Home » কী নিয়ে স্বপ্ন দেখছে ইরানের মানুষ? মিশেল ফুকো, অনুবাদ: ছন্দা মাহবুব

কী নিয়ে স্বপ্ন দেখছে ইরানের মানুষ? মিশেল ফুকো, অনুবাদ: ছন্দা মাহবুব

( ১৯৭৮ সালে, ইরানের শাহর বিরুদ্ধে বিক্ষোভ যখন চরম পর্যায়ে পৌঁছায়, তখন ফরাসির প্রভাবশালী দার্শনিক মিশেল ফুকো Corriere della Sera এবং Le Nouvel Observateur-এর বিশেষ সংবাদদাতা হিসেবে কাজ করছিলেন। সাংবাদিক হিসেবে ফুকো ইরান ভ্রমণ করেন, আয়াতুল্লাহ খোমেনীর মতো নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং বিপ্লব নিয়ে একাধিক প্রবন্ধ লেখেন। ইরানে ফুকোর অভিজ্ঞতা তার চিন্তায় একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় তৈরি করে, যা তার এনলাইটেনমেন্ট, সমকামিতা এবং রাজনৈতিক আধ্যাত্মিকতার অনুসন্ধান সংক্রান্ত ধারণাকে প্রভাবিত করে। ফুকোর ইরান সম্পর্কে লেখাগুলো পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে ইরানের সম্পর্কের ইতিহাস ও ভবিষ্যৎ এবং বৃহত্তরভাবে রাজনৈতিক ইসলামের বোঝাপড়ার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেক ফরাসি বুদ্ধিজীবী তাকে এই অভিযোগে তিরস্কার করেন যে তিনি ইরানের বিপ্লব দ্বারা বিভ্রান্ত হয়েছিলেন। ফুকো এসব সমালোচনার কোনো স্পষ্ট জবাব দেননি, এমনকি ধারণা করা হয় যে, ইরান সম্পর্কে তার পূর্ববর্তী লেখাগুলোর অবস্থান থেকেও তিনি পরোক্ষভাবে সরে এসেছিলেন। অনূদিত এ লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল লে নুভেল অবজারভাত্যর [Le Nouvel Observateur] পত্রিকায় অক্টোবর (১৬-২৩), ১৯৭৮ সংখ্যায়। জ্যানেট আফারি এবং কেভিন বি অ্যান্ডারসন-কৃত ইংরেজি থেকে বাংলায় অনূদিত।লেখাটিতে ব্যবহৃত সকল ফুটনোট অনুবাদক ছন্দা মাহবুবের – সম্পাদক)

“তারা কখনোই তাদের নিজেদের ইচ্ছায় আমাদের ছেড়ে যাবে না। ভিয়েতনামে যেমন করেছিল তার থেকে বেশি ভালো কিছু না হবে না।” আমি বলতে চেয়েছিলাম, ভিয়েতনাম থেকে যাওয়ার জন্য তারা যতটা ইচ্ছুক ছিল তার থেকেও কম ইচ্ছুক এখান থেকে যেতে। কারণ এখানে তেল আছে, মধ্যপ্রাচ্য বলেও কথা। ক্যাম্প ডেভিডে[1]র পর আজ তাদের দেখে মনে হচ্ছে তারা লেবাননকে সিরিয়ার আধিপত্যে এবং পরবর্তী কালে সোভিয়েত বলয়ে ছেড়ে দিতে প্রস্তুত। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পরিস্থিতি মোতাবেক পূর্ব দিক থেকে হস্তক্ষেপ করার বা শান্তি পর্যবেক্ষণ করার এমন সুযোগ থেকে নিজেকে বঞ্চিত করতে প্রস্তুত হবে কি?

আমেরিকানরা কি শাহকে শক্তির নতুন এক পরীক্ষার দিকে, দ্বিতীয় ‘ব্ল্যাক ফ্রাইডে[2]‘-র দিকে ঠেলে দেবে? বিশ্ববিদ্যালয়ে পুনরায় ক্লাস শুরু হওয়া, সাম্প্রতিক ধর্মঘট, আবারও শুরু হতে থাকা গোলযোগ এবং আগামী মাসের ধর্মীয় উৎসবগুলো এমন একটি সুযোগ তৈরি করতে পারে। সাভাকের (SAVAK[3]) বর্তমান নেতা যখন কঠোর এবং লৌহ মুষ্টির  মোগাদাম।

এটা বিকল্প পরিকল্পনা, এই মুহূর্তে যা খুব কাম্য বা সম্ভাব্যও নয়। বেশ অনিশ্চিতও। যদিও কিছু সেনাপতির ওপর নির্ভর করা যেতে পারে, কিন্তু সেনাবাহিনীর ওপর নির্ভর করা যাবে কিনা তা স্পষ্ট নয়। সুনির্দিষ্ট প্রেক্ষাপট থেকে অর্থহীনও বলা যায়, কারণ কোনো “কমিউনিস্ট হুমকি” নেই।  বাইরে থেকে নেই যেহেতু গত পঁচিশ বছর ধরে এই বিষয়ে একমত হওয়া গেছে যে সোভিয়েত ইউনিয়ন ইরানের গায়ে হাত দেবে না। ভেতর থেকেও নেই কারণ আমেরিকানদের প্রতি ইরানিদের যেমন ঘৃণা আছে তেমনই আছে ভয়, সোভিয়েতদের প্রতি।

