Home » আধুনিক অসমিয়া এবং বাংলা কবিতাঃ একটি পরিচিতি // বাসুদেব দাস

আধুনিক অসমিয়া এবং বাংলা কবিতাঃ একটি পরিচিতি // বাসুদেব দাস

অসমিয়া তথা অন্যান্য ভারতীয় ভাষার কবিতায় আধুনিক যুগের চিন্তা, ধ্যান-ধারনার সমাবেশ ঘটেছিল পশ্চিমের সাহিত্যের সংস্পর্শে। ইউরোপীয় সাহিত্যের ইতিহাসে বিভিন্ন ঘটনাবলী আধুনিকতার পটভূমি রচনা করেছে। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ ন্যায়, নীতি, বিশ্বাস, মানবীয় তথা পারিবারিক সম্পর্কে রাষ্ট্রীয় এবং সামাজিক ব্যবস্থায় প্রবল আলোড়নের সৃষ্টি করেছে। মার্ক্সীয় দর্শন এবং ফ্রয়েডীয় বিজ্ঞান চেতনা ইউরোপের সামাজিক তথা মানসিক জগতে এক নতুন পরিমগুলের সৃষ্টি করে। কুড়ি শতকের অসমিয়া কবিতাতেও ইউরোপ,আমেরিকা তথা পৃথিবীর অন্যান্য দেশের আধুনিক ভাবধারা এবং আঙ্গিকের ছাপ পড়ে। এই ভাবধারার প্রভাব কখনও ইংরেজি সাহিত্য থেকে সরাসরি আবার কখনও বা প্রতিবেশী বাংলা ভাষার মাধ্যমে প্রবাহিত হয় আধুনিক অসমিয়া কবিতার দ্বার মুক্ত হয় গত শতকের চল্লিশের দশকের প্রথম ভাগে। বিষয়বস্তুর নির্বাচন,শব্দ চয়ন, বাক্য বিন্যাস, রচনা-শৈলী, মানস চিত্রের গঠন এবং ছন্দের রূপ সজ্জা সমস্ত দিকেই নতুনত্বের পসরা নিয়ে আধুনিক অসমিয়া কবিতা সমৃদ্ধ।
সমাজ ক্রমশ নগরকেন্দ্রিক হয়ে উঠছে। নাগরিক সভ্যতায় মানুষ ক্রমশ নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ছে। যন্ত্রযুগের প্রভাব মধ্যবিত্তের জীবনকে করে তুলেছে রুগ্ন এবং শ্বাসরুদ্ধকর। জীবন ক্রমশ আত্মকেন্দ্রিক এবং সংকীর্ণ হয়ে উঠছে। এই নগরকেন্দ্রিক সভ্যতার বায়ুজলে শোষিত ব্যক্তি মানুষের প্রতিফলন ঘটেছে আধুনিক অসমিয়া কবির কবিতায়:
আমার আত্মার স্বকীয়তার চারপাশে অক্টোপাশের মতো এক অসত্য শহর
(অহরহ যেখানে আদর্শের অপঘাত যেন ভাঙ্গা আয়নার বিকৃত প্রতিবিম্ব।)
এই শহরে প্রসাধনরত কাঁচা যৌবনের রূপের বেসাতি চলে
ডাস্টবিনে যেন অন্ন কুড়িয়ে খায় ভেতো কুকুর।
(জন্মের আগের প্রার্থনা – বীরেশ্বর বরুয়া)


‘নিজেই প্রবাসী তার আধাগড়া মহানগরের
যেখানে জীবনের হল না সুচনা
সেই মরা শহরের বুকে একা বসে
স্বপ্নের দ্বারা স্বপ্নের অভাব পূরণ করে।
(লখিমীঃ নবকান্ত বরুয়া)


পঞ্চাশের দশকের একজন অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং উল্লেখযোগ্য কবি নবকান্ত বরুয়া। নবকান্ত বরুয়া মাটির পৃথিবীর কবি। জীবনের প্রতি কবির মোহ বর্তমান। পৃথিবীর মানুষের দুঃখ-কষ্ট সহানুভূতির সঙ্গে উপলদ্ধি করেও তিনি পৃথিবীকে ভালোবাসেন। আধুনিক সভ্যতার প্রতি তার ঘৃণার উগ্রতা লক্ষ্যণীয়। বরুয়া কাল চেতনার কবি। যুগ পরিবর্তন তথা সময় প্রবাহের অভিজ্ঞতাই হল তাঁর কবিতার হৃদপিগু। যুগ চেতনা,সমাজ বাস্তবতা এবং বৌদ্ধিক জিজ্ঞাসার সমন্বয়ে নবকান্ত বরুয়ার কবিতা এক নতুন রূপ লাভ করেছে:
ওরা রত্বাকর
ওদের বাল্মীকি করে তোলার দায়িত্ব কেবল আমাদের ।
(একজন বন্ধুকে)


