Home » আশানুর রহমানের দুটি নভেলাঃ প্রেম, বৃষ্টি আর নীরবতার গল্প // ছন্দা মাহবুব

আশানুর রহমানের দুটি নভেলাঃ প্রেম, বৃষ্টি আর নীরবতার গল্প // ছন্দা মাহবুব

পেশায় ব্যাংকার আশানুর রহমান ছাত্র জীবনে পরিবর্তনবাদী রাজনীতির সাথে যুক্ত ছিলেন। তার একমাত্র উপন্যাস লেনিন  পাঠকমহলে ব্যাপক সাড়া ফেলে এবং এ উপন্যাসের জন্য তিনি আন্তর্জাতিক ক্রিয়েটিভ আর্টস অ্যাওয়ার্ডে ভূষিত হয়েছেন। এছাড়া প্রকাশিত হয়েছে তার গল্পগ্রন্থ ভোর ও বারুদের গল্প । এবারের বইমেলায় প্রথমা প্রকাশন থেকে প্রকাশিত দুটি নভেলা—প্রথম প্রেম ছায়ার আঙিনাযা এক মলাটে সংকলিত হয়েছে – সম্পাদক

আশানুর রহমানের দুটি নভেলা—প্রথম প্রেম ও ছায়ার আঙিনা—যা এক মলাটে সংকলিত। দুটি নভেলাই প্রেমের কাহিনী নিয়ে, মুলত বলা যায় এমন বিষয়কে কেন্দ্র করে যা সাহিত্যে দীর্ঘদিন ধরেই জনপ্রিয় বিষয় হিসেবে বিবেচিত—ত্রিভুজ প্রেম, শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্ক, এবং আবেগের জটিল টানাপোড়েন। এই উপাদানগুলো স্বভাবতই গভীর মনস্তাত্ত্বিক অনুসন্ধান, নৈতিক দ্বন্দ্ব এবং সূক্ষ্ম বর্ণনাশৈলীর দাবি রাখে। সেই দাবি পূরণের জন্য আশানুর রহমানের আন্তরিক চেষ্টা চোখে পড়ে।

বইয়ের প্রথম নভেলা ‘প্রথম প্রেম’। শিক্ষক, ছাত্রী এবং ছাত্রীর মা – এই তিনজনকে নিয়ে গল্প এগিয়েছে একটু একটু করে। গল্পের নামের সাথে যেমন ইভান তুর্গেনেভের উপন্যাস ‘প্রথম প্রেম’ এর মিল আছে তেমনি কাহিনিতেও বেশ কিছু মিল দেখা যায়, যদিও ভিন্ন পরিবেশে, ভিন্ন আঙ্গিকে। পুরো গল্পেই বারবার ঘুরে ফিরে এসেছে তুর্গেনেভের কথা, তার উপন্যাসের কথা, প্রেমের সংজ্ঞার কথাও। মূল চরিত্র যেহেতু সাহিত্যের শিক্ষক, তাই খুব কাব্যিক ঢঙে এগিয়েছে সম্পর্কগুলোর বুনন। রূপক ও অলংকারের প্রাচুর্য লেখার ভঙ্গিকে এক ধরনের কাব্যিকতা যেমন দিয়েছে, তেমনি মাঝে মাঝে বর্ণনার স্বাভাবিক ছন্দকেও ধীর করেছে, আচ্ছন্ন করেছে পাঠের স্বচ্ছতাকেও।