শাহের উপদেষ্টারা, আমেরিকান বিশেষজ্ঞ, শাসনব্যবস্থার টেকনোক্র্যাট, কিংবা রাজনৈতিক বিরোধী দলের বিভিন্ন গোষ্ঠী (তা সে ন্যাশনাল ফ্রন্ট হোক বা আরও “সমাজতান্ত্রিক-মনোভাবাপন্ন” ব্যক্তিরাই হোক না কেন)[4]— গত কয়েক সপ্তাহে সকলে কমবেশি খুশি মনে সম্মত হয়েছেন যে  একটি  “দ্রুততম অভ্যন্তরীণ উদারীকরণ” প্রক্রিয়ার উদ্যোগ নিতে, কিংবা অন্তত সেটি ঘটতে দিতে। এই মুহুর্তে, রাজনৈতিক নেতাদের কাছে স্প্যানিশ মডেলটি সবচেয়ে পছন্দের[5]। ইরানের জন্য এই মডেল কি সামঞ্জস্যপূর্ণ? এখানে বেশ কিছু কারিগরি সমস্যা রয়েছে। সময় নিয়েও প্রশ্ন আছে -এখনই, নাকি পরে, আরেকটি সহিংস ঘটনা ঘটার পর? ব্যক্তি নিয়েও প্রশ্ন আছে: শাহকে নিয়ে, নাকি তাকে ছাড়া? হয়তো তার ছেলেকে নিয়ে, কিংবা স্ত্রী? আর সাবেক প্রধানমন্ত্রী আমিনি[6]—যিনি এই প্রক্রিয়ার নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য মনোনীত—তিনি কি ইতিমধ্যেই ক্লান্ত ও অকার্যকর হয়ে পড়েননি?

রাজা এবং সাধু

তবে, ইরান ও স্পেনের মধ্যে যথেষ্ট পার্থক্য রয়েছে। ইরানে অর্থনৈতিক উন্নয়নের ব্যর্থতা একটি উদার, আধুনিক, পাশ্চাত্য ধাঁচের শাসনব্যবস্থার ভিত্তি গড়ে তুলতে বাধা দিয়েছে। এর পরিবর্তে, তৃণমূল স্তর থেকে এক বিশাল আন্দোলন গড়ে ওঠেছে, যা এই বছর বিস্ফোরিত হয়ে ধীরে ধীরে পুনর্গঠিত হতে থাকা রাজনৈতিক দলগুলোকে নাড়িয়ে দিয়েছে। এই আন্দোলনই সম্প্রতি তেহরানের পাঁচ লক্ষ মানুষকে রাস্তায় নামিয়ে এনেছে, দাঁড় করিয়েছে মেশিনগান ও ট্যাংকের সামনে ।

তারা শুধু “শাহের মৃত্যু হোক” বলেই স্লোগান দেয়নি, বরং “ইসলাম, ইসলাম, খোমেনি, আমরা আপনাকে অনুসরণ করব” এবং এমনকি “খোমেনিই রাজা” বলেও স্লোগান দিয়েছে।

ইরানের পরিস্থিতিকে ঐহিত্যবাহী দুটি প্রতীকের মধ্যকার এক দ্বন্দ্বযুদ্ধ হিসেবে দেখা যেতে পারে—একদিকে রাজা, অন্যদিকে সাধু; একদিকে সশস্ত্র শাসক, অন্যদিকে সহায়-সম্বলহীন নির্বাসিত ব্যক্তি। স্বৈরাচারী শাসকের মুখোমুখি খালি হাতে রুখে দাঁড়ানো এবং জনগণের অকুণ্ঠ সমর্থন পাওয়া একজন। এই ভাবমূর্তির নিজস্ব একটা শক্তি আছে, তবে এটি এমন এক বাস্তবতাকে কথা বলে যা লক্ষ লক্ষ মৃত মানুষ নির্দিধায় মেনে নিয়েছিল। 

ক্ষমতা কাঠামোতে কোনো বড় ধরনের পরিবর্তন বা ভাঙন ছাড়াই দ্রুত উদারীকরণের ধারণার পূর্বশর্ত হলো তৃনমূল থেকে উঠে আসা গণআন্দোলনকে সিস্টেমের সাথে মিশিয়ে ফেলা অথবা সেটিকে নিষ্ক্রিয় করে দেওয়া। এখানে প্রথমে আন্দাজ করতে হবে যে এই আন্দোলন ঠিক কতদূর এবং কোথায় যেতে চায়। তবে, গতকাল প্যারিসে, আয়াতুল্লাহ খোমেইনি যেখানে আশ্রয় নিয়েছেন, সব ধরনের চাপ সত্ত্বেও ‘সব ভেস্তে দিয়েছেন’।”

তিনি শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে একটি আবেদন জানিয়েছিলেন, একই সঙ্গে তিনি মুসলিম সম্প্রদায় এবং সেনাবাহিনীকেও আহ্বান জানান। তিনি তাদের অনুরোধ করেছিলেন—কুরআনের নামে এবং জাতীয়তাবাদের নামে—তারা যেন নির্বাচন, সংবিধান ইত্যাদি বিষয়ে সবরকম আপসের বিরোধিতা করে।