বীরেন্দ্রকুমার ভট্টাচার্ষের ‘বিষ্ণুরাভা, এতিয়া কিমান রাতি’ একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় কবিতা। কবিতাটিতে জনতার মুক্তির আকুল আকাঙ্খার সঙ্গে অন্ধকার ঘুচিয়ে আলো আনার এক আশার উৎকণ্ঠা ব্যঞ্জিত হয়েছে। কবিতাটিতে কলাগুরু বিষ্ণুপ্রসাদ রাভার আদর্শের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা প্রকাশ পেয়েছে। গণশিল্পী বিষ্ণুরাভা জনতার মুক্তির জন্য করা ঐকান্তিক প্রচেষ্টা,বৈপ্লবিক চিন্তাধারা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে কবি ভট্টাচার্য পুনরায় তার তুলিকার আবশ্যকতা অনুভব করেছেন। কবি স্থির নিশ্চিত যে কলাগুরুর তুলিকা জনতার আশা, আবেগ মূর্ত করে তুলবে, বৈপ্লবিক চেতনার দ্বারা জনতার প্রাণে নতুন উদ্দীপনা জাগিয়ে তুলবে
বিষ্ণুরাভা,আবার তুলিকা নাও
ইটের দেওয়ালে এঁকে যাও সেই ছবি,
যে ছবিতে ফুটে হাজার শিল্পীর উত্থান,
অখ্যাত জনের আশা আবেগের বোল।
(বিষ্ণুরাভা,এতিয়া কিমান রাতি)

ষাটের দশকের একজন বিশিষ্ট কবি হীরেন ভট্টাচার্য সা্ংগীতিক মাধুর্য কবির কবিতাকে একটি বিশিষ্টতা দান করেছে। অন্যান্য মানবতাবাদী কবিদের মতোই শ্রীভট্টাচার্য মানুষকে অন্তর থেকে ভালোবাসেন। স্বদেশ তার কাছে পরম আদরের এবং ভালোবাসার। অনুভূতির গভীরতা তার কবিতাকে একটা পৃথক সৌন্দর্য দান করেছে। জীবন যন্ত্রণার ভয়াবহতা উপলদ্ধি করে কবি শোকাকুল। কবির কাছে এই জীবন যন্ত্রণা অসহনীয়–

আসলে
আমি মরে গেছি
তিলে তিলে
বড় কষ্টকর এই নিঃশ্বাস । (ব্যর্থশর)
জীবন যন্ত্রণার ছবি এঁকেই কবি ক্ষান্ত থাকেন না,যন্ত্রণার অবসান ঘটিয়ে নতুন দিনের নতুন আদর্শের বীজ বপনে কবি দৃঢ় সঙ্কল্পবদ্ধ:
এবার ,
এডোঙা রক্তের নিচে
ফুল নয়,পুঁতে রাখলাম মূল।
হৃদয়ের গভীর গোপনে
বাড়ে ক্ষণে ক্ষণে
কবি সঙ্কীর্ণ জীবনের পরিধি ভেঙ্গে বিশাল মহাজীবনের গান গাইবার জন্য চেষ্টা চালিয়ে যান, যে গানে নতুন জীবন গড়ার জন্য বিপ্লবের শব্দ রয়েছে,যে গান জীবনের সমস্ত কলুষতা নাশ করে ধ্বংসের মধ্য দিয়ে সৃষ্টির অযুত সম্ভাবনা বহন করে আনে।
রাম গগৈ মাটি এবং মানুষের কবি। শোষিত, লাঞ্ছিত মানুষের শোষণের বিরুদ্ধে তার কবিতা এক বলিষ্ঠ প্রতিবাদ ।একদিকে অন্যায়,অসত্যের স্বরূপ প্রকাশ এবং অন্যদিকে নতুন মহাজীবন গড়ার আদর্শ রাম গগৈর কবিতায় একটি ভিন্ন মাত্রা দান করেছে। কবি মনে করেন,ত্যাগ এবং পবিত্রতার আদর্শে যীশু,বুদ্ধ/হজরত মহম্মদ ইত্যাদি মহাপুরুষ মানবীয় শান্তির জন্য নেওয়া মহান প্রচেষ্টা কখনও বিফল হতে পারে না। যদি পৃথিবীতে প্রেম, ন্যায় এবং ত্যাগের আদর্শ মিথ্যা বলে প্রমাণিত হয় তাহলে পৃথিবীতে শান্তির আশা করা বৃথা:
হিংসামত্ত পৃথিবীতে ব্যর্থ যদি যীশু বুদ্ধ হজরত
আত্মত্যাগ মহাপুরুষের
মিথ্যা যদি সত্য,প্রেম,ন্যায় আর ত্যাগের আহ্ববান
কেবল ক্ষমতা যদি সত্য হয়
শান্তি কোথায় কোথায় পাব,দুদণ্ড নির্ভয় চিত্ত,একটু আরাম।
(তেজীমলা তোমার কারণে)


