Home » দ্য লাস্ট মেট্রো অফ আওয়ার লাইফ // অরিত্র আহমেদ

দ্য লাস্ট মেট্রো অফ আওয়ার লাইফ // অরিত্র আহমেদ

আশা করতেছি, এই কবিতাটা লেখা শেষ হওয়ার পরেই

আমি তার মেসেজ পাব,

সারাদিন যার সাথে আমার কোনো কথাই হয় নাই,

সারাদিন যার ভাবনায় ছিলাম-

আশা করতেছি, খুব বেশি বড়ো হবে না কবিতাটা,

কারণ কবিতাটা বড়ো হওয়া মানে তার মেসেজও দেরিতে আসা-

ভাবতেছি, আজ থেকে আবার খোদায় বিশ্বাস করা শুরু করব আমি,

খুব পার্সোনাল এক খোদা, ইনোসেন্ট অফ রাইটস অ্যান্ড রিলিজিয়নস,

যে খোদারে ডাকব, যার পায়ে পড়ে কানব,

যারে বুকপকেটে নিয়ে ঘুরে বেড়াব লালবাগের অগোছালো রাস্তায়-

হঠাৎ জীবনটারে একটা মসজিদ মনে হইতেছে আমার,

এবং খোদা আছে, মনে হইতেছে, আমি তারে পাব,

এবং এহেন অনেকদিন পর খোদায় বিশ্বাস করতে কেমন যে লাগবে আমার,

তা-ই ভাবতেছি…

আজকের এই ছাঁদের হাওয়ার হিম, পায়ের তলায় ঠাণ্ডা টাইলস,

আর গায়ের খাড়া খাড়া লোমগুলি

আমার খোদা-যাপনের সাক্ষী-

আশেপাশে কেউ নেই; আর কারো সঙ্গে সারাদিন কোনো কথা হয় নাই,

আমি সব সময়ের মতো মনে মনে কথা বলছি থেকে থেকে;

সারাদিন নিজেরে ক্যান্সারে-পাওয়া কুত্তার মতো নিঃসঙ্গ মনে হইছে আমার,

যে হয়তো জানে না, তার পেটে ক্যান্সার-

সারাদিন ফিসফিস করে আত্মকরুণায় ভরা অনেক কথাই আমি বলছি নিজেরে,

অন্যদেরও বলতে চাইছি, কিন্তু কেউ সাড়া দেয় নাই,

It’s always the lonely one, or the lonelier one,

who knocks on the door. God, save me.

সারাদিন আমি ভূতের মতন দাঁড়ায়ে ছিলাম অনেক অনেক দরজায়;

সারাদিন ঘোরের মধ্যে ছিলাম, নতুন প্রেমে পড়লে

যে টক্সিক ঘোরে উত্তাল হয়ে যায় মানুষ-

নিজের ঘোর আর ভূতময়তা ভাঙার জন্য আম্মার সঙ্গে মশকরা করছি,

বাচ্চাদের সামনে গান গাইছি,

চন্দ্রবিন্দুর-

সারাদিন খোদার দুয়ারে দণ্ডায়মান অনুতপ্ত শয়তানের মতো

কান্না করছি,

বলিউডি গান শুনে বুক ভার হইছে আমার;

সারাদিন খোদার পিছনে পিছনে মায়ের ন্যাওটা বাচ্চার মতো

আবদার করে বেড়াইছি, খোদা, কিছু দাও আমারে, কাউরে তো দাও!

আজ সারাদিন আমার মনে হইছে, দস্তয়েভস্কি’র কথা অর্ধেক সত্য,

(আজ আবার দস্তয়েভস্কি’র জন্মদিন ছিল),

ভালোবাসতে না পারা যেমন নরক, ভালোবাসতে পারাও তেমনি

নরকেরই আরেকটা ভ্যারিয়েশন হইতে পারে খুব সহজেই;

আমি যদি খোদারে পাই, তো খোদার কসম, ভালোবাসা আর খুঁজব না,

ভালোবাসবো না (দোজখের অঙ্গার আগুনের সন্ধান আর কেনই বা করবে!),

সারাদিন আমার মনে হইছে, এই খোদাহীনতা বা এই ভালোবাসাহীনতা,

যেকোনো একটা যদি না থাকত,

তো আমার সুখ ঠেকাইতে পারত না কেউ, খোদার কসম,

But happiness, for me, is elsewhere.