শাহ-বিরোধী শিবিরের মধ্যে কি একটি বহু-প্রত্যাশিত বিভাজন ঘটছে? বিরোধী শিবিরের “রাজনীতিবিদরা” আশ্বস্ত করার চেষ্টা করছেন, তারা বলছেন“এটা ভালো। খোমেইনি পরিস্থিতিকে তীব্র করে তুলে শাহ ও আমেরিকানদের বিরুদ্ধে আমাদের শক্তিশালী করছে। যাইহোক তার নাম মিছিলের স্লোগান মাত্র, কারণ তার কোনো নির্দিষ্ট কর্মসূচি নেই। ভুলে যাবেন না, ১৯৬৩ সাল থেকে রাজনৈতিক দলগুলোর মুখ বন্ধ করে রাখা হয়েছে[7]। আপাতত আমরা খোমেইনির চারপাশে একত্র হচ্ছি, কিন্তু একবার স্বৈরশাসন বিলুপ্ত হলে এই সব কুয়াশা কেটে যাবে। প্রকৃত রাজনীতি তখন নিয়ন্ত্রণ নেবে, আর আমরা শিগগিরই এই বৃদ্ধ ধর্মপ্রচারককে ভুলে যাব।” কিন্তু গত সপ্তাহের শেষে প্যারিসের উপকণ্ঠে আয়াতোল্লার নামমাত্র গোপন বাসভবনকে ঘিরে যে তীব্র উত্তেজনা দেখা গেল, সেইসাথে “গুরুত্বপূর্ণ” ইরানিদের আনাগোনা হুট করে নেওয়া এই আশাবাদকে নাকচ করে দেয়। এই সবকিছুই প্রমাণ করে যে জনগণের বিশ্বাস সেই রহস্যময় স্রোতের শক্তিতেই আছে যা পনেরো বছর ধরে নির্বাসিত এক বৃদ্ধ এবং তাঁর নাম জপকারী জনগণের মধ্যে প্রবাহিত হচ্ছিল।

কয়েক মাস আগে এই স্রোত সম্পর্কে জানার পর থেকেই এর ধরন এবং বৈশিষ্ট্য আমাকে কৌতূহলী করে তুলেছে। “আমরা জানি তারা কী চায় না, কিন্তু তারা এখনও জানে না যে তারা কী চায়,” সত্যি কথা বলতে, অনেক বুদ্ধিমান বিশেষজ্ঞের মুখে এই কথাটি বারবার শুনতে শুনতে আমি কিছুটা ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম।  

“মানুষ কী চায়?” বিক্ষোভ পরবর্তী দিনগুলোতে এই একটি প্রশ্ন মাথায় নিয়ে আমি তেহরান ও কোমের রাস্তায় হেঁটেছি। পেশাদার রাজনীতিবিদদের এই প্রশ্নটি না করার ব্যাপারে আমি সতর্ক ছিলাম। তাদের পরিবর্তে আমি ধর্মীয় নেতা, ছাত্র, ইসলামের সমস্যা নিয়ে কাজ করা বুদ্ধিজীবী এবং প্রাক্তন গেরিলা যোদ্ধা[8] যারা ১৯৭৬ সালে সশস্ত্র সংগ্রাম ত্যাগ করে প্রচলিত সমাজের ভেতরে থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন আঙ্গিকে কাজ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল- এদের সকলের সাথে দীর্ঘ আলাপ-আলোচনা করতাম।

“আপনি কী চান?” ইরানে যতদিন ছিলাম এই প্রশ্নের উত্তরে আমি একবারও ‘বিপ্লব’ শব্দটি শুনিনি। কিন্তু প্রতি পাঁচজনের মধ্যে চারজনের  উত্তর ছিল “একটি ইসলামী সরকার।”এতে অবাক হওয়ারও কিছু ছিল না। আয়াতুল্লাহ খোমেনী আগেই সাংবাদিকদের কাছে তাঁর সংক্ষিপ্ত প্রতিক্রিয়া হিসেবে এটি জানিয়েছিলেন এবং সেই সময় পর্যন্ত উত্তরটি সেখানেই আটকে ছিল।

ইরানের মতো একটি দেশে, যেখানে বিপুল সংখ্যক মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকা সত্ত্বেও দেশটি আরব বা সুন্নি কোনোটিই নয় এবং সেকারণেই অন্য দেশগুলোর তুলনায় প্যান-ইসলামিজম বা প্যান-আরবিজমের প্রতি কম সংবেদনশীল, সেখানে এর সঠিক অর্থ কী?