যেকোনো লেখাতেই চরিত্রকে ফুটিয়ে তোলা এবং সম্পর্কের বিকাশ একটা সময় সাপেক্ষ বিষয়। কিন্তু নভেলা বলেই হয়তো লেখকের তাগিদ ছিল দ্রুত করার। ছাত্রী মায়া, শিক্ষক আরমান আর মায়ার চাকরীজীবী মা নাজনিনের মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন আবেগ বা দ্বিধা যে সম্পর্ককে পাঠকের কাছে তুলে ধরে সেটা প্রেম, বন্ধুত্ব, শ্রদ্ধা নাকি দূরত্ব তা খুব স্পষ্ট করে বোঝা যায় না। হয়তো এক্ষেত্রে লেখক চেয়েছেন পাঠকের উপর নির্ভর করতে। কারণ নানা উপমা এবং রূপকের মধ্যে দিয়ে বারবার যে কথাটি ঘুরে ফিরে এসেছে তা হচ্ছে প্রেমের, বিশেষ করে প্রথম প্রেমের কোনো সংজ্ঞা হয় না। প্রেম একেজনের কাছে একেক রকম। কারো কাছে তা নীরবতা, কারো কাছে শ্রদ্ধা, কারো কাছে ছেড়ে দিয়ে ফিরে পাওয়া। মায়া, আরমান এবং নাজনীনকে নিয়ে যে সম্পর্ক লেখক উপস্থাপন করেছেন সেরকম সম্পর্কের উপস্থাপনে নৈতিকতা, ক্ষমতার ভারসাম্য এবং মানসিক জটিলতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এই গল্পে জটিলতার গভীর অনুসন্ধান চোখে পড়ে চরিত্রগুলোর কথোপকথন এবং চিন্তার বিন্যাস থেকে। ঘটনার মৃদু প্রবাহ একে একে তিনটি চরিত্রকে যথাযথ অবস্থানে স্থির করলেও, সম্পর্কের অন্তর্নিহিত আবেগ পাঠকের ধরাছোয়ার বাইরেই থেকে যায়, এবং পাঠকের মনে গভীর কিছু হারিয়ে ফেলার অতৃপ্তি জেগে উঠে।

গল্প বলার ঢঙে লেখকের সাবলীলতা চোখে পড়লেও অনেক ক্ষেত্রে রেটোরিক বাক্য সহজ-সরল দৈনন্দিন যাপন এবং সম্পর্ককে জটিল করে তোলে। যেমন মায়া যখন মাকে জিজ্ঞেস করে – ‘মা তুমি কি ক্লান্ত?’ তখন নাজনীনের উত্তর ‘ক্লান্তি দিয়ে মানুষ মাপা যায় না’ মা এবং মেয়ের সম্পর্কের স্বাভাবিক ছন্দকে একটু হলেও হোঁচট খাওয়ায়। বৃষ্টি, জল, ভিজে যাওয়া, সোঁদা মাটির গন্ধ – শব্দগুলো বারবারই ফিরে এসেছে গল্পে। গল্পের মূল সুর এবং পাঠকের অনুভূতি দুটোই নমনীয় হয়েছে তাতে। মাঝে মাঝে হঠাৎ হঠাৎ মায়ার মধ্যে প্রথম প্রেমের আগুনে ঝলকানি দেখা গেলেও, বেশিরভাগ সময়েই তা ফিরে এসেছে বৃষ্টি জলের কাছে।

গল্পের শেষে মায়া যখন তার প্রথম উপন্যাস ‘প্রথম প্রেমের দেশ’-এর শেষ অধ্যায় লিখে শ্রান্তিতে বা তৃপ্তিতে চেয়ারে হেলান দিয়েছে তখন তার কাছে আরমানের ক্ষুদে বার্তা আসে ‘আজ তোমার বই পড়লাম। তুমি যেখানে প্রথম প্রেম কে দেশ বানিয়েছ……’। শেষ অধ্যায় লেখার আগেই বই পড়ে ফেলার বিষয়টি লেখকের অসাবধানতা নাকি এর মধ্যে অন্য কোনো বিষয় আছে, তা পাঠকের কাছে ধাঁধাঁ হিসেবেই থেকে যায়।   