আধুনিক অসমিয়া কবিতার ইতিহাসে নীলমণি ফুকন এক উল্লেখযোগ্য নাম। বিরামহীন কাব্যচর্চা,গভীর ঐকান্তিক সাধনা,পরীক্ষা নিরীক্ষা এবং আত্মবিশ্লেষণ সুলভ মনোভাব কবির কবিতাকে স্বকীয়তা দান করেছে। ফুকনের কবিতায় প্রতীকবাদ এবং চিত্রকল্পধর্মিতা বিশেষভাবে লক্ষ্য করা যায়। ফুকন নির্জনতার কবি। নির্জনতা প্রিয় হলেও বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে উদ্ভূত সামাজিক চেতনার ইঙ্গিত তার কবিতায় রয়েছে। ফুকনের কবিতায় চিত্রকল্পের অভিনব প্রয়োগ লক্ষ্য করা যায়। আধুনিক কবিতার আঙ্গিকের সঙ্গে লোক সংস্কৃতির উপাদান মিশ্রিত করে কবি জীবনের গভীরতায় প্রবেশ করার প্রয়াস করেছেন। ‘সোণালী কণীর কৃহুম’, ‘গোলাপী জামুর লগ্ন’ ইত্যাদি কবিতায় এই ধরনের সাঙ্গীতিক মাধূর্ষের প্রয়োগ পাঠকের মনকে সহজেই আন্দোলিত করে তোলে । কিছু ব্যক্তিগত প্রতীকের ব্যবহার কবির কবিতাকে কখনও কখনও জটিলতা দান করেছে।
ষাটের দশকের একজন প্রতিভাবান কবি হরেকৃষ্ণ ডেকা। গভীর জীবনবোধ এবং আঙ্গিকের নিজস্ব রীতি কবিকে স্বাতন্ত্র্য দান করেছে। ভাষার অকৃত্রিম প্রকাশ এবং ভাবের কলাগত রূপায়ণ কবিতাগুলোকে সজীবতা দান করেছে। কবির একটি অন্যতম কবিতা ‘সমুদ্রভীতি’। কবি মনে করেন :জীবন অন্ধকারে হারিয়ে গেলেও অনন্ত সময় এবং মহাজীবনের বিশালতার প্রতীক সমুদ্র চিরদিন নীরব নির্বিকার হয়ে থাকবে:
তথাপি শঙ্খের ধ্বনি, নিনাদিত হোক বাতাসে
যদিও জেনেছি আমি
নেমে আসবে অন্ধকার ছায়া অকস্মাৎ , ক্রমে ক্রমে লুপ্ত হবে
সঙ্গীতের প্রতিটি লহর
দেখেছি সমুদ্র নিজে নির্বিকার,চিরদিন গর্ভবতী।
(সমুদ্রভীতি)
হরেকৃষ্ণ ডেকার পরিচয় শুধু কবি হিসেবেই নয়,একজন সফল গল্পকার এবং সমালোচক হিসেবেও তিনি সমধিক পরিচিত। শ্রীডেকার কাব্যসঙ্কলন গুলো যথাক্রমে ‘স্বরবোর’(১৯৭৩),‘রাতির শোভাযাত্রা’ (১৯৮১),‘আন এজন’(১৯৮৬), এবং ‘ভালপেোৱার বাবে এষার’ (২০০৩)।
রবীন্দ্র সরকারের কবিতায় বাস্তববোধ সকল স্তরের নরনারীর প্রতি বস্তুনিষ্ঠ রাজনৈতিক সচেতনতার পরিচয় পাওয়া যায়। সমাজের স্বার্থকে অবজ্ঞা করে যারা শোষণ করে চলেছেন তাদের প্রতি কবির ক্রোধ অপরিসীম । প্রতীক এবং কল্পচিত্রের মাধ্যমে কবি বাস্তব জীবনের চিত্র অঙ্কন করেছেন। এই প্রসঙ্গে বলা যেতে পারে যে রবীন্দ্র সরকারের মাতৃভাষা বাংলা ।তবে তিনি আজীবন অসমিয়াতেই কাব্য চর্চা করে চলেছেন। অসমিয়া সাহিত্যে তার এই অসমান্য অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ সম্প্রতি সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কারে তাকে সম্মানিত করা হয়েছে।
আশির দশক থেকে অসমিয়া কবিতা বিশেষ সমৃদ্ধি লাভ করে। সাম্প্রতিক অসমিয়া কবিদের মধ্যে সমীর তাঁতী স্বকীয় শৈলী এবং প্রকাশ ভঙ্গির মাধ্যমে কবিতা রচনা করে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন। কবির প্রতিভার স্বীকৃতি স্বরূপ আসাম ভ্যালি পুরস্কারে কবিকে সম্মানিত করা হয়। তাঁর কাব্যগ্রন্থের মধ্যে ‘যুদ্ধভুমির কবিতা’, ‘কাফ্রি কবিতা’ (নিগ্রো লোক কবিতার অনুবাদ), ‘ শোকাকুল উপত্যকা’,কদম ফুলা রাতি’, ‘বিষাদ সঙ্গীত’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তাঁতী সমাজ সচেতন কবি। প্রচলিত সমাজ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে কবি লেখনী ধারণ করেছেন। মানবতাবাদী কবি তাঁতী যুদ্ধভূমির যাবতীয় বীভৎসতা, নিষ্ঠুরতা ও গ্লানির বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন। সমাজতান্ত্রিক আদর্শে বিশ্বাসী কবি সামাজিক দায়বদ্ধতার নিদর্শন হিসেবে কবিতাকেই হাতিয়ার করে নিয়েছেন।
আধুনিক কবিতার অন্যতম লক্ষণ নিঃসঙ্গ চেতনা তার কবিতায় লক্ষ্য করা যায়।