প্রকৃতপক্ষে, শিয়া ইসলামে এমন কিছু বৈশিষ্ট্য আছে যা ‘ইসলামি সরকার’ পাওয়ার আকাঙ্ক্ষাকে এক বিশেষ রূপ দেয়। এর সাংগঠনিক কাঠামোর দিকে তাকালে দেখা যায়, এখানে ধর্মীয় যাজকতন্ত্রে (Clergy) কোনো কঠোর স্তরবিন্যাস বা উঁচু-নীচু ভেদাভেদ নেই।  ধর্মীয় নেতারা একে অপরের থেকে বেশ স্বাধীন। তবে তারা তাদের অনুসারীদের (যারা তাদের কথা শোনে) ওপর নির্ভরশীল—এমনকি আর্থিকভাবেও। এখানে বিশুদ্ধ আধ্যাত্মিক কর্তৃত্বকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। চিন্তার প্রতিফলন এবং পথপ্রদর্শন এই দুই ভূমিকা একজন আলেমকে অবশ্যই পালন করতে হয় তার প্রভাব বা ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার জন্য। আর এটাই মূলত এই সংগঠনের ভিত্তি। শিয়া মতাদর্শ যে নীতি মেনে চলে তা হচ্ছে – সর্বশেষ নবীর মাধ্যমেই সত্য সম্পূর্ণ বা সিলগালা হয়ে যায়নি। মুহাম্মাদ (সা.)-এর পর ওহীর আরেকটি চক্র শুরু হয়েছে, ইমামদের অসমাপ্ত চক্র, যারা তাদের বাণী, দৃষ্টান্ত এবং শাহাদাতের মাধ্যমে একটি আলো বহন করেন, যা সর্বদা একই এবং সর্বদা পরিবর্তনশীল। এই আলোই ভেতর থেকে শরিয়াহ বা আইনকে আলোকিত করতে সক্ষম। এটি শুধু সংরক্ষণের জন্যই তৈরি করা হয় না, বরং সময়ের সাথে সাথে এর মধ্যে নিহিত আধ্যাত্মিক অর্থকে উন্মোচন করার জন্যও তৈরি করা হয়। দ্বাদশ ইমাম তাঁর প্রতিশ্রুত প্রত্যাবর্তনের আগে অদৃশ্য থাকলেও, তিনি মৌলিকভাবে বা সম্পূর্ণভাবে অনুপস্থিত নন। মানুষ নিজেই তাঁকে ফিরিয়ে আনে, কারণ যে সত্যের প্রতি তারা জাগ্রত হয়, তা তাদের আরও বেশি আলোকিত করে তোলে।।

সাধারণত বলা হয় যে শিয়া মতাদর্শ অনুযায়ী, ইমামের শাসন ব্যতীত অন্য সকল ক্ষমতা বা শাসনব্যবস্থাই খারাপ। তবে আমরা যেভাবে দেখি, বিষয়গুলো তার থেকেও অনেক বেশি জটিল। এই কথাই আয়াতুল্লাহ শরীয়তমাদারি আমাকে বলেছিলেন আমাদের মিটিং এর  প্রথম কয়েক মিনিটে। তিনি বলেছিলেন “আমরা ইমামের প্রত্যাবর্তনের অপেক্ষায় আছি, তবে এর অর্থ এই নয় যে আমরা একটি সুশাসনের সম্ভাবনাকে বাদ দিয়ে দিচ্ছি। আপনারা খ্রিষ্টানরাও ঠিক এটিই অর্জনের চেষ্টা করছেন, যদিও আপনারা শেষ বিচার দিবসের অপেক্ষায় আছেন।” যেন তাঁর কথাকে আরও বেশি গ্রহণযোগ্য ও বিশ্বাসযোগ্য করে তোলার জন্য, তিনি যখন আমাকে অভ্যর্থনা জানান, তখন তাঁর চারপাশে ইরানের মানবাধিকার কমিটির বেশ কয়েকজন সদস্য উপস্থিত ছিলেন।

একটা বিষয় পরিষ্কার থাকা দরকার। ‘ইসলামী সরকার’ বলতে ইরানে কেউ এমন কোনো রাজনৈতিক শাসনব্যবস্থা বোঝায় না, যেখানে ধর্মগুরুদের তত্ত্বাবধান বা নিয়ন্ত্রণের ভূমিকা থাকবে। আমার কাছে ‘ইসলামী সরকার’ কথাটি দুই ধরনের বিষয়কে নির্দেশ করে বলে মনে হয়েছে।

কেউ কেউ আমাকে কোনো নেতিবাচক ইঙ্গিত ছাড়াই বলেছিলেন এটি “একটা ইউটোপিয়া বা কল্পরাজ্য”। আর বেশিরভাগই বলেছিলেন এটা “একটা আদর্শ”। যাই হোক, এটি একই সাথে খুব পুরোনো এবং সুদূর ভবিষ্যতের একটি বিষয়। নবীর সময়ে ইসলাম যেমন ছিল, সেখানে ফিরে যাওয়ার একটি ধারণা; কিন্তু একই সাথে এমন এক উজ্জ্বল ও দূরবর্তী বিন্দুর দিকে এগিয়ে যাওয়াও, যেখানে আনুগত্য বজায় রাখার পরিবর্তে বিশ্বস্ততার পুনরারম্ভ সম্ভব হবে। এই আদর্শের সন্ধানে, ইসলামের সৃজনশীলতার উপর বিশ্বাসের পাশাপাশি আইনসর্বস্বতার প্রতি অবিশ্বাস- আমার কাছে অপরিহার্য বলে মনে হয়েছিল।