দ্বিতীয় নভেলা ‘ছায়ার আঙিনা’ও ত্রিভুজ প্রেমের (নাকি বন্ধুত্ব)। একদা ছাত্র এবং বর্তমানে সহকর্মী রোহান এবং অধ্যাপক অনন্যার মধ্যে যেটুকু আবেগ, বুনন, দূরত্ব, নীরবতা, সম্ভ্রম তাকে অনেক ক্ষেত্রেই বন্ধুত্ব বলেই ভ্রম হয়। প্রেমের তুমুল ভাংচুর, হুড়মুড় ভাব এখানে নেই। হতে পারে সেটা বয়স এবং পেশাগত অবস্থানের প্রভাব। কিন্তু সামান্য কথা বলা, মনে মনে ভালো লাগা (ভালোবাসা টাইপের শব্দ চোখে পড়ে না), কিংবা মনে মনে রোহানের প্রতি কিছুটা ঝুঁকে পড়ায় অনন্যা যখন অপরাধবোধ বা নৈতিকতার টানাপোড়নে ভুগে তখন পাঠক হিসেবে কিছুটা বিভ্রান্ত হতেই হয়। এর কারণ কী অনন্যা বিবাহিত, তাই? বিবাহিত নারীদের বন্ধু থাকা, কথা বলতে ভালো লাগা – এসব  কী তাহলে অপরাধ? স্বাভাবিক এমন অনেক প্রশ্নই মাথায় আসে। অনন্যার স্বামী অরজিতের মধ্যে যে প্রেম অনন্যার প্রতি সেই প্রেমও আমাদের পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা তুলনায় বেশ উদার। অরিজিত অনন্যাকে ছেড়ে দিয়ে অপেক্ষা করে ফিরে আসার। ত্রিভুজ সম্পর্কে কাউকে ফিরতে হলে আরেক জনকে ছেড়েই আসতে হয়। এটা খুব সাধারণ গাণিতিক সমাধান। এই গল্পও তাই বলা যায় ফিরে আসার কিংবা ছেড়ে যাওয়ার মধ্যেই শেষ হয়। যদিও লেখক বারবার বলতে চেয়েছেন ‘চলে যাওয়া মানে প্রস্থান নয়।’

‘প্রথম প্রেম’ এবং ‘ছায়ার আঙিনা’ দুটো আলাদা গল্প এবং দুটো গল্পেই তিনটি করে চরিত্র। তিনটি চরিত্র তিনটি চরিত্রকে ঘিরেই আবর্তিত হয়েছে। প্রথম গল্পের ডমিনেন্ট থিম যদি হয় প্রেম তাহলে দ্বিতীয় গল্পেরটা নৈতিকতা। এ দুটো বিষয়ই মূলত আলোচনার বিষয়বস্তু ছয়টি চরিত্রের মধ্যে। আলাদা কাহিনি হওয়া সত্ত্বেও চরিত্রগুলোর ভাষা আবেগ এবং অভ্যাসের মধ্যে সাদৃশ্য চোখে পড়ে, যেমন নোটবুকে একটা/দুটো লাইন টুকে রাখা, বৃষ্টি এবং সোঁদা মাটির গন্ধ ভালো লাগা, নীরবতা পছন্দ করা এরকম। এই সাদৃশ্য মূলত চরিত্রগুলোর প্রেমকেই প্রকাশ করতে চেয়েছে, এবং এক্ষেত্রে বলতেই হয় প্রেমের অনুভূতি দুনিয়াজুড়ে একই রকম।

ভাষা ও বর্ণনাশৈলীর দিক থেকেও বইটি নিঃসন্দেহে সুখপাঠ্য। সংবেদনশীল ও শিল্পসম্মত নান্দনিক ভাষার ব্যবহার প্রশংসাযোগ্য। সবথেকে উল্লেখযোগ্য বইটি এমন কিছু সম্পর্ককে সামনে আনতে চেয়েছে যা সমাজে অনেক সময় অস্বস্তিকর বা অনুচ্চারিত থেকে যায়। এই বিষয় নির্বাচনের মধ্যে একটি সাহসিকতা রয়েছে, যা পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।

বইয়ের প্রকাশক প্রথমা প্রকাশন, প্রকাশ : ২০২৬, পৃষ্ঠা সংখ্যা : ১২০

ছন্দা মাহবুব

জন্ম ১৯৭৭ সালে, ঢাকায় । পড়াশোনা করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃত্তিকা বিজ্ঞান এবং ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট এন্ড ভালনারেবিলিটি স্টাডিজ বিভাগে। পেশায় বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার কর্মী ।
নানা বিষয়ে অনুবাদ করেছেন । বিশেষ আগ্রহ শিশুতোষ সাহিত্য অনুবাদে । অনূদিত ও সম্পাদিত বই ৯টি । উল্লেখযোগ্য অনুবাদ বই: কাগজের হাজার সারস (২০১৮), কোরিয়ার কবিতা (২০১৯), কাফকা ও ভ্রমণ পুতুল (২০২২), ঈশ্বর তুমি কি শুনছ? আমি মার্গারেট বলছি (২০২১), কিম সওলের শত কবিতা (২০২৩), পিপ্পি লংস্টকিং (২০২৫)।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ভাষা
Scroll to Top