তার বন্ধু ঊষা আর অয়নই থাকবে! আর এর নাম হবে, ‘‘ম্যাকডালেন জঙ্গলে আপতন’’! “Mishap in Macdalen Woods!’’

Link for the previous episode: https://uthon.com/%e0%a6%ae%e0%a7%8d%e0%a6%af%e0%a6%be%e0%a6%95%e0%a6%a1%e0%a6%be%e0%a6%b2%e0%a7%87%e0%a6%a8-%e0%a6%9c%e0%a6%99%e0%a7%8d%e0%a6%97%e0%a6%b2%e0%a7%87-%e0%a6%86%e0%a6%aa%e0%a6%a4%e0%a6%a8-%e0%a6%aa/

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ভাষা
Scroll to Top