ধর্মীয় ক্ষমতাধর একজন আমাকে ব্যাখ্যা করে বলেছিলেন, যে সকল সমস্যার সমাধান বিষয়ে কুরআনে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু বলার দাবী নেই, সেগুলোকে আলোকিত করার জন্য সুশিল সমাজ, ধর্মীয় বিশেষজ্ঞ, পণ্ডিত এবং বিশ্বাসীদের দীর্ঘ সময়ের কাজ প্রয়োজন হবে। তবে এখানে কিছু সাধারণ দিকনির্দেশনা পাওয়া যায়।  ইসলাম শ্রমের মূল্যায়ন করে। কাউকেই তার শ্রমের ফল থেকে বঞ্চিত করা যাবে না। যা সবার প্রাপ্য (যেমন: পানি, খনিজ সম্পদ) তা কেউ একচেটিয়াভাবে দখল করতে পারবে না। স্বাধীনতার প্রতি শ্রদ্ধা রেখে, সকলকে সম্মান জানানো হবে যতক্ষণ পর্যন্ত তাদের কার্যক্রম অন্যের ক্ষতির কারণ না হয়। সংখ্যালঘুরা সুরক্ষিত থাকবে এবং নিজেদের খুশিমতো জীবনযাপন করতে পারবে এই শর্তে যে তারা সংখ্যাগুরুদের কোনো ক্ষতি করবে না। নারী ও পুরুষের মধ্যে অধিকার বিষয়ে কোনো বৈষম্য থাকবে না, তবে পার্থক্য থাকবে, যেহেতু তাদের মধ্যে প্রাকৃতিকভাবেই ভিন্নতা রয়েছে। রাজনীতির ক্ষেত্রে, সিদ্ধান্তগুলো সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামতের ভিত্তিতে নিতে হবে। নেতারা জনগণের কাছে কাছে দায়বদ্ধ থাকবেন, এবং কুরআনে যেমন বলা হয়েছে, প্রত্যেক ব্যক্তি শাসকের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে ও তাকে জবাবদিহি করতে সক্ষম হবে।

প্রায়শই বলা হয় যে ইসলামী সরকারের সংজ্ঞাগুলো স্বচ্ছ নয়। কিন্তু, এগুলোকে আমার কাছে খুব প্রচলিত মনে হয়েছে, তবে বলতেই হবে, আশ্বস্ত করার মতো স্বচ্ছ না। আমি বললাম, “এগুলো গণতন্ত্রের মৌলিক সূত্র, তা বুর্জোয়া হোক বা বিপ্লবী। অষ্টাদশ শতাব্দী থেকে আমরা এগুলোর পুনরাবৃত্তি করে চলেছি, এবং আপনি জানেন এর পরিণতি কী হয়েছে।”কিন্তু আমি সঙ্গে সঙ্গে যে উত্তর পেলাম তা হলো-“আপনার দার্শনিকদের অনেক আগেই কুরআন এগুলো ঘোষণা করেছিল, এবং যদি খ্রিস্টান ও শিল্পোন্নত পশ্চিমারা এর অর্থ হারিয়ে ফেলে, ইসলাম ঠিকই জানবে এর মূল্য ও কার্যকারিতা কীভাবে রক্ষা করতে হবে।”

যখন ইরানিরা ইসলামী সরকারের কথা বলে, যখন বুলেটের হুমকির মুখে রাজপথে এটিকে স্লোগানে পরিণত করে; যখন এর নামে, সম্ভবত রক্তপাতের ঝুঁকি নিয়েও, বিভিন্ন দল ও রাজনীতিবিদদের বানানো চুক্তি প্রত্যাখ্যান করে, তখন সম্ভবত তাদের মনে সবার কাছ থেকে পাওয়া কিংবা কারো কাছ থেকে না-পাওয়া এইসব ফর্মুলা থাকেনা, অন্য কিছু থাকে। তাদের হৃদয়েও অন্য কিছু থাকে। আমি বিশ্বাস করি যে তারা এমন এক বাস্তবতার কথা ভাবছে যা তাদের খুব কাছাকাছি, যেহেতু তারা নিজেরাই এর সক্রিয় প্রতিনিধি।

এটি সর্বোপরি এমন একটি আন্দোলন বিষয়ে বলে যা ইসলামিক সমাজের ঐতিহ্যবাহী কাঠামোকে রাজনৈতিক জীবনে একটি স্থায়ী ভূমিকা দেওয়ার লক্ষ্য রাখে। একটি ইসলামিক সরকারই পারবে শাহের শাসনকে প্রতিহত করার জন্য মসজিদ ও ধর্মীয় সম্প্রদায়গুলোতে গড়ে ওঠা হাজার হাজার রাজনৈতিক কেন্দ্রের কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে।। আমাকে একটি উদাহরণ দেওয়া হয়েছিল। দশ বছর আগে ফেরদৌস শহরে বড় ধরণের ভূমিকম্প হয়েছিল। পুরো শহরকে পুনর্গঠিত করার প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল। যে পরিকল্পনাটি গ্রহণ করা হয়েছিল তা অধিকাংশ কৃষক এবং ক্ষুদ্র কারিগরদের সন্তুষ্ট করতে পারেনি, ফলে তারা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। একজন ধর্মীয় নেতার নির্দেশনায় তারা কিছুটা দূরে তাদের নিজেদের শহর গড়ার জন্য চলে যায়। পুরো অঞ্চল থেকে তারা তহবিল সংগ্রহ করেছিল। সকলের মতামতের ভিত্তিতে তারা বসবাসের জায়গা নির্বাচন করেছিল, পানি সরবরাহের ব্যবস্থা করেছিল এবং সমবায় সমিতি গঠন করেছিল। তাদের শহরের নাম তারা দিয়েছিল ‘ইসলামিয়া’। ফেরদৌসের ভূমিকম্প ধর্মীয় কাঠামোগুলোকে কেবল প্রতিরোধের কেন্দ্র হিসেবে নয়, বরং রাজনৈতিক সৃজনশীলতার উৎস হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ার একটা সুযোগ তৈরি করে দিয়েছিল। যখন কেউ ‘ইসলামিক সরকারের কথা বলে তখন মূলত এরকম স্বপ্নের[9] কথাই ভাবে।

অদৃশ্য বর্তমান

কিন্তু মানুষ অন্য একটি আন্দোলনের স্বপ্নও দেখে, যা প্রথমটির ঠিক বিপরীত এবং পরিপূরক। সেটা এমন এক আন্দোলন যা রাজনীতিতে আধ্যাত্মিক মাত্রা যোগ করার সুযোগ দেবে, যাতে রাজনীতি—বরাবরের মতো—আধ্যাত্মিকতার পথে বাধা না হয়ে এর সুযোগ এবং বিকাশের ক্ষেত্র হয়ে ওঠে। এখানেই আমরা এমন এক ছায়ার দেখা পাই যা বর্তমানে ইরানের সমস্ত রাজনৈতিক ও ধর্মীয় জীবনকে তাড়া করে ফিরছে। তিনি হলেন আলী শরীয়তী। দুই বছর আগে তার মৃত্যু তাঁকে শিয়া মতবাদে ‘অদৃশ্য বর্তমান’ এবং অনুপস্থিত থেকেও চির-উপস্থিত থাকার  অতি মর্যাদাপূর্ণ স্থানটি দিয়েছে।

ধর্মীয় পরিমণ্ডল থেকে আসা শরীয়তী ইউরোপে পড়াশোনার সময় আলজেরীয় বিপ্লবের নেতাদের সাথে, বিভিন্ন বামপন্থী খ্রিস্টান আন্দোলনের সাথে এবং মার্ক্সবাদী নয় এমন সাম্যবাদী ধারার সাথে যোগাযোগ রেখেছিলেন। (তিনি গুরভিচের ক্লাসেও অংশ নিয়েছিলেন[10]।) তিনি ফানোঁ ও মাসিনিয়োঁর[11] কাজ সম্পর্কে জানতেন। পরে তিনি মাশহাদে ফিরে আসেন এবং সেখানে তিনি শিক্ষা দিতে শুরু করেন। তিনি বলতেন শিয়া মতবাদের প্রকৃত অর্থ সতেরো শতক থেকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পাওয়া ধর্মের মধ্যে খোঁজা উচিত নয়; বরং এটি খুঁজতে হবে সামাজিক ন্যায়বিচার এবং সাম্যের সেই বাণীর মধ্যে, যা প্রথম ইমামগণ প্রচার করে গিয়েছেন। তাঁর ‘সৌভাগ্য’, সরকারি নিপীড়ন তাঁকে তেহরানে যেতে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে একটি মসজিদে তাঁর জন্য প্রস্তুতকৃত একটি নির্দিষ্ট ঘরে পাঠদান করতে বাধ্য করেছিল। সেখানে তিনি যাদের উদ্দেশ্যে বা যে জনসমাগমে কথা বলতেন তারা ছিল তাঁর একান্তই নিজস্ব। তাদের সংখ্যা শীঘ্রই হাজারে পৌঁছে যায়- ছাত্র, মোল্লা, বুদ্ধিজীবী, বাজারের সাধারণ মানুষ এবং মফস্বল থেকে আসা পথচারী সকলে ছিল সেখানে। শরীয়তী একজন শহীদের মতো মৃত্যুবরণ করেন, যখন তাকে তাড়া করা হচ্ছিল এবং তাঁর বইগুলো নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। তার পরিবর্তে তাঁর পিতাকে গ্রেপ্তার করা হলে তিনি নিজে থেকে ধরা দেন। এক বছর কারাগারে থাকার পর এবং নির্বাসনে যাওয়ার কিছুকাল পরেই তিনি এমনভাবে মৃত্যুবরণ করেন যাকে খুব কম মানুষই স্বাভাবিক মৃত্যু বলে মেনে নিয়েছিল। কয়েকদিন আগে তেহরানের বিশাল বিক্ষোভে খোমেনির নামের পাশাপাশি একমাত্র আলী শরীয়তীর নামই উচ্চস্বরে উচ্চারিত হয়েছিল।