সত্যি বলতে, এইসব পুরনো কথা আমার আর লিখতে ইচ্ছা হচ্ছে না;

মুসলমানের বাচ্চা যখন নিহিলিস্ট হয়ে যায়,

জীবনের কোনো ভড়ং যখন তারে আর টানতে পারে না,

তখন এই সমস্ত শব্দের ক্যাচাল আর অ্যাস্থেটিক নির্বুদ্ধিতা

সময় খরচ ছাড়া আদৌ কোনো কাজে আসে না আর-

এর চেয়ে বেহতর আগামসি লেনে দাঁড়ায়ে

সোব্বাসী মেয়েদের উঁচু বুকের দিকে জোর করে না তাকায়ে

ঢালু বরাবর হেঁটে যাওয়া-

আমি কি পারব না, খোদা? আমি কি পারব না

জীবনের চেয়ে সুন্দর কোনো মসজিদে যেতে?

আমি কি পারব না খোদা সত্ত্বেও পাপ আর পাপের মধ্যে খোদারেই

চর্চা করে যেতে?

আমি কি পারব না কায়েতটুলীর পড়শীর মতো

মহল্লার কে কোথায় আছে, কেমন আছে, নখদর্পণে সব খবর রাখতে?

আমি কি পারব না, খোদা, মুসলমানের বাচ্চার মতো কপালে কালো দাগ নিয়ে

একটা অভিনয়হীন জীবন কাটায়ে দিতে?

আমার পাছায় লাথি মেরে যে সমস্ত সুখ-দুঃখ সারা জীবনের জন্য লাপাত্তা হয়ে গেছে,

আমারে শক্তি দাও, খোদা, আমি যেন সেগুলোর কথা না ভাবি;

আমার আঙুলে গিট্টু লাগায়ে যে সমস্ত উদ্দীপনা ছেড়ে চলে গেছে আমারে,

আমারে শক্তি দাও, খোদা, আমি যেন সেগুলোর কথা না ভাবি;

আমি স্টেশনে যেতেই যে সমস্ত রঙিন মেট্রো গন্তব্যের দিকে চলে গেছে,

আমারে শক্তি দাও, খোদা, আমি যেন সেগুলোর কথা না ভাবি;

আর অন্তত একটা মেট্রো তুমি রাখ, যেটা কেবল আমারই,

আমার যত দেরিই হোক, যেটায় আমি উঠতে পারব, খোদা,

আমি তোমার কাছেও ফিরে এসেছি অনেক দেরিতে-

আমার ফ্লোরেই মসজিদ, অথচ মসজিদহীনতায় আমার চেয়ে বেশি

কেউ ভোগে নাই-

আজ সারাদিন আমি অপেক্ষায় ছিলাম-

এখনো আছি-

কিন্তু এখনো সেই মেসেজ আমি পাই নাই-

এই কবিতাও দেখা যাচ্ছে শেষই হচ্ছে না-

আমি আসলে নিজেরই তৈরি করা একটা স্বর্গে বাস করার স্বপ্ন দেখতেছি,

নিজের একটা ঘরের মতো নিজেরই একটা খোদার স্বপ্নে বিভোর-

নিজেরই তৈরি করা নরকে আমি জ্বলতেছি,

ভালোবাসার নরক, ভালোবাসাহীনতার নরক-

আমি মূলত এই দুনিয়ারই উপযুক্ত না,

ন্যাচরালি বাঁচার তো দূরে যাক, ন্যাচরালি মরার যোগ্যতাও হয়তো আমি রাখি না।

তবু খোদা, আমার ইচ্ছা হচ্ছে, সবাই যেমন আগ্রহ নিয়ে ভোট দেয়,

তেমনি ভোট দিতে,

তেমনি আগ্রহ করতে;

আমার ইচ্ছা হচ্ছে মিছিলের মতো হালকা আর ভাসমান একটা ভিড়ে

নিজেও নিশ্চিন্তে ভেসে যেতে-

যদিও মাঝেমাঝে ভিড়ের দিকে তাকালে ভয়ই হয়,

মনে হয় যত বড়ো ভিড়, তত বড়ো লনলিনেস, তত বড়ো বিষণ্নতা;

তাছাড়া একটা ভূতময় শরীর নিয়ে ভিড়ে মিশে যাওয়াও

সহজ কোনো ব্যাপার না-

আপনার ভূতগুলি অনৈচ্ছিক পেশীর মতো আপনাকে টেনে ধরে রাখে

মিশতে দেয় না,

আপনার কোনো আবদার ওই ভূতগুলি শোনে না-

আপনি কেবল সহ্য করেন, ও অপেক্ষা করেন,

আপনার পেটের ভিতরে আপনার ইচ্ছার বিপরীতে

কত কিছু পরিপাক হয়, কেমনে হয়, কিসে কোষ্ঠকাঠিন্য বাঁধে,

কিছুই বোঝেন না আপনি-

আজ সারাদিন আমিও মূলত সহ্যই করে গেছি এইসব পরিপাক,

আমার ভিতরের ভূতগুলি, আমার অন্ত্রর্গাত্রের কোটি কোটি ব্যাকটেরিয়ার মতো

ইনভিজিবল ভূতগুলি আমারে সারাদিন শাসন করে গেছে;