‘হে মোর নিঃসঙ্গতা, হে মোর হাহাকার
‘পৃথিবীর কাছে একবার ক্ষমা চেয়ে যাও।’ ( কোনোবাই কর’বাত)


সনস্ত তাঁতি (১৯৫২) অসমে একজন অত্যন্ত জনপ্রিয় কবি। তার কবিতা সমাজমনস্ক, বিশেষত বামপন্থী মানুষের মধ্যে তুমুল আলোড়ন তুলেছিল। সামাজিক অসাম্য,অন্যায় উৎপীড়ন,শোষণ বঞ্চনা তার কবিতার বিষয় হিসেবে বারবার ফিরে এসেছে। তাঁতির কাব্যপ্রস্থগুলির মধ্যে ‘উজ্জ্বল নক্ষত্রর সন্ধানত'(১৯৮০), ‘নিজর বিরুদ্ধে শেষ প্রস্তাব’ (১৯৯০), ‘মৃত্যুর আগর স্টপেজত’ (১৯৯৬), ‘শব্দত অথবা শব্দহীনতাত’ (১৯৯৩), ‘জীর্ণ বসন্তর সৌরভ’ (২০০২), ‘আপুনি আপোনার সৈতে যুদ্ধ করিব পারিব নে’ (২০০৫) বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য । গভীর জীবনবোধ,নিবিড় প্রেমের উপলদ্ধি এবং অনাবিল-অকৃত্রিম ভালোবাসা সনন্তের কবিতাকে এক বিশেষ মাত্রা দান করেছে:
‘ আমি প্রার্থনা করি শোকে শ্রিয়মান লোকদের জন্য
আমি প্রার্থনা করি নির্বোধ এবং হিংস্র মানুষের হাতে নিহত শিশুদের জন্য
আমি প্রার্থনা করি অক্ষত পৃথিবীর জন্য:


অনুপমা বসুমতারী (১৯৬০) প্রায় দুই দশকেরও অধিককাল ধরে নিরলসভাবে কাব্য চর্চা করে চলেছেন। তাঁর প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থগুলো হল ‘রূপালী রাতির ঘাট’, ‘দুখ আরু প্রেমর মোহনাত’, ‘শীতল রাতির অনুরাগ’,জারাকান্দা সরা রাতি’ ইত্যাদি।তার কবিতায় জীবনের বর্ণময় রূপ, জীবন জিজ্ঞাসা এবং প্রকৃতির বৈচিত্রময় রূপ সার্থকভাবে প্রয়োগ করেছেন। নারী হয়েও আরোপিত নারীবাদ তার কবিতায় আমরা দেখতে পাই না। স্মৃতি, পিছুটান, আত্ম আবিষ্কারের আকাঙ্খা তার কবিতার অনেকটা অংশ জুড়ে রয়েছে:
তুমি যদি যেতে চাও আমার শৈশব এবং কৈশোরের
বিশাল বুকে থাকা আমার গ্রামে
মাঠের কোণে থাকা অশ্বথ গাছ এবং
সৌন্দর্য এবং পূর্ণতার সম্ভাবনা নিয়ে অপেক্ষা করে থাকা ……
নীলিম কুমার (১৯৫৬) আজকের প্রজন্মের একজন অত্যন্ত শক্তিশালী কবি। প্রায় তিন দশক জুড়ে বিভিন্ন পরীক্ষা নিরীক্ষার দ্বারা অসমিয়া কবিতাকে সমৃদ্ধ করে তুলে চলেছেন। ‘মই তোমালোকর কবি’, ‘স্বপ্নর রেলগাড়ি’, ‘টোপনির বাগিচা’, ’কাইলৈর পরা তোমাক ভালপাম’, ‘আমার আকাশত চারিজনী জোন’, ‘নরকাসুর’, ‘আত্মগাথা’, ‘ধুনীয়া তিরোতাবোর আরু অন্যান্য কবিতা’ কবির উল্লেখযোগ্য কাব্যসঙ্কলন। আধুনিক জীবনের শূন্যতাবোধ ,গভীর অন্তর্দৃষ্টি এবং লোকজীবনের সুর তার কবিতাকে বিশেষভাবে সমৃদ্ধ করেছে। যৌনতার ব্যবহারে কবি অকপট । লোরকা এবং নীলমণি ফুকনের কবিতার দ্বারা নীলিমকুমার বিশেষভাবে প্রভাবিত। ‘উদয় ভারতী’ পুরস্কারে সম্মানিত এই কবির কবিতা ভারতীয় বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়ে প্রশংসা লাভে সমর্থ হয়েছে। সমকালীন পরিস্থিতির কোনো ঘাত প্রতিঘাত তার কবিতায় খুব একটা লক্ষ্য করা যায় না। তিনি যেন অনেকটা সমাজের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে কবিতা রচনা করেছেন।


গঙ্গামোহন মিলির উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ হল ‘নৈর ঘাটর সুহুরি’(১৯৯০), দিচাংমুখর এবাটি-আপং(১৯৯৮), ‘নদী মানুহর ঠিকনা’(২০০২), ‘ঐনিতমর পৃথিবী’(২০০৩), ‘মাতমরার বিষাদগাথা আরু অন্যান্য কবিতা’ (২০১০)। নদী কবির কবিতার প্রিয় বিষয় । নদী এবং নদী তীরবর্তী জীবনের বর্ণময় রূপ কবির কবিতায় আন্তরিকতার সঙ্গে উপস্থাপিত হয়েছে। মিলির কবিতায় গ্রাম্য জীবনের সরলতা এবং আন্তরিকতা,প্রকৃতির স্নিগ্ধ রূপ,লাবণ্য,নাগরিক জীবনের কদর্যতা এবং অন্তঃসারশূন্যতা ফুটে উঠেছে।
‘দাদুর কাঁধে উঠে গ্রাম ঘুরে বেড়াতাম
সগৌরবে বলে বেড়াত
এটা আমর নাতি তোরা দেখবি
সে বড় মানুষ হবে।
আপনার শৈশবে ছিল কি এমন একজন দাদু
একজন নাতি হওয়ার সৌভাগ্য হয়েছিল কি আপনার ?
দাদু এবং নাতি
কেবল এক স্মৃতি মাত্র !!


অনুপম কুমার সাম্প্রতিক কালের একজন উল্লেখযোগ্য কবি। তার প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থগুলো যথাক্রমে ‘মই অমূল্য বরুয়া ’, ‘প্রিয়ঙ্কা এনেকৈয়ে আছে’, ‘নেইলকাটার আরু অন্যান্য কবিতা’, ‘মাটি কঠালর গোন্ধ’ ইত্যাদি। কবি এবং অনুবাদক অনুপম কুমার অসমিয়া থেকে হিন্দিতে বেশ কিছু গ্রন্থ অনুবাদ করেছেন। ‘সংঘাতর পিছর এখন ছবি’ নামে কবিতাটি কোকরাঝারের আশ্রয় শিবিরের শরণার্থীদের নামে উৎসর্গ করা হয়েছে । কবিতাটিতে আশ্রয় শিবিরের একজন মাতার অন্তর্বেদনা প্রকাশ পেয়েছে।শরণার্থী শিবিরের একজন মাতার করুণ হাহাকারই বর্তমান সময়ের বাস্তব,কবি সেই বাস্তব চিত্র শিল্পসম্মতভাবে আঁকার চেষ্টা করেছেন।
জীবন নরহ (১৯৭০) সাম্প্রতিক কালের একজন প্রতিষ্ঠিত কবি। তার প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ হল ‘অ মোর ধুনীয়া কপৌফুল’, ‘তুমি পকা ধানর দরে গোন্ধাইছা’, ‘সোণা মোর ফুঁলকুলি’,‘মোমাইদেউর ফুলনি’,‘হালধীয়া উপমা’ ইত্যাদি। তাঁর ‘অতিথি’ কবিতাটিতে মিসিং সমাজের প্রাণ-স্পন্দনের পরিচয় পাওয়া যায়। সজীব এবং ধ্বনিময় চিত্রকল্প,ভাষার স্বাচ্ছন্দ্য এবং ব্যঞ্জনা কবিতাটিকে এক ভিন্ন মাত্রা দান করেছে। লোকজীবনের নানা উপাদান কবির কাব্যে বারবার ফিরে এসেছে। বেশ কিছু ভারতীয় ভাষায় জীবন নরহের কবিতা অনুদিত হয়েছে।


বিপুলজ্যোতি শইকীয়ার (১৯৬৫) কবিতার ভাষায় প্রজ্ঞার পরিচয় পাওয়া যায়। কবির প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘মহাকাব্যর প্রথম পাত’ আশির দশকে পাঠকদের মধ্যে রীতিমতো আলোড়নের সৃষ্টি করেছিল। অগ্রজ প্রয়াত কবি নবকান্ত বরুয়ার কাব্য পাঠ থেকে মহাকাব্যিক বোধ লাভ করেছেন। চিন্তার স্বাতন্ত্র্য,মেধার পরিচয় এবং কবিতার ভাষা কবিকে আলাদাভাবে আমরা সহজেই চিনে নিতে পারি। কবির ভাষা খজু কিন্তু ব্যঞ্জনাধর্মী। কবি বিশ্বাস করেন যে মানুষের জীবনে যে সঙ্কট আসে তা ক্ষণকালীন এবং মানুষের শুভবুদ্ধিই তাকে সমস্ত সঙ্কটের উর্দ্ধে নিয়ে যেতে পারে:
যে পথে সৈনিক যায় যুদ্ধের মাঠে
সেই পথে আমরা আনতে পারি বর্ষার নদীর মুখ
যে পথে এখন বিধ্বস্ত নগরীর উদ্বান্ত যায় আশ্রয়ের সন্ধানে
সেই পথে আমরা বিদ্যালয়ে পাঠাতে পারি ছোট ছোট শিশুদের

অসমিয়া সাহিত্যে এই সময়ের একজন অত্যন্ত শক্তিশালী এবং জনপ্রিয় কবি হলেন অনুভব তুলসী । কবির কাব্যসঙ্কলনগুলো যথাক্রমে ‘নাজমা’, ‘দোরোণ ফুল’, ‘জলমগ্ন দৃশ্যাবলী’, ‘জয় জয়তীর জয়’ ইত্যাদি। অনাড়ম্বর শব্দের সাবলীল প্রকাশ তার কাব্যশৈলীকে একটি ভিন্ন মাত্রা দান করেছে। তবে তার কবিতায় মেধা ও মননের বিরল প্রকাশ অনেক সময় সাধারণ পাঠকের রসপ্রহণের ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দীড়ায়। ভাষার মিতব্যয়িতা এবং প্রকৃতির নিবিড় পাঠ কবির কবিতার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। শব্দ সচেতনতা এবং লিরিকধর্মিতা অনুভবের কবিতায় একটা অন্য মাত্রা এনে দিয়েছে। তার কবিতা অসংখ্য সূচকের সমষ্টি।অর্থ নিরূপণের প্রক্রিয়া তা নিয়ন্ত্রণ করে। ‘বরষুণের খেতিয়ক’ সঙ্কলনের ‘সেউজী সেউজী’ সেবুজ সবুজ) কবিতার কয়েকটি পংক্তি এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যেতে পারে:

পাতা এবং প্রেমিকের
মাঝের সেই সাঁকো
কেউ দেখেছে কি
সবুজ সেই লতিকা


কবির কবিতা সবসময়েই দ্বৈত সংকেতে ভরপুর। পাতা এবং প্রেমিক বলতেই কবি সামাজিকভাবে নির্ধারিত এবং গৃহীত প্রেমের ডিসকোর্সগুলোকে কবিতায় নিয়ে এসেছেন। তাই আমরা দেখতে পাই যে তিন দশক জুড়ে অসমিয়া কবিতার পাঠককে মোহাবিষ্ট করে রাখা অনুভব তুলসীর কবিতার ভাষা ইউনিফাইড অর্থাৎ একীভূত ভাষা।
কবি সৌরভ শইকীয়ার শব্দচয়ন অনেকটাই অগতানুগতিক। বুদ্ধিদীপ্ত মন এবং আবেগিক হৃদয়ের সম্মিলন তার কবিতায় অনুভব করা যায়। ‘শিমুল সাগর’, ‘সরাপাতর ভায়োলিন’,‘সৌরভর সোণারু ভ্রমণ’ তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যসঙ্কলন। কবির কবিতার ভাষা সাবলীল এবং ব্যঞ্জনাধর্মী। রোমান্টিক ভাবাকুলতা এবং লোক কবিতার অনুষঙ্গ তার কবিতাকে একটা বিশেষ মাধুর্য দান করেছে। —
কবিতা লেখার চেষ্টা না করাই ভালো ।
তিনি বলেছেন —
কবি হওয়ার বাসনা না থাকা
ভালো। অক্ষরের নামে একটি অক্ষর সাজানোর জন্য
কাগজের নামে একটা কাগজ ছেঁড়ার
মূল্যবান সময় নষ্ট না করা ভালো
জ্বলন্ত গোধুলির মোমটা নিভিয়ে দেবার
কষ্ট না করাই ভালো….?

অতনু ভট্টাচার্য অসমিয়া কবিতার জগতে স্বকীয় বৈশিষ্ট্যের দ্বারা নিজের একটি স্থান করে নিয়েছেন। এই তরুণ কবির প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থগুলি যথাক্রমে ‘সহযোদ্ধা’, ‘অশ্লীল রাতির কবিতা’, ‘জীবনর ভগ্মাংশ’ এবং ‘প্রাপ্তি অগ্রাপ্তি’। অতনু একই সঙ্গে একজন প্রতিষ্ঠিত গল্পকার। শব্দ চয়নের সঙ্গে সঙ্গে প্রকাশ রীতিতেও কবি হীরেন ভট্টাচার্যের প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। অতনুর কবিতায় বুদ্ধিদীপ্ত প্রকাশ ভঙ্গি আমাদের চমৎকৃত করে:

‘আপনার ভালো লাগুক বা না লাগুক
সেই মানুষটি এখন আপনি
অপানার সামনে ওই যে টেবিল
ওই চশমাজোড়া/
এ যে কাগজ/ কী করবেন /আপনি ভাবুন তো (কবিতা)

আশির দশক থেকে নিরলসভাবে কাব্য সাধনায় ব্রতী দেবপ্রসাদ তালুকদারের কাব্যগ্রন্থগুলো হল যথাক্রমে ‘শব্দর জোনাকত’, ‘খুলি দিলো আন এখন খিরিকী’, ‘ কারো তো নহার কথা নাই এই বাটে’, ‘নমরিব লগা পাতখিলা’ ইত্যাদি। সম্পাদিত কাব্যগ্রন্থ ‘উশাহত বেলিফুল’।

সাম্প্রতিক কালের কবি কুশল দত্তের কবিতায় সামাজিক চিন্তাভাবনার সঙ্গে মনস্তত্ত্বের এক গভীর সংযোগ লক্ষ্য করা যায়। ‘ইলেকট্রনিক চরাই’ কাব্যগ্রন্থ ২০০৩ সালে মুনীন বরকটকী পুরস্কার লাভ করে। কবির প্রায় কবিতাতেই আধুনিক জীবনের মানসিক অন্তর্দ্বন্দ্ব ফুটে উঠেছে। অত্যন্ত দক্ষতা এবং আন্তরিকতার সঙ্গে কৰি গ্রামের নৈসর্গিক সৌন্দর্যের সঙ্গে আধুনিক মানুষের নিঃসঙ্গতার ছবির সমন্বয় ঘটিয়েছেন। জীবনের বিচিত্র অভিজ্ঞতা কবির কাব্যচর্চার মূল বিষয়।
বিশ শতকের শেষার্ধ থেকে একবিংশ শতকের দ্বিতীয় দশক পর্যন্ত সময়কালের মধ্যে বেশ কিছু কবি কাব্যচর্চার মাধ্যমে অসমিয়া কবিতার ভাণ্ডার সমৃদ্ধ করে চলেছেন। তাদের মধ্যে প্রেম গগৈ,সমীন্দ্র হুজুরী,নিবেদন দাস পাটোয়ারী,দেবানন্দ ভট্টাচার্য, চেনীরাম গগৈ, রাজীব ফুকন, অজিৎ গগৈ, প্রদীপ শইকীয়া, রাজীব বরুয়া, মনজিৎ সিং, রাজেন গগৈ, সুরেশ রঞ্জন গদুকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।


এবার আমরা খুব সংক্ষপে আধুনিক বাংলা কবিতার একটা পরিচয় দিতে চেষ্টা করব। আধুনিক বাংলা কবিতার পরিধি বিশাল এবং ব্যাপক। প্রবন্ধের এই ক্ষুদ্র পরিসরে তাকে ধরা অসম্ভব। তাছাড়া এই ক্ষেত্রে আমি একেবারেই যোগ্য ব্যক্তি নই কারণ এই বিষয়ে আমার পড়াশোনা খুবই সীমিত।
রবীন্দ্র পরবর্তী আধুনিক কবিতার জয়যাত্রা শুরু হয়েছিল পাঁচজন কবির হাতে। তাঁরা হলেন বুদ্ধদেব বসু, জীবনানন্দ দাস, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, বিষ্ণু দে এবং অমিয় চক্রবর্তী। মূলত এঁরাই ছিলেন যজ্ঞের পুরোহিত।
আমরা আলোচনার সুবিধার জন্য বিস্তৃত আলোচনায় না গিয়ে এঁদের পরবর্তী কয়েকজন কবিকে বেছে নিয়েছি।
১৯২৪ সনে কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর বর্তমান বাংলাদেশের ফরিদপুর জেলায় জন্ম হয়। প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘নীল নির্জন’ ১৯৫৪ সনে প্রকাশিত হয়। নীরেন্দ্রনাথ তাঁর কবিতায় আজকের পৃথিবীর অসুস্থতা, বিকৃ্তি ও জটিলতার ছবি এঁকেছেন। সময়ের এই নগ্ন বাস্তবতা এখনকার কবিতার স্বাভাবিক বিষয়। মানুষের প্রতি নীরেন্দ্রনাথের এক গভীর ভালোবাসা ও শ্রদ্ধাবোধ আছে।তাই মানুষের অপমান,মনুষ্যত্ববোধের ক্রমাবনতি তাঁকে ক্ষুব্ধ করে তোলে:
সারাটা দিন মানুষ দেখে,মানুষ দেখে,
এখন শুধুই অসম্মানের জ্বালায় জ্বলছি আমি।
কবির কবিতায় সমকাল চেতনা প্রখরভাবে উপস্থিত। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার আলোকে সে চেতনা কবিতার বিষয়ে এনেছে এক আশ্চর্য আন্ত্রিকতা। ‘কলকাতার যীশু’, ‘উলঙ্গ রাজা’ আজ কিংবদন্তিতে পরিণত হয়েছে।
আধুনিক কবিতার ইতিহাসে শঙ্খ ঘোষ এক উজ্জ্বল ব্যক্তিত্ব।প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘দিনগুলি রাতগুলি’ ১৯৯৫৬ সনে প্রকাশিত হয়। ‘বাবরের প্রার্থনা’ কাব্যগ্রন্থের জন্য ১৯৭৭ খ্রিস্টাব্দে সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কারে সম্মানিত হন। তাঁর কবিতা মুখরিত কখনও দুঃখের নিবিড় বিষাদে, কখনও আনন্দের উচ্ছ্বাসে আবার কখনও যৌবনের উত্তাপে। কবির কবিতায় ইতিহাস চেতনার ও ঐতিহ্যানুসৃ্তির মেলবন্ধন ঘটেছে। বাংলাদেশের যুদ্ধের সময়কার কাল যেম্ন তাঁর কবিতায় উঠে এসেছে, তেমনই ‘ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউণ্ড’,ঢাকা ১৯৭৫ কবিতায় বিধৃত হয়েছে সমকাল।
আধুনিক বাংলা কবিতার জগতে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় একটি জনপ্রিয় নাম। ১৯৩৪ সনে এখনকার বাংলাদেশের ফরিদপুরে জন্ম হয়। পঞ্চাশের দশকে কবিতা রচনার সূত্রপাত।প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘একা এবং কয়েকজন’ ১৯৫৮ সনে প্রকাশিত হয়। এক আশ্চঅর্য বিষাদময়তা সুনীলের কবিতাকে ঘিরে রেখেছে।এই বিষাদের জন্ম শুধু নারীকে ঘিরে নয়-শিশুকালে অসংখ্য স্বপ্ন, প্রথম যৌবনের স্বপ্ন-সব কিছু রয়েছে-রয়েছে স্বপ্নভঙ্গের নিদারুণ বেদনা,–‘কেউ কথা রাখে নি,তেত্রিশ বছর কাটলোমকেউ কথা রাখে নি’। ১৯৩৩ সনে চব্বিশ পরগণায় কবি এবং গদ্যশিল্পী শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের জন্ম।কবির প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘হে প্রেম হে নৈঃশব্দ্য’ ১৯৬০ সনে প্রকাশিত হয়। পঞ্চাশের দশকের কবি হলেও তাঁর প্রতিভার যথার্থ স্ফুরণ ঘটে ষাট এবং সত্তরের দশকে। ‘অবনী বাড়ি আছো’, ’যেতে পারি কিন্তু কেন যাবো’ কবির বহুল পঠিত এবং আলোচিত কবিতা। কবি জানেন উত্তরাধিকারীর হাতে সব সঁপে দিয়ে প্রকৃ্তির নিয়মে একদিন চলে যেতে হয়। কবিকেও যেতে হবে। কিন্তু তিনি একাকীত্ব অপছন্দ করেন।তাই যাবার বেলায় তিনি নিয়ে যেতে চান নিজের সঙ্গীদের।তবে অসময়ে নয়।
জয় গোস্বামী (১০ নভেম্বর ১৯৫৪) বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে আবির্ভূত একজন আধুনিক বাঙালি কবি। পশ্চিমবঙ্গের এই কবি বাংলা ভাষার উত্তর-জীবনানন্দ পর্বের অন্যতম জনপ্রিয় কবি হিসেবে পরিচিত। তার কবিতা চমৎকার চিত্রকল্পে, উপমা এবং উৎপ্রেক্ষায় ঋদ্ধ। তিনি দুইবার আনন্দ পুরস্কার পেয়েছেন। ‘বজ্রবিদ্যুৎ-ভর্তি খাতা’ কাব্যগ্রন্থের জন্য তিনি পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি পুরস্কার অর্জন করেছেন।
কবি সুবোধ সরকারের জন্ম ১৯৫৮ সনে।এই পর্যন্ত তাঁর প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থের সংখ্যা ত্রিশটির ও অধিক। ২০১৩ সনে তাঁর প্রতিভার স্বীকৃ্তি স্বরূপ সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কারে সম্মানিত হন।‘ঋক্ষমোষ কথা’দিয়ে কবির যাত্রা শুরু হয়। শৈশবে যার জীবন দারিদ্র, অনাহার, নকশাল আন্দোলনের উত্তাপ আর মায়াকোভস্কির গ্রন্থ দিয়ে শুরু,পরবর্তীকালে দুই বাংলার বুকে তিনিই বিখ্যাত হয়ে উঠেছেন তার ‘শাড়ি’, ‘কাল্লু’, ‘রূপমকে একটা চাকরি দিন’, ‘ময়ূরপঙ্খী’ কবিতার মাধ্যমে।সুবোধ সরকার সম্পর্কে একটি কথা না বললেই নয় ‘ভাষানগর’পত্রিকার সম্পাদনা সূত্রে ভারতীয় প্রাদেশিক ভাষার কবিতাকে যেভাবে লালন করে চলেছেন তার কোনো তুলনা হয় না। কবিতাকে বাস্তববাদী, প্রখরভাবে গণচেতনা মুখর করে তোলার চেষ্টা অনেকেই করেছেন। সুভাষ মুখোপাধ্যায়,শক্তি চট্টোপাধ্যায়, শামসুর রহমান, নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী অথবা জয় গোস্বামীর কবিতায় তারই ইঙ্গিত পাই। কিন্তু স্বাতন্ত্র্যের দিক দিয়ে সুবোধ সরকার সত্যিই অনন্য।


প্রবন্ধের এই ক্ষুদ্র পরিসরে আধুনিক অসমিয়া এবং বাংলা কবিতার সামগ্রিক পরিচয় তুলে ধরা সম্ভব নয়,আমি সে চেষ্টাও করিনি। আমি শুধু অসমিয়া এবং বাংলা কবিতার একটি পরিচিতি তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। এই প্রবন্ধ যদি পাঠকদের মনে আলোচিত কবিদের সম্পর্কে কিছুটা আগ্রহ জাগিয়ে তুলতে সক্ষম হয় তাহলে তা আমার ভবিষ্যতের প্রেরণা বলে বিবেচিত হবে।

বাসুদেব দাস

১৯৫৮ সনে অসমের নগাঁও জেলার যমুনামুখে বাসুদেব দাসের জন্ম হয়।শৈশব কেটেছে গুয়াহাটি শহরে। ১৯৮২ সনে গৌহাটি বিশ্ববিদ্যালয়  থেকে বাংলা সাহিত্য ও ভাষা তত্ত্বে এম এ করেন। আজ পর্যন্ত অসমিয়া অনূদিত গল্পের সংখ্যা তিনশো ষাটের ও বেশি।সম্প্রতি NEINAD এর পক্ষ থেকে অসমিয়া ভাষা-সংস্কৃতির প্রচার ও প্রসারের জন্য Distinguished Life Membership এর দ্বারা সম্মানিত করা হয়।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ভাষা
Scroll to Top