রাষ্ট্রের উদ্ভাবকগণ

ইসলামিক সরকারকে একটি ‘ধারণা’ বা এমনকি একটি ‘আদর্শ’ হিসেবে বলতে আমি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি না। বরং, ‘রাজনৈতিক সদিচ্ছা’র একটি রূপ হিসেবে এটি আমাকে বেশি প্রভাবিত করে। বর্তমান সমস্যাগুলোর মোকাবিলায় সামাজিক ও ধর্মীয়ভাবে অবিচ্ছেদ্য কাঠামোগুলোকে রাজনৈতিক রূপ দেওয়ার যে প্রচেষ্টা, তা আমাকে বিশেষভাবে মুগ্ধ করেছে। রাজনীতির ভেতরে একটি আধ্যাত্মিক মাত্রা উন্মোচিত করার এই চেষ্টাও আমাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে।

স্বল্প সময়ের জন্য, এই রাজনৈতিক সদিচ্ছা দুটি প্রশ্ন উত্থাপন করে:

১. ‘আমিনি সলুশ্যন[12]‘ প্রতিরোধ করার জন্য এটি কি যথেষ্ট শক্তিশালী এবং স্থির সংকল্প? ‘আমিনি সলুশ্যনের’এর পক্ষে (অথবা কেউ চাইলে বিপক্ষেও বলতে পারেন) যুক্তি হলো এটি শাহের কাছে গ্রহণযোগ্য, বিদেশি শক্তিগুলোর দ্বারা সুপারিশকৃত, এবং পশ্চিমা ধাঁচের সংসদীয় শাসনব্যবস্থা এর লক্ষ্য। এটি নিঃসন্দেহে ইসলাম ধর্মকে বিশেষ মর্যাদা প্রদান করবে।

২. এই রাজনৈতিক সদিচ্ছার মূল কি ইরানের রাজনৈতিক জীবনে একটি স্থায়ী শক্তিতে পরিণত হওয়ার মতো যথেষ্ট গভীর, নাকি এটি মেঘের মতো মিলিয়ে যাবে, যখন রাজনৈতিক বাস্তবতার আকাশ পরিষ্কার হয়ে যাবে এবং যখন আমরা বিভিন্ন কর্মসূচি, রাজনৈতিক দল, সংবিধান, পরিকল্পনা এবং এই জাতীয় বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলতে পারব?

রাজনীতিবিদরা হয়তো বলবেন যে, এই দুটি প্রশ্নের উত্তরের ওপরই আজ তাঁদের অনেক কৌশল নির্ভর করছে। তবে, এই ‘রাজনৈতিক সদিচ্ছা’র বিষয়ে আরও দুটি প্রশ্ন রয়েছে যা আমাকে আরও গভীরভাবে ভাবিয়ে তুলছে।

একটি প্রশ্ন ইরান এবং তার অদ্ভুত নিয়তির সাথে সম্পর্কিত। ইতিহাসের ঊষালগ্নে পারস্য, রাষ্ট্রের উদ্ভাবন করেছিল এবং এর মডেল ইসলামের হাতে তুলে দিয়েছিল। এর প্রশাসকেরাই খিলাফতের পর্ষদ পরিচালনা করতেন। কিন্তু এই একই ইসলামের ভিতর  থেকে,  এটি এমন এক ধর্ম গ্রহণ করেছিল যা তার জনগণকে রাষ্ট্রশক্তির প্রতিরোধের জন্য অসীম শক্তি জুগিয়েছিল। এই “ইসলামিক সরকার” প্রতিষ্ঠার ইচ্ছার মধ্যে কি একটি মীমাংসা, একটি দ্বন্দ্ব, নাকি নতুন কিছুর সূচনা দেখা উচিত?

অন্য প্রশ্নটি পৃথিবীর এই ছোট্ট ভূখণ্ডটি নিয়ে, যার মাটির উপরে এবং নিচে—উভয়ভাগের সম্পদই বৈশ্বিক পর্যায়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অর্থ বহন করে। এই ভূমিতে বসবাসকারী মানুষের কাছে নিজেদের জীবনের বিনিময়ে হলেও এমন একটি জিনিসের খোঁজ করার সার্থকতা কী, যার সম্ভাবনা আমরা রেনেসাঁ এবং খ্রিস্টধর্মের সেই বিশাল সংকটের পর থেকে ভুলে গিয়েছি—আর তা হলো  ‘রাজনৈতিক আধ্যাত্মিকতা’ । আমি এখনই ফরাসিদের হাসির শব্দ শুনতে পাচ্ছি, কিন্তু আমি জানি যে তারা ভুল।


[1] ১৯৭৮ সালের সেপ্টেম্বরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টারের মধ্যস্থতায় ইসরায়েল ও মিশরের মধ্যে স্বাক্ষরিত ঐতিহাসিক শান্তি চুক্তি, যার মাধ্যমে মিশর প্রথম আরব রাষ্ট্র হিসেবে ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেয়।

[2] ১৯৭৮ সালের ৮ সেপ্টেম্বর তেহরানের জালেহ স্কয়ারে বিক্ষোভকারীদের ওপর শাহ’র সেনাবাহিনীর রক্তক্ষয়ী গণহত্যাকান্ড ইরানের ইতিহাসে ব্ল্যাক ফ্রাইডে নামে পরিচিত

[3] ১৯৭৮ সালে জেনারেল নাসের মোগাদাম ইরানের কুখ্যাত রাজনৈতিক পুলিশ বাহিনী সাভাক (SAVAK)-এর প্রধান নিযুক্ত হন এবং বিপ্লবের পর ১৯৭৯ সালে তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়

[4] ১৯৪৯ সালের অক্টোবরে প্রতিষ্ঠিত ন্যাশনাল ফ্রন্ট ছিল একটি ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তাবাদী দল। ১৯৭৮ সালে করিম সানজাবি এই দলটির প্রতিনিধিত্ব করেন।

[5] ১৯৭৫ সালে স্বৈরশাসক ফ্রান্সিসকো ফ্রাঙ্কোর মৃত্যুর পর, স্পেন ফ্যাসিবাদী একনায়কতন্ত্র থেকে সাংবিধানিক রাজতন্ত্রে দ্রুত এবং তুলনামূলকভাবে শান্তিপূর্ণভাবে রূপান্তরিত হয়। ১৯৭৭ সালে চল্লিশ বছরের মধ্যে প্রথম অবাধ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল, যখন বামপন্থী দলগুলো সংসদীয় ক্ষমতায় জয়লাভ করে।

[6] আলী আমিনি ছিলেন একজন মধ্যপন্থী রাজনীতিবিদ, যিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ বলে বিবেচিত হতেন। ১৯৭৮ সালের সেপ্টেম্বরে, তিনি শাহকে সরাসরি শাসন থেকে সরে আসতে এবং সকল বিরোধী দলকে একত্রিত করে একটি জোট সরকারকে ক্ষমতা গ্রহণের সুযোগ দিতে পরামর্শ দেন।

[7] এই সময়কালে সরকার দুটি দল গঠন করেছিল, মারদোম পার্টি (জনগণের দল) এবং ইরান-ই নভিন পার্টি (নতুন ইরান দল)।

[8] মার্ক্সবাদী-লেনিনবাদী ফেদায়িন খালক এবং ইসলামপন্থী বামপন্থী মুজাহিদিন খালকের গেরিলা কার্যকলাপের উপর শাহের দমনপীড়নের ফলে তাদের তিন শতাধিক সদস্য নিহত হয়। এরপর কেউ কেউ এই ধরনের রাজনীতি ত্যাগ করলেও, অন্যরা থেকে যায়, যার ফলে ১৯৭৮-৭৯ সালে প্রধানত ছাত্র বামপন্থার মধ্যে এই গোষ্ঠীগুলোর উত্থান ঘটে।

[9] ফুকো এখানে ফরাসী শব্দ Songe শব্দ ব্যবহার করেছেন, যা স্বপ্ন এবং দিবাস্বপ্ন দুটোই বোঝায়  

[10] জর্জেস গুরভিচ (১৮৯৪-১৯৬৫) ছিলেন একজন বিশিষ্ট ফরাসি সমাজবিজ্ঞানী এবং ‘অটোজেস্টন’ (স্ব-ব্যবস্থাপনা) নামক জার্নালের প্রতিষ্ঠাতা।

[11] ফ্রাঞ্জ ফানোঁ (১৯২৫-৬১), ক্যারিবীয় বংশোদ্ভূত দার্শনিক, সাংবাদিক এবং মনোবিজ্ঞানী, প্রায়শই ১৯৫০ ও ১৯৬০-এর দশকের আফ্রিকান মুক্তি সংগ্রামের সর্বশ্রেষ্ঠ চিন্তাবিদ হিসেবে বিবেচিত হন। শরিয়তি তাঁর কিছু কাজ ফারসি ভাষায় অনুবাদ করেছিলেন। লুই মাসিনিয়ঁ (১৮৮৩-১৯৬২), একজন শীর্ষস্থানীয় ফরাসি প্রাচ্যবিদ, বিশেষত সুফি এবং অন্যান্য ইসলামী মরমী সাধকদের উপর তাঁর লেখার জন্য পরিচিত।

[12] আলী আমিনি ছিলেন ইরানের একজন বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী (১৯৬১-১৯৬২)। ফুকো তাঁর লেখায় “আমিনি সমাধান” (Amini solution) বলতে ১৯৭৯ সালের বিপ্লব থামানোর জন্য একটি মধ্যপন্থী এবং সংস্কারবাদী পদ্ধতির কথা বুঝিয়েছেন।

ছন্দা মাহবুব

জন্ম ১৯৭৭ সালে, ঢাকায় । পড়াশোনা করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃত্তিকা বিজ্ঞান এবং ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট এন্ড ভালনারেবিলিটি স্টাডিজ বিভাগে। পেশায় বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার কর্মী ।
নানা বিষয়ে অনুবাদ করেছেন । বিশেষ আগ্রহ শিশুতোষ সাহিত্য অনুবাদে । অনূদিত ও সম্পাদিত বই ৯টি । উল্লেখযোগ্য অনুবাদ বই: কাগজের হাজার সারস (২০১৮), কোরিয়ার কবিতা (২০১৯), কাফকা ও ভ্রমণ পুতুল (২০২২), ঈশ্বর তুমি কি শুনছ? আমি মার্গারেট বলছি (২০২১), কিম সওলের শত কবিতা (২০২৩), পিপ্পি লংস্টকিং (২০২৫)।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ভাষা
Scroll to Top