আমি পারি নাই, খোদা, তাদের আকার-প্রকার বুঝতে;

আমার কোন সুখটা কখন দুঃখে পরিণত হয়,

কোন দুঃখটা সুখে, এবং কখন,

আমি কিছুই জানতে পারি না;

ফলে নিতান্তই আউলাঝাউলা একটা অস্তিত্ব নিয়ে আমাকে ঘুরে বেড়াতে হয়

বিহারী পল্লীতে, যেখানে উর্দুভাষী মেয়েরা লুচি কিনতে এসে

অশ্লীল কৌতুক শুনে মুখ টিপে হাসে-

আমার হাসি পায় না, অশ্লীলও মনে হয় না কিছু-  আমি খালি হেঁটে বেড়াই,

আর দেখি, মানুষের শ্লীল-অশ্লীল ব্যাকরণ, রাষ্ট্রহীন কথোপকথন;

এবং মাঝেমাঝে ধাক্কা দিই দরজায়;

কেউ কেউ খোলে;

কেউ কেউ ঘরের ভিতর থেকে আবছায়া রিপ্লাই দেয়,

মনে হয়, আমারে গ্রাহ্য না করেই যে দুনিয়া এমন নিখুঁতভাবে চলতে পারে,

সেই দুনিয়ার কথা আমি এত কথা ভাবি কেন?

আমার কেন মন চায় ভোটার হইতে? কেন নিজের ভিতরে একটা বিহারী সত্তা

আজীবন পুষে রাখার সাহস হয় না আমার?

কেন নায়ক হইতে ইচ্ছা হয় আমার? মাঝেমাঝে মহানায়ক?

আজ সারাদিন তো একরকম ঘুমায়েই ছিলাম-

আন্ডারগ্রাউন্ডে লুকানো টেরোরিস্টের মতো হুটহাট জেগে উঠে

নিজের হীনতা দেখতে পাইছি আমি-

কিছুটা ভাঙচুর করার বড়ো ইচ্ছা ছিল আমার- কিন্তু পারি নাই;

আমার পাতাল-জীবনের দেয়ালগুলি ভেঙে আমি উঠে আসতে পারি নাই

ঘটনাস্থলে;

বা আমি যখন আসছি, তখন ঘটে গেছে সবকিছু;

বড়ো কিছু ঘটবার তুমুল মোমেন্টগুলি ততক্ষণে নিঃশেষিত;

হাস্যকর দর্শকের মতো শুধু দাঁড়ায়ে থাকছি-

খেলতে পারি না, খেলা দেখতেও ভালো লাগে না-

এবং এরপরও আমি যখন খোদার কাছে হাত তুলে বলি,

খোদা, অন্তত একটা মেট্রো আমার জন্য বাকি রাখো-

তখন আসলেই মনে হয়, খোদা আমার কথা শুনতেছে-

খোদা আমারে ফিরায়ে দেবে না- আসলেই মনে হয়,

আমি মেসেজটা পাব-

যেন এত কান্নার পরে আর কেউ অজান্তেও উপেক্ষা করতে পারে না,

চুপচাপ বসে থাকতে পারে না-

ভিতরের কতগুলি শুভবোধ আর অশুভ-আশঙ্কা খুব প্রকট হয়ে ওঠে এই সময়,

মনে হতে থাকে, আমি আসলে তীব্র সুপারস্টিশাস একজন মানুষ,

সুপার-বিলিভার; এবং একদিন আমি আমার খোদারে পাব,

একদিন ভালোবাসতে পারব;

একদিন খোদা আর ভালোবাসা মিউচুয়ালি এক্সক্লুসিভ হয়ে থাকবে না

আমার জন্য;

একদিন ভোরের আজান শুনে হতচকিত হয়ে তারে জিজ্ঞেস করতে পারব,

‘ঘুমাবা না?’

১০ই ফেব্রুয়ারি ২০২৬

অরিত্র আহমেদ

জন্ম ২০০০ সালে, যশোরে। যশোরের গ্রামাঞ্চলে শৈশব ও কৈশোর অতিবাহিত করেন। পড়াশোনা করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় লোক প্রশাসন বিভাগে। ভালোবাসেন দর্শন, কবিতা ও নির্জনতা। ভালো লাগা থেকে অনুবাদ করেন। এ যাবৎ প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা দুই।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ভাষা
Scroll to Top