Home » ম্যাকডালেন জঙ্গলে আপতন (পর্ব ৪) | সামিহা মাহজাবিন অর্চি

ম্যাকডালেন জঙ্গলে আপতন (পর্ব ৪) | সামিহা মাহজাবিন অর্চি


রাইট হোম, হুইটলি, লন্ডন; বিকাল ৫টা।
প্রায় একশ হাজার ডলারের পোশাকের ব্যবসা থাকলেও অতিমাত্রায় বিলাসিতা নেই রাজবাড়িটিতে। একেবারে নেই তা নয়, তবে যা আছে তা বাড়ির ভেতরে, বাইরে ততটা নয়। বাড়িতে রাইট দম্পতি, আর তাদের একমাত্র ছেলে থাকেন। কাজের লোকের সংখ্যা মোট তিনজন, তবে পারিবারিক গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার সময়ে তাদের কারোরই আলোচনা সভার ধারেকাছে থাকার অনুমতি নেই।
শনিবার বিকেলবেলা, উত্তেজনাকর আলোচনায় মত্ত মিস্টার রাইট ও তার পরিবারের সদস্যরা।
‘এতগুলো টাকা জলে গেল! তুমি এভাবে চুপচাপ বসে আছ কেন বাবা? ব্যবসার কী হবে?’ আতঙ্কিত কণ্ঠে চুপচাপ বসে থাকা বাবাকে বলতে লাগল জেমস। তার উৎকন্ঠা দেখে বহুদিন পর রাইট পরিবারের দায়িত্ববান ছেলে বলে মনে হচ্ছে তাকে।
‘বসে হা হুতাস করলে তো কিছু হবে না জেমস!’ বললেন মিসেস লরেন রাইট। আতঙ্কে তার সুশ্রী চেহারা কুঁচকে গিয়েছে। স্বামীর দিকে তাকিয়ে বললেন,‘তুমি কিছু বলছ না কেন? কী করব এখন?’
‘পঁচাশি হাজার ডলার।’ ভয়ার্ত গম্ভীর কন্ঠে বললেন টমাস রাইট, ‘আট বছরে ব্যবসার যতটা উন্নতি হয়েছিল, তা একবারে পানির নিচে তলিয়ে গেল! সব তো ঠিকই ছিল। ম্যানেজারকে হাজার বার করে ফোনে জিজ্ঞাসা করেছিলাম ট্রাকে কোনো সমস্যা আছে কি না! হঠাৎ করে কেন হলো এমন?’ আনমনে বলতে লাগলেন টমাস রাইট। তার হাত-পা উত্তেজনায় কাঁপছে।
‘তোমার আরও দেখেশুনে ম্যানেজার নিয়োগ দেয়া দরকার ছিল!’ বলল জেমস,‘ওর নামে যে আগে একটা কেস হয়েছিল, এটা জানা থাকলে আমিই তোমাকে না করতাম ওকে নিয়োগ দিতে! তার মধ্যে আবার এই জ্যাক বারবেরি আমাদের ফাঁসিয়ে দিল!’
এমন সময়ে কলিংবেল বাজল। জেমস গিয়ে দরজা খুলল। দু’জন যুবতী ও একজন যুবক দাঁড়িয়ে। পাশে গেটের দারোয়ান।
‘কী চাই?’ অপরিচিতদের জিজ্ঞাসা করল জেমস।
‘গুড মর্নিং স্যার।’ বলল সামনে দাঁড়ানো যুবতীটি,‘আমরা টমাস রাইটের সঙ্গে কথা বলতে চাই।’
সিকিউরিটি গার্ড বললেন,‘স্যার আমি অনেকবার না করেছি, বলছেন সাংবাদিক…’
‘এখন কোনো ইন্টারভিউ নেওয়া যাবে না। প্লিজ বিরক্ত করবেন না। আমাদের কারোরই মানসিক অবস্থা ঠিক নেই।’, বলে সে দরজা লাগিয়ে দিতে গেলেই যুবকটি বলে উঠল, ‘স্যার, আমাদের কথা বলা জরুরি। আমরা-’
‘বললাম তো এখন সম্ভব নয়!’ ক্রুদ্ধস্বরে বলল জেমস।
‘মি রাইট,’ মুখ খুলল দ্বিতীয় মেয়েটি, ‘আমরা নিউজ চ্যানেল থেকে এসেছি। মি বারবেরির অ্যাকসিডেন্টের ব্যাপারে আপনাদের সাথে কথা বলতে চাই।’
‘বললাম তো..’
‘আমরা আপনাদের বিরুদ্ধে কথা বলব না।’ জেমসের কথা শেষ হওয়ার আগেই বলল সে,‘আপনাদের সাথে সামান্য কিছু কথা বলে নিয়ে যথাসম্ভব আপনাদের হয়েই রিপোর্ট তৈরি করব। কিন্তু এর জন্য আপনাদের সহযোগিতা প্রয়োজন।’
মেয়েটির এই কথা শুনে কয়েক সেকেন্ডের জন্য তাকিয়ে রইল জেমস। তারা বর্তমানে যথেষ্ট প্রভাবশালী, কিন্তু জ্যাক বারবেরিও কম প্রভাবশালী নয়। ভেবে নিয়ে সে মৃদু কন্ঠে বলল,‘ভেতরে আসুন।’ রাজবাড়ির ভেতর প্রবেশ করল সহেলি, ঊষা ও অয়ন। আশেপাশে তাকাল। সাজানো-গোছানো বাড়ি। দেখেই বোঝা যায় বিলাসিতা থেকে সৌন্দর্যের দিকেই বেশি মন দেয়া হয়েছে।
জেমস তাদের ড্রয়িংরুমে নিয়ে এল। মি রাইট ও মিসেস রাইট সেখানেই বসে ছিলেন। অপরিচিত কয়েকজনকে ছেলের সাথে দেখে প্রশ্ন করলে জেমস বলল,‘ওরা নিউজ চ্যানেল থেকে এসেছেন। বাবা, তোমার সাথে কথা বলবেন। মি বারবেরির ব্যাপারে।’
টমাস রাইট তাদেরকে দুর্বল দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করলেন। বসতে বললেন। তারা পাশাপাশি দুটো সোফায় বসল। সহেলির পাশে অয়ন, আর আরেকটায় ঊষা। জেমস গিয়ে তার মায়ের পাশে বসল।
তারা নিজেদের ছদ্মনামে পরিচয় দিয়েছে। সাথে নকল আইডি কার্ডও দেখিয়েছে। সহেলির নাম সোহা রহমান, ঊষার নাম তৃষা আহমেদ ও অয়নের নাম অরুণ রায়।
‘বারবেরি আমার বিরুদ্ধে ঠিক কী বলেছে আমি ভালো করেই জানি।’ ধীরে ধীরে বললেন তিনি, ‘আমার বিরুদ্ধে অনেক প্রমাণও আছে। কিন্তু বারবেরি যতই প্রমাণ দেয়ার চেষ্টা করুক, সত্যি এটাই যে, আমি বা আমার ছেলে কেউই ওকে মারার চেষ্টা করিনি।’ তার কন্ঠে অত্যন্ত দৃঢ়তা লক্ষ করা যায়।
সহেলি হালকা মাথা নেড়ে বলল,‘মি রাইট, আপনাকে দু-একটা প্রশ্ন করব। তার জন্য আপনাদের লিখিত অনুমতি চাই। আপনাদের তিনজনেরই।’
‘ঠিক আছে।’ মৃদু কন্ঠে বললেন মি রাইট। অয়ন একটা সাদা কাগজ এগিয়ে দিল। মি রাইট, মিসেস রাইট আর জেমস, তিনজনই এক লাইনে অনুমতি দিচ্ছে লিখে সাইন করে দিল। তারা খেয়াল করল, লিখতে গিয়ে মি রাইটের বেশ কষ্ট হচ্ছে। তার হাতের কবজি কিছুটা বাঁকা। আবার, মিসেস রাইট ও জেমস, দুজনেই লিখেছেন বাঁ হাতে।
‘কথা রেকর্ড করতে পারি?’ জিজ্ঞাসা করল সোহা ওরফে সহেলি। মি রাইট অনুমতি দিলে সে ঊষার দিকে তাকাল। ঊষা নিজের ফোনে রেকর্ডিং অন করে দিল। সহেলি একে একে প্রশ্ন করল, মি রাইট উত্তর দিলেন। মাঝে কয়েকবার মিসেস রাইট ও জেমস রাইটও উত্তর দিলেন।
‘জ্যাক বারবেরির সাথে আপনার কী সূত্রে পরিচয় হয়েছিল?’
‘বস হিসেবে পরিচয় হয়েছিল। আমি তার সেক্রেটারি ছিলাম প্রায় তিন বছর।’
‘কাজ ছেড়ে দিয়েছিলেন কবে?’
‘প্রায় দশ বছর হল।’
‘ছেড়ে দেওয়ার কারণ কী?’
‘অসুস্থ ছিলাম। আবার আমার দুটো হাতেই সমস্যা আছে। ডান হাতের কবজি ছোট থেকেই কিছুটা বাঁকা। আরেকটা হাতের দুটো আঙুলে সমস্যা হয়েছিল মি বারবেরির সাথে কাজ করার সময়ে। একটা হিসেব ভুলভাল টাইপ করে ফেলি। যার কারণে বেশ ঝামেলায় পড়তে হয়। একটা বড় অর্ডার হাতছাড়া হয়ে যায়। উনি ভীষণ রাগি স্বভাবের। রেগে গিয়ে বের করে দেন।’
‘সেজন্য তার ওপর আপনার রাগ আছে?’
‘রাগ থাকাটাই স্বাভাবিক।’ বলে উঠলেন মিসেস রাইট, ‘হঠাৎ করে বেকার হয়ে যাওয়ায় আমাদের প্রায় দু’বছর অনেক কষ্টের মধ্যে কাটাতে হয়েছে। দু’বছরের অনেক শ্রমের পর ধীরে ধীরে পোশাক ব্যবসাটা দাঁড় করান গেছে।’
‘আর সেটাও এবার শেষ হতে বসেছে!’ বলল জেমস, ‘আর আমার ধারণা, এতে ওই বারবেরিরই হাত আছে! বাবাকে নিজের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখে ওর গা জ্বলছিল! তাই দু’দিক দিয়ে আঘাত করে শেষ করতে চাইছে আমাদের!’
‘জেমস।’ বলে উঠলেন মি রাইট, ‘এতে তার হাত আছে কি নেই কিছু না জেনে তা বলা যায় না।’ এরপর আবার ওদের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘রাগ তার ওপর আমার হয়েছিল। কিন্তু রাগ দেখিয়ে তো আর আমি চাকরিটা ফিরে পাব না! আর তাছাড়া, তার থেকে এখন এত বছর পর আমি শোধই বা কেন তুলব? আমি তো ভালোই আছি।’
‘আপনার সাথে তার বহু বছর পর আবার দেখা হয় কোথায়?’ ইচ্ছে করে প্রশ্ন করল সহেলি।
‘অক্সফোর্ডের ব্রিজ নাইট ক্লাবে।’ উত্তর দিলেন তিনি, ‘ওখানে এক বন্ধুর সাথে যাতায়াত শুরু করি। প্রথম দিনেই মি বারবেরির সাথে দেখা হয়।’
‘কোনো ধরনের সংঘর্ষ হয়নি?’ প্রশ্ন করলো ঊষা।
মি রাইট ঊষার দিকে এক ঝলক দেখে আবারও মাথা নামালেন। জবাব দিলেন, ‘আমি তাকে না চেনার ভান করেছিলাম, যেন কোনো ঝামেলা না হয়। আমার পরিচয় পেয়েও তিনি অবাক হননি, সোশ্যাল মিডিয়ায় না কি আমাকে দেখেছেন। এই বলে..পুরোনো কথা তুলে আমাকে সকলের সামনে ছোট করার চেষ্টা করেন। আমি এড়িয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্যে সেদিন বেরিয়ে যাই।’
এরমধ্যেই চাকর এসে কফি দিয়ে গিয়েছে। জেমস বলে এসেছিল।
‘এরপর আর দেখা হয়নি?’ মিসেস রাইট কফির কাপ হাতে দেওয়ার পর জিজ্ঞেস করল অয়ন।
‘সেদিনের পর কিছুদিন যাইনি। আবারও আমার সে বন্ধু যাওয়ার জন্য পীড়াপীড়ি করল। আমার স্ত্রী বলল যে, তার ভয়ে আমার গুঁটিয়ে থাকার তো কোনো মানে হয় না। চিন্তা-ভাবনা করে..আমি সেখানে আবারও যাই। নিয়মিত যাতায়াত শুরু করে দেই। তাকে এড়িয়ে যেতাম। তিনি খোঁচা দেওয়ার চেষ্টা করতে এলেও ব্যাপার সামাল দিয়ে দিতাম। একদিন..ক্লাবের বাথরুমে আমার সাথে সরাসরি কথা বলেন তিনি। আমি সরাসরি বলি যে, তার সাথে আমার কোনো সমস্যা নেই, আমাকে যেন বিরক্ত না করেন। ..উনি হেসে আমাকে বলে যান যে, ব্যবসায় তাকে কেউ ডিঙোতে পারবে না।’
সহেলি ঊষা আর অয়নের সাথে দৃষ্টি বিনিময় করল। যেদিন বারবেরির অ্যাকসিডেন্ট হয়, সেদিন আপনার সাথে দেখা হয়?’
‘না। আমি আমার বন্ধু ও ব্যবসার অংশীদার মাইকেলের বাড়িতে গিয়েছিলাম। সেখান থেকে বের হয়ে ফিরতে ফিরতে প্রায় একটা বেজে গিয়েছিল। তবে..’ তিনি জেমসের দিকে তাকালেন। সে মাধা নিচু করে রেখেছে।
‘জেমস ম্যাকডালেন জঙ্গলে প্রায়ই ঘোরাঘুরি করতে যায়। সেদিনও এক বন্ধুর সাথে দেখা করতে যায়। দুটোর পরে ফেরে।’
‘আমার বন্ধু বাড়িতে ছিল না। আমি জানতাম সেটা। রাতের বেলা বের হলে মা বকবে তাই, মিথ্যে বলে বেরিয়ে ছিলাম।’ মাথা নামিয়ে জেমস বলল।
‘হুম…আচ্ছা..আজ তাহলে আসি?’ বলে উঠে দাঁড়াল সহেলি। অয়ন উঠে দাঁড়াল। ঊষা উঠে দাঁড়াতে গিয়ে তার মোবাইলটা কোলের ওপর থেকে পড়ে গেল। সে নিচু হয়ে সেটা তুলে নিয়ে রেকর্ডিং অফ করে দিল।
‘হুম।’ গম্ভীরভাবে বললেন মি রাইট। হঠাৎ কিছু একটা মনে হতেই বললেন,‘আচ্ছা..আমার কার্ডটা রাখতে পারেন।’
‘জ্বী। দিন।’ বলল সহেলি।
মি রাইট পকেটে হাত দিয়ে মানিব্যাগ না পেয়ে আশেপাশে তাকালেন। জেমস সোফা থেকে মানিব্যাগটা নিয়ে তার থেকে কার্ড বের করে দিল।
‘ধন্যবাদ সময় দেওয়ার জন্য।’ হালকা হেসে বলল সহেলি, ‘আসি।’

‘তিনজনের কারো লেখাই তো হুমকি চিঠির সাথে মিলছে না সহেলি!’ উদ্বিগ্নভাবে বলল অয়ন।
‘হ্যাঁ! তাই তো!’ ঊষার মুখেও হতাশার ছাপ।
‘তার মানে ওরা কেউ লেখেনি?’ বলল অয়ন।
ঊষা বলল,‘তাহলে কে লিখল?’
সহেলি ডান পাশের সিটে বসেছে। ঊষা মাঝে, আর অয়ন বামে। সামনে ড্রাইভারের পাশের সিটে মি ব্রাউন। গাড়ি নিয়ে বাইরে অপেক্ষা করছিলেন তিনি। তাদের নিজের গাড়িতে করেই এনেছেন।
‘তাহলে তোমাদের কষ্ট বৃথা গেল?’ জিজ্ঞেস করলেন মি ব্রাউন।
সহেলি জানলার দিকে তাকিয়ে ছিল। বলল, ‘তাদের কেউই এটা লেখেনি, সেটাই মনে হচ্ছে।’
‘হতে পারে না যে অন্য কাউকে দিয়ে লিখিয়েছে?’ বলল ঊষা।
‘হতে পারে। আবার নাও হতে পারে।’ সহেলি বলল। তার কন্ঠে হতাশা বা উৎকন্ঠা, কোনোটারই আভাস পাওয়া যাচ্ছে না।
এমন সময়ে ঊষার ফোনে একটা ম্যাসেজ এল। সে ম্যাসেজ দেখতে দেখতেই মুখ কুঁচকে মৃদু কন্ঠে বাংলায় বলল, ‘উফ! একে নিয়ে আর পারি না! জানে যে আমি সাইন্সে ভালো না! শুধু শুধু আমাকে অপদস্ত করার বুদ্ধি!’
‘কী হয়েছে?’ জিজ্ঞেস করল সহেলি।
‘আমার বোন ম্যাসেজ দিয়েছে।’ বিরক্ত চেহারায় বলল ঊষা,‘সাইন্সের একটা টপিক বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য। ঠিক করে কিছুতেই বুঝতে পারছে না।’
কী টপিক?’ জিজ্ঞেস করল অয়ন।
‘স্ট্যাটিক ইনারশিয়া আর ডাইনামিক ইনারশিয়া। কী দাঁত ভাঙা নাম!’
‘স্ট্যাটিক ইনারশিয়া…ফিজিক্সের টপিক।’
‘ফিজিক্স বলে মুখ গোমড়া হয়ে গেল বুঝি মিস্টার কেমিস্ট?’ অয়নকে খোঁচা দিয়ে বলল ঊষা।
না..তা কেন হবে? জানি এটা। নিউটনের ১ম সূত্রের সাথে কানেক্টেড ।’
‘স্থিতি জড়তা আর গতি জড়তা।’ বলল সহেলি, ‘বস্তুর স্থির থাকার প্রবণতা হলো স্থিতি জড়তা বা Static Inertia আর গতিশীল থাকার প্রবণতাকে বলে গতি জড়তা বা Dynamic Inertia।’
‘আচ্ছা..তবে..ও বলছে একটু বিস্তারিত বলতে।’ বলল ঊষা।
‘সহজ উদাহরণ হল..গাড়ি ব্রেক। গাড়ি যখন হঠাৎ করে ব্রেক কষে, আমরা সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ি। এর কারণ আমরা অতক্ষণ স্থির হয়ে বসেছিলাম। হঠাৎ ব্রেক হওয়াতে গাড়িটা গতিশীল থেকে স্থির হয়ে গেল। আর আমরা ব্রেক হওয়ার আগের স্পিডটার কারণে সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ি। গাড়িটা গতিশীল থাকা অবস্থায় হঠাৎ ব্রেক করলে তা কিছুটা এগিয়ে গিয়ে থামে, সেটা গতিশীল থাকতে চায়। আমাদের শরীরে নিচের অংশ স্থিরই থাকে, কিন্তু ওপরের অংশ গতিশীল থাকে কারণ গাড়ি চলার সময়ে আমাদের বেশ ঝাঁকুনি লাগে। এটাই গতিশীল থাকার প্রবণতা বা গতি জড়তা। আবার, ধরো একটা কয়েন একটা কার্ডবোর্ডের ওপর রেখে একটা গ্লাসের ওপর কার্ডবোর্ডটা রাখা হলো। কার্ডবোর্ডটা যদি আমরা হ্যাঁচকা টানে সরিয়ে নিই, কয়েনটা কার্ডবোর্ডের সাথে আসে না, বরং গ্লাসে পড়ে যায়। কারণ, কয়েনটা স্থির হয়ে ছিল। হঠাৎ কার্ডবোর্ডটা গতিশীল হয়ে সরে গেলে সেটা স্থির থাকার চেষ্টা করতে গিয়ে পড়ে যায় গ্লাসে।’
‘এর কারণ স্থিতি জড়তা। এটা মূলত নিউটনের ১ম সূত্রের বেসিক টপিক। বল প্রয়োগ না করলে বস্তু স্থির থাকে বা স্থির হয়ে যায়, আর প্রয়োগ করলে গতিপ্রাপ্ত হয়, গতিশীল হয়। এই যে গাড়ি চলার সময়ে মানুষের ঝাঁকুনি লাগে, তা হয় বাতাসের বলের কারণে। একইভাবে যখন বল প্রয়োগ হঠাৎ থেমে যায়, গতিশীল বস্তুটিও হঠাৎ থেমে যায়। ব্যাপারটা অনেকটা ভড়কে যাওয়া আরকি। বল প্রয়োগ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় মানুষ ভড়কে যায়। ফলে অনেক সময়ে ব্যথাও পেয়ে যায়, সিট থেকে পড়ে যায়। আবার হঠাৎ কার্ডবোর্ডটা সরে যাওয়ায় কয়েনটা ভড়কে যায়, কিছু বুঝে ওঠার আগেই গ্র্যাভিটির টানে গ্লাসে পড়ে যায়।’ সে সিটে হেলান দিয়ে বলল,‘দ্যাট্স কল্ড স্ট্যাটিক ইনারশিয়া আর ডাইনেমিক ইনারশিয়া। স্থিতি জড়তা ও গতি জড়তা।’ একাধারে কথা বলা শেষ করে চুপ হয়ে গেল সহেলি।
‘থ্যাঙ্ক ইউ সহেলি। অনেক সহজ করে বলেছ। এত সহজ করে যদি স্কুলের সাইন্স টিচাররা পড়াতেন…’ বলতে বলতে বোনকে ম্যাসেজ দিতে লাগল ঊষা। সাথে অয়নের দিকে ব্যাঙ্গাত্মক দৃষ্টিও নিক্ষেপ করল। অয়ন কিছুটা আমতা আমতা করে বলল,‘ফিজিক্স নিয়ে..অনেকদিন পড়াশুনা হয়নি। আমি ক্যামিস্ট্রি নিয়ে গবেষণা করছি! তাই..মাথায় আসেনি! তাতে এভাবে তাকানোর কোনো কারণ নেই!’
‘হুম..’ বলল ঊষা, ‘একেই বলে অতি চালাকের গলায় দড়ি!’
ঊষা আর অয়নের কথা কাটাকাটি চলতে লাগল। সহেলি গম্ভীর হয়ে গিয়েছিল। তার কিছু একটা মনে হল। সে বলল, ‘রেকর্ডিংটা আমার ফোনে পাঠিয়ে দেয় ঊষা। একটু লাগবে। আর…মি ব্রাউন। আপনি একটু ওই কল রেকর্ডিংটা আমার ফোনে পাঠিয়ে দিন প্লিজ।’
‘আচ্ছা।’ পরপর উত্তর দিল ঊষা আর মি ব্রাউন।
দুটো রেকর্ডিংটা পেতেই কানে ফোন লাগিয়ে শুনল সহেলি। ভাবনায় ডুবে গেল। হাজারটা চিন্তা তাকে ঘিরে ধরল।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ভাষা
Scroll